অনেকেই কুকুর লালন পালন করে থাকে। ফলে কুকুরের প্রকাশ্যে পা তুলে প্রস্রাব করে! হরহামেশা দেখে বলে, এটা নিয়ে হয়ত অনেকেরই কোন বোধোদয় হয়না।
খুব কম সংখ্যক মানুষই কৌতূহলী হয়। কেউ যদি প্রশ্ন করে কারণ কি? তাহলে এক কথায় বলা যাবে, ‘ক্ষমতা দেখানো’ অন্যকথায় ‘ক্ষমতার বিস্তার’! পা তোলে ক্ষমতা প্রদর্শন
আরো পড়তে পারেন…
- কুকুরের সাহচর্য ও প্রভুভক্তির দায়
- স্বর্ণকারের বাটখারা ও রত্তি দানার ইতিবৃত্ত
- তিতা করল্লা ও চাহিদার বিবর্তন
কুকুরের মূত্রত্যাগ
দৃশ্যত কুকুরের মূত্র ত্যাগের সাথে ক্ষমতা দেখানোর আপাত কোন মিল না থাকলেও, আমরা ভিতরে গেলে মানুষের সাথে কুকুরের একটি অদ্ভুত মিল দেখতে পাব!
তা হল, এক মহল্লার মাস্তান যেভাবে, অন্য মহল্লার মাস্তানকে নিজের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে দেয়না ঠিক একই খাসিয়ত কুকুরের কাছেও আছে! কুকুরের প্রভাব বিস্তারের খেলাটা চলে পা তুলে প্রস্রাব করার মাধ্যমে!
কুকুর, শিয়াল, খেঁকশিয়াল সবই নেকড়ে গোত্রের বংশধর। এরাও সবাই হুবহু কুকুরের মত পা তুলে প্রস্রাব করে। কিন্তু কুকুরের এমন কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, যদ্বারা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করা যায়।
মানব শিশু যখন পরিপক্ব হয় তখন চিরুনি দিয়ে চুল বাঁকা করা, ভ্রু-বাকিয়ে মুখমণ্ডলের পার্থক্য নির্ণয় করে। গোঁফ গজানো সহ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তাকে বালেগ হওয়া বুঝায়; এভাবে শিশু কুকুর যখন বালেগ হয়, তখন সে পা তোলে প্রস্রাব করার অভ্যাস করে।
নেকড়ে কিংবা শৃগাল ছানা একত্রে মিলেমিশে থাকতে পারলেও, কুকুর ছানার প্রথম শত্রু হল, তার আপন ভাই-বোনেরা। নিজেরা লড়াই করে দক্ষ হয়। খাদ্যাভাবের ভয় তাদেরকে তাড়া করে, তাই তারা ভিন্ন মহল্লায় ঢুকতে চায়।
কুকুরের বয়স পরিপক্ব হলে, ভিন্ন পাড়া-মহল্লায় প্রভাব বিস্তার করতে চায়। অন্য পাড়ার কোন খাম্বা কিংবা খুঁটির গায়ে, প্রস্রাব নিক্ষেপ করে আসে। এভাবে এক জনের সীমানায়, অন্যজনের প্রস্রাব করা কুকুর সমাজে অমার্জনীয় অপরাধ!
একজনের সীমানায় চুপি চুপি ঢুকে পড়ে, অন্যজন এভাবে প্রস্রাব করে নিরাপদে চলে যাবে, এটা কুকুরেরা কোনমতেই মেনে নিতে পারেনা।
কুকুর অন্য কুকুরের প্রস্রাবের ঘ্রাণ মুখস্থ করে রাখে এবং শোধ নেবার জন্য, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া অপরাধীকে মনে মনে খুঁজতে থাকে। এখান থেকেই পাড়া-মহল্লা দখলের সূত্রপাত হয়।
কোটি টাকার ভিটে-প্লটে, বহুকোটি মূল্যের অর্থে বানানো বাড়ির সীমানা প্রাচীর ও ভিতরে ঢুকার অধিকার ও দখলদারিত্ব নিয়ে, কুকুরদের মাঝে বাড়ির মালিকের অলক্ষ্যে চলে এই লড়াই-সংঘাত।
এটা ঠিক পাড়া-মহল্লার মাস্তানদের মত। এক মাস্তান তার এলাকায় পানি ব্যবসা একাই করবে, অন্য কেউ ঢুকতে পারবে না। কেউ একাই ডিস ব্যবসা করবে, অন্যরা দাঁড়াতেই পারবে না। ওদিকে পৌর কর্পোরেশন কিংবা সরকারের কোন খবরই নাই, যদিও যথাযথ অনুমতি দেবার মালিক তারা।
এই ক্ষেত্রে কুকুরের আচরণও ঠিক একই ধরনের! মানুষের মাস্তানি চরিত্রের এই দিকটা, কুকুর থেকেই পাওয়া বললে, বেশী বাড়ীয়ে বলা হবে না।
মানুষ যেভাবে স্বাধীনতা উপভোগ করতে চায়, সর্বত্র ভ্রমণ করতে চায়। কুকুরের মনেও তা ঘুরপাক খায়! যেহেতু কুকুরের শত্রু আরেক কুকুর। তাই ইচ্ছে করলেই এই সুযোগ হাতিয়ে নিতে পারে না।
দয়াহীন ভূমি-দস্যু যেভাবে গরীবের ভিটেমাটি কেড়ে খায়। কুকুরদের মধ্যেও দুর্বল বলে অতিরিক্ত দয়া পাবার কোন সুযোগ থাকে না। অন্যের এলাকায় গেলেই আক্রান্ত হতে হয়।
তবুও কুকুর এটাতে দমে যায় না। সে বুকে সাহস জোগাড় করে, নিজের উপর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে, অন্যের এলাকায় কদাচিৎ ঢুঁ মারে। এতে হয় জিতে, নয় পরাজিত হয়ে আসে। এটাই তাদের জীবন।
কুকুরের এসব যাত্রা যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ তাই সর্বোচ্চ যতটুকু যাওয়া যায়; ততটুকু সীমানার মধ্যে প্রস্রাব করে নিজের উপস্থিতির নিদর্শন রেখে যেতে চায়।
কখনও অত্যাচারী নিরীহ ব্যক্তির জমিতে খুঁটি বসিয়ে বুঝিয়ে দেয়, এই জায়গায় দ্বিতীয়বার এসো না। কুকুরের মনোবৃত্তিও প্রায় কাছাকাছিই।
তার তো আর হাত নেই যে, মাটিতে খুঁটি বসাবে! তাই সে মানব প্রদত্ত স্থায়ী কোন খুঁটিতে কুকুর প্রস্রাব করে, নিজের নিদর্শন রেখে আসে। যাতে করে পরবর্তী আরেকদিন আসলে সে বুঝতে পারে যে, কোন বাধা-বিঘ্ন ব্যতীত এতটুকু পথ কোন একদিন সে আসতে পেরেছিল।
প্রজনন ঋতুর আগে কুকুর সীমানা বাড়ানোর ধন্ধে জড়িয়ে পড়ে। যে যতটুকু পারে সীমানা চিহ্ন ঢালতে থাকে। উভয় পক্ষের ক্ষমতা সমান হলে কিংবা কেউ দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী হলে, লুকোচুরিও চলতে থাকে।
শক্তিশালী কুকুর দুর্বলের সীমানায় ঢুকলে, দুর্বল তাকে প্রতিহত না করে, চুপিসারে শক্তিশালীর ওখানে গিয়ে কাজ সেরে আসে। উদ্দেশ্য হল, মাদী কুকুরের দৃষ্টি আকর্ষণ।
কেননা সেও মহল্লার শক্তিশালী মাস্তানের পক্ষে থাকতে চায়। যে শক্তিশালী, তার রাজত্বে সন্তানেরাও বেশী ঘুরতে পারবে, বেশী খেতে পারবে। এভাবে মূত্র-যুদ্ধের মাধ্যমে কুকুরের ছায়া দখল-বাজি চলতে থাকে।
মানব সমাজেও কদাচিৎ দেখা যায়, প্রতিপক্ষের ওখানে গিয়ে মিছিল-মিটিং করে বুঝিয়ে দেয় যে, তোমার রাজত্বে আমার প্রভাব শুরু হয়েছে।
বিপক্ষ কুকুর কারো নিকটস্থ স্থানে মূত্রের দাগ দেওয়া মানে তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার সমতুল্য। কোন এক সময় তাকে বাগে পেলে, কোন উপলক্ষ ব্যতিরেকেই তার উপর হামলে পড়ে। এই কাজে কোন করুণা চলেনা।
মহল্লার উঠতি বয়সী ছেলেরা যেভাবে অজানা কারণে এক দল অন্য দলের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয়। সেভাবে কখনও কুকুরেরাও সংঘবদ্ধ হয়ে যায় এবং একদল অন্যদলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মানুষের কাছে অহেতুক এই মারামারির কোন সদুত্তর না থাকলেও, মূলত লড়াই চলে এলাকার দখল-বাজিকে কেন্দ্র করেই।
কুকুর পা তুলে, প্রস্রাব করে মোটামুটি স্থায়ী কোন ঠুনি, খাম্বা কিংবা গাছের গোড়ালিতে। অস্থায়ী কিছুতে প্রস্রাব করে নিজে নিজে বিভ্রান্ত হতে চায়না।
তারপরও মানুষের মধ্যে যেভাবে বে-আকল আছে, কুকুরের মধ্যেও আছে। তারা জিনিষের স্থায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা না পেয়ে, গাড়ির টায়ার কিংবা ট্যাক্সির পিছনে প্রস্রাব করে আসে।
কুকুরের মার্কিং
প্রস্রাব নিয়ে ওদের শত্রুতার অন্ত নেই। এক স্থানে কুকুর প্রস্রাব করে চলে গেলে সেটাকে Marking বলে। আরেকজন এসে সেটার উপরে প্রস্রাব করে বুঝিয়ে দেয় যে, তাকে Over Marking করা হলো।
এর অর্থ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হল। কখনও কুকুর একই স্থানে পরপর দু’বার প্রস্রাব ছিটিয়ে Double Marking করে বুঝিয়ে দেয়। এখানে কেউ পুনঃ Marking করলে কপালে কিন্তু খারাবি আছে! নিজের দেওয়া পুরানো Marking অব্যাহত থাকলে কিংবা ঘ্রাণ মজবুত থাকলে, প্রস্রাব না করে শুধুমাত্র পা তুলেই প্রস্রাবের অভিনয় করে বিদায় নেয়।
মাদী কুকুর খাড়া ঠুনিতে প্রস্রাব করেনা। তবে সেও তার এলাকা Marking করে রাখে। মাটিতে, ঝোপ-ঝাড়ে, ইট, পাথরেই Marking কার্য চলে। কোন একদিন ওখানে আসলে ঘ্রাণের মাধ্যমে পুরানো জায়গাটি খুঁজে নিয়ে, উপস্থিতি হালনাগাদ করে রাখে।
মানব সমাজে, পাড়া-মহল্লায় মাঝে মধ্যে ‘লেডি মাস্তানের’ আগমন ঘটে। তারাও চাঁদাবাজি করে, এলাকার শান্তি বিনষ্ট করে। মাদী কুকুরের মধ্যেও কদাচিৎ এই চরিত্র দেখা যায়। যেসব মাদী কুকুর একটু শক্তিশালী কিংবা ঘাড় ত্যাড়া স্বভাবের। তারা পুরুষ কুকুরের ন্যায় পা তুলে পুরুষের Marking করা খুঁটিতে প্রস্রাব রেখে যায়।
মাদী কুকুরের ক্ষমতা প্রদর্শনের এটা হল আরেক ধরনের মাস্তানি। মূলত এলাকার খাদ্য দখল ও বাচ্চার নিরাপত্তার জন্যই এটা করে থাকে। গায়ে পরে কেউ মাস্তানি করতে আসলে তার ঘাড় মটকে দিবে।
তবে পুরুষ কুকুর এসব হুমকিকে থোড়াই কেয়ার করে। তারা আপোষ রক্ষা করে তাকে এলাকার নেত্রী হিসেবেই মানিয়ে চলে। পা তোলে ক্ষমতা প্রদর্শন