রম্য চিঠি – পীর বাবার দরবারে

পীর-বাবার-দরবারে
মোজাদ্দেদে জামান, গাউসুল আজম, শায়খুল মাশায়েখ, আমীরে শরীয়ত, বাহারে তরীকত, নওয়াবে হাকীকত, রাহবারে মারেফাত, মাহবুবে ছোবহানী, কুতুবে রাব্বানী, ছৈয়দে ছামাদানী, এশকে হামদানী, বারকাতে রুহানী, হযরাতুল আল্লামা, জনাব মাওলানা, হাজী, গাজী, কাজী, ক্বারী, মুন্সি, মোহাম্মদ তদারক উল্লাহ ফরায়েজী সাহেব মাদ্দাজিল্লহুল আলী, দ্ব’মাত বরকাতিহুমুল আলীয়াহ। আসসালামু আলাইকুম…………। পীর বাবার দরবারে
হুজুর, আমি অধম, নাপাক, নাখাস্তা, নালায়েক, পাপী, বদবখত, অকৃতজ্ঞ, গুনাহগার খাদেম, হুল মিয়া। আপনার দরবার শরীফে তশরিফ নিয়াছিলাম। আপনার বহু গুণ ও কেরামতির খবর শুনিয়া, আপনার দরবারের নিয়োগ-কৃত খলিফা অলি মিয়ার কথায় সম্মোহিত হইয়া, বিদেশ যাওয়ার সমূদয় জমানো টাকা ভাঙ্গাইয়া আপনার মূল্যবান-পুণ্যবান চেহারা মোবারক দেখিতে আপনার দরবার শরীফে উপনীত হইয়াছিলাম। দূরের রাস্তার হাজারো ঝক্কি ঝামেলা পোহাইয়া অলি মিয়ার সাথে আপনার দরবারে ছহি-ছালামতে পৌঁছাইতে পারিয়াছিলাম এবং দরবারের বিশাল তোরণ দেখিয়া এবং তোরণের গায়ে আপনার লিখিত উক্তি পড়িয়া, মনের আনন্দে কষ্টকর সফরের সকল দুঃখ কষ্ট নিমেষেইভুলিয়া গিয়াছিলাম!
আপনার দরবারে উপস্থিত হাজারো মুরিদ-মুর্শিদদের পিছনে ঠেলিয়া, গায়ের সমুদয় শক্তি দিয়া, ধাক্কা-ধাক্কি করিয়া, আপনার কাছাকাছি পৌঁছিতে পারি নাই! আপনাকে নিজ হাতে ধরিবার কিংবা আপনার পদ যুগলে চুম্বন করিবার বাসনা ব্যর্থই রইল! গুনাহগারের সকল পাপ মোচনের জন্য,বিদেশ যাওয়ার সমূদয় অর্থ খরচ করিয়া, আপনার কাছাকাছি হইয়াও, সান্নিধ্যে যাইতে পারি নাই! এই দুঃখ আমাকে চিরকাল জ্বালাতন করিবে। আপনাকে দেখিতে যাইয়া, আমার টাকা পয়সা সবই পকেট মারের পকেটে গিয়াছে। এই ঘটনায় খারাপ লাগিলও অন্তরে বেশী দুঃখ লই নাই। দুঃখ একটাই আপনার সাথে মোলাকাত করিতে পারি নাই!
হুজুর আপনার বহুত কেরামতির কথা শুনিয়া, আপনাকে নিজ চোখে দেখিতে স্বীয় দরবার শরীফে গিয়াছিলাম। তবে সরাসরি আপনার সাক্ষাৎ না পাইলেও আমি আপনার বহু কেরামতির নমুনা স্বীয় চক্ষে দেখিয়াছি, অনেক কিছু কানে শুনিয়াছি, বহু কিছু অন্তরে উপলব্ধি করিয়াছি! যাহার দু‘কলম লিখিতে না পারিলে, আমি অধম মুরিদের পক্ষ হইতে আপনার প্রতি অশ্রদ্ধা হইবে বলিয়া মনে করি!
লোকমুখে শুনিয়াছি আপনার নূরানি মুখমণ্ডল দেখিলে নাকি বহুত পুণ্য অর্জিত হয় এবং বেশুমার গুনাহ মাফ হইয়া যায়। সেজন্য মানুষদের দলে দলে, আপনার পুণ্য মুখশ্রী দর্শনে ঠেলাঠেলি করিতে দেখিয়াছি। আপনার মোটা ভ্রু, চ্যাপ্টা নাক, ক্রিম কালারের দাঁড়ি, সুরমা মাখা চোখের অনিন্দ্য সুন্দর পূত-পবিত্র মুখখানা দূর হইতে দেখিয়া আমি নিজেও পুলকিত এবং গর্বিত ভাব অনুভব করিয়াছি!
হুজুর, আপনার পবিত্র মুখদর্শনে আমার গর্বিত হওয়ার পাশাপাশি বহু নিঃসন্তান রমণীকে বড় আশা লইয়া আপনার দরবারের বারান্দায় ঘুরাঘুরি করিতে দেখিয়াছি! নিঃসন্তান রমনীরা একটি সন্তানের আশায়, নিজেরা গর্ভিত হইবার জন্য, আপনার দেওয়া পানি ও তেল পড়া ইজ্জতের সহিত লইয়া যাইতে দেখিয়াছি! আপনার দরবারে কোন নারী তার স্বামীর সাথে, কেউবা পিতার সাথে, কেউবা মায়ের সাথে, কেউবা ভ্রাতার সাথে আসিয়াছেন। আপনার মহামূল্যবান সাক্ষাতের জন্য দরবারের বাহিরে তাঁহাদের সকলকে লম্বা লাইনে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়াছি।
কাহারো হাতে দেখিলাম বোতল ভরা পানি, কাহারো আঙ্গুলে পেঁচানো সূতা, কাহারো রসির মাথায় পেঁচানো তাবিজ! পবিত্র সনালু গাছের লাটি সমেত আপনার দরবার অভ্যন্তর হইতে অনেক জনকে বাহির হইতে দেখিয়ছি! কাহারো হাতে দেখিলাম, আপনার মোবারক শরীর ধৌত করার ‘গোসল শরীফের শিশি ভরা পানি’। বরকতের আশায় কাহারো চশমায়, কাহারো আংটিতে, কানফুলে, মোবাইলের হুকে, আপনার পরিধেয় বস্ত্রের সুতা পেঁচাইয়া রাখিতে দেখিলাম! তাঁহাদের সকলের চেহারা দেখিয়া অনুমান হইল, তাঁহারা বিজয়ী হইয়াছেন! সহসা তাঁহারা গর্বের সহিত গর্ভবতী হইবেন বলিয়া নিশ্চিন্ত মনে দরবার ত্যাগ করিতেছেন!
হুজুর, বাস-ট্যাক্সিতে করিয়া, দোলনায় দুলিয়া, পালকিতে চড়িয়া, রিক্সায় বসিয়া, পায়ে হাঁটিয়া কিংবা কারো পিঠের উপর ভর করিয়া, প্যারালাইসিস, পঙ্গু, প্রতিবন্ধী, বোবা ও কানা রোগীকে আপনার হুজুরী খানার সামনে লাইন ধরিয়া, তীর্থের কাঁকের মত হাঁ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়াছি। আরো দেখিয়াছি বহুমূত্র, প্রেশার, জণ্ডিস, হাঁপানি, একজিমার রোগীকে!
যাহারা আপনার মূল্যবান সাক্ষাতের জন্য রাস্তায় উপর পেটের খিদে লইয়া বসিয়া আছেন! যাহারা আপনার দরবার হইতে বাহির হইতেছেন তাহাদের হাতে নানা রোগের, বিভিন্ন আকৃতির তাবিজ-কবজ দেখিলাম। টেকো মাথার মানুষকে আপনার দরবার হইতে চূল গজাবার তৈল পড়া নিয়ে হাসিমুখে বাহির হইতে দেখিলাম! বিয়ে হইতেছেনা এমন কুশ্রী চেহারার মেয়ের দুঃচিন্তাগ্রস্থ বাবাকে, তেল সমেত আপনার দরবার হইতে হাসিমুখে বাহির হইতেও দেখিলাম!
কিসমিসের মত চামড়া সদৃশ, এক বুড়িকে দেখিলাম আপনার নিকট হইতে তৈল পড়া জোগাড় করিতে! শুনিলাম আপনার পড়া তৈলের কল্যাণে বুড়ির শরীরের চামড়াও নাকি যৌবনকালের ন্যায় উজ্জ্বল-উচ্ছল আর আঙ্গুরের মত মসৃণ হইবে! এই সুসংবাদ ছড়াইয়া যাইবার কারণে নাকি, সুপার ষ্টার ললনারাও আপনার সান্নিধ্যে ঝাঁপাইয়া পড়িতেছে। তাহারা আপনার পড়া তেল মুখে মাখাইয়া, জাতির সমুদয় ত্যাড়া ছেলেদের মনে দোলা লাগাইতে, লাক্স-ফেয়ার এন্ড লাভলীর টিভি প্রতিযোগীতায় অংশ লইয়া চ্যাম্পীয়ন হইতেছে!  সর্বোপরি কথা হইল,  যাহারা আপনার দর্শন পাইয়াছে, তাহাদের সকলের চেহারায় বিজয়ের হাঁসি, মুখে আনন্দের বন্যা বইতে দেখিলাম। অপেক্ষমাণ সবাইকে আপনার বিভিন্ন কারামতের প্রশংসা করিতে দেখিলাম!
হুজুর, আপনার দরবারের দুইপাশে দাঁড়ানো সারি সারি দামী গাড়ি দেখিয়াছিলাম। গাড়ী ওয়ালা কাউকে গাড়ী থেকে নেমেই, সরাসরি দরবারের অভ্যন্তরে ঢুকিতে দেখিলাম। তাহাদের কাউকে আপনার দর্শন শেষে, দাঁত খিলাল করিতে করিতে দরবার হইতে বাহির হইতে দেখিলাম! তাহারা নাকি দরবারের সম্মানিত মেহমান, সেজন্য তাহাদের লাইনে দাঁড়িয়ে তকলিফ করিতে হয়না। আপনার দর্শনে সম্মানিত মেহমানদের যত জনই আসিল, তাহাদের হাতে বিভিন্ন কিসিমের উপহার সামগ্রী দেখিলাম। আমি মূর্খ মানুষ এসব জিনিষ চিনিবার কথা নয়, তবে আকল দিয়া বুঝিতে পারিলাম এর সবই দামী জিনিষ হইবে!
আপনার নিয়োগ কৃত খলিফা অলি মিয়ার নিকট এ বিষয়ে জানিতে চাহিলে তিনি জানাইলেন, তাহাদের কেউ বিদেশে থাকেন, কেউ বিদেশে যাইবেন। অনেকে দেশে বড় চাকুরী করেন, ওনাদের অনেকেই নাকি বড় ব্যবসায়ী। তাহাদের বিভিন্ন নিয়ত আছে, নিয়ত পূরণের জন্যই তাহারা আপনার দরবারে আসেন। অনেকেই আসিয়াছেন টেণ্ডারের জন্য দোয়া চাইতে। কাহারো নিয়ত কাস্টমস্ এ আটকানো মাল ছহি ছালামতে উদ্ধার পাইতে, কেউ আসিয়াছেন দূদকের দেওয়া মামলা থেকে রক্ষা পাইতে। আবার কেউ আসিয়াছেন ইটের ভাটায় ভাল ইট তৈরি হচ্ছেনা বলে ইটের দোয়া নিতে। কেহবা আসিয়াছেন তাহার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ জানিতে!
শুনিলাম আপনি নাকি চোখ বন্ধ করা মাত্রই অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ দেখিতে পান! আপনার জন্য চোখের পলকে মক্কা-মদিনা, বাগদাদ শরীফ দেখানো কোন ব্যাপার নয়! লম্বা চুল, বক্রাকার দাঁড়ি, গলায় রেশমী বন্ধনি, ঠোটে ফুটানো হয়েছে মহিলার কানফুল! যাঁহাকে পিছনের দিকে দেখিতে মহিলার মতন, সামনের দিকে গেলে পুরুষ। এই ব্যক্তি আসিয়াছেন নাকি গ্রীন কার্ডের জন্য ডিজিটাল দোয়া নিতে। অলি মিয়া কহিলেন, হুজুরের কাছে গ্রীন কার্ড, ডিবি লটারি থেকে শুরু করিয়া প্রবাসীদের সকল সমস্যা সমাধানের জন্য অনেকেই দরবারে আসিয়া থাকেন। আপনিও সাথে সাথে দয়া পরবশ হইয়া, তাহাদের সমস্যা সমাধান করিয়া থাকেন। গ্রীন কার্ড, ডিবি লটারি কি জিনিষ জানিতে চাহিলে, অলি মিয়া বিরক্ত হইলেন এবং বেশী বেশী প্রশ্ন করিতে নিষেধ করিলেন, সেটা নাকি আপনার নির্দেশ।
হুজুর, আপনার দরবারের আঙ্গিনায়, কাউকে দেখিলাম পরকালের সওয়াবের আশায় গানের তালে তালে হালকায়ে জিকির করিতে। নারী পুরুষ সবাই একসাথে জিকিরে মত্ত হইল, খুবই পুলকিত হইলাম। আমার নিজের জেলার মোল্লা হুজুরেরা এই কিসিমের জিকিরের নিয়ম জানেনা বলিয়াই মনে হইল! হারমোনিয়ামের সূর আর ঢোলের বাড়িতে নারী-পুরুষ সবাই মতোয়ারা হইবার উপক্রম হইল। সবার দিলে তখন অন্য জগত, অলি মিয়া কহিল এটার নাম ‘মারফতের জিকির’! মারফতের নাম বহু শুনিয়াছি কখনও দেখিনাই। আপনার দরবারে আসিবার পরই মারফতের দৃশ্য ও নমুনা দেখিলাম এবং নিজেকে বড় ধন্য মনে করিলাম।
আপনার সম্মানিত কতক মুরীদান দের দেখিলাম তাঁহারা যত্র তত্র বেহুশের মতো পড়িয়া আছে! অলি মিয়া কহিলেন তাঁহারা নাকি হালকায়ে জিকিরের গভীর জজবায় হুঁশ হারাইয়া ফেলিয়াছেন! কাউকে দেখিলাম গাছের কলকির ভিতর কি জানি ভরিয়া, তাহাতে আগুন লাগাইয়া, হুঁক্কার মত সুখ-আনন্দে ধূমপানের মত করিয়া টানিতেছে! কতককে দেখিলাম বৃত্তাকারে বসিয়া খুব ইজ্জত-এহতেরামের সহিত কলকি টানিতেছেন। শান্তভাবে, ভদ্রতা সহকারে ছওয়াবের নিয়তে তাহাদেরকে এভাবে কল্কি টানিতে দেখিয়া, আমারও একটু টানিবার বাসনা হইল। অলি মিয়া জানাইল সর্বনাশ, এইটা পান করিতে হইলে তরিকতের আরো গভীরে যাইতে হইবে। নতুবা বমি করিয়া, মাথা ঘুরাইয়া জমিনের উপর আছাড় খাইয়া পড়িব। এমনও হতে পারে জীবনে আর কোনদিন উঠিতে পারিব না।
আমার অনুনয়ের পরে, অলি মিয়া সেখান থেকে নির্গত ধূম শূন্য থেকে একটু-আধটু টানিবার সুযোগ করিয়া দিলেন। তরিকতের কল্কি-থেকে উত্থিত সেই ধুম, একটুখানি নাকে টানিয়াই আমি ভূমিতে ধসিয়া পড়িলাম। পরদিন সকালে নিজেকে অর্থকড়ি হারানো অবস্থায় রাস্তার পাশে এক বস্ত্রে উদ্ধার করিলাম! তখনই বুঝিতে পারিলাম তরিকতের অনুসারী হিসেবে আমার অবস্থান এখনও কত নিচে!
হুজুর, চুল-মোচ-দাঁড়ি জটলা পাকানো, আলকাতরা মিশ্রিত বস্তা পরিধানকারী কাউকে উদাস মনে চলিতে দেখিলাম। ধারনা হইল এদের জন্য গোসল করা নিষেধ! নাকের কফ, মোচের সাথে মিশিয়া মুখে নতুন রঙ্গের মোচ-দণ্ড সৃষ্টি হইয়াছে। তাঁহাদের দাঁড়ি-মোচ-চুল জটলা পাকাইয়া বটগাছের ঝুলন্ত মূলের ন্যায় ঝুলিতে দেখিলাম। তাঁহারা শরীরের নিচের অংশ আবৃত করার চেয়ে উপরের অংশ আবৃত করার প্রতি বেশী মনোযোগী বলিয়া মনে হইল। কৌতূহলী মানুষ তাঁদের শরীরের সবকিছু দেখিতে পায়। অলি মিয়া জানালেন এরা বড় বুজুর্গ, আল্লাহর পেয়ারা বান্দা, তাহাদের কাছে কি আছে তা কেউ জানেনা! প্রকৃতপক্ষে দুনিয়াতে তারাই আল্লাহকে পাইয়াছেন!
অলি মিয়াকে কহিলাম তাহাদের কাছে কি আছে, এটাতে না জানার কি আছে? একটু খেয়াল করিয়া তাকাইলেই তো তাহাদের শরীরের ভিতর বাহির সবই দেখা যায়। আমার কথায় অলি মিয়া বেজায় অসন্তুষ্ট হইয়া কহিল, বেকুপের মত কথা বলবেন না, ‘আমি বলিলাম এক জগতের কথা আর আপনি বুঝিলেন অন্য কথা’। যাক, তাহারা নাকি দুনিয়া বিরাগী হইয়াছেন। তাহাদের সম্মান নাকি অনেক উঁচুতে। মশা, মাছি পর্যন্ত বেয়াদবি হইবে মনে করিয়া তাহাদের বিরক্ত করেনা। অপরিণামদর্শী ছারপোকা যদি তাঁহাদের চামড়াতে কামড় বসাইয়া দেয়,ছারপোকার ভবলীলা নাকি ঘটনাস্থলেই সাঙ্গ হয়!
এ ধরনের আল্লাহর পেয়ারা বান্দাদের খুবই কাছে পেয়ে, আমি উৎফুল্ল হইলাম। তাই ভক্তি সহকারে তাহাদের একজনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে চেষ্টা করিলাম! তাঁহার কাছাকাছি হইতেই বুজুর্গ সাহেবের পবিত্র শরীর থেকে এমন এক ধরনের কটু গন্ধ আমার নাকে ঢুকিল, তাহা আমার জন্য সহ্য করা কঠিন হইল! ভাবিলাম আবার বুঝি বেহুশ হইতে হইবে। এইবারের বেহুঁশ যাতে আমার জীবনের শেষ বেহুশ না হয়; সেইভয়ে উপর ওয়ালার সাহায্য চাইলাম। তার দয়ায় সে যাত্রায় বেঁচে যাই। তবে কোন মতে বমিটা দমাইয়া রাখিতে পারিয়াছিলাম।
বুঝিলাম গাঁজারও একটা গুণ আছে, আরো বুঝিলাম দুর্গন্ধ প্রিয় মশা মাছি কেন তাঁদের সন্নিকটে আসিতে ভয় পায় আর কেনই বা ছারপোকার ভবলীলা নিমেষেই সাঙ্গ হয়। আরো শিখিলাম আল্লাহর দেওয়া স্বীয় নাকটিকে আরো পবিত্র করিতে হইবে, নতুবা এঁদের সান্নিধ্যে হাসিল করা যাইবে না। একজন গোস্বা করিয়া কহিল, আমার নাক পবিত্র করিতে হইলে, নাকি কিছুদিন ট্যানারীতে চাকুরী করিতে হইবে। ট্যানারী জিনিষটা কি জিনিষ কিছুই বুঝিলাম না। তবে ধারনা করিলাম এটাও হয়ত মারেফতি দরবেশদের থাকার জন্য অন্য ধরনের আস্তানা হইবে।
হুজুর এভাবে মানুষকে দলে দলে, বহু সমস্যা নিয়ে, বহু দূর-দূরান্ত হইতে আপনার দরবারে আসিতে দেখিলাম। মনে হইল আপনার দরবারে আসিতে পারিয়া, সকল মানুষই খুশি হইয়াছে। আপনার বিভিন্ন পরামর্শ, দোয়া, তাবিজ, কবজ, তবররুক পাইয়া তাহারা সবাই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করিতেছিল। হুজুর আপনি নাকি কখনও কখনও আপনার বগল মোবারক উপরের দিকে আলগাইলে আমেরিকা থেকে জাপান, যার যাহা ইচ্ছা তাহা দেখিতে পায়! নিজের শত্রুকে দেখিতে পায়, নিজের হারানো জিনিষ কোথায় লুকানো হয়েছে তাও নাকি দেখা যায়। গর্ভে ছেলে হইবে কি মেয়ে হইবে; তাহাদের ভবিষ্যৎ ছবিও নাকি দেখিতে পাওয়া যায়! আমি এসব খবর শুনিয়াই বিদেশ গমনের যাবতীয় অর্থ খরচ করিয়া আপনার পবিত্র চেহারা মোবারক দেখিবার নিয়তে, আপনার সান্নিধ্য পাইতে চাহিয়াছিলাম। কিন্তু বদবখতের কপাল এতই খারাপ কোথায় আপনার পায়ে চুমো দিব, কোথায় আপনার শরীর মোবারকের গন্ধ নিব, কোনটাই সম্ভব হয়নি, আপনাকে শুধু এক চিলিক দেখিয়াই খুশি থাকিতে হইল।
হুজুর, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়া আপনার নিকট দুকলম লিখা শেষ করিতে যাইতেছি। জানিনা পাপিষ্ঠ নরাধমের এই চিঠিখানা আপনার কাছে কবেতক পৌঁছিবে? আপনার পবিত্র চেহরা মোবারক দেখিতে যাইয়া, আমার সমুদয় টাকা-পয়সা শেষ করিয়াছি। তাতে আমার কোন দুঃখ নাই, চিন্তা নাই। তবে একটি কথা আমার মাথায় বারবার ঘুরপাক খাইতেছে, কাউকে বলিতেও পারছি না।আশাকরি আপনি আমার বেয়াদবি নেবেন না। আপনার শানদার ইজ্জত দিয়া মাফ করিবেন, নতুবা আপনার ভীষণ বদদোয়ায় আমি জ্বলিয়া যাইব।
হুজুর, আপনার নিকট তো অনেক কেরামত আছে, যাহা লোকমুখে শুনিতে পাইয়াছি। তাহা হইলে আপনি যদি একটু কষ্ট করিয়া বাংলাদেশের কোথায় গ্যাসের খনি আছে, তেলের খনি আছে, সোনার খনি আছে তাহা যদি সরকারকে বলিয়া দিতেন, তাহা হইলে বহু মানুষের উপকার হইত! খনি খোঁজ করিবার নামে সরকারের অনেক টাকাও বাঁচিয়া যাইত। বড় বড় পুরষ্কার প্রাপ্ত খুনিরা কোথায় লুকাইয়া আছে, অন্তত একজনের ঠিকানা যদি আপনি আমাকে বলিয়া দিতেন। তাহা হইলে আমি পুলিশ ডাকিয়া তাহাকে ধরাইয়া দিতে পারিতাম। তাহা হইলে আমার জীবনে যা লোকসান হইয়াছে, পুরষ্কারের টাকা দিয়া সব পুষিয়ে নিতে পারিতাম। আপনার বিপদগ্রস্ত মুরিদ চলমান মুসিবত হইতে উদ্ধার পাইত।
আপনি যদি আমাদের দেশের প্রধানমত্রীকে বলিয়া দিতে পারিতেন, কে তাঁহার সম্ভাব্য খুনি। তাহলে তিনি তাদের অগ্রিম ধরিয়া ফেলিতে পারিতেন। আপনার কেরামতির তথ্য বিদেশে রপ্তানি করিয়া বিদেশের বহু গুপ্তচর সংস্থা থেকে বহু বৈদেশিক মুদ্রা লাভ করা যাইত। দুনিয়ার কোন সভ্য দেশে তথ্য মন্ত্রনালয় না থাকিলেও আমাদের দেশে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আলবৎ দরকার আছে! আমাদের দেশে বহু তথ্যের দরকার বলিয়া সেখানে একজন মন্ত্রী থাকেন, মন্ত্রনালয় থাকে, লোকবল থাকে! দেশের মানুষের তাবৎ তথ্য আপনার বোগলের তলে, সেই হিসেবে তো আপনি নিজেই একটি চলমান তথ্যমন্ত্রণালয়!
তাই আপনি ইচ্ছা করলেই জাতির বিপদের দিনে, তথ্য সাপ্লাই দিয়া জাতির বড় উপকার করিতে পারিবেন। তাহলে কেন আপনি নিজেকে লুকাইয়া রাখিয়াছেন? আজ আমাদের দেশ অপশাসনে ভরিয়া গিয়াছে। খুনি, মাস্তান, লুটেরা, বখাটেদের অত্যাচারে দেশের জনজীবন অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। তাই আপনি প্রতিদিন অন্তত একটি করিয়া ভবিষ্যৎ বানী দিয়া পুলিশ বাহিনীকে সাহায্য করুন। পুলিশ কম করে হলেও প্রতিদিন একজনকে মৃত্যু থেকে বাঁচাইবে একজন অপরাধীকে ধরিবে। তাহলে বছরে কমপক্ষে ৩৬০ জন মানুষ বাঁচিয়া যাইবে আবার ৩৬০ জন মানুষ কম মরিবে। আপনার কেরামতের শানে বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করিতে পারিবে। এর ফলে আপনার খাদেমের সংখ্যাও কোটি কোটি ছাড়িয়া যাইবে।
ইতি আপনার বদবখত অধম মুরিদ
হুল মিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *