ঈদের দিনে ধনী কৃপণের বাড়ীতে

ধনী কৃপণ

খালাত, মামাত ও আমি ফুফাতো ভাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ঈদের দিনে একসাথে বেড়াতে বের হব‍! সঠিক দিনে আরো চার জন বেড়ে মোট সাত জনের একটি ছোট্ট দলে পরিণত হল। বাকিরা আমাদের স্কুলেরই মুখ-চেনা সহপাঠী। সাত জনের নানার বাড়ী, খালার বাড়ী, ফুফুর বাড়ীর একজন করে ধরা হলেও অন্যূন একুশটি পরিবারে বেড়াতে যেতে হবে। ঈদের দিনে ধনী কৃপণের বাড়ীতে

আরো পড়তে পারেন…

  • শৃগালের সাথে মানুষের মিল যেখানে
  • পাটের চমকপ্রদ ব্যবহার

মা আগেই বলে দিয়েছিলেন, প্রতিটি ঘরেই যেতে হবে এবং নিজের পরিচয় দিয়ে, সবাইকে পায়ে ধরে সালাম করে, দোয়া আনতে হবে। যথারীতি আমাদের একজনের নানার বাড়ীর এক পাশ ধরে শুরু হল বেড়ানোর যাত্রা। বাড়ীর অর্ধেক পরিবার বেড়ানোর মধ্যেই, পেটের অবস্থা আঠালীর মত হয়ে গেলো। চণা ঢুকানোর মত জায়গা নেই! ফলে, পরবর্তী বাড়ী গুলোতে শুধুমাত্র পায়ে ধরে সালাম পর্বই অব্যাহত রইল।

সর্বশেষ এমন একটি বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালাম। যার ভিতর থেকে মানুষের গুঞ্জন আসছে বটে কিন্তু বাড়ীতে ঢুকার কোন পথ নেই! চারিদিকে বেড়া দিয়ে আবদ্ধ! হয়ত প্রবীণেরা জানে এই বাড়ীতে ঢুকার পথ কোথায় কিন্তু আমাদের মত কিশোরদের পক্ষে এটা বের করা কষ্টকর ছিল তারচেয়ে বড় কথা, এটা তাদের কাছে একটি তাজ্জবের বিষয় হয়ে উঠল।

একটি ঘর ব্যতীত পুরো মহল্লাতেই ঘুরে বেড়ানো হল! এতে সওয়াবের কাজটি অপূর্ণাঙ্গ বলে মনে হল। নিজেদের মাঝে প্রশ্ন ছুড়লাম, এই ক্ষুদ্র দলের কেউ একজনও কি ওই বাড়ীর আত্মীয় নয়! একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি হল। একজন আমতা আমতা করে জানাল, ওটা তার একমাত্র মামার বাড়ি!

দলের মধ্যে বেয়াড়া গোছের একজন বলল, তাহলে মুখ বন্ধ রেখেছ কেন? ওটা আমাদেরও মামার বাড়ী সুতরাং তোমার মামার বাড়ীতে ঢুকার পথ তুমিই দেখাও। তার সাহায্যে বেড়ার এক ফাঁকে রসি আলগা করে সদলবলে সবাই বাড়ীতে ঢুকে পড়লাম।

একজন সজোরে দরজার শিকলে নাড়া দেয়। ভিতর থেকে কর্কশ কণ্ঠে আওয়াজ আসে, কে????

সবাই থমকে দাঁড়ালাম! ঘরের ভেতর থেকে এমন কর্কশ জিজ্ঞাসা ঈদের দিনের ঐতিহ্যের সাথে একেবারেই বেমানান! ঈদের দিনে ধনী কৃপণের বাড়ীতে

ভাবছি করা যায় কিন্তু সেই বেয়াড়া মেহমান পিছু হটার পাত্র নয়। সে ততোধিক উচ্চাঙ্গে চিল্লায়ে বলল, “আমরা!!!”

ভেতর থেকে ঝাঁজালো কণ্ঠে বলা হলো, এই দুপুরে তোমরা কারা?? ফিতরা দেওয়া হয়ে গেছে!! এখন যেতে পার! ঈদের দিনে ধনী কৃপণের বাড়ীতে

ততক্ষণে বাড়ির বাহির দিক দিয়ে ঘুরে এক মহিলা হাজির। হ্যাঁ, অনেকটা পরিচিত মুখ! তাকে রাস্তা ঘাটে কদাচিৎ দেখে থাকি। তাহলেই তিনিই হবেন এই বাড়ীর কর্ত্রী। মনে হয় তিনিও আমাদের কাউকে চিনে থাকবেন। সবাই তার পায়ে পড়ে সালাম করল।

তিনি কিছুটা পাংশু বদনে মুখে আঙ্গুল এঁটে ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, “এই চুপ! চুপ!” তোমরা বাড়ীতে কিভাবে ঢুকেছ? কে ঢুকিয়েছে? ইত্যাদি। ভাগিনার দিকে চোখ পড়াতে বললেন, তুমি একা আসতে, এতজনকে কেন বাড়ীর পথ চিনিয়েছ!!

