নলের পানি যবে শুকিয়ে যাবে

নলের পানি

নলকূপের পানি তুলে গোসল করছেন? হাঁড়ি পাতিল ধোয়া কিংবা গ্যারেজের কাজে! যদি এমন কারো অবস্থান হয়, একটি পুকুর কিংবা নদীর ধারে! নির্ঘাত তিনি আল্লাহর নেয়ামতের অপচয় কর চলছে! আমাদের দেশ নদীমাতৃক বলে, সর্বত্র পানি দেখা যায়। ফলে কোন বস্তুর দরপতন হলে, তাকে ‘পানির দরে’ বলে উপহাস করা হয়। কিন্তু কদাচিৎ পানির দর যে, জীবনের চেয়েও দামী হয়ে যায়, সেটা তেমন পরিবেশে না পৌছা অবধি অনুধাবন করতে পারেনা। নলের পানি যবে শুকিয়ে যাবে

আরো পড়তে পারেন….

  • একচোখা নিতীর খারাপ প্রভাব
  • দোষারোপ কারী আজীবন অসুখী
  • মানুষের সঙ্গ ও রুচি বাছাইয়ের পদ্ধতি

মাটির নীচে প্রবাহমান নদীর মত পানি থাকেনা। বন্যা আর প্লাবনের পানির, যে কয়েকটি ফোঁটা শক্ত মাটির আস্তরণ ভেদ করে পাতালে পৌঁছে; তাদেরই সমষ্টি হল, এই ভূগর্ভস্থ পানি। একটি বিশুদ্ধ পানির ফোঁটা তৈরি হতে বহুদিন সময় লাগে। আর লক্ষ বছর ধরে জমানো পানিই, আমরা ব্যবহার করি অপাংতেয় কাজে।

ভূগর্ভস্থ পানি এটা আল্লাহর একটি বিরাট নেয়ামত। মানুষকে যা হিসেব করেই ব্যবহার করতে হয়। নিজের বসত ভিটার সামান্য একটি জায়গায় নল গেঁড়ে দিলেই পানি উঠে আসে বলে, অনেকেই এই পানির মূল্য অনুধাবন করতে পারে না। কিন্তু চিন্তাশীল মানুষকে তা ভাবিয়ে তুলে। একটি উদাহরণ দেই।

ধরুন, একটি শহরে কেউ একটি বিলাসবহুল বাড়ী করল। চারিদিকে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। দেখাদেখি দেশের ধনীরা সেখানে এলো এবং তারাও ঘরবাড়ি বানাল। এলাকাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠল, ফলে এখানকার ছোট্ট এক টুকরো জমির মালিক হতেও অনেক অর্থকড়ির দরকার হয়। আমাদের দেশে এমন নজীর বহু। কোন এক কারণে সেখানে দীর্ঘদিনের পানি সমস্যা দেখা দিল! মানুষ মাটি খুঁড়ে পানির তালাশ করল কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল! এমন ঘটনার পরে কি আর সে শহরের ভূমির মূল্য থাকবে? নিশ্চয়ই নয়! বিলাসবহুল ভবনে থাকার জন্য যেমন মানুষ পাওয়া যাবেনা, জমির মূল্যও পতনও কেউ ঠেকাতে পারবে না।

আমরা যেখানে বসতবাড়ি করি তা কিন্তু নীচের পানির প্রবাহের উপর ভিত্তি করেই করে থাকি। সর্বত্র পানি পাওয়ার কারণে, বিষয়টি আমরা তেমন বুঝি না কিন্তু আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এটাই ভাবনায় রেখেছিলেন! তাদের ভাবনার উপর আমাদের অভিজ্ঞতা যোগ হওয়ায়, আমরা একাজে অনেকটা নির্ভার। যা’হোক আমাদের দেশ সামনের দিকে ভয়ঙ্কর ঝুঁকির দিকে দ্রুতগতিতে এগুচ্ছে।

পানির অভাবে সভ্যতা কিভাবে ধ্বংস হতে পারে, তার একটি করুণ নির্দয় ইতিহাসের কথা উল্লেখ করব। দিল্লীর খ্যাতিমান শাসক মোহাম্মদ তুগলক (রাজত্বকাল ১৩২৫-১৩৫১) দিল্লীর অদূরে “দৌলতাবাদে” রাজধানী সরিয়ে নিয়েছিলেন। প্রাকৃতিক ভাবে এলাকাটি ছিল সুন্দর ও নৈসর্গিক। সামরিক দিক দিয়ে বেশ নিরাপদ। উপরে গাছপালা দেখেই তুগলক ভুলেও ভাবেন নি যে, সেখানে মাটির নীচে পানি নেই! মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে পুরো শহরের জনগোষ্ঠী নিঃশেষ হয়ে যায়! বেঁচে যাওয়া কিছু মানুষ ও সেনা সদস্যকে নিয়ে পুরানা দিল্লীর দিকে ফিরে আসেন কিন্তু তিনি দিল্লী অবধি আর পৌছতে পারে নি। পথেই মৃত্যুবরণ করেন।

বিদেশে একমাত্র ধনীরাই সুইমিং পুলে গোসল করতে পারে কিন্তু দেশের মানুষ পুকুরে গোসল করাটাকে গরিবি খাসিয়ত মনে করে! গ্রামে দেখেছি মানুষ এখন আর পুকুরে গোসল করে না! সবার ঘরে নলকূপ আছে, তাতেই গোসল, বাসন-কোসন ধোয়া এমনকি ব্যবহার্য কাপড় ধৌত করার কাজ চলে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে।

এক ব্যক্তির পুকুর পাড়ে, ক্ষেতের মধ্যেই নলকূপ দেখে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসিলে জানান দেয়, গাছের পানি নিষ্কাসন, গরুর পানীয় জলের সরবরাহ ও গোয়াল ঘর ধৌত করার জন্য বসানো হয়েছে! নলের পানি যবে শুকিয়ে যাবে

বিরাট ঘাট সমেত, মসজিদের পাশেই পুকুর। কোন এক দানবীর সওয়াবের আশায় একটি গভীর নলকূপ বসিয়ে মসজিদের পাশে একটি অজুখানার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি প্রশংসায় ভেসে যাচ্ছেন। ওদিকে অব্যবহারের কারণে পুকুরটি মজে পড়ে আছে। নলকূপের ২৪ ঘণ্টার অনর্গল পানি, পাশের একজনের জমিকে ভাসিয়ে দিচ্ছেন! তার আপত্তি মসজিদ ও নামাজীর বিপক্ষে যায় বলে, কারো নিকট থেকে সদুত্তর পায়না। একজন উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, “দৈনিক শত মুসল্লির ওজুর পানি তার জায়গার উপর দিয়ে যাচ্ছে বলে, তার হয়ত কবর আজাবই মাফ হয়ে যাবে”!

সমালোচনার জন্য লিখছি না, দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতার জন্য লিখছি। যেখানে পানির দরকার সেখানে তা করতেই হয় কিন্তু বেখেয়ালেও আমরা অনেক কিছু করে ফেলি যা সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির জন্য অকল্যাণ ডেকে আনে।

মাটির নীচে এখন সুপেয় পানির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে! অনেক জায়গায় আর্সেনিকের মত বিষ উঠছে। মাটির উপরে জলাধারের অভাব হেতু, পরিমাণ মত পানি চুষে ভূগর্ভে যেতে পারছেনা। তার উপর অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি পরিবেশের সমস্যা সৃষ্টি করছে। গাছের অভাবে সঠিক সময়ে, প্রয়োজনীয় বৃষ্টি হয়না। আমরা মাটির ভেতর থেকে শুধু পানিই টেনে তুলছি কিন্তু ভেতরেও যে পানি পৌছাতে হবে সে জন্য কোন ভূমিকা রাখছি না।

তাই নিত্য ব্যবহার্য কাজে অপ্রয়োজনীয় নলকূপ ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। যদিও হস্তচালিত নলকূপ এক্ষেত্রে কিছুটা উত্তম। কেননা ওটা দিয়ে পানির অপচয় তেমন করা যায়না। ঘরোয়া পরিবেশের নলকূপের চেয়ে, ব্যবসায়ীক কাজে ব্যবহৃত নলকূপ অনেক বেশী পরিমাণ পানি উত্তোলন করে। মাটির নীচের সুপেয় পানির গুরুত্ব বুঝে হিসেব করে ব্যবহার করা উচিত। যেসব গভীর নলকূপে সার্বক্ষণিক পানি উঠে, সেগুলোর মুখে গেইট ভাল্ব লাগিয়ে শুধুমাত্র ব্যবহারের সময় খোলার ব্যবস্থা করা উচিত। নতুবা অচিরেই আমরা ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছি। যা কোনভাবে সমাধান করা সম্ভব হবেনা।