ব্যবসায়ীক পেশাদারিত্বে ভিন জাতির উপমা

বেকারি

১৯৯৩ সনের দিকে ওমানের প্রবাস জীবনে, একটি বৃহৎকায় বেকারিতে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বেকারির মালামাল ক্রয় করার জন্য, মাসে অন্তত তিনদিন ওমান থেকে দুবাইতে যাতায়াত করতে হত। ব্যবসায়ীক পেশাদারিত্বে ভিন জাতির উপমা

চিনি, দুধ পাউডার, ডালডা, ঘি, ময়দা, খেজুর, বাদাম, কিসমিস, আইসেন্স, ফুড কালার, মিক্স ফ্রুড সহ আরো কত কি? বেকারিতে বহু আইটেম তৈরি হত বিধায় সহসাই মালামাল শেষ হয়ে যেত। ফলে বেকারির গুরু দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে ওমান-দুবাইর যাত্রার একজন নিত্য নৈমিত্তিক পথিকে পরিণত হই।

আরো পড়তে পারেন…

  • দৈন্যতা ও পঞ্চাশ বছরের ব্যর্থতা
  • মরার জন্য আমাদের জায়গা কোথায়?

বর্তমান দুনিয়ায় চোখ জুড়ানো শহর হল দুবাই। যখনকার কথা বলছি তখন দুবাই শহরের বেশীরভাগ ভবনই দোতলা থেকে চার তলা পর্যন্ত। দেখার মত তেমন কিছু ছিলনা। তারপরও দুবাইতে আসলে যে কারো মন বসে যেত। এই শহরে ইরানী, ইয়েমেনী, ভারতী, লেবাননী ব্যবসায়ীদের জমজমাট কারবার ছিল। বেকারি আইটেম কিনার জন্য বিশেষত ইরানী ও ইয়েমেনী ব্যবসায়ীদের থেকে মালামাল ক্রয় করতাম। এদেরকে ব্যবসায়ীক হিসেবে যথেষ্ট বিশ্বস্ত, আস্তা-ভাজন ও কাজে পেশাদারিত্ব হিসেবে পেয়েছি। ক্রেতার সাথে ঠগ-বাজি করার কারবার ছিল না।

কোন কারণে একবার মালামালের দাম বেড়ে যায়, এতে করে পরিকল্পনা মতে বাজার করায় সমস্যা হয়। সকল আইটেম কিনতে অক্ষম হই, অধিকন্তু ট্রাকের একটি অংশ খালি চলে যাবে। বেকারির কোন এক আইটেমের জন্য অগ্রিম অর্ডার পড়েছিল, যা বানাতে অন্য আইটেমের সাথে অন্তত পক্ষে পনের কার্টুন কিসমিসের দরকার।

এক ইরানী দোকানদারকে সমস্যার কথা বললাম, তিনি সাগ্রহে সমস্যা শুনলেন এবং কি কি জিনিষ লাগবে জানতে চাইল। তিনি সকল জিনিষ তো বাকিতে দিলেনই, আরো জানালেন পঁচিশ কার্টুন (প্রতি কার্টুনে ছয় কেজি) কিসমিস তার স্টোরে আছে, বাকিতে নিলে সবগুলোই নিতে হবে অধিকন্তু পুরানো বাজার দরেই কিসমিস বিক্রি করবেন। নতুন কিসমিস নতুন দামে যেহেতু এগুলো আগের কেনা ছিল, তাই আগের দরে।

এই ব্যবসায়ী থেকে মাত্র একবারই বাজার করেছিলাম। আমাকে মনে রাখার কথা নয় কিন্তু কোন জামানত সাক্ষী ছাড়াই তিনি এতগুলো বাজার বাকিতে দিলেন কোন বিশ্বাসে? এটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল! এটি এক শহর থেকে অন্য শহরের কারবার নয় বরং এক দেশ থেকে অন্য দেশের। দ্বিতীয়বার না আসলে, তাদের করার কিছুই নেই।

পরে জানতে পেরেছিলাম এভাবেই তারা ব্যবসা করে। কিছু মালামালের বিনিময়ে রিস্ক নেয় যাতে করে ক্রেতার মনোস্তাস্তিক আগ্রহ ও শ্রদ্ধা কিনতে পারে। হয়ত বাকিতে নেওয়া ক্রেতা ঠগ-বাজি করে টাকাটা ফেরত নাও দিতে পারে। এমতাবস্থায়ও মানুষটি ইরানী ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করবে। অন্যরা তার প্রশংসায় অভিভূত হয়ে ইরানীদের থেকে বাজার করতে আগ্রহী হবে। এ ধরনের ঝুঁকি নিলে ১০ শতাংশেরও কম মানুষ টাকা দেয়না কিন্তু বাকী ৯০ শতাংশ মানুষ তাদের স্থায়ী ক্রেতা হিসেবে বন্দি হয়ে যায়।

আমি ট্রাক নিয়ে এসেছি বাজার করতে, একজন ঠগ মানুষ এমন হতে পারে না। তাছাড়া আমাদের বাজারের ফর্দ দেখেই তারাও বুঝে নিয়েছিল যে, আমাদের প্রতিষ্ঠানও বড় হবে। একবার শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারলে, আজীবন তাদের থেকেই বাজার নেওয়া হবে। হয়েছিলও তাই। একই বৈশিষ্ট্য ইয়েমনীদের কাছেও দেখেছি।

ব্যবসা কারে কয় কিভাবে করতে হয়, তা যদি কেউ শিখতে চায় তাহলে এদের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করলেই বুঝতে পারবে। রক্ত মাংসে ব্যবসা ঢুকে থাকার কারণে তারা জানে কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে এবং কোথায় কিসের ব্যবসা হবে। সকালে দোকান খুলে গভীর রাত অবধি প্রতিষ্ঠান চালানোর মত ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা তাদেরই আছে।

প্রবাসে ব্যবসায়ীদের পেশাদারিত্বের কোন বিকল্প নেই। অপেশাদার ব্যবসায়ী যত বড় প্রতিষ্ঠানই গড়ে তুলুক না কেন, অধিক মুনাফা অর্জনের লোভে ব্যবসায়িক জীবনের কোন এক পর্যায়ে দুই নম্বরিতে জড়িয়ে পড়েই। ফলে তার খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানও মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হবে। এরা ব্যবসাকে একটি ক্ষণস্থায়ী জুয়ার আসরের মত মনে করে। টাকা বানিয়ে ভেগে পর, এমন চিন্তার মানুষ যতই বুদ্ধিমান ও চৌকশ হউক না কেন। সে পেশাদারী ব্যবসায়ী হতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *