প্রজ্ঞা মানবজীবনের সর্বোত্তম গুণাবলীর নাম। আল্লাহ প্রদত্ত ওহী তথা আসমানি সংবাদের আগমন যেখানে শেষ, সেখান থেকেই প্রজ্ঞার যাত্রা শুরু। শুধুমাত্র স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়লেই প্রজ্ঞাবান হওয়া যায় না। প্রজ্ঞা অর্জন করার জন্য চেষ্টা, সাধনা, অধ্যবসায়ের সাথে সাথে ঔচিত্য-বোধের সঙ্গে লড়াই করার যোগ্যতাও অর্জন করতে হয়। ফলে প্রজ্ঞাবান মানুষের বিশ্লেষণ ক্ষমতায় প্রবল এবং সাধারণের উপর প্রভাব বিস্তারে পারঙ্গম হয়। প্রজ্ঞাবান নিজে যা বুঝে তা অন্যের চিন্তার মাঝে ঢুকিয়ে দেবার ক্ষেত্রে সক্ষম। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি অন্যদের মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করার ক্ষেত্রে খুবই পারদর্শী। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্যা গুলো সৃষ্টির পিছনে মূল উপাদান কি, সেটা সহজে বের করতে পারে। ফলে তারা আগামী বছর, আগামী দশক কিংবা মৃত্যু পরবর্তী আগামী শতাব্দীতে কি হবে, তার চিত্র স্বীয় মানস-পটে পরিষ্কার আঁকতে পারেন। প্রজ্ঞা Wisdom মানুষের শ্রেষ্ঠতম গুন
প্রজ্ঞা আল্লাহর স্বীয় গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত একটি মূল্যবান উপাদান। যা থেকে সমগ্র মানবজাতি কিঞ্চিত পরিমাণ সংগ্রহ করতে পেরেছে। আল্লাহ স্বীয় দয়ায় কাউকে প্রজ্ঞা দান করেন অথবা যারা চায়, যারা মূল্য বুঝেও তাদের প্রতিও বিলিয়ে থাকেন। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে আল্লাহ নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন প্রজ্ঞাবান হিসেবে। আল্লাহর রাসুল (সা) কে জগতের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ নিজ সম্পর্কে বলে থাকেন “ওয়াল্লাহু আলীমুন হাকিম” বলে। যার অর্থ “আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়”। এ থেকেই বুঝা যায়, মানব জীবনে প্রজ্ঞার গুরুত্ব কত বেশী এবং দুনিয়াতে তার কত সম্মান ও মর্যাদা।
আরো পড়তে পারেন…
- দূরদৃষ্টি Prudence অর্জনের গুরুত্ব
- অন্তর্দৃষ্টি Insight অর্জনের প্রয়োজনীয়তা
- যোগ্য লোক অলস হলে কূটচালে অভ্যস্ত হয়
দুনিয়ার ধর্মবেত্তাগন স্বীয় যুগে প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে পরিগণিত ছিলেন। মোহাম্মদ (সা), ইসা ও মুসা (আ) সহ সকল নবীদেরকে কোন শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করতে হয়নি। কোন নবীদেরই শিক্ষক ছিলেন না, কেননা তারাই শিক্ষক হিসেবে দুনিয়াতে এসেছিলেন। ওহীর জ্ঞানের বাইরে তারা যে কথাগুলো বলতেন, সে গুলোতে প্রজ্ঞার প্রভাব দেখা যেত। তারা সংক্ষিপ্ত কথা বলতেন কিন্তু তাতেই বহুবিধ ব্যাখ্যা-বর্ণনা লুকিয়ে থাকত। এটার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েই রাসুল (সা) বলেছেন,
“সংক্ষিপ্ত ভাষণ প্রজ্ঞার পরিচায়ক, তাই ভাষণ সংক্ষিপ্ত কর, অবশ্যই কোন কোন ভাষণে যাদুকরী প্রভাব বিদ্যমান থাকে”
মুসলিম-১৮৯৪
প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের কথাগুলো প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়। প্রজ্ঞাবান মানুষ নৈতিকতার দিক দিয়ে উচ্চ মর্যাদায় সম্মানিত থাকেন। তারা যখন কথা বলেন মানুষ তন্ময় হয়ে শুনতে থাকে। তাদের কথায় প্রাণ লুকিয়ে থাকে ফলে তা হৃদয়ঙ্গম ও মুখস্থ করাটা শ্রোতাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
প্রজ্ঞাবান মানুষের ব্যাপ্তি শুধু নৈতিকতা, পরকাল, আত্মার উৎকর্ষ সাধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। তারা ইহ-কালীন জগতের সমস্যা মোকাবেলা ও এ থেকে উত্তরণের পরামর্শ দেবার ক্ষেত্রেও সূক্ষ্মদর্শি হয়ে উঠেন। তারা যেমন মানুষকে ইহকাল ও নৈতিকতার কথা বলে; দুনিয়াতে প্রসিদ্ধ অর্জনের রাস্তাগুলো চিনিয়ে দেবার ক্ষেত্রