বন্ধুত্বের পরিমাপ হয় ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে। একজন মানুষের বহু বন্ধু থাকতে পারে কিন্তু সকল বন্ধুই সমান মাপের হয়না। চরম ঘনিষ্ঠতার জন্য রুচি, অভ্যাস, আদর্শ, জীবনযাত্রা, লক্ষ্য, সমৃদ্ধি, অর্থ-বিত্ত, খ্যাতি, পরিচিতি বহু কিছুই নির্ভর করে। এ সব গুণাবলীর সাথে উভয়ের অন্তত অর্ধেক মিল স্থাপিত হলেই বন্ধুত্ব সৃষ্টির সূচনা হয়। বন্ধুত্বের উভয় পাশে, রুচির মিলের পরিমাণ বাড়তে থাকলে উভয়ের বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। আবার মানব চরিত্রের এমন কিছু উপাদান লুকিয়ে থাকে যার ফলে, অধিক ঘনিষ্ঠতায় সম্পর্ক নষ্ট হয়।
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
প্রকৃত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতার মাত্রার উপর নির্ভর করে। কারো সাথে ঘনিষ্ঠতা যদি উভয়ের রুচি-অভিরুচির মাত্রা প্রায় সমান পর্যায়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য বন্ধুদের কথা ধোপে টিকে না। কখনও পিতা-মাতা কিংবা কাছের আত্মীয়-স্বজনের দেওয়া তথ্যও বিশ্বাসে আনতে চায়না। কেননা বাহ্যিক দৃষ্টিতে উভয়ে অনুভব করে যে, তাদের সম্পর্ক আজীবন এমনকি বৃদ্ধাবস্থা অবধি পর্যন্ত বিরাজমান থাকবে। ফলে ঘনিষ্ঠ মাত্রায় পিছিয়ে থাকা অন্য বন্ধুরা তখন মন্তব্য করার ক্ষেত্রে খুব হিসেবি হয়। না জানি একটি মন্তব্যের কারণে উল্টো তার সম্পর্ক ঢিলে হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি কোন একদিন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দোষ প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাহলে এসব বন্ধুরা বদনাম করতে জোট বেঁধে হামলে পড়ে এবং বলতে থাকে, এতদিন তো সেই তোমার অন্যতম দোস্ত ছিল, এখন মজা বুঝ! অধিক ঘনিষ্টতার এটা একটা মন্দ দিক, যার মাধ্যমে অন্যরা সুযোগ নেয়। বন্ধুদের সম্মিলিত টিপ্পনীতে তখন সে ব্যক্তি চরম একাকীত্ব বোধ করে। কোন কারণে কারো সাথে ঘনিষ্ঠতা শীতল হলে, অন্যদের মন্দ দিকটা এভাবে ভেসে উঠে। তারা যে এতদিন হিংসেয় জর্জরিত ছিল সেই লুকায়িত অবয়ব প্রকাশিত হয়ে পড়ে। অধিক ঘনিষ্ঠতায় সম্পর্ক নষ্ট হয
ঘনিষ্ঠতা বিনষ্টের কারণ
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গভীর হওয়ার মাঝেও কেউ শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না যে, তা আজীবন বহমান থাকবে। দীর্ঘ বছরের ঘনিষ্ঠতা একটি ঠুনকে অভিযোগের কারণেই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে! অবিশ্বাসের কোন কাজ করলে কিংবা কথা ও কাজের মধ্যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হলে, উভয়ের মধ্যে চরম অনাস্থা ও অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। এই ধরনের অনাস্থা আর কখনও মেরামত করা যায় না। দিন দিন দূরত্ব বাড়তে থাকবে। কখনও শারীরিক হামলার কারণও হয়ে উঠতে পারে। এই অবস্থায় করনীয় হল, উভয়ের কোন একজন যদি, সুবিধাবাদীদের কু-প্ররোচনায় অংশ না নিয়ে, অপবাদ না রটিয়ে, ধৈর্যের সাথে দীর্ঘদিন চুপ মেরে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, তাহলে কোন একদিন সে সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হতে পারে। তবে তা ঐ ঘনিষ্ঠ জনের সাথে অনুরূপ আরেকটি ঘটনা না ঘটা অবধি। জগত সংসারের সকল পরিবারের অধিকাংশই স্বার্থপরতার ধন্ধে আবদ্ধ। যার মুখ আছে আর যে কথা বলে, তার শত্রু সৃষ্টি হবেই তাই এই ধরনের ঘটনা মানব জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই অধিক ঘনিষ্টতা সুষ্টি করাই মূল কাজ নয়, উভয়ের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে সেটাকে হেফাজত করাও দায়িত্ব।
আরো পড়ুন…
-
যোগ্য লোক অলস হলে কূটচালে অভ্যস্ত হয়
-
বস্তুবাদী সরকার, নৈতিকতার প্রতিবন্ধক
ঘনিষ্ঠতা নষ্টের সামাজিক কারণ
ঘনিষ্ঠতা নষ্টের সামাজিক কারণটাই সবচেয়ে বেশী মর্মপীড়ার কারণ হয় যা সবার কাছেই বরদাশত করা কঠিন। শুরুতে উভয়ের রুচি-অভিরুচির অনেকটাই মিল থাকার কারণে তাদের মধ্যে যে মধুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সেটাতে টান ধরে তাদের কারো একজনের অবজ্ঞার সূত্র ধরে। এই দিকটায় লক্ষ্য করে ইংরেজ কবি উইলিয়াম সেইক্সপিয়র একটি বিখ্যাত উক্তি করেছেন, “Familiarity breeds contempt – অতি ঘনিষ্ঠতায় সম্পর্ক নষ্ট হয়”
দু’জনের মধ্যে যদিও ঘনিষ্ঠতা আছে কিন্তু তাদের দু’জনের জীবন-মান, সমস্যা ও সামাজিক অবস্থা কখনও এক হয়না। উভয়ের কোন একজনের অবস্থা যদি কোন কারণে উন্নততর হয় কিংবা তার সাথে আরো উঁচু বৈষয়িক শ্রেণীর লোকজনের সাথে উঠা-বসা শুরু হয়। তখন সে উঁচু বৈষয়িক শ্রেণীর মানুষের সাথে নিজেকে খাপ খাইতে গিয়ে, ভাল করে মিলিয়ে নেবার প্রচেষ্টায় এক নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়। তখন সে প্রতি পদে পদে আপদ হিসেবে দেখতে পায় তার সেই সব ঘনিষ্ঠজনদের। এতদিন যাদের সাথে ভাব করে, বন্ধুত্ব বিনিময় করে শান্তি পেত। বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা দিত সেই আমার কাছের বন্ধু, প্রিয়জন! নতুন শ্রেণীর বন্ধু যোগ হওয়াতে সে মাঝখানে দাড়িয়ে তার ডানে-বাঁয়ে অবস্থিত বন্ধুদের স্ট্যাটাসের বিরাট তফাৎ দেখতে পায়। ফলে পুরানো বন্ধুদের পরিচিত আগের মত শক্ত করে দিতে পারে না। কেননা নতুন সৃষ্টি হওয়া উঁচু বৈষয়িক শ্রেণীর মানুষের সামাজিক স্ট্যাটাস আর আগের ঘনিষ্ঠজনের সামাজিক স্ট্যাটাস এক নয়। অধিকন্তু তাকে ঘনিষ্ঠ হিসেবে সাথে রাখতে গেলে, উঁচু শ্রেণীর মানুষের মাঝে দূরত্ব বাড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। আবার ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে, সময়-অসময় তার অনাহুত উপস্থিতি উভয়কে বিব্রত করতে পারে। এই মনের জ্বালার কথা ঘনিষ্ঠজনকে বুঝাতে পারে না আবার দমাতেও পারে না।অধিক ঘনিষ্ঠতায় সম্পর্ক নষ্ট হয়
তখন তার জন্য একটিই রাস্তা খোলা থাকে, সেটা হল ‘অবজ্ঞা’। কৌশলে ঘনিষ্ঠজনকে অবজ্ঞা-উপেক্ষা করা যায়। ডান-বামের দুই শ্রেণীর বন্ধুদের জন্য, ভিন্নতা দিয়ে দুই ধরনের অনুষ্ঠান করার মাধ্যমে প্রকাশ পায় তিনি মর্মজ্বালায় ভুগছেন। যা রাজ দরবারে রাজারা আম জনতা আর খাস জনতার জন্য করে থাকে। এটা অবজ্ঞা-উপেক্ষা করার প্রাথমিক পর্যায়। এটা করে ঘৃণার জন্য নয়, বরং আপাত আপদ মুক্ত হতে। ভিন্ন দিকে এই অবজ্ঞা উপেক্ষার ধারালো সূচের আঘাতে অন্য ঘনিষ্ঠজন তিলে তিলে কষ্ট পেতে থাকে। এটা সে না পারে কাউকে বুঝাতে না পারে সইতে। একপর্যায়ে সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, যদিও ক্ষিপ্ততায় কোন উপকার নেই। এখানেও করণীয় একটা, অবজ্ঞা সহ্য করা কষ্টকর হলেও ধৈর্য ধরা, এভাবে ধৈর্য ধরলে একদিন সে এটার যথাযথ উত্তর দিতে পারবে। তবে একজন দূরদর্শী প্রজ্ঞাবান মানুষ এই সমস্যাকে সহজে মোকাবেলা করতে পারে। এই দিকের প্রতি লক্ষ্য রেখেই মহাকবি শেখ সাদি বলেছেন, “তোমার বন্ধু দাওয়াত না দেওয়া অবধি, হুট করে তাদের ওখানে উঠে যেও না”। এই পদ্ধতিতে উভয়ের ইজ্জত মর্যাদা রক্ষা হয়। এতে সাময়িক ঘনিষ্ঠতা একটু কমে গেলেও উষ্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রাখা যায়, যার সূত্র ধরে কোন একদিন আবারো ঘনিষ্ঠতা তৈরি হবে। শুধু ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে, নিজে কারো উপদ্রবের কারণ হই কিনা সেটা সর্বদা নিজেকে যাচাই করতে হয়। কেনন ঘনিষ্ঠতা কখনও নিজের কারনেও বিনষ্ঠ হতে পারে।
আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা
এতক্ষণ বলা হল, অতি ঘনিষ্ঠতায় সম্পর্ক মলিন হয়। তবে আদর্শ ও চিন্তার মাঝে যে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয় সেটা তুলনামূলক বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চেয়ে মজবুত থাকে। যদিও উভয়ের অবস্থার মাঝে বিরাট তফাৎ পরিলক্ষিত হয়। এই আদর্শ বহু ধরনের হতে পারে। তাদের একটি হল ধর্মীয় আদর্শ। ধর্মের মিল থাকলেও হয়না তার ভিতরেও ঘনিষ্ঠতার আরো কিছু উপাদান থাকে, মাজহাবী আদর্শের মিল, কোন মতবাদের মিল, একই পীরের মুরিদ হওয়া কিংবা রাজনৈতিকও আদর্শের মিল থাকা। ভাই-ভাই আপনজনে শত্রুতা-কলহে লিপ্ত হয় আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে। তাই এসবেও স্বার্থের ব্যাপার যোগ হলে কখনও ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়, দূরত্ব বাড়ে। এই ধরনের পরিবেশে ধৈর্যের সাথে নিজেকে সংবরণ করলে, ঘনিষ্ঠতা বিনষ্ঠের কারণ কমে যায়।
জৈবিক ঘনিষ্ঠতা
বিশেষ জৈবিক চাহিদার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দুই জনের একই স্বার্থের তাগিদে এই ঘনিষ্ঠতার উদ্ভব হয়। মনোমালিন্যের কারণে ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝেও মনোমালিন্য থাকে কিন্তু সন্তানাদির মায়া ও দায়িত্বের কারণে তারা একসাথে থাকতে বাধ্য হয়। সন্তানাদি জন্ম হয়ে একদা তারা বড় হলে আলাদা হয়ে চলে যায়। পরিশেষে বুড়ো অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী দু’জনই আবারো একাকী হয়ে পড়ে এবং একসাথে থাকা শুরু করে। এখানে আর মনোমালিন্য থাকেনা। বিবাহিত জীবনের শুরু আর একাকী হওয়ার মাঝে অনেক ঘটনা প্রবাহ জরিয়ে থাকে। এই বয়সে তারা একে অপরকে আরো ভাল করে চিনে নেয়। একে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একদা জৈবিক চাহিদার কারণে সৃষ্ট হওয়া ঘনিষ্ঠতা উভয়ের মধ্যে পরম নির্ভরশীলতার সৃষ্টি করে। স্ত্রী বৃদ্ধা ও অসুস্থ, তার নিজের পরিচর্যার দরকার হওয়া স্বত্বেও, সে তার বৃদ্ধ স্বামীর প্রতি আন্তরিক হয়ে উঠে। তার সেবা যত্ন পরিচর্যা কে। এই পর্যায়ের ঘনিষ্ঠতা কখনও ছিন্ন হয়না। স্বামী উত্তেজিত হলে স্ত্রী চুপ থাকা এবং স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামী ধৈর্যশীল হয়ে, পরিবেশ শান্ত হয়ে বন্ধুত্বপূর্ন হলে, তখন বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলে সংসার জীবনে ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হবার আশঙ্ক্ষা অনেকটা কমে যায়।অধিক ঘনিষ্ঠতায় সম্পর্ক নষ্ট হয়
অন্তরের ঘনিষ্ঠতা
অন্তরের ঘনিষ্ঠতাই হল প্রকৃত ঘনিষ্ঠতার মূল ভিত্তি। এটা সৃষ্টি হয় আল্লাহর ভালবাসার কারণে। দুইজন বন্ধুর মাঝে এই ঘনিষ্ঠতার সৃষ্টি হয় শুধুমাত্র আল্লাহর কারণে। তারা উভয়ে তাই ভালবাসে যা আল্লাহ ভালবাসেন। উভয়ে তাই অপছন্দ করেন যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। এমন ব্যক্তিদের মধ্যে আল্লাহ যে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করে দেন। সেটা কোনদিন নষ্ট হয় না। বরং আল্লাহ স্বয়ং নিজেই এই ঘনিষ্ঠতার রক্ষাকর্তা হয়ে যান।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই। এ ধরনের ঘনিষ্ঠতায় অনুপ্রাণিত হয়ে রাসুল (সা) এর সাথে দলে দলে মানুষ নিজের মাতৃভূমি, পরিবার, ধন-সম্পদ ত্যাগ করে রিক্ত হস্তে চলে গিয়েছিলেন। বদরের যুদ্ধে রাসুল (সা) উপর আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন আবু উবায়দা বিন জাররাহ (রা)। এক ব্যক্তি বারে বারে রাসুলের (সাঃ) উপর হানা দিতে চায়। আবু উবায়দা তাকে রুখে দিচ্ছিলেন। শেষ বার সেই ব্যক্তি রাসুল (সা) কে হামলা করতে মরিয়া হয়ে উঠে এবং ঘোড়াকে দ্রুত ধাবিত করে। আবু উবায়দা (রা) কালবিলম্ব না করেই পিছন থেকে তরবারির আঘাত হানেন। দ্রুতগামী ঘোড়ার সওয়ার হতে হামলাকারীর মাথা মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়েই মাটিতে লুটিয়ে পরে। সেই হামলাকারী আর কেউ নন স্বয়ং আবু উবাদার পিতা জাররাহ স্বয়ং নিজেই! মানুষের সাথে মানুষের অন্তরের ঘনিষ্ঠতার মাত্রা কতটুকু থাকলে এ ধরনের ঘটনার জন্ম দিতে পারে। তা চিন্তা করাই বাহুল্য ব্যাপার। তাই হাদিস শরীফে এসেছে, রাসুল (সা) বলেছেন, “অন্তর সমূহের ঘনিষ্ঠতার মত কিছুই আমি দেখিনি” আদাবুল মুফরাদ-২৬১।