তোমরা যারা খুনের দৃশ্য দেখছিলে : বেঁচে গেছ বাচারা! ভাগ্যিস আলী এখন বেঁচে নেই!

স্ত্রীর সামনে খুন হয়েছে স্বামী। প্রত্যক্ষ দর্শী অনেকে। স্ত্রী একাই চেষ্টা করেছে খুনিকে প্রতিহত করতে। পারেনি। রাস্তায় মানুষ ছিল, তারা তখন খুনের ঘটনা দেখায় মত্ত! ভয়ঙ্কর এই খুন কেন সংঘটিত হয়েছে, কার দোষ, কে নির্দোষ সেটা আমার লিখার বিষয় নয়। পুলিশ আছে, আদালত আছে। ন্যায় বিচার হউক জোরালো দাবী করছি। 

এই ঘটনার কাছাকাছি ধরণের একটি হত্যাকাণ্ড আলী (রা) জমানায় ঘটেছিল। তখনকার বিচারক কিভাবে এই হত্যাকাণ্ডের রায় দিয়েছিলেন, সেটা তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য। সচেতন পাঠকের জন্য বিরাট উপাদান হতে পারে।


দু’জন লোক নদীর তীরে বসে ছিল। একজন লোক বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে, তাদের দিকে দৌড়ে আসছিল। খোলা তরবারি হাতে এক খুনি তার পিছনে ধাওয়া করছিল। ভীত সন্ত্রস্ত লোকটি প্রাণ বাঁচাতে, এই দুই জনের কাছে এসে দাড়িয়ে গেল। ততক্ষণে খোলা তরবারী হাতে আক্রমণ কারী ব্যক্তিও সেখানে পৌঁছে গেল। প্রথম সুযোগেই সে লোকটির বুক বরাবর ছুরি ঢুকিয়ে দেয়। আরো কয়েক বার। বসে থাকা দু’জনের একজন এ ঘটনা দেখে লাফিয়ে উঠে, তার সিদ্ধান্ত নিতে দেরী হয়ে গিয়েছিল। তারপরও তড়িৎ সিদ্ধান্তে হত্যাকারীকে পিছন দিক থেকে কায়দা করে আটকিয়ে ফেলে। খুনিকে নিরস্ত্র করে এবং জীবিত আটকিয়ে বিচারকের কাছে সোপর্দ করে।


বিচারক বসে থাকা দু’জনকেই বন্ধী করে। তাদেরকে জেরা করে প্রয়োজনীয় তথ্য জোগাড় করে।


ফয়সালার দিন।


প্রথম ব্যক্তি খুনি। তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয় এবং সেদিনই রায় কার্যকরের আদেশ হয়।


দ্বিতীয় ব্যক্তি তথা যিনি খুনিকে জীবিত ধরতে পেরেছিলেন তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তার দোষ ছিল, মানুষটি যখন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে দৌড়ে আসছিল, তখন আগে ভাগে প্রস্তুতি নেয় নাই কেন? সে যদি আগে থেকে ভূমিকা রাখত তাহলে খুনি এবং নিহত এই দুইজন মানুষকে প্রাণে বেঁচে যেত।


তৃতীয় ব্যক্তির চোখ দুটো উপরে ফেলার নির্দেশ জারি করা হয়। তার অপরাধ! সে দাবী করেছিল, এই ঘটনা সে চোখে দেখেনি! একজন আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার, দৌড়ার উপর সাহায্য চাওয়া, তাদের সামনে এসে দাড়িয়ে যাবার পর খুনির তলোয়ার চালানোর মত কাজ করার পরও নাকি তিনি এসব দেখেন নাই! 


তাই বিচারকের ফায়সালা হল, পরিষ্কার খোলামেলা দিনে যে চোখ এই ধরনের মারাত্মক ঘটনা দেখার যোগ্যতা রাখে না। মানব কল্যাণে কাজে লাগেনা। সে ধরনের চোখ কারো জন্যই  না থাকা উত্তম। তাই তার চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে।


আজ যারা খুনের দৃশ্য দেখেছে কিন্তু খুনিকে ধরতে কিংবা নিহত ব্যক্তিকে বাঁচাবার চেষ্টা করেনি! উপরোক্ত বিচারে তাদের সবার চোখ তো থাকারই কথা নয়! উল্টো এসব মানুষের মৃত্যু দণ্ড হত এবং সেটাই হত যুক্তি যুক্ত।
যে খুনি, সে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে, এ ধরনের জঘন্য কাজ করে ফেলতে পারে। সে নিজেই জানে ধরা পড়লে তাকেও খুন হতে হবে। এটা মেনে নিয়েই খুনিরা মিশনে নামে। কিন্তু যারা হত্যাকাণ্ড প্রতিহত না করে, দৃশ্য দেখেছে! তারাও খুনির মত অপরাধী। সমাজ ও জাতি ধ্বংস হচ্ছে এসব মানুষের কারণেই।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, “নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল।” আল-মায়িদা : ৩২


নৃশংস ভাবে বিশ্বজিতকে হত্যা করা হল। ভিডিও ক্যামরার মাধ্যমে টিভি চ্যানেল গুলো ধারা বিবরণী দিল। সারা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে দেখল! আদালতে কেউ প্রমাণ করতে পারেনি, বিশ্বজিতকে কে হত্যা করেছে। আদৌ কেউ হত্যা করেছিল কিনা? ধৃত ব্যক্তিরাও খুনের অপবাদ থেকে রেহায় পেল!


দুনিয়াতে খুন-খারাবীকে আমরাই উপভোগের মাধ্যমে বানিয়েছি! খুন এখন একটা সাধারণ ব্যাপার। কারণ জগত জানে বাংলাদেশে খুনের বিচার কখনও হয়না। পথে-ঘাটে, নদী-নালা, নর্দমা, ডোবা, রেল রাস্তার পাশে যত্রতত্র মানুষের লাশ পাওয়া যায়। অন্তত একটি খুনের বিচার যদি আলী (রা) জমানার মত রায় হত। তাহলে খুনির কলিজার রক্ত ভয়ে-আতঙ্কে হীম-শীতল পানিতে রূপান্তরিত যেত।


একটি হাদিস দিয়ে কথা শেষ করব। আল্লাহ বলেছেন, “কোন মজলুম যদি বাঁচার জন্য তোমাদের সাহায্য চায় আর তোমরা যদি তাকে বাঁচার নিমিত্তে নিজেদের হাত প্রসারিত না কর। তাহলে কসম সেই সত্তার, দুনিয়া থেকে তোমাদের ততক্ষণ মৃত্যু হবেনা, যতক্ষণ না তোমাদের অবিকল সে ধরনের কিংবা আরো করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি তোমাদের না করাই।”


তাই আসুন নৈতিকতার স্থান থেকে, সকল প্রকার জুলুম এবং খুনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি, সোচ্চার হই। তা না হলে, আমি, আপনি কিংবা তিনি এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হব আর মানুষেরা মোবাইলে ছবি ধারণ করবে। কেউ পানি পান করানোর জন্যও এগিয়ে আসবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *