দূরদৃষ্টি Prudence অর্জনের গুরুত্ব

দূরদৃষ্টি
চর্ম-চোখে দূরে, বহুদূরের বস্তু অবলোকন করার নাম দূরদৃষ্টি নয়। মূলত চোখ না থাকলেও মানুষ দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে পারে। দূরদৃষ্টি শক্তির ক্ষমতার সাথে মানুষের চর্ম চোখের কোন সম্পর্ক নেই। এর সাথে পুরোপুরি আকল, জ্ঞান-বুদ্ধি, অধ্যবসায় ও অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্ক। দেশ, রাজ্য, জনগোষ্ঠী পরিচালনা করতে গেলে দূরদৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। দূর-দৃষ্টিহীন মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সুবিধা করতে পারে না। রাজনীতিতে প্রচুর অর্থকড়ি খরচ করেও, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়না। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন শিক্ষক একটি জনগোষ্ঠীকে তৈরি করতে পারে। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন অভিভাবক দেশের জন্য উত্তম সন্তান উপহার দিতে পারে। দূরদৃষ্টি Prudence অর্জনের গুরুত্ব

দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষকে দূরদর্শীও বলা হয় এবং তার কাজকে বলা হয় দূরদর্শিতা। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ পরিবারের হর্তা-কর্তা হলে সে সংসার সুখের হয়। গৃহিণীর আচরণে ভুল হলে বাড়াবাড়ি করে না বরং ভবিষ্যতে যাতে এই ভুল না হয়, সেটা রুখতে শুধু পরামর্শ দিয়েই শেষ করেনা বরং নিজেও ভূমিকা রেখে সংশোধন করে। এতে সংসারে অসঙ্গতি থাকলেও দূরদর্শিতার কারণে আগুন জ্বলেনা, অশান্তি আসেনা। দূরদর্শিতা মানুষকে ঠাণ্ডা মাথার মানবে পরিণত করে। ক্ষমতার বাইরে কিংবা জীবন যাত্রার বাইরে অতিরিক্ত চাহিদার প্রতি তারা আসক্ত হয়না। তাই অনেক পাবার আশায় আসক্ত মহিলারা তাদের সাথে সুখের সংসার বানাতে পারেনা। দূরদৃষ্টি Prudence অর্জনের গুরুত্ব

রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতা আনতে পারেন একজন দূরদর্শী ব্যক্তি। দূরদর্শী কূটনৈতিকের দ্বারা সারা জাতী উপকৃত হতে পারে। ঝগড়া-বিবাদের উৎপত্তির মূল গোরায় তারা সহজে পৌছতে পারে বলে, মামলা-বিবাদেও তারা সফলতা দেখাতে পারেন। একজন বিচারকের অন্যতম পুঁজি ও সম্পদ হল স্বীয় দূরদর্শিতা। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতাদের দ্বারাও পুরো জাতি-গোষ্ঠী উপকৃত হয়। এরকম একজন রাষ্ট্র-নেতা যখন কথা বলেন তখন হেঁয়ালি পনা কিংবা জনগণকে শুধু খুশী করার জন্যই কথা বলেন না। প্রয়োজনে তিনি কম কথা বলবেন কিন্তু যখন বলতেই হয়, তখন তিনি তার বক্তব্যের প্রতিটি বাক্যকে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করেন। একটি ছোট্ট বাক্য নিয়েও বহুবার ভাবে। কাউকে কথা দেবার সময় ভেবে চিন্তেই দেন।

দূরদর্শী জাতীয় নেতা, শিক্ষক কিংবা আলেম তাদের মুখ নিঃসৃত কথার গভীরতা অনুধাবন করেই বলে থাকেন। কথার তাৎপর্য আগামীকাল কেমন হবে, আগামী বছর কি হবে এবং তার মৃত্যুর পরের ফলাফল কেমন হবে, এসব কিছুকেই গুরুত্ব দেয়। উপস্থিত যারা খুশী হয়ে হাততালি লাগাচ্ছে, পরবর্তীতে আবার তারাই বিচারের দাবীতে মাঠে রাস্তায় নামে কিনা, এসবকে মাথায় রাখে। জনপ্রিয়তায় ঘাটতি হবার আশঙ্কা থাকা স্বত্বেও তারা মানুষকে উপস্থিত খুশী করা থেকে বিরত থাকে। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে তারা কথা বলে না। প্রয়োজনে এসবের উত্তর জানিনা বলে বিনয় প্রকাশ করতেও লজ্জাবোধ করেনা।

ইতিহাসের একটি ঘটনা থেকে দেখতে পাই, ঈমাম মালিক (রহ) এর কাছে, সিরিয়া থেকে আগত এক ব্যক্তি ষাটটি প্রশ্নের তালিকা নিয়ে আসেন। তিনি প্রশ্নের জবাবে, একে একে ছেচল্লিশটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘আমি এর উত্তর জানিনা’! প্রশ্নকর্তার জোরাজুরির পরেও তিনি একই কথা বলতে থেকেছেন! মানুষ মাত্রই ভুল করে, এটা তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আজকের দুনিয়ার ছোট খাট ত্রুটি নিয়ে ইমামদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষরা যেভাবে বিষেধাগার করে। ইমাম মালিক জানিনা কথাটি বলতে লজ্জা বোধ করেন নি, তিনি ধারনা করে একটি উত্তর দিয়ে দিতে পারতেন। মানুষটি খুশী হয়ে চলে যেত, এভাবে করাকে তিনি সমীচিন মনে করেন নি। তিনি জানতেন, পরবর্তী প্রজন্ম যদি তার একটি প্রশ্নের মধ্যে গোঁজামিল পেয়ে যায়। তাহলে তার কষ্টে অর্জিত সারা জীবনের জ্ঞান গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। আজ তার কথার যে মূল্য দুনিয়াতে আছে, তাহলে তার কিছুই থাকত না। বারশত বছর আগে বসে হাজার বছর পরে কি ঘটবে, সেটা চিন্তা করে বুদ্ধি-জ্ঞান দিয়ে যে উত্তর দিয়েছেন তার নামই ‘দূরদর্শীতা’।

একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ কথার পিটে কথার উত্তর দেন না। নিজেরা অন্যের কথার বাক্যবাণে আক্রান্ত হলেও, সকল কথার উত্তর দিতেই হবে, এমনটি তারা মনে করে না। তারা বুঝেন, কথা একবার ছুটে গেলে সেটা আর ফিরানো যায় না। তারা বুঝে, আজকের একটি কথায় যে ঘায়ের সৃষ্টি করবে, হাজার কথার মলম দিয়েও কাল সেটার ক্ষত সারানো কঠিন হবে। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ অন্যের আক্রমণাত্মক কথার উত্তর দিতে গিয়ে বাজে ভাবে সে কাজে জড়িয়ে পড়ে না। সময়ের অপচয় করেনা বরং দূরদর্শী মানুষ তার কাজ ও চরিত্রের মাধ্যমেই কথা বলে। এমন জীবন গড়ে তুলেন, অনুসারীরাই প্রতিপক্ষের কথার উত্তর দিতে মাঠে নেমে যাবে।

ইতর প্রকৃতির মানুষ সর্বদা মিথ্যা বলে। ওজন হীন মানুষ হাস্যরস, চটকদার কথায় পটু হয় এবং নিজেই বেশী কথা বলার সুযোগ পেতে পরিবেশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ওদের এত কথা বলার পরও, মানুষ তাদের কথায় কোন গুরুত্ব দেয় না। পক্ষান্তরে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ সকল পরিবেশে কথা বলে না। কখনও তারা শুধু কথাই শুনে থাকেন। নিজের মানের উপযোগী মানুষ সেখানে না থাকা অবধি মুখ খোলে না। কেননা অন্যরা তার কথার গভীরতা বুঝবে না কিংবা মূল্য দিতে জানবে না। কথা যদি বলতেই হয়, তাহলে উপস্থিতির মূল্যবোধ, জ্ঞান ও জীবনাচরণের সাথে খাপ খায় এমন উপমা দিয়ে কথা বলে। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের কথাকে লোকেরা মগজে গেঁথে রাখে। তাই কখনও তাদের কথা ও কাজে যদি একবার স্ববিরোধী হয়, তাহলে সারা জনমের ফসল নষ্ট হয়। এই ভয়ে দূরদর্শী মানুষ কথা ও কাজে খুব হিসেবি হয় এবং এটাই তাদের বড় অর্জন।