ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (বই নোট)
ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ বইটির লেখক মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। ১৯৮৫ সনের রাজশাহী জেলা শাখার বাছাই করা দায়ীত্বশীল পর্যায়ের ভাইদের উদ্দেশ্যে রচিত বক্তব্যটি পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তৎকালীন মহানগরী আমীর ছিলেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ থেকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ
কেয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ার মানুষের কাছে আল্লাহর দ্বীন পৌঁছানোর দায়িত্ব উম্মতে মোহাম্মদীর
সে হিসেবে এই দায়িত্ব আমাদের এবং সকলের
সর্বকালে সর্বযুগে একটি দলকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়েছে এবং হবে।
এটাই আল্লাহর নির্দেশ কোরআনের বানী এবং আল্লাহর শেষ নবীর প্রত্যাশা।
যারা এখন ইসলামী আন্দোলন করছে তা নবী রাসুলদের সেই আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা মাত্র
যারা এ আন্দোলনে শরীক তারাই নবী রাসুলদের বিশেষ করে শেষ নবীর সার্থক উত্তরসূরী।
নবী রাসুলগণ এবং কুরআন এমন ব্যক্তিদেরকে ছিদ্দিকীন, সালেহীন ও শোহাদা নামে অভিহিত করেছে
তারা সকল যুগে মানব জাতিকে দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তির পথ দেখিয়েছে
উক্ত আন্দোলনকে আল কুরআনে ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
উক্ত জিহাদকে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমানের দাবী পূরণের এবং আখেরাতের নাজাতের একমাত্র উপায় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই সাথে জিহাদে আল্লাহ তা’আলা তার ঈমানদার বান্দাহদের কাছে দুটো জিনিসের কোরবানী দাবী করেছেন। একটি হল মাল, অন্যটি হল প্রাণ
জিহাদকে একটি ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করে, মাল ও জান দেবার আহবান করা হয়েছে…. সূরা ছফ ১০ – ১১
সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং তাদের উত্তরসূরীগণ আল্লাহর এ জমিনে মানুষের জন্যে যে দ্বীন রেখে গেছেন তা মাল-জান কোরবানীর ফসল
অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাদের সংগী সাথীদের ইতিহাস বিস্তারিত জানার সুযোগ তেমন একটা নাই, তবে
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার সাথীদের উদ্বুদ্ধ করণের সংক্ষিপ্ত ইশারা ইঙ্গিত আল্লাহ্ তাআলা দিয়েছেন।
আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও দৃষ্টান্তের জন্যে তার প্রিয় সাহাবাদের নজিরবিহীন ত্যাগ ও কোরবানীর ঘটনা ইতিহাস হয়ে আছে
আরো পড়ুন: ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি (বই নোট)
সুরা ছফের ১০ ও ১১ নং আয়াতে জিহাদের জীবন্ত নমুনা পেশ করা হয়েছে
সাহাবীরা কুরআনের উক্ত নির্দেশের আলোকে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি সত্যিকার অর্থে-ঈমান এনেছেন।
আল্লাহর রাসূলের প্রত্যক্ষ সাহচর্যে ঈমানের দাবী পূরণে যথার্থ ভূমিকাও রেখেছেন।
আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্যে আল্লাহর পথে অকাতরে মালের কোরবানী পেশ করেছেন। প্রয়োজনে জান কোরবানী দিয়েছেন
নবী রাসূলের সাথে আন্দোলনে শরীক লোকেরা আন্দোলনের জন্যে প্রয়োজনীয় উপায় উপকরনের কারো মুখাপেক্ষী ছিলেন না।
যারাই আন্দোলনে শরীক হয়েছেন, তারাই উপায় উপকরণ সংগ্রহ করেছেন, নিজেদের মালের কোরবানীর মাধ্যমে।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথীদের ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত , কেয়ামত পর্যন্ত এ পথের পথিকদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
আজকের দিনেও আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ, মালের কোরবানী, জানের কোরবানী কোন বিকল্প নাই।
এ পর্যায়ে কোরআনের আলোকে ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’র কাজে মালের কোরবানী বা ‘ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ’র ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পেশ করতে চাই।
- আসমান ও জমিনের মালিকানা আল্লাহর। বিজয়ের আগে পরে পরে দান করার গুরুত্ব বিষয়ে আলোচনা রয়েছে…. সুরা হাদিদ ১০-১১
- আল্লাহর পথে মাল খরচ করে এবং খোঁটা না দেওয়া ব্যক্তিকে উত্তম প্রতিদানের ঘোষনা দেওয়া হয়েছে…. বাকারা – ২৬২
- সম্পদ থেকে আল্লাহর রাস্তায় খরচ কারীর জন্যে যথার্থ প্রতিদানের ঘোষণা দেওয়া আছে…. বাকারা – ২৭২
- শক্রর মোকাবেলায় ঘোড়া সহ সাধ্যমত প্রস্তুতির জন্যে ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ উত্তম প্রতিফলের নিশ্চয়তা রয়েছে…. আনফাল – ৬০
- নামায কায়েম গোপনে প্রকাশ্যে রিজিক থেকে খরচ কারির জন্যে হাশরে দিনের মুক্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে… ইবরাহীম: ৩১
- ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ কে শষ্য বপনের সাথে তুলনা করে, ৭টি ছড়া থেকে ৭০০ গুন প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে…. বাকারা – ২৬১
- খরচ কর আল্লাহর পথে, নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না বলে সতর্ক করেছেন…. বাকারা – ১৯৫
- সোনা রূপা সঞ্চয় করে কিন্তু ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর পথে ব্যয় করেনা, তাদের কঠিন শাস্তির ভয় লাগানো হয়েছে… তওবা ৩৪-৩৫
- ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর জন্যে কৃপনতার আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের ভয়াবহ পরিনাম সম্পর্কে জানানো হয়েছে…. মুহাম্মদ-৩৮
ইনফাকের গুরুত্ব বিষয়ে নিম্নবর্ণিত হাদীস গুলোও প্রনিধানযোগ্য
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা মানব সন্তানকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি খরচ কর, তোমার জন্যে খরচ করা হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)।
আসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সাঃ) বলেছেন, খরচ কর, কত খরচ করলে তা বড় করে দেখার জন্যে হিসাব করতে যেও না, তাহলে আল্লাহ তোমার বিপক্ষে হিসাব কষবেন। সঞ্চয়ের প্রতি মনোযোগী হবে না, তাহলে আল্লাহ তোমার বিপক্ষের জমা ভাল করে সংরক্ষণ করবেন। তোমার সাধ্যমত খরচ কর।” (বুখারী ও মুসলিম)
আবূ উমামা থেকে বর্ণিত, “রাসুল (সাঃ) বলেছেন, হে আদম সন্তান, যদি তোমার উদ্বৃত্ত সম্পদ খরচ কর তাহলে তা তোমার জন্যে কল্যাণকর হবে। আর যদি তা সঞ্চয় করে রাখ তাহলে তা হবে তোমার জন্যে অকল্যাণকর। তবে হ্যাঁ, তোমার জীবন ধারণের ন্যূনতম সম্পদের জন্যে তোমাকে পাকড়াও করা হবে না। এ খরচের সূচনা কর তোমার পরিবার থেকেই।“ (মুসলিম)
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, “রাসুল (সাঃ) বলেছেন, দানকারী আল্লাহর নিকটতম, বেহেশতের নিকটতম এবং মানুষেরও নিকটতম হয়ে থাকে এবং দূরে থাকে দোযখ থেকে। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি অবস্থান করে আল্লাহ থেকে দূরে, বেহেশত থেকে দূরে, মানুষ থেকেও দূরে এবং দোযখের নিকটে। অবশ্য অবশ্যই একজন জাহেল দাতা একজন বখিল আবেদের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিকতর প্রিয়।” (তিরমিযি)
ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর মূল ভাবার্থ
আমার উপরে কোরআনের যে কিছু সংখ্যক আয়াত ও কতিপয় হাদিস অধ্যয়ন করেছি। উক্ত আয়াত গুলোতে ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর কথা বারে বারে এসেছে
ফলে আমাদেরকে ‘ইনফাক’ ও ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ কথাগুলোর মূল অর্থ ও তাৎপর্য কি সেটাই ভালভাবে বুঝার ও তাৎপর্য অর্জনের চেষ্টা করব।
ইনফাকের সংজ্ঞা ও বিশ্লেষণ
اِنْفَاقٌ فِي سَبِيلِ الله – ইনফাক (إنفاق) অর্থ ব্যয় করা, দান করা বা খরচ করা, বিশেষত আল্লাহর রাস্তায় খরচ। ফি (في): অর্থ মধ্যে, তে বা জন্য এখানে ‘পথে’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সাবিলিল্লাহ (سبيل الله) দুটি অংশ মিলে গঠিত, সাবিল (سبيل): পথ বা রাস্তা। আল্লাহ (الله): মহান আল্লাহ তাআলা। সুতরাং, সাবিলিল্লাহ অর্থ আল্লাহর পথে। যার পূর্ন অর্থ দাড়ায় “আল্লাহর পথে খরচ বা দান করা”
ইনফাক শব্দটি আরবী ‘নফক’ (نفق) ধাতু থেকে উৎসরিত। নফক অর্থ সুড়ঙ্গ যা দিয়ে দ্রুত ঢুকে বের হওয়া যায়। আরব দেশে সড়ক পথের টানেল কে নফক হিসেবেই উল্লেখ করা হয়
মুনাফেক ও নিফাক শব্দদুটো একই ধাতু থেকে গঠিত। অনির্ভর ব্যক্তি বা উপাদান। যা একদিকে ঢুকে অন্যদিকে বের হয়ে যায়। যাকে ধরে রাখা যায় না, বা আস্তায় নেওয়া সম্ভব হয় না।
(বিয়ে মেজবানিতে লাইন ধরে খানা সাপ্লাইয়ের মত, নিজের হাতে থালা আসে, মুহুর্তেই সেটাকে অন্যের হাতে হস্তান্তর করা হয়। মাঝ ডিম-তরকারী কিছু একটা রাখা যায় না)
পরিবারের জন্যে খরচ করা, দান-সদকা করা, জীবিকার জন্য টাকা-পয়সা ব্যয় করাকেও “ইনফাক” বা “নাফাকা” (نفقة) বলা হয়। যেমন: আরবীতে পরিবার ও সন্তানের ভরণপোষণের খরচকে বলা হয় ‘নাফাকাতুল আওলাদ‘।
বাজারের যে পন্য দ্রুত এসে দ্রুতই ফুরিয়ে যায়। অর্থাৎ ভাল মাল, চলা মাল, বাজারের চাহিদা বোঝাতে (সুকুন নিফাক – سوق النفاق) তথা পণ্যটি বাজারে খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় বা পণ্যটির ব্যাপক চাহিদা বুঝাতে ব্যবহার হয়।
শব্দের এমন গঠনের কারনেই, মূলত ইনফাক শব্দের অর্থ মাল খরচ করাই বুঝানো হয়। আমাদের দেশে চাঁদা বলতে বলতে যা বুঝানো হয়, ইনফাক সে অর্থে অনেক বড় কিছু। চাঁদা শব্দটি ফার্সি, যার অর্থ ‘যৎকিঞ্চিত’ দান।
শাব্দিক অর্থের আলোচনায় ইনফাকের দুটো দিক পাওয়া যায়
১. এ পরিমাণ খরচ করতে হবে যাতে অর্থ-সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ না আসে। বা দাতার মনে সঞ্চয়ের ধারণা বদ্ধমূল হওয়ার সুযোগ না আসে।
২. ভরণ-পোষণ বা খোরপোষের অর্থের তাৎপর্য হল দাতা যার জন্যে দান বা খরচ করবে তার প্রয়োজন পূরণ করার মত অর্থ অবশ্যই ব্যয় করবে।
অনেকের যতকিঞ্চিত দান দিয়ে দীর্ঘ বছরে হয়ত একটি মসজিদ হতে পারে কিংবা মাদ্রাসা হতে পারে কিন্তু দ্বীনকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সেকারণেই মালের প্রয়োজন।
ফি সাবিলিল্লাহর অর্থ
আমরা উপরে যে আয়াতগুলো আলোচনায় এনেছি সেখানে শুধু ইনফাকের কথা বলা হয়নি বলা হয়েছে ‘ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ’ হিসেবে
আগে উল্লিখিত আয়াত গুলো দেখলে পরিষ্কার হবে যে, ফি সাবিলিল্লাহর সাথে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ অথবা কিতাল ফি সাবিলিল্লাহ জড়িত আছে।
অতএব আল কোরআনে ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর আহ্বান মূলতঃ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে অর্থ ব্যয়কেই বুঝানো হয়েছে।
যদিও ফি সাবিলিল্লাহ কথাটি ব্যাপক অর্থেও ব্যবহৃত হওয়ার অবকাশ আছে।
গরীব-দুঃখী মিসকিনকে সাহায্য করাকেও ফি সাবিলিল্লাহ বলা হয়
তেমনি যে কোন সেবামূলক কাজও ফি সাবিলিল্লাহর কাজ বলা হয়
কিন্তু এগুলো এগুলো ফি সাবিলিল্লাহর মৌলিক কাজ নয়।
ফি সাবিলিল্লাহর মৌলিক কাজ ‘জিহাদ এবং কিতাল ফি সাবিলিল্লাহ’ কে বুঝায়। ইনফাকের অর্থের সাথে ফি সাবিলিল্লাহর শব্দগুলো যোগ করলে অর্থ দ্বারায় আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রয়োজন পূরণ,
এর উপায়-উপকরণ যোগাড় ও এই মহান কাজটি পরিচালনার জন্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্যে অর্থ-সম্পদ খরচ করা।
চাঁদার মনোভাব নিয়ে অর্থ দান করার মাধ্যমে এর হক আদায় হতে পারে না।
যৎকিঞ্চিত দান দিয়ে দীর্ঘ বছরে হয়ত একটি মসজিদ কিংবা মাদ্রাসা হতে পারে
কিংবা কিছু গরীব দুঃখী লালন পালন ও কিছু অবকাঠামো হতে পারে
কিন্তু দ্বীনকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, সেকারণেই মালের প্রয়োজন।
ফলে ইসলামী আন্দোলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে চাঁদার পরিভাষা ব্যবহার না করে আরবি ‘এয়ানত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ সহযোগিতা দান ৷
ইনফাকের তাৎপর্য
আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার খাতে কেন আমাদেরকে মাল সম্পদ খরচ করতে হবে
তাঁর পথে জিহাদের আহবানের মধ্যেই প্রশ্নটির উত্তর রয়েছে
তোমরা জিহাদ কর আল্লাহর পথে মাল দিয়ে এবং জান দিয়ে।
অর্থাৎ দ্বীন প্রতিষ্ঠার এই জিহাদে মাল ও প্রাণের কোরবানির দরকার আছে
এ দুটো জিনিস কোরবানি দেয়ার মত একদল মুজাহিদ ময়দানে থাকবে
তাদের হাত ধরেই আল্লাহর দ্বীন কায়েমের সংগ্রাম বিজয় হবে।
যেমন বিজয়ী হয়েছিল রাসুল (সাঃ) সাথে তার সাহাবী-গন
আল্লাহ বলেছেন, যারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, নিহত বা বিজয়ী হবে তাদের উত্তম প্রতিদানে ভূষিত করা হবে…. নেসা-৭৪
ইনফাকের পথে প্রধান অন্তরায় হল মোহ
দুনিয়ার ধন-সম্পদ, ভোগ-বিলাসের মোহ আল্লাহর পথের প্রধান অন্তরায়।
সেই মোহ কাটাতেই জানের কোরবানি পেশ করার ব্যাপারে তাকিদ করেছেন।
আল্লাহর পথে মাল খরচের মাধ্যমেই বৈষয়িক ও পার্থিব মোহ কাটে
মানুষের কাছে তার জান এবং মাল দুটোই প্রিয়।
কখনও জান বাঁচানোর জন্যে সমস্ত মাল লুটিয়ে দিতে যেমন পরোয়া করে না
আবার মালের মোহ চরিতার্থ করতে গিয়ে জীবন বিপন্ন করতেও পারে
এ দুয়ের মাঝে আল্লাহ তা’আলা মালের কোরবানিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন
পার্থিব জগতের মায়ার তুলনায় আখেরাতের মায়া-মহব্বত বেশী করাই লক্ষ্য
নচেৎ কেউ আল্লাহর পথে, আল্লাহ নামে জান দিতে পারে না।
অন্যদিকে আল্লাহর পথে বেশি বেশি মাল খরচের অভ্যাস না হলে
আখেরাতের জীবনকে অগ্রাধিকার দেবার মানসিকতা তৈরি হবে না
তাই আল্লাহর পথে টিকিয়ে রাখতে ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ পথে ত্যাগ দরকার
আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও টিকিয়ে রাখতে ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ পথে ত্যাগ দরকার
আল্লাহর জমিনে দ্বীন কায়েমের সংগ্রাম বিজয়ী হওয়ার জন্যে অর্থ-শক্তি দরকার
জনশক্তিকে অর্থ-শক্তিতে বলিয়ান হওয়া অপরিহার্য
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা এই সংগ্রামে মাল ও জান দুটো দিতে বলেছেন
মুহাম্মদ (সাঃ)-কে দাওয়াতি তৎপরতার মাধ্যমে জনশক্তি যোগাড় করতে হয়েছে
এই জনশক্তির আর্থিক কোরবানির দ্বারা উপায়-উপকরণ যোগাড় করতে হয়েছে।
অলৌকিকতা বা মু’জেযা নবী-রাসুলদের জীবনে সংঘটিত অবশ্যই হয়েছে
কিন্তু তা সংঘটিত হয়েছে একদিকে নবুওয়াতের প্রমাণ হিসাবে,
অপরদিকে কোন কওমকে ধ্বংসের আগে পক্ষে যুক্তি-প্রমাণের পরিসমাপ্তির জন্যে
মুজেজা দিয়ে সংগ্রাম সফল করানো হয়নি, এমনকি বদর, ওহুদ কোথাও না
রাসুলদের জীবনে বহু মু’জেযা সংঘটিত হলেও তা দিয়ে দ্বীন বিজয়ের প্রমাণ নেই
বরং স্বাভাবিকভাবে প্রতিপক্ষের সাথে মুকাবিলা করেই দ্বীন বিজয়ী হয়েছে।
অর্থ ব্যয় করে অস্ত্র সংগ্রহ অতঃপর সংগ্রামের মাধ্যমেই ইসলাম বিজয়ী হয়েছে
শেষ নবীর মাধ্যমে আমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ:
“তাদের সার্থক-ভাবে মুকাবিলার জন্যে তোমরাও যথাসাধ্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর আর ঘোড়া সজ্জিত অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় প্রস্তুত থাক, যাতে করে আল্লাহ দুশমন এবং তোমাদের দুশমনকে ভীতি প্রদর্শন করতে পারো। এদের ছাড়া এমন দুশমনদেরও মুকাবিলা করতে হবে, যাদের কথা তোমরা জান না। আল্লাহ তাদের ব্যাপারে জানেন। আর আল্লাহর পথে যা কিছুই তোমরা খরচ করনা কেন, তার প্রতিদান তোমরা অবশ্যই পাবে, তোমাদের প্রতি কোন অবিচার করা হবে না।” আনফাল – ৬০
দ্বীন বিজয়ের জন্যে অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য অন্যতম বড় Factor কিন্তু
আল্লাহর দ্বীন বিজয়ের জন্যে আল্লাহর সাহায্যই বড় Factor কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু আল্লাহর সেই সাহায্য আসার জন্যে প্রস্তুতি সংক্রান্ত আমল অপরিহার্য
যা সূর আনফালের ৬০ নং আয়াতের মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় বস্তুগত প্রস্তুতি কম হলেও আল্লাহ পুষিয়ে দেন
গায়েবী মদদও কখনও জুটে যায় কিন্তু সেই আশায় বা চিন্তায়
আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা বা শিথিলতা প্রদর্শনের কোন সুযোগ নাই।
আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সমসাময়িক দুনিয়ার প্রতিপক্ষ চিহ্নিত করতে হবে এবং
তার মোকাবিলায় যথার্থ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিপক্ষ দ্রুত গতিতে এগুবে আর ইসলামী শক্তি শামুকের গতিতে তা চলবে না
এভাবে প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় বিজয় লাভ আল্লাহ তায়ালার সুন্নাত বহির্ভূত নীতি
ইসলাম বিরোধী শক্তির প্রস্তুতি মোকাবেলায় আমরা কোথায়
আজকের প্রেক্ষাপটে ইসলাম বিরোধী শক্তির প্রস্তুতি কেমন আর আমরা কোথায়
ইসলামী আন্দোলনের প্রতিপক্ষ শক্তি সমূহের প্রস্তুতি ও তাদের নানা কলাকৌশল
তাদের নানা তৎপরতা মূল্যায়ন করে, তার মোকাবেলা চিন্তা করা হলে,
ইসলামী আন্দোলনের জন্যে উপায়-উপকরণ ও বিভিন্নমুখী রসদ সামগ্রী দরকার
ডিজিটাল জমানার জন্যে যোগ্য প্রতি উত্তর দেবার মত শক্তি দরকার
নিজেদের বিরুদ্ধে প্রচার প্রোপাগান্ডার মোকাবেলায় মিডিয়া দরকার
জগতের ওই শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত করে দাঁড়াতে জ্ঞান বিজ্ঞানের দখল দরকার
চলমান জ্ঞান বিজ্ঞানকে আত্মস্থ করে তাকে ব্যবহার করার সক্ষমতা দরকার
এসব তো রাসুল (সাঃ) যুগে ছিলনা কিন্তু আমাদের তো মোকাবেলা করতে হবে
দিনে দিনে পরিবর্তিত জমানায় আবার নূতন ভাবে বিরোধিতার বিস্তার ঘটবে
এসবের মোকাবেলায় প্রথম যে শক্তির দরকার তা হল অর্থনৈতিক শক্তি
অতঃপর যে শক্তির দরকার তা হল জনবল শক্তি
যে জনবল নিজেই শক্তি নিজেই অর্থের যোগানদাতা তার পরাজয় সম্ভব হয়না
সে কারণেই ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ তথা আল্লাহর রাস্তায় দান সর্বোত্তম জেহাদ
ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর ক্ষেত্রে রাসুল (সাঃ) -এর ভূমিকা
নবুওয়াত আসার পূর্বে মুহাম্মদ (সাঃ) আরবের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন
খাদিজা (রাঃ) ব্যবসায়ে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই তিনি এ অবস্থায় উন্নীত হন। তাছাড়া হযরত খাদিজা তার সমুদয় সম্পদ ব্যবহারের অনুমিত দিয়েছিলেন
ইতিহাস সাক্ষী সেই রাসুলের ওফাতের সময় কোন সম্পদ রেখে যান নাই
রাসুল (সাঃ) তার সমুদয় সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে দিয়েছিলেন
ইনফাকের ক্ষেত্রে মক্কার সাহাবায়ে কেরামগণের ভূমিকা
সাহাবাগনও মাল ও জান কোরবানির নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
তাঁদের এই কোরবানির জন্যে স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, তিনি তাদের কাজে খুশী
‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলে ঘোষনাই দিলেন যে আল্লাহ তাদের কাজে রাজী হয়েছেন
আল্লাহর রাসুলের নিজের হাতে গড়া এই ভাগ্যবান লোকদের একাংশ মুহাজির
অন্য অংশ আনসার নামে অভিহিত; মাল ও জানের ক্ষেত্রে দুই দলই সমান ত্যাগী
নবী (সাঃ) মুহাজিরদের মক্কার ১৩ বছরে চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেন
তারা তাঁদের মালের সকল মায়া ত্যাগ করে মদিনায় হিজরাত করেন
বাপ-দাদার ভিটা-মাটি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবই ফেলে দিয়ে যান
আল্লাহর ডাকে তারা সাড়া দিতে তাঁদের বিন্দুমাত্র দেরী করেনি
মদিনার লোকেরা ইসলামে নতুন হলেও আন্তরিকতায় কোনমতে পিছিয়ে ছিল না
ইনফাকের ক্ষেত্রে মদিনার সাহাবায়ে কেরাম গণের ভূমিকা
মক্কা থেকে আগত সম্বলহীন লোকদের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেন
মুনাফিক ও ইহুদিদের কুমন্ত্রণা সত্ত্বেও তাঁরা বিভ্রান্ত হননি।
মক্কার ছিন্নমূল লোকদের মদিনায় পুনর্বাসন করতে সর্বোচ্চ ত্যাগ করল
অচিরেই বদর, ওহোদের যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছে ক্ষতিও হয়েছে
এতে মদিনা-বাসীদের মক্কার মানুষদের কারণে বিরাট অর্থনৈতিক চাপ এসেছে।
আল্লাহর দ্বীনের কারণে মদিনার আনসারগণ হাসিমুখেই এ চাপের কাঁধে নিয়েছেন আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে তাঁরা বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিলেন
ফলে আল্লাহ তাদের হাত দিয়েই দ্বীনকে বিজয়ী করেছেন
মুহাজির ও আনসারগণের এ কোরবানি সর্বকালের সর্বযুগের সেরা কোরবানি
তারা আমাদের জন্যে যেমন অনুকরণ ও অনুসরণ-যোগ্য আদর্শ হয়ে থাকবে
তেমনি তাঁদের ব্যক্তিগত ভূমিকাও সবার জন্যে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আমরা এখানে মাত্র কয়েকজনের ভূমিকা অতি সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস পাব।
ইনফাকের পথে খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) এর ভূমিকা
মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওয়াত ঘোষণার সাথে সাথেই তিনি তাঁর প্রতি ঈমান আনেন
হেরা গুহার ঘটনা ও ওয়ারাকা ইবনে নওফলের মাধ্যমে বুঝেন তিনি নবী হবেন
তিনি আরো বুঝেছিলেন যে, আল্লাহর রাসুল হিসাবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে
এই দায়িত্ব পালন করতে তার প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে।
তাই তিনি ঈমান ঘোষণার সাথেই নিজের সমস্ত মাল নবী (সাঃ) হাতে দেন
তিনি ঐ সময় মক্কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ছিলেন।
তাঁর সমস্ত মাল আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত সম্প্রসারণ ও দাওয়াত কাজে ব্যয় হয়
ইনফাকের পথে আবু বকর (রাঃ) এর ভূমিকা
নবী (সাঃ) এর সাথী আবু বকর (রাঃ) মক্কার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।
রাসুল (সাঃ) ডাকে সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম ব্যক্তি।
তিনি রাসুল (সাঃ) সকল দুঃসময়ে সাথী হিসাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন
তেমনি এ পথে অকাতরে অর্থ বিলাতেও কুণ্ঠিত হননি।
মক্কী জীবনে দ্বীন কবুল-কারী দুঃস্থ অসহায় ক্রীতদাসদের তিনি আজাদ করেছেন
মদিনার জীবনেও আল্লাহর রাসুলের আহ্বানে সর্বস্ব দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন
রাসুল (সাঃ) নবুওয়তের ঘোষণা শুনে ৪০ হাজার দিরহাম ওয়াকফ করে দিলেন
ওটাই ছিল তার ব্যবসায়ের মূল মূলধন, পুরো মূলধন ত্যাগ করে ইসলামের জন্য
কুরাইশদের যে সব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণ করতেন তিনি তাদের মুক্ত করতেন
কোন নও মুসলিম দাস-দাসীদের কাউকে খরিদ করে আজাদ করে দিতেন।
তিনি যখন মদিনায় যান সাথে মাত্র ২.৫ হাজার দিরহাম, সেটাও ব্যয় করে দেন
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি।
কিন্তু আবু বকরের ইহসান এমন যে, তা পরিশোধ করতে আমি অক্ষম।
তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন স্বয়ং রাসুল (সাঃ)
তার অর্থ আমার এত উপকারে এসেছে যে, অন্য কারো অর্থ তেমন আসেনি। তাবুক অভিযানে তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী।
এ অভিযানের সময় বাড়ীতে যা কিছু ছিল সবই নিয়ে এসেছিলেন
বলেছিলেন আমার ঘরে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল থাকাই যথেষ্ট।
ইনফাকের পথে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর পথে কোরবানির ক্ষেত্রে উমার (রাঃ) ছিলেন অগ্রগামী।
দাওয়াত সম্প্রসারণ ও বিজয়ের জন্য তাঁর বীরত্ব ইতিহাসের পাতায় প্রোজ্জ্বল
তেমনি অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রেও তার অনন্য দৃষ্টান্ত ইতিহাসে উজ্জ্বল
এ ব্যাপারে তিনি সব সময়ই অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন।
তাবুক অভিযানে তার মোট সম্পদের অর্ধেকটাই রাসুল (সাঃ) হাতে তুলে দেন
তাবুক যুদ্ধে আবু বকর (রাঃ) কোরবানি দেখে বলেছিলেন, তাকে কখনও হারানো যাবেনা
ইনফাকের পথে উসমান (রাঃ)
হযরত ওসমান (রা.) ছিলেন কুরাইশদের সম্মানিত ও ধনাঢ্য ব্যক্তি।
বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী বলে তিনি তিনি গণী’ উপাধি লাভ করেন।
ইসলামী আন্দোলনে উসমানের অবদান মুসলিম জাতি কখনও ভুলতে পারবে না।
ইসলামের সেই সংকটকালে আল্লাহর রাস্তায় তিনি ব্যাপক অর্থ খরচ করেছেন
ইসলামের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত দেবার জন্য আর কোন উদাহরণ নেই
১২ হাজার দিরহামে ইয়াহুদী মালিকানাধীন ‘বীর রুমা’- রুমা কুপের শেয়ার নেন
মুসলমানদের জন্যে একদিন বাদে একদিন পানি তোলার ব্যবস্থা করে দেন,
অতঃপর ইহুদিরা সেটা দশগুণ দামে কিনতে চাইলেন, তিনি বিক্রি করেন নাই
উল্টো আরো ৮ হাজার দিরহাম দিয়ে কুপটি এককভাবে কিনে নেন এবং
কিনেই কুপটি তিনি মদিনার মুসলমানদের জন্য ওয়াক্ফ করে দেন।
বিনিময়ে রাসুল (সাঃ) তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন।
তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালেও তিনি প্রচুর অর্থ দান করে উত্তম নজীর পেশ করেন।
তাবুক যুদ্ধের এক তৃতীয়াংশ সৈন্যের যাবতীয় ব্যয়ভার তিনি কাঁধে নেন
সাড়ে নয় শো উট ও পঞ্চাশটি ঘোড়া সরবরাহ করেন৷
তাবুকের বাহিনীর পিছনে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ আর কেউ বহন করতে পারেনি
বর্ণনায় এসেছে, যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য কোঁচড়ে করে এক হাজার দীনার আনেন
সবগুলোই ঝুর ঝুর করে রাসুলুল্লাহর (সাঃ) এর কোলের উপরে ঢেলে দেন।
রাসুল (সাঃ) খুশিতে দিনারগুলি উল্টে পাল্টে দেখেন এবং বলেন:
আজ থেকে উসমান যা কিছুই করবে কোন কিছুই তার জন্য ক্ষতিকর হবে না। বর্ণনায় এসেছে, তাবুকের যুদ্ধে তাঁর দানে সন্তুষ্ট হয়ে রাসুল (সাঃ) তার জন্যে
আগে-পিছের সকল গুনাহ মাফের দোয়া ও জান্নাতের জন্যে ওয়াদা করেছেন
ইনফাকের পথে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)
আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) নিবেদিত প্রাণ বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন।
মক্কায় তিনি ধনাঢ্য ব্যক্তি না হলেও, মদিনায় গিয়ে ব্যবসা শুরু করেন
আল্লাহর তাঁর ব্যবসায়ে প্রচুর মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দেন
সেই অর্থ আল্লাহর পথে ব্যয়ে তিনি কখনো কার্পণ্য প্রদর্শন করেননি
তাবুক যুদ্ধের পরীক্ষায় তিনিও কৃতকার্য হন বরং এ পরীক্ষায়ও তিনি উত্তীর্ণ হন। নবম হিজরিতে তাবুক অভিযানের সময় মুসলমানগণ যে ঈমানী পরীক্ষার সম্মুখীন আবদুর রহমান (রাঃ) তাবুক যুদ্ধে ৮ হাজার দিনার রাসুল (সাঃ) হাতে তুলে দেন
মুনাফিকরা কানাঘুষা শুরু করে দেয় এটা তো লোক দেখানোর জন্যে করছে
জবাবে আল্লাহ বলেন, এতো সেই ব্যক্তি যার উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হতে থাকবে। (সূরা তওবা-৭১)
উমার (রাঃ) তাঁর এ দান দেখে বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আবদুর রহমান গুনাহগার হয়ে যাচ্ছে’
কারণ, সে তার পরিবারের লোকদের জন্য কিছুই রাখেনি।’
এ কথা শুনে রাসুল (সাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘আবদুর রহমান, পরিবারের জন্য কিছু রেখেছ কি?
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। যা দান করেছি— তার থেকেও বেশি তাদের জন্য রেখেছি’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, কত?
বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুল যে রিজিক, কল্যাণ ও প্রতিদানের অঙ্গীকার করেছেন, তাই’ রেখেছি।
ইনফাকের পথে মুহাজিরদের ভূমিকা
রাসুল (সাঃ) সাথীদের কোরবানি আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ঈমান ঘোষণার সাথে সাথেই বহুমুখী বিপদ-মুসিবত তাদের উপর আপতিত হয়।
জুলুম-নির্যাতনের ষ্টীম রোলার তাদের উপর চালানো হয়।
রুটি-রোজগারের সকল পথই তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
ধনী-সচ্ছল ব্যক্তিদের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে।
কিন্তু সকল কিছুকে উপেক্ষা করে তারা ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য তারা সকলেই জান-মাল অকাতরে বিলিয়ে দেন।
এ ব্যাপারে তাদের কোন আক্ষেপ তো ছিলই না বরং
এ ক্ষেত্রেও তাদের প্রতিযোগিতা ছিল ঈর্ষা করার মত নজিরবিহীন।
তারা নিজের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও জীবন হক পথে বিলিয়ে দিয়েছেন
এবং হকের ঝাণ্ডা উড্ডীন রাখতে কোন ধরনের পিছপা হননি।
এমনকি দ্বীনের তাগিদে জন্মভূমি ত্যাগ করেও দৃষ্টান্ত দিয়েছেন
ইনফাকের পথে আনসারদের ভূমিকা
নবুয়তের ১৩ বছর পর সাহাবিদের মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দেন।
সম্পদ, স্বজন, স্বদেশ ছেড়ে সবাই হিজরত করলেন
মদিনায় যারা পৌঁছলেন তাদের কাছে আল্লাহর নাম ছাড়া আর কিছুই ছিল না
মদিনার আনসাররা সর্বোচ্চ ভালবাসা দিয়ে মেহমানদারী করলেন
তারা সহায় সম্বলহীন এ মুহাজিরদেরকে ভাই-হিসেবে গ্রহণ করলেন
আনসাররা আল্লাহ তা’লার এ মহান ইহসানের পুরোপুরি শোকর আদায় করলেন
নবী করীম (সাঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কায়েম করলেন। তাঁরা পাতানো ভাইদেরকে নিজ ধন-সম্পদ সমান ভাগে ভাগ করে নিলেন।
এটা তারা করেছিলেন শুধুমাত্র দ্বীনের জন্য, দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য।
সাহাবিদের এমন গুণের কারণেই আল্লাহর প্রিয় ও পছন্দনীয় হতে পেরেছিলেন।
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।
বর্তমান যুগে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিপক্ষ ও তাদের প্রস্তুতি
বর্তমান যুগ সন্ধিক্ষণে এ আন্দোলনের প্রতিপক্ষ সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। তাদের প্রস্তুতিরও যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বর্তমান বিশ্বে যে দেশেই পরিচালিত হোকনা কেন
তার প্রধান প্রতিপক্ষ দুই পরাশক্তি-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত রাশিয়া। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিপক্ষ তাদের প্রভাব বলয়ের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহ
ঐ দুই প্রতিপক্ষের সাথে আছে প্রতিবেশী আরেকটি পাতি বৃহৎ শক্তি।
সব প্রতিপক্ষ পরিকল্পনার মাধ্যমে ইসলামের পুনঃর্জাগরণ ঠেকাতে সক্রিয়
তাদের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ, দ্বন্দ্ব, ইস্যু নিয়ে নানা মতপার্থক্য আছে, কিন্তু ইসলাম ইস্যুতে সর্বত্রই তারা এক ও অভিন্ন ভূমিকা পালন করে আসছে।
গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজির কারণে কখনও কিছুটা ভিন্ন দেখা যায়, সেটাও বাহ্যিক ব্যাপার
কিন্তু ইসলামী পুনঃর্জাগরণ ঠেকানোর ব্যাপারে তাদের কোন শৈথিল্য নেই।
তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিশ্বের প্রচার মাধ্যম সমূহ তাদের সুবিধা দেয়
ইহুদীরা ইসলামের বিরুদ্ধে এই কাজে সর্বোচ্চ সহায়তা দিয়ে থাকে
মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে ওরা চিন্তার বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্যে বাছাই করেছে
রীতিমত Intelectual and cultural Agression চালাচ্ছে।
বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে তাদের মানসিক গোলামে পরিণত করছে।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে প্রশাসনে ঢুকে প্রভাব সৃষ্টি করার সুযোগ গ্রহণ করে
এনজিওদের মাধ্যমে জাল বিস্তার করে সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির চেষ্টা চলে
ওদের প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আমাদের স্বকীয় মূল্যবোধ ধ্বংসের অপ্রয়াসও চালায় সেই জালে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বস্তুগত সহযোগিতা দিয়ে তাদের পক্ষে রাখতে সচেষ্ট হয়
উপরন্তু রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলে সমাজ-রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
এদের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের উপর সরাসরি আঘাত হানার ব্যবস্থা করছে।
যে উপেক্ষিত ক্ষেত্রে ইনফাকের অবদান রাখা অতিব গুরত্বপূর্ন
ইসলামী আন্দোলনের কর্মকৌশল সাজাতে এদের রণকৌশলকে দেখতে হবে
সেগুলোর মোকাবেলায় নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি কৌশল সাজাতে হবে
এই ক্ষেত্রে দুনিয়ার কোন শক্তির বুদ্ধি-পরামর্শ আন্দোলনকে সাহায্য করবে না
বস্তুগত দিক দিয়েও তাদের কোন সহযোগিতা পাওয়া যাবেনা
আল্লাহর উপর ভরসা করে আন্দোলনের নিজস্ব জনশক্তিকেই প্রস্তুত করতে হবে
ফলে সাধ্যমত ইসলামী জনতাকে সহায়ক শক্তি হিসাবে পেতে চেষ্টা করতে হবে
মুহাম্মদ (সাঃ) প্রতিপক্ষও সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল।
ধনবল ও জনবলে তারাই বেশী বলিয়ান ছিল।
মদিনায় হিজরতের পর প্রতিপক্ষের সংখ্যা আরো বৃদ্ধিই পেয়েছিল।
মক্কায় প্রতিপক্ষর ছিল প্রভাবশালী, সম্পদশালী ও তাদের প্রভাবাধীন জনগণ।
মদিনায় প্রতিপক্ষ হল মুনাফিক গোষ্ঠী ও ইহুদীদের সম্মিলিত শক্তি
তার সাথে বাড়তি প্রতিপক্ষ যোগ হল রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যবাদ
যাদেরকে আধুনিক বিশ্বের আমেরিকা ও রাশিয়ার সাথে তুলনা করা যায়।
এসব প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় আল্লাহর রাসুল (সাঃ) প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন
সহযোগিতা নিলেন নিজস্ব ইমানদার জনশক্তির উৎস থেকেই
বাইরের কারও সাহায্য-সহযোগিতার জন্যে মুখাপেক্ষী হননি
এরা প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় জান বাজি রেখে লড়াই করতে প্রস্তুত হয়েছে
তেমনি যাবতীয় উপায়-উপকরণ ও রসদ সামগ্ৰী যোগাড়ে মনোনিবেশ করেছে
এবং সোৎসাহে উৎসাহ-উদ্দীপনা সহকারে মালের কোরবানি পেশ করেছে।
ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর পথে স্বার্থক উত্তরসূরী
আমাদের আজকের ইসলামী আন্দোলন মূলত: সেই আন্দোলনেরই উত্তরসূরি।
দুনিয়ার আর কোন আন্দোলনের সাথে এর সামান্যতম সামঞ্জস্যও নেই।
ফলে আল্লাহর রাসুল ও তাঁর হাতে গড়া সাথী-সঙ্গীদের সৃষ্টি করা সেই ঐতিহ্য
পুনরুজ্জীবিত করতে পারলেই এ আন্দোলনের নিজস্ব শক্তি ও গতি সৃষ্টি হবে
এবং ধাপে ধাপে সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হবে।
সেই ঐতিহ্যের অনুসরণে আজকের শহীদী খুনের নজরানা পেশ করা সম্ভব হচ্ছে
অন্য কথায় জানের কোরবানি পেশ করা সম্ভব হচ্ছে, তেমনি তাঁদের ঐতিহ্যের অনুসরণে খাদিজা, আবু বকর, উমার ও উসমান (রাঃ) এর মত কোরবানির
নজির স্থাপনের জন্য আল্লাহর কিছু বান্দাদের এগিয়ে আসা কি অসম্ভব?
ইসলামের অর্থ ব্যয়ের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ
ইসলাম ও ঈমানের মূল দাবী আল্লাহর কাছে জান ও মাল সোপর্দ করা
ইসলামের বাস্তব কাজ প্রতিষ্ঠায় অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা প্রাধান্য পায়
মূল্যবোধ কিছুটা হারিয়ে গেলেও ব্যয়ের প্রবণতা, ঐতিহ্য একেবারে নিঃশেষ হয়নি
ইসলামে অর্থ-সম্পদের কোরবানির দু’ধরনের ব্যবস্থা রেখেছে
একটা বাধ্যতামূলক যেমন যাকাত। অপরটি স্বেচ্ছামূলক।
যেমন গরীব, আত্মীয়-স্বজন, দুঃস্থ অসহায়দের সাহায্য-সহযোগিতা করা।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন, মসজিদ, মাদ্রাসা প্রভৃতি কায়েমে অর্থ ব্যয় করা।
স্বেচ্ছায় অর্থ ব্যয়ের মন-মানসিকতা তৈরিতে যাকাতের একটা ভূমিকা আছে।
প্রতিদানের আশা ছাড়া, নিঃস্বার্থ দানের অভ্যাস করাই যাকাতের উদ্দেশ্য
সেই যাকাতের যে আটটি খাতের মধ্যে ফি সাবিলিল্লাহর খাতও রয়েছে
মানুষের স্বেচ্ছামূলক খাতের মধ্যে ফি সাবিলিল্লাহর খাতে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ আছে
কোরআন হাদিসের আলোকে আল্লাহর পথে জিহাদ হলো সর্বোত্তম আমল।
অতএব এই সর্বোত্তম আমলের জন্যে অর্থ ব্যয় হবে সর্বোত্তম খাতে অর্থ ব্যয়
যাকাতের আটটি খাতের মধ্য থেকেও ফি সাবিলিল্লাহর খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ আল্লাহর দ্বীন কায়েম না হলে যাকাতের উদ্দেশ্যেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্যে সংগ্রামের পথে দান করাই হল সর্বোত্তম দান।
অন্য কোন দানের তুলনায় এ কাজের দানে সওয়াব হবে সবচেয়ে বেশি।
আজ আমরা ইসলামের শিক্ষা ভুলতে বসেছি বায়তুল মালকে রাজনৈতিক চাঁদা মনে করা হচ্ছে। এ পথের দান সর্বোত্তম সওয়াব এটা ভাবা তো দূরের কথা, এমন দানে আদৌ সওয়াব হয় কিনা এ সম্পর্কেই সন্দেহ-সংশয় পোষণ করেন।
মসজিদে হারামের সংরক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর চেয়েও আল্লাহর পথে জেহাদকে উত্তম বলা হয়েছে
সুরা তাওবার ১৮-২২ নং আয়াতে মসজিদের হারামের রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজিদের পান করানোর চেয়েও আল্লাহর পথে জেহাদ পরিচালনাকে উত্তম বলা হয়েছে।
আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য অর্থ ব্যয় সওয়াবের দৃষ্টিতে যেমন সর্বোত্তম কাজ
তেমনি বাস্তবতার আলোকেও এ পথে অর্থ ব্যয়টাই কার্যকর এবং অর্থবহ।
আমরা নামাযের জন্য মসজিদ তৈরিতে অর্থ ব্যয় করি এটা নিঃসন্দেহে ভাল কাজ
কিন্তু আল্লাহর দ্বীন কায়েম না হলে, এই মসজিদে নামায পড়ার মানুষ থাকবে না
আমরা মাদ্রাসার জন্যে খরচ করে থাকি, সে পথে আরো খরচ করা উচিত
কিন্তু দ্বীন কায়েম না হলে এই শিক্ষা আমাদের সমাজে যথার্থ গুরুত্ব পাবে না
আবার এ শিক্ষা বাস্তবেও কোন কাজেও লাগবে না।
আমরা ইয়াতিমখানা তৈরি করে এতিমদের পুনর্বাসনের কাজে অর্থ ব্যয় করি
নিঃসন্দেহে এটাও একটা সওয়াবের কাজ এবং সেবামূলক কাজ
সকল ছিন্নমূল, অভাবী লোকদের চাহিদা পূরণের জন্যে তো ইসলামী রাষ্ট্র দরকার
সমাজ বিপ্লবের আগে যে কাজ মোটেই সম্ভব নয়।
নিজেদের সকল সম্পদ ব্যয় করেই যদি অভাবী লোকদের অভাব পূরণ করতে যায় সেই চেষ্টা হবে নিষ্ফল ও অনুৎপাদন-মুখী, মানুষ দান দয়ার উপর নির্ভরশীল হবে
সওয়াবের নিয়তে, মানবতার সেবায় নিয়োজিত সামাজিক কাজ অবশ্যই ভাল কাজ
এভাবে যারা দান-খয়রাত করতে অভ্যস্ত তাদের দান আল্লাহ কবুল করুন।
আমরা এ দোয়াও করি যে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সর্বোত্তম খাতে, অর্থবহ খাতে ও উৎপাদন-মুখী খাতে অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে অর্থ ব্যয়ের তৌফিক দিন,
তাদের এ পথে অর্থ ব্যয়ের যথার্থ গুরুত্ব উপলব্ধি করার তৌফিক দিন। আমীন।
ইনফাকের ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলনের ঐতিহ্য
ইসলামী আন্দোলনের প্রধানত অবদান রেখেছেন আম্বিয়ায়ে কেরামগণ (আঃ)
এরপর কোরআনে সিদ্দিকীন, সালেহীন এবং শোহাদা নামে অভিহিত করা হয়েছে।
এই পুস্তিকায় মুহাম্মদ (সাঃ) ও সাহাবাদের ভূমিকা আলোচনায় এসেছে
তাঁদের ভূমিকা আমাদের প্রেরণার উৎস, তবুও মনের কোনে প্রশ্ন জাগতে পারে।
নবীদের ব্যাপার তো আলাদা, সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর ব্যাপার তো আরো ভিন্ন
নবীদের সাথী-সঙ্গীদের ব্যাপারও আলাদা।
কাজেই অতীতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আজকের বাস্তবতা তো ভিন্ন
নবীদের যুগ আর বর্তমান যুগের সমস্যা, চাহিদা কি একই? কিভাবেই হতে পারে এমন প্রশ্ন উদয় হলে
আজকের সমসাময়িক বিশ্বের ঘটনায় সেটা কিভাবে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। উপমহাদেশে সৈয়দ আহাম্মদ শহীদ ব্রেলভী মুজাহিদ আন্দোলন করেছেন
এই আন্দোলনে তৌহিদী জনতা পায়ে হেঁটে যোগদানের রেকর্ড করেছেন
তেমনি অকাতরে এই আন্দোলনের জন্যে আর্থিক সহযোগিতা ও করেছেন।
বাংলাদেশের যেখানে মুজাহিদ আন্দোলন ছিল সেখান থেকে ওশর যেত
বিভিন্ন দ্বীনি খেদমতেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দানের রীতি আজো চালু দেখা যায়। আজকের বিশ্বেও দু’টি আন্তর্জাতিক ইসলামী সংগঠন এভাবেই চলে
একটি জামায়াতে ইসলামী ও অন্যটি জামায়াতে ইখওয়ানুল মুসলেমিন
এই আন্দোলনে জড়িতরা সাহাবীদের মত জান ও মাল কোরবানির প্রয়াস পাচ্ছেন
সাহাবায়ে কেরামগণ যেভাবে ঈমানের ঘোষণায় জুলুম-নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছে
ইসলামী আন্দোলনে শরীক লোকেরাও একই জুলুম ও নির্যাতনেরই সম্মুখীন হচ্ছে
সাহাবীরা সে যুগে যেভাবে নিজেদের অর্থ-সম্পদ এ পথে ব্যয় করতেন
আজকের যুগেও ইসলামী আন্দোলনের লোকেরাও ত্যাগ, কোরবানির চেষ্টা করছেন
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রঃ) তাঁর লিখিত সব বই থেকে টাকা কামাতে পারতেন
তিনি তাঁর মধ্য থেকে মাত্র ২/৩টি বইয়ের আয় পরিবারের জন্যে রেখে
বাদবাকি সমস্ত বইয়ে ইসলামী আন্দোলনকে ওয়াকফ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মালের উৎস
জামায়াতের সহযোগীদের অনেকেই জীবনের কেরিয়ার এই আন্দোলনের জন্যে কোরবানি দিয়েছেন।
অনেকেই অর্থনৈতিক কোরবানির ক্ষেত্রে আয়ের শতকরা ৫ ভাগ দিয়ে দিচ্ছেন
কেউ কেউ ১০ ভাগ, ২০ ভাগ পর্যন্ত জামায়াতের বায়তুলমালে দিয়ে দেন
এই ঐতিহ্যের মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ কোরবানির ঐ দু’টো নিয়মের অনুসরণ হচ্ছে
যদিও এটাকে ফরয ওয়াজেব হিসাবে গণ্য করা হয় না
আমাদের সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই জামায়াতে বেশী
তাই মোটামুটি হিসাবে এই পর্যায়ের লোকদের আয়ের শতকরা পাঁচ ভাগ দিলে
তা অন্তত কোরবানি বা ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর পর্যায়ে পর্যায়ে পড়ে।
অতএব আন্দোলনের কর্মীরা নিজ আয়ের কমপক্ষে শতকরা পাঁচ ভাগ মাল দিচ্ছেন
এটা নিম্ন মধ্যবিত্তদের বেলায়ই প্রযোজ্য, আর যারা উচ্চ মধ্যবিত্তদের পর্যায়ে পড়ে
তাঁদের জন্য শতকরা পাঁচ ভাগ কোরবানির পর্যায়ে পড়তে পারে না।
আমাদের মধ্যে দ্বিতীয় আরেকটি ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়, তাহলো
নিজের পারিবারিক ও সাংসারিক খরচে সংগঠনকে পরিবারের ১ জন সদস্য গণ্য করা
ফলে পরিবার সদস্যদের মাথাপিছু বণ্টন করলে সংগঠনের ভাগে যতটা পড়ে
ততটা বায়তুলমালে জমা দেওয়ার মাধ্যমে দ্বীনের ভরন পোষণের দায়িত্ব নেওয়া
এভাবে ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ অর্থ অনুধাবন করে দ্বীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা
এবং দ্বীনি আন্দোলনকে নিজের পরিবারের সদস্য বানাবার মাধ্যমেই অর্থ ব্যয়ের অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।
ইনফাক ফি সাবিলিলিল্লাহ বইয়ের লেখক পরিচিতি:
লেখক: মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী
জন্ম: ৩১ মার্চ ১৯৪৩ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রাম
শাহাদাত: ১১ মে ২০১৬ ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারের ফাঁসির সেলে
ছাত্রজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিকে সম্পৃক্ত
১৯৬১ পাবনার শিবপুর ত্বহা সিনিয়র মাদ্রাসা, ফাজিল প্রথম শ্রেনীতে উত্থীর্ণ
১৯৬৩ ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসা ফাজিল প্রথম শ্রেণীতে উত্থীর্ণ
১৯৬৩ ঢাকা আলীয় ফেকাহশাস্ত্রে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্থীর্ণ
১৯৬৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম ডিগ্রি
১৯৬২ – ৬৬ পর্যন্ত ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় অফিস সেক্রেটারী
১৯৬৬ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘ সভাপতি
১৯৭১ ছাত্র সংঘের দায়িত্ব থেকে বিদায় গ্রহণ করেন
১৯৯১ – ২০০১ সালের সংসদ সদস্য
১৯৯২ – ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগের সাথে যুতপত আন্দোলনের নেতা
২০০১ – ২০০৬ সালের সংসদ সদস্য।
কৃষি ও শিল্পমন্ত্রনালয়ের ইতিহাস খ্যাত স্বনামধন্য মন্ত্রী
স্ত্রী: শামশুন্নাহার নিজামী
১৯৬৪ এমএসসি উদ্ভিদ বিজ্ঞান, রাজশাহী ইউনিভার্সিটি –
ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (নোট বই) পিডিএফ ডাউনলোড করতে চাইলে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন