এক পলকে জান্নাত ভ্রমণ

এক পলকে জান্নাত ভ্রমণ : জান্নাতের সংক্ষিপ্ত বিবরন

মুমিন যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাঁরা একটি ঘোষণা শুনতে পাবে:

  • আপনি এখানে সুস্থ থাকবেন চিরকাল এবং কোনদিন রোগাক্রান্ত হবেন না
  • আপনি এখানে চিরকাল জীবিত থাকবেন এবং কখনও মৃত্যু বরণ করবেন না
  • আপনি অফুরন্ত নেয়ামত রাজি পেতে থাকবেন, যা কোন কালেই শেষ হবেনা

জান্নাতের ভৌত বিন্যাস

জান্নাতের ভবন গুলো তৈরি করা হয়েছে স্বর্ণ এবং রৌপ্য নির্মিত ইট দিয়ে।
শোভা বর্ধনের জন্য ইয়াকুত তথা হীরা-মানিকের মত রত্নরাজি দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়েছে।
ভবনের রং বে-রঙের আস্তরণ থেকে বের হয় কস্তূরীর সুঘ্রাণ।
জাফরান দিয়ে তৈরি হয়েছে বালি ও ইটের গাঁথুনি।

জান্নাতের তোরণ তথা গেইট

জান্নাতের আটটি তোরণ তথা প্রধান গেইট আছে।
প্রত্যেকটি গেইট ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদায় অভিষিক্ত।
দুনিয়ার জীবনে সৎকর্মের ধরণ ও প্রকৃতি অনুসারে, ভাগ্যবান ও সম্মানিত ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন তোরণ দিয়ে প্রবেশ করবে।
নামাজিরা এক গেইট দিয়ে, রোজাদার অন্য গেইট দিয়ে, দানশীলেরা আরেক গেইট দিয়ে প্রবেশ করবে…..

জান্নাতের আটটি দরজার নাম ও পরিচয়:

  • ১.      জান্নাতুল মাওয়া
  • ২.      দারুল মাকাম
  • ৩.      দারুস সালাম
  • ৪.      দারুল খোলদ
  • ৫.      জান্নাতুল আদন
  • ৬.      জান্নাতুন নাঈম
  • ৭.      জান্নাতুল কাশিফ
  • ৮.      জান্নাতুল ফেরদাউস

জান্নাত গুলোর মধ্যে তুলনামূলক ব্যবধান প্রায় এই রকম

  • জান্নাত উল মাওয়া হল উত্তম শ্রেণীর।
  • জান্নাত উল ফেরদাউস হল সর্বোত্তম শ্রেণীর।
  • জান্নাত উল আদন হল উভয়ের মাঝামাঝি শ্রেণীর।

জান্নাতের খাবার

জান্নাতিরা প্রথমেই নিরবচ্ছিন্ন ৪০ বছর ধরে সুস্বাদু খাবার ও ফল খেতে থাকবে।
খাদ্যের প্রতিটি গ্রাস আগের টির চেয়ে ভিন্ন স্বাদের হবে।
তৃপ্তিদায়ক ঢেকুরের মাধ্যমে তাদের খাদ্য কণা হজম হবে।
মনোহর সুগন্ধি ঘামের মাধ্যমে দেহের জলীয় জৈব বের হবে।
ফলে জান্নাতের অধিবাসীরা না পায়খানা করবে আর না প্রস্রাব করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করবে।

জান্নাতে নিদ্রা ও বিশ্রামের ধরণ

জান্নাতিরা কোনদিন হয়রান হবেনা, চিরকাল তরুণ, তরতাজা ও সতেজ থাকবে।
ফলে তাদের পরিশ্রান্তের কারণে ঘুমের দরকার হবেনা।
তবে তারা আনন্দ উপভোগ, মজাদার কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনার সময় হেলান দিয়ে কিংবা পাশ্বদেশ ঠেস দিয়ে পরিবেশ, পরিবেশনা, উপস্থাপনা উপভোগ করবে।
সেখানেও তাদের কষ্ট করতে হবেনা।
সকল প্রকার সেবা জান্নাতের নিদ্দিষ্ট চাকর তথা গেলমানেরা করবে।

গেলমান কারা কি তাদের পরিচয়

এখনও যৌবনে পদার্পন করেনি, যৌবন সম্পর্কে ধারণাও জন্মেনি কিন্তু সকল কিছুর সাথে পরিচয় আছে
প্রয়োজন মত হুকুম পালন করতে পারে কিন্তু যৌনতা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ এমন ছেলেরাই হবে গেলমান।
জান্নাতিদের খুশী করতে পারলে তারা আনন্দিত হবে, জান্নাতি ব্যক্তির অন্তরে কি আশা পোষণ করছে, তারা চোখ দেখলেই বুঝতে পারবে এবং নিজ উদ্দেগ্যে সাথে সাথেই তা হাজির করবে।
এমন মনোবৃত্তি দিয়ে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।

জান্নাতের উদ্ভিদ রাজি

জান্নাতে সুদৃশ্যনয়নাভিরাম বাগান রয়েছে। প্রতিটি বাগানের ব্যাপ্তি হবে, একজন মানুষের একশত বছরের যাত্রার সমান। বাগানের ছায়া হবে বিস্তৃত, ঘন ও নিবিড়।
জান্নাতের কোন গাছে কাঁটা থাকবেনা। গাছের পাতা হবে হাতির কানের ন্যায় বড়। ফলসমূহ লটকানো থাকবে সারি সারি, থোকায় থোকায়।

জান্নাতে কলা, ডালিম, বরই, খেজুর, আঙ্গুর সহ সকল ধরনের ফলের সমাহার থাকবে পাওয়া যাবে, যত ইচ্ছে খেতে পারবে

জান্নাতের খেজুর ছড়ার প্রতিটি শলাকার দৈর্ঘ্য হবে ১২ হাত লম্বা। প্রতিটি খেজুরের আকৃতি হবে একটি কলসের ন্যায় বড়। এগুলো হবে মধুর চেয়েও মজাদার, দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও কোমল এবং এতে থাকবেনা কোন বিচি।
বিশাল আকৃতির বাগানে গুচ্ছ আকারে ঝুলতে থাকবে আঙ্গুর। বিরাট আকৃতির গুচ্ছে প্রতিটি আঙ্গুর হবে কলসের ন্যায় বড়। বাগানের এসব গাছের কাণ্ড হবে স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা নির্মিত।
একজন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রশ্ন করেন ইয়া রাসুলুল্লাহ, এসব খাদ্য, উপকরণ একজনের জন্য যথেষ্ট কিনা? রাসুল (সাঃ) উত্তরে বলেছেন, এসব তুমি এবং তোমার পুরো বংশধরদের জন্যই যথেষ্ট

জান্নাতের বাসস্থানের ধরণ ও প্রকৃতি

যারা দুনিয়ার ক্ষণকালের জীবনে পরস্পরকে ভালবেসেছে শুধুমাত্র আল্লাহর কারণে।
তারা জান্নাতে পাবে প্রচুর পরিমাণ মূল্যবান রত্নরাজি, দামী উপঢৌকন, পর্যাপ্ত সুবিধাদি।
তাদের জন্য দেওয়া হবে, দৃষ্টি নন্দন আকৃতির, অভিনব অঙ্কনের, চিত্তাকর্ষক প্রাসাদ সম বাড়ী।
যার তলদেশে থাকবে সদা প্রবাহমান ঝরনা। জান্নাতের কোন প্রাসাদ একটি আরেকটির মত হবেনা এমন কি কাছাকাছি ধরণেরও হবেনা।

প্রাচুর্য ময় সে সকল প্রাসাদের সুবিধাদি

প্রতিটি প্রাসাদে আছে বৃহদাকার ৭০ হাজার কক্ষ! প্রতিটি কক্ষে আছে ৭০ হাজার সুসজ্জিত খাবার আসন। প্রতিটি খাবার আসনে পরিবেশিত হবে ৭০ হাজার রকমের খাদ্য দ্রব্য।
কক্ষগুলো তেমনি আলোকিত হবে, যেমনি দুনিয়ার জীবনে সূর্যলোকে আলোকিত হয়। জান্নাতে কোন রাত নাই, তাই সর্বক্ষণ দিনের আলো বিরাজিত থাকবে
প্রত্যেকের প্রাসাদের গঠন, ধরণ, সৌন্দর্য ও সাজানোর প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির হবে! ফলে একজনের বাড়ী অন্য জন দেখতে যাবে। দেখতে যাবার সময় প্রচুর অনুচর, সাথী, বন্ধুদের নিয়ে যাওয়া হবে, তাদের মেহমান দারী করানো হবে।
এসব পরিবেশনের জন্য নিয়োগ থাকবে মায়াবী চেহারার ৮০ হাজার কিশোর; যাদের পোশাক থেকে সদা নির্গত হবে মোতির ঝিলিক।

জান্নাতীদের পোশাক

জান্নাতের পোশাক হবে, অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয়। সূক্ষ্ম, মোলায়েম ও মার্জিত। ওজন হীন, বহু বর্ণের ও রত্নরাজি সজ্জিত।
জান্নাতিরা এমন পোশাক পরিধান করবে, যা অতি সূক্ষ্ম ও মিহি তন্তুর মাধ্যমে তৈরি হবে।
পোশাক পরিধান করলে দেহের ভিতর দেখা যাবে! এমন কি চামড়ার নীচে শিরায় রক্তের প্রবাহ দৃশ্যমান হবে!
এভাবে একজন একসাথে ৭০ টি পোশাক পরিধান করতে পারবে!
এ পোশাক কখনও পুরানো হবেনা, কখনও ময়লা হবেনা, কখনও ছিঁড়েও যাবেনা
এমনকি একটি পোশাক অন্য আরেক জনের ব্যবহৃত পোষাকের মত হবেনা!
জান্নাতের সকল গোলামদের পোশাক হবে মনি-মুক্তা খচিত।

জান্নাতের দাড়োয়ান

জান্নাতে নিজের প্রাসাদে ঢুকার সময়, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের, চিত্তাকর্ষক কারুকাজে সজ্জিত পোষাকে দণ্ডায়মান এক সুদর্শন যুবককে দাঁড়ানো দেখবে
জান্নাতিরা প্রশ্ন করবে, জনাব আমার প্রাসাদে ঢুকার নিয়ম কি, তার অনুমতি কিভাবে পেতে পারি?
সুদর্শন যুবক খুবই লজ্জিত হয়ে, অমায়িকতার সাথে উত্তর দেবে, জনাব আমাকে আপনার প্রাসাদের দ্বাররক্ষক নিযুক্ত করা হয়েছে।
আমি চিরদিন আপনার হয়েই থাকব, চির বিশ্বস্ত থাকব, আমাকে যা আদেশ করবেন তা হুবহু পালন করা হবে।

জান্নাতে প্রবাহমান ঝরনা থাকবে

প্রতিটি জান্নাতে চারটি প্রবাহমান ঝরনা থাকবে। এসব ঝরনা জান্নাতিদের জন্য বানানো প্রাসাদের পার্শ্বদেশ, তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকবে। প্রাসাদের একপাশে বাগান আর অন্যপাশে লেকের মত মোহনীয় সৌন্দর্য ধারণ করে, দিগন্ত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সদা প্রবাহিত হতে থাকবে।

জান্নাতে অবস্থিত ৪টি ঝরনার উপাদান পৃথক হবে, তা যথাক্রমে

  • ১.     পানি
  • ২.     দুধ
  • ৩.     মধু
  • ৪.     শরাবান তহুরা
বলা হয়েছে, এগুলো দেখতে দুনিয়ার এসব উপকরণের মত মনে হলেও, এগুলো খেতে দুনিয়ার এসব সৃষ্টির চেয়ে বহুগুনে আকর্ষনীয়, মজাদার ও সুস্বাদু হবে।
প্রতিটি চুমুকে নতুন নতুন স্বাদ পাওয়া যাবে, যা আগেরটির মত হবেনা। ফলে জান্নাতিরা যতই পান করতে থাকবে একই পানীয়ের মাঝে কোন কালেই তৃপ্তি মিঠবে না।

জান্নাতে ফোয়ারা (ফাউন্টেন) থাকবে!

জান্নাতে তিনটি আলোচিত ফোয়ারা বা ফাউন্টেন আছে।
সকল জান্নাতের মানুষ এসব ফোয়ারার স্থানে মিলিত হবে।
সেখানে আনন্দ-বিনোদনের সময় কাটানো হবে!
বিভিন্ন জান্নাতে অবস্থিত জান্নাতিরা এসব ফোয়ারার স্থানে মিলিত হবে।
এক একটি ফোয়ারার দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক সৌন্দর্য পুরো উপভোগ করতে একজন মানুষের কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার বছরের বেশী সময় লাগে যাবে।

জান্নাতে অবস্থিত ফোয়ারার নামগুলো

  • ১.      কাফুর
  • ২.      জানযাবিল
  • ৩.      তাসনীম

জান্নাতে সকল মানুষের ব্যক্তিত্ব ও আকার পরিবর্তন হবে

প্রতিটি ব্যক্তির উচ্চতা হবে, আদম (আঃ) এর মত। (তিনি ৬০ হাত লম্বা ছিলেন)
প্রতিটি ব্যক্তির বয়স হবে, ঈসা (আঃ) এর মত। (৩০ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে)
প্রতিটি ব্যক্তির ধৈর্য-সহিষ্ণুতা হবে আইয়্যুব (আঃ) এর মত।
প্রতিটি ব্যক্তির সহনশীলতা হবে, ইয়াকুব (আঃ) এর মত।
প্রতিটি ব্যক্তির সৌন্দর্য হবে, ইউসুফ (আঃ) এর মত।
প্রতিটি ব্যক্তির কণ্ঠস্বর হবে, দাউদ (আঃ) এর মত।
প্রতিটি মানুষের রুচি, অভ্যাস, স্বভাব, শিষ্টাচার হবে, সাইয়্যেদানা মোহাম্মাদ (সাঃ) এর মত।

জান্নাতে যাবার যোগ্যতা

জান্নাতে যাবার একমাত্র যোগ্যতা হল তাকওয়া অর্জন। তাকওয়ার সহজ অর্থ হল একমাত্র আল্লাহকে ভালবাসা আর একমাত্র তাকেই ভয়করা। তাঁকে পাওয়ার জন্য কোনকিছুকে পছন্দ করা, তার অপছন্দ হবে এই ভয়ে কোন কিছু অপছন্দ করা। অর্থাৎ সকল পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ড হলেন তিনি।

তাহলে তাঁকে ভালবাসা আর ভয় করা ধরণ কেমন হবে?

দৌড়াতে শিখেছে এমন একটি শিশু তার মাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসে, তাঁর মাকে সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস করে এবং তার মাকেই সবচেয়ে বেশী ভয় করে (নির্দেশ অমান্য হবে বলে)।

জান্নাতে কারা যাবে কিভাবে যাওয়া যাবে

কোন ব্যক্তির দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা আমলের মাধ্যমে মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না! জান্নাতে যাবার একটি মাত্র উপায় আল্লাহর ভালবাসাঅর্জন করার মাধ্যমে দয়া আদায়। মানুষের কোন প্রকার যোগ্যতাই জান্নাত পাবার ক্ষেত্রে সহায়ক হবেনা।
আল্লাহ বলেছেন, জান্নাতের এক ইঞ্চি পরিমাণ জায়গার মূল্য পুরো পৃথিবী দশ বার বিক্রি করলেও সমান হবেনা সুতরাং যে পৃথিবীতে একটি দামী শহরে এক বিঘা জমির মালিক হওয়া যেখানে দুঃসাধ্য সেখানে জান্নাতে শত শত খাদেম সহ একটি প্রাসাদের মালিক হওয়া ততোধিক কঠিন।

তারপরও জান্নাতে যাওয়াকে ভিন্নভাবে সহজ করা হয়েছে

জান্নাতে যাওয়াটা তার জন্যে সহজ হবে,  যিনি তার ইচ্ছা শক্তিকে শানিত করে, আল্লাহর ভালবাসা পাবার জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

আল্লাহর ভালবাসা পাবার একমাত্র রাস্তা হল রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে হুবহু অনুসরণ করা।

ক্ষণে ক্ষণে এই কথাটি মনে রাখতেই হবে

কেয়ামতের দিনআল্লাহ যদি কোন মানুষের উপর সুবিচার করেন, তাহলে তিনি নিশ্চিতই জাহান্নামে যাবে! কেননা কোন মানুষের পক্ষে তার নেয়ামতের হক আদায় করা সম্ভব হবে না।  আর, আল্লাহ তাঁর রাহিমনামের কল্যাণে  যদি কারো উপর দয়া করেন, শুধুমাত্র তিনিই জান্নাতে  যেতে পারবেন। কেননা জান্নাত পাওয়াটা সরাসরি আল্লাহর সম্পর্কিত বিষয়; নচেত নয়…