প্রতিদিনের মত যথারীতি আজকে পাশের পাড়ার মাহতাব (ছপ্দনাম) কে ডেকে আনার দায়িত্ব পড়ল। আমি ও তাহের তাদের বাড়ীতে পৌছার পথেই শুনতে পেলাম, সে তাদের পেয়ারা গাছে বসে, “ও পরানের তালত ভাই, চিঠি দিলাম পত্র দিলাম..” লিরিকের গানটির শেষের কলি গেয়ে চলছিল! মানুষ
কয়েকদিন ধরে দোকান-পাট, হাট-বাজার, বিয়ে-অনুষ্ঠানের মাইক ও ক্যাসেট প্লেয়ারের মাধ্যমে এই গানটি কান ঝালা পালা করছিল। সদ্য বাজারে আসা এই গানটি গাওয়া নিয়ে মায়ের পক্ষ থেকে কড়া ভাষায় নিষেধ ছিল।
আরো পড়তে পারেন,
- বিড়ির আদালতে দিগম্বর বিচারক
- কুকুরের সাহচর্য ও প্রভুভক্তির দায়
মনে বড় দুঃখ, গান নিয়ে আমার মা রীতিমতোই খট্টর প্রকৃতির। অন্যদের মায়ের মত অত উদার প্রকৃতির ছিলেন না। মাহতাবের মুখস্থ শক্তি প্রবল কোন গান মাইকে একবার শুনলেই গানের প্রায় অর্ধেকটা সুর সহ মুখস্থ হয়ে যায়। আমরা তার মুখে ওগুলো শুনে মজা নিতাম।
স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীর নতুন ক্লাস শুরু হয়েছে, সামনে ২১শে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান কিন্তু কিছু ছাত্রদের কোন দেখা নেই। স্কুলে ইনস্পেকটর আসবেন, ছাত্র সংখ্যা বেশী দেখাতে হবে ফলে স্যারদের দুঃচিন্তার অন্ত নেই। সে কারণে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করেন। সামনের ২১শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানের লোভ দেখিয়ে কিছু ছাত্রকে স্কুল মুখো করার চিন্তা করছেন।
আমি ও তাহের ক্লাসে ভদ্র হিসেবে পরিচিত। কারো বাড়ীতে আমাদের পাঠালে তাদের পিতা-মাত আমাদের দেখে উৎসাহী হয়ে, হয়তবা তার সন্তানকেও স্কুলে পাঠাবেন। স্যারদের এমন চিন্তায় প্রতিদিন সকালে কোন একজনের বাড়ীতে আমাদের পাঠানো হচ্ছে। আজ মাহতাব ও তার আম্মুকে বুঝিয়ে স্কুলের আনার মিশন।
তার আম্মুকে জানালাম, বিজন স্যার মাহতাবকে স্কুলে যেতে বলেছেন। আর মাহতাবকে বললাম, সামনের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠান, সে যেন অংশগ্রহণ করে এবং আজ থেকেই যেন স্কুলে যায়।
মা ছেলের কথোপকথনে আমরা অভ্যস্ত নই। কোনদিন ধারণা ছিলনা তাদের পরিবেশ এমন। আমি ও তাহের দু’জন হতভম্ব হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছি। চলুন তাদের আলাপচারীতা তাদের জীবন থেকেই দেখে আসি-
অগ্নিশর্মা মাহতাবের মা গরম মেজাজে বললেন, কি শরমের কথা! মাহতাব তুই আজকেও স্কুলে যাস নাই?
মাহতাবের বোন রান্না ঘর থেকে প্রতি উত্তর দিল, কই সে তো ছয় মাস ধরেই স্কুলে যায় না!
মা বলল, এতদিন যাস নাই সমস্যা নাই। যা, এখন থেকেই স্কুলে যা!
মাহতাব উত্তর দিল, “স্কুলে যেতে আমার মন চাচ্ছে না। যদি আমাকে চারটি আবুল বিড়ি দাও তাহলেই স্কুলে যাব”
কেন তোকে না গতকালই, চারটি বিড়ি দিয়েছিলাম?
দিয়েছিলেন তো! বালিশের পাশেই রেখেছিলাম পরে খোঁজ করে আর পাইনি। নিশ্চয়ই তুমি হয়ত তা খেয়ে ফেলেছ!
হট্টগোলের মধ্যে তাদের বাবা বাড়ীতে এলেন। তিনি পাশের জমিতেই কৃষিকাজ করছিলেন। তার হাতে ডাবা (নারিকেলের হুক্কা)। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন সমস্যা কি?
মাহতাবের মা – সবার ছেলে স্কুলে যায়, তোমার পুত তো যায়না। স্কুল থেকে মাষ্টার খবর পাঠিয়েছে তাকে পাঠাতে! কি শরমের কথা, তোমার ছেলে পড়তে যায়না এই খবর কি তুমি জান? যাই হউক, এখন সে যাবে বলেছে কিন্তু বিড়ির জন্য বায়না ধরেছে। তোমার ছেলের বায়না পূরণ করো।
পিতা – আমার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে নিয়ে যাও। তবে চারটি দেওয়া যাবেনা, তিনটিই নাও। আর আমাকে দাও, আমি ডাবায় জ্বলা কলকির আগুন থেকে বিড়ি ধরিয়ে দেই!
মাহতাব – “তোমাকে আগুন ধরাতে দিলে বিড়িতে এমন টান মারবে, এতে বিড়ির আগুন আগা থেকে পাঠায় চলে আসবে!”
পিতা, যা, যা তোর বিড়ি তুই ধরিয়ে নে, স্কুলে যা তারপরও মানুষ ‘হ’।
আমি ও তাহের বোবার মত মাহতাবকে মানুষ করার জন্য রওয়ানা হলাম…