এবার আমাদের চেহারায় চিন্তার রেখাপাত হলো। মহিলার কথায় একটু লজ্জাও লাগল। ভাবছি কোথাও একটা বড় ভুল করে ফেলেছি না তো। সবাই একে অপরের মুখের পানে তাকাচ্ছি আর আমাদের অগোচরে ঘটা ইতিপূর্বের কৃতকর্মের তালিকা মেলাচ্ছি।

ইত্যবসরের সবাই চুপি চুপি মহিলার সাথে বাড়ীর পিছনে চলে গেলাম। যেন হ্যামিলনের বাঁশী ওয়ালাকে অনুসরণ করছি। আমাদের সবার মনে এক অজানা আশঙ্কা ভর করল। তিনি রান্না ঘরের সামনে দাড়িয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি সেমাই খেয়ে এসেছ? আমাদের ঘরে কি আর খাবে?

তখনকার দিনে ঈদের মিষ্টান্ন হিসেবে ধনী-গরীব প্রতি জনের ঘরেই সেমাই রান্না করা হত। ধনী-গরীবের সেমাইয়ে মধ্যে তফাৎ হত গুড়ের সেমাই আর চিনির সেমাইয়ের মধ্যে সাথে কিসমিস, বাদাম, খোরমা, আলু-বুখারার ব্যবহার দিয়ে। সারাদিন সেমাই খেয়ে এমনিতেই হাপিত্যেশ করছি কিন্তু শেষের বাড়িতে মেহমান হতে গিয়ে, ব্যতিক্রম ধর্মী গোলমেলে সমস্যায় পড়লাম।

ভদ্র মহিলার উদ্বিগ্ন প্রশ্নে বুঝতে পারছিলাম না, সেমাই খাব বললে সমস্যা দূর হবে! নাকি খাবো না বললে হবে! কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেবার আগেই, দুইজন সমস্বরে বলে দিল, আমরা সবাই সেমাই খাব!

মহিলা চিন্তিত গলায় বললেন, সবাই খাবে! তাহলে বাবা চুপচাপ খেয়ে ফেলতে হবে। ভাবলাম, কি সমস্যারে বাবা, প্রতিটি পদক্ষেপেই নতুন ঝামেলার আশংকা। এটা এলাকার অন্যতম ধনীদের একজনের বাড়ী কিন্তু মানুষটি কৃপণ বলে এলাকায় রটনা আছে। কৃপণ কাকে বলে কিংবা কোন ধরনের কাজের কারণে কাউকে কৃপণ বলা হয়, সে ধারণার পাবার বয়স তখনও হয়নি।

ভদ্র মহিলা দুটো থালায় সেমাই তূলে, সেখানে আটটি চামচ বসিয়ে দিয়ে বললেন, চুপ চাপ খেয়ে, জলদি ভেগে পড়। তোমাদের মামা জানতে পারলে বড় সর্বনাশ হবে। কোন উচ্চবাচ্য নয়, শব্দ করবে না, থালায় আওয়াজ তুলবে না!

এই কথা শুনে শিশু মেহমানদের কপালে ঘামের রেখা দিল। পেটে এমনিতেই জায়গা নেই। ভদ্র মহিলাকে কিছুটা খুশী করার জন্যই সেমাই খাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে ফলাফল উল্টো। না খেলেই ভাল হতো। ততক্ষণে সতীর্থদের কয়েকজন থালায় রাখা সেমাইয়ে চামচের ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে।

মনে শঙ্কা, অনভ্যস্ত পরিস্থিতি; জলদি কাজ সাড়ার দায়বদ্ধতা, ধাতব চামচের সাথে থালার সংস্পর্শে টুং টাং শব্দের গতি, ভদ্র মহিলার কথা মত নিয়ন্ত্রণে রইল না। ঘরের ভিতরে বসা গৃহ স্বামী বুঝে ফেলেছেন যে, তার অজান্তে, রান্না ঘরে কাউকে নাস্তা পরিবেশন করা হচ্ছে!

ওদিকে গৃহ স্বামীর ভিন্ন দশা। ব্যক্তি হিসেবে তিনি ধনী হলেও, তার কাছে আছে মাত্র একটি লুঙ্গি! ঈদের দিনে তার কোন এক বেয়াই আসার কথা, তাই লুঙ্গিখানা ধুইয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছেন এবং স্বীয় গায়ের চাদরটি লুঙ্গির মত পেঁচিয়ে গৃহাভ্যন্তরে গোপটি মেরে অপেক্ষা করছেন। বেয়াইকে পরিবেশন করার মত কিছু সেমাই রান্না করা হয়েছিল কিন্তু গিন্নী তার অজান্তে রান্নাঘরে কাউকে সে সিন্নি গোপনে পরিবেশন করছিলেন। এটাতে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায় এবং হন হন করে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েন।

গিন্নীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হায়! হায়! তুমি করেছ টা কি? সেমাই তো সব ছেলে-পুলেদের খাইয়ে দিয়েছ? এদেরকে না খাইয়ে বিতাড়ন করে দিতে! এখন বেয়াইকে খাওয়াবে কি? তা ছাড়া এসব ছেলেরা বাড়ীতে ঢুকল কিভাবে? নিশ্চয়ই তুমি তাদের বাড়ীতে ঢুকেছ। তোমাকেই তিন দিন উপোষ রাখব…

হট্টগোলের মধ্যে ছোট্ট মেহমানেরা কিংকর্তব্য বিমূঢ়। ঈদের দিনে কারো বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়া নাগরিক অধিকার। এদিন মেহমানের অযাচিত আগমন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। ছোটদের ক্ষেত্রে তো নয়ই। মানুষের বাড়ীতে অনুরোধ করে সেমাই খাওয়ায় আর এ বাড়ীতে এটা নিয়ে গণ্ডগোল হচ্ছে। রীতিমত স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মত পরিস্থিতি। একেবারেই অপরিচিত সমস্যা, হিসেব মেলানো কষ্টকর। এই মুহূর্তে করণীয় কি, ছোট্ট মেহমানদের মাথায় ঢুকছিল না। তবে তারা বুঝতে পেরেছে যে, এ বাড়ীতে ঢুকা থেকে এই পর্যন্ত ঘটা প্রতিটি পদক্ষেপেই অন্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মেহমান দলের মধ্যে যে বুদ্ধিমান, সে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে যথারীতি গৃহস্বামীর পায়ে ধরে সালাম করে বসল! বিষয়টি দারুণ বুদ্ধিমত্তার কাজ ছিল বটে কিন্তু বিপত্তি ঘটাল সেই বেয়ারা ক্ষুদে মেহমান!

পা ধরে সালাম করে উঠার সময়, পেঁচানো চাদরের ফাঁক দিয়ে তার মাথা ভিতরে ঢুকে পরে কিছুটা পেঁচিয়ে যায়। এতে করে তার মাথা আর গৃহস্বামীর লজ্জার মাথা একসাথে ঠোক্কর খায়!

ভদ্রলোকের মেজাজ যা একটু কমে এসেছিল, এই অপ্রত্যাশিত শরমিন্দা কাণ্ডে আবারো তেতে যায়। তিনি ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠেন, এই তুমি কার ছেলে? এ বলে চিল্লায়ে উঠতে গেলে, সহপাঠী হ্যাঁচকা মেরে মাথা বের করে আনে, এতে করে গৃহস্বামী পুরটাই দিগম্বর হয়ে যায়।

অপ্রত্যাশিত কাণ্ডে মেহমান দলের সবাই ভ্যাবাচেকা খেয়ে বুঝতে পারে যে, পরবর্তী আচরণ মোটেও সুখকর হবেনা। তাই যে যার মত, তড়িৎ সিদ্ধান্তে সবাই ভোঁ-দৌড় লাগায়।

সমস্যার শেষ নয়, আরো ব্যাপার আছে! এই বাড়ীতে ঢুকার সময় রসি আলগা করে বেড়ার ফাঁক গলিয়ে কসরত করে ঢুকা হয়েছিল! মেহমান দলের পালানোর সময় সে দরজা তো আর হা করে খোলা থাকার কথা নয়! পালানোর সময় সাত জনের সবাই বেড়ার একটি দুর্বল স্থানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেড়ার ঠুনি নড়বড়ে হয় উটে, মুহূর্তেই পুরো বেড়ার লাইনটি টাল হারিয়ে মাটিতে নুইয়ে পড়ে।

ওদিকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, পরনের চাদর ঠিক করে গৃহ স্বামীও দৌড়ে এসেছিলেন। তিনি করুন চোখে দেখতে পেলেন যে, ততক্ষণে তার বাড়ীর সীমানা বেড়ার বিরাট একটি অংশ ততক্ষণে মাটির সাথে শুয়ে পড়েছে।

তিনি চিল্লাচ্ছেন, হায়! হায়! এগুলো কার ছেলে? স্ত্রীকে দোষারোপ করে বলছেন, একটাকেও ধরতে পারলাম না। ধরা গেলে তো তার পিতা থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেত।

মেহমান দলের উদ্ধার প্রাপ্ত সদস্যরা আশু মুসিবত থেকে মুক্তি পেয়ে, বুকে থুথু মেরে সাহস ফিরিয়ে ঘোষণা করলেন, আজকের মত বেড়ানো এখানেই শেষ এবং ঈদের দিনের খুশী বেড়ানো হলেও, সবার বাড়ীতে অনুমতি ছাড়া মেহমান হতে নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *