ইসলামী চেতনায় ভাস্কর্যের অবস্থান

ভাষ্কর্য

ভাস্কর্য তাই যা উঁচু বেদীতে স্থায়ীভাবে সাঁটানো হয়। একটি ভাস্কর্য সে দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টির পরিচয় তুলে ধরে। কেননা প্রতিটি ভাস্কর্যই, ইতিহাসের পিছনের কথা তুলে ধরে। শহরের প্রবেশ মুখে, কোন নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, রাজপথের পাশে, আলোচিত স্থানে, পার্ক, চিড়িয়াখানা, শপিং-মল, বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনায় সুদৃশ্য যে স্থাপনা বানানো হয়, তাকেই মূলত ভাস্কর্য বলে।

ধনী মানুষের ড্রয়িং রুম, হল রুম কিংবা অতিথি শালাতেও ছোট আঙ্গিকের ব্যক্তিগত অভিরুচির ভাস্কর্য বসানো থাকে। এগুলোকেও বেদিতে বসানো হয়। তবে উন্মুক্ত স্থায়ী ভাস্কর্য পর্যটকের স্মৃতি ও সে দেশ ভ্রমণের স্বাক্ষর বহন করে। মক্কার ঘড়ি, আইফেল টাওয়ার, লিবার্টি টাওয়ার, তাজমহল, জাতীয় স্মৃতি সৌধ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে দাড়িয়ে ছবি তোলার মাধ্যমে এই স্বীকৃতি আদায় করা হয় যে, সেখানে তিনি গিয়েছিলেন। ভাস্কর্যের মূল আবেদনটি এখানেই। ইসলামী চেতনায় ভাস্কর্যের অবস্থান

আরো পড়তে পারেন…

  • স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও মূর্তি-প্রতিমার সাত কাহন
  • বিচক্ষণতা : সফল ও শ্রেষ্ঠ মানুষের উন্নতির সোপান
  • মান্যকারী আর উপেক্ষাকারী দু’জন কখনও সমান হয়না

তবে ভাস্কর্যের মধ্যে কি থাকবে সেটা, সেটা জাতীর রুচি, অভিরুচি, কৃষ্টি, সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে। পর্যটকেরা ভাস্কর্য দেখেই বুঝতে পারে সে জাতির মনোবৃত্তি কেমন। ঢাকার শাপলা ভাস্কর্য বাংলাদেশের জলজ জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাহ্মণ-বাড়িয়ার কোরআন ভাস্কর্য সে অঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় চিন্তার কথা তুলে ধরে। রাজশাহীর আম ভাস্কর্য সে অঞ্চলের আমের প্রাচুর্যের কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্যের উঁচু রাইফেল দেখলে অতীতের হার না মানা গৌরবের কথা মনে করিয়ে দিবে।

এভাবে আমাদের দেশের বহু স্থানে নান্দনিক ভাস্কর্য দেখা যায়। এগুলো খুবই সুন্দর ও অর্থবহ। প্রয়োজনীয়তা কিংবা অর্থ অপচয়ের কথা ব্যতীত এ ধরনের ভাস্কর্য নির্মাণের সাথে ইসলাম ধর্মের কোন বিরোধ নেই! আবার জাতীয় জীবনে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণে কখনও রাষ্ট্রীয় স্থাপনাও কদাচিৎ ভাস্কর হয়ে উঠে। জাতীয় সংসদ ভবন, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, সোনারগাঁ, আহসান মঞ্জিল এসবের অন্যতম উদাহরণ।

মূল কথা হল ভাস্কর্য কে কিভাবে বানাবে, সেটাতে কি ফুটিয়ে তোলা হবে, তা নির্ভর করে যারা ভাস্কর্যের পৃষ্ঠপোষক ও পরামর্শক, তাদের মর্জির উপর। তবে নিকট অতীত থেকে আমাদের দেশে মানুষের দেহায়বের সাথে সম্পর্কিত ভাস্কর্যের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্যের সাথে একটু বৈসাদৃশ্য বৈকি।

ইদানীং কালে বঙ্গবন্ধুর দেহাকৃতি দিয়ে ভাস্কর্য বানানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কেউ বলেছেন এটা মূর্তি, কেউবা বলেন ওটা ভাস্কর্য।

যাই হোক, ভাস্কর্য সম্পর্কে আমরা কিছুটা আলোচনা করলাম। যে দেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম, সে দেশের মানুষের ধর্ম এ ব্যাপারে কি বলে, চলুন একটু দেখে নেই।

প্রাণীদেহের মূর্তি বানানো এবং এর পিছনে অর্থায়ন করা ইসলাম ধর্মে সরাসরি হারাম তথা নিষেধ। এ ব্যাপারে ইসলাম ধর্মের অবস্থান খুবই কঠোর। মূর্তি ভাস্কর হিসেবে আসুক কিংবা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আসুক। ইসলামের বাণী একটাই, সেটা হারাম।

প্রাণী দেহ বানানো কিংবা নিজ হাতে প্রাণীদের ছবি অঙ্কন করা ইসলাম ধর্মে চরম ঘৃণিত কাজ। যারা এর পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বয়ং মোহাম্মদ (সা) বলেছেন,

“দুনিয়াতে আমাকে পাঠানোই হয়েছে মূর্তি ধ্বংস করার জন্য”

সুতরাং এই বিষয়ে তার অনুসারীদের কর্ম-বিশ্বাস কেমন হওয়া উচিত, তা একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি স্বীয় আকল দিয়েই বুঝতে পারে।

দুনিয়ার অন্য কোন ধর্মে এ সম্পর্কে কোন বিধিনিষেধ নেই। তারা নিজেদের ঘরেও মূর্তি রাখতে পারে। তবে তারা ইসলাম ধর্মের এই অনুভূতিকে বাড়াবাড়ি মনে করতে পারে। মূলত চিন্তা ও আদর্শের তফাৎ ও বৈপরীত্য আছে বলেই তো দুনিয়াতে এত ধর্মের সৃষ্টি। তাই একের কাজ অন্যের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হতেই পারে। সেটার জন্য অন্য ধর্ম দায়ী নয়। মানুষ শুধু সিদ্ধান্ত নিতে পারে মাত্র, তা সে অনুসরণ করবে কি করবে না।

দুনিয়াতে অনেক ধর্মের বসবাস। সকল ধর্মের প্রভু, অবতার এক নয়। নাগরিকেরাই ধর্ম মেনে চলে। তাই ভূখণ্ডে যে ধর্মের নাগরিক বেশী সে দেশে সেই ধর্মের প্রচ্ছন্ন প্রভাবও বেশী। স্বীকার করুন বা না করুন, ‘ধর্ম’ হল সকল শ্রেণির মানুষকে এক করে রাখার অন্যতম হাতিয়ার। পুরো জাতিকে এক স্থানে, এক মানদণ্ডে ঐক্যবদ্ধ রাখার শ্রেষ্ঠতম উপাদান। বর্তমান ইউরোপে বেশীরভাগই ধর্ম বিমুখ, নাস্তিক। কিন্তু খ্রিস্টানিটির কথা বলে তাদের ডাকা হলে তারা সবাই সারা দেয়। ইউরোপে এই উদ্দীপনাই এখন তাদের সর্বশেষ শক্তি।

সে হিসেবে আমাদের দেশের মুসলিম কমিউনিটিকে শক্তিতে পরিণত করতে হলে, তাদের ধর্মীয়, ভাবাবেগকে শ্রদ্ধা করা উচিত, এটাকে মূল্য দিতে হবে। এটাতে দেশ ও জাতি উপকৃত হয়। মানুষ অর্থের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে কিন্তু আদর্শিক ক্ষতি মেনে নেয় না। ফলে শক্তি দিয়ে তাদের আবেগ-আদর্শের বিপরীতে দাঁড়ালে, একদিন হিতে বিপরীত হবেই। মানসিক বৈপরীত্ব্য কোন কালেই জাতিকে এক অবস্থায় দৃঢ় করেনা।

তাছাড়া বিক্রিয়া ঘটিয়ে যেভাবে এসিডের ক্ষমতা যাচাই করা হয়। সেভাবে একটি জাতি কতটুকু ঘুমিয়ে আছে তা পরীক্ষা করার জন্য অন্যতম বিক্রিয়া হল “ধর্মীয় কুৎসা থেরাপি”। ধর্মের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হলে, মানুষ ক্ষিপ্ত হয়। এসব ক্ষিপ্ত মানুষের প্রতিক্রিয়া ও কর্মকাণ্ডের উপরই বিবেচনা করা হয়, দেশের মানুষের মজবুতি কেমন? আবার কিছু মানুষ পাশ্চাত্যের ভিসা পাবার লোভে ধর্ম বিদ্বেষ ছড়ায়। ক্ষুন্নিবৃত্তির চাহিদা মেটাতে দেশের সুনাম নষ্ট করেই এভাবে কিছু মানুষ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে! এই কাজ গুলো সরকারের কাঁধে বসে, মতলবি মানুষেরাই করে থাকে। ক্ষতি হয় দেশ ও সরকারের, বদনাম হয় জাতি ও ধর্মের আর লাভবান হয় কাঁধে বসে থাকা সওয়ারীর। তলে তলে এমনটি হচ্ছে কিনা, এটা দেখাও সরকারের দায়িত্ব কেননা তারাই জনগণের দায়িত্ব নিয়েছে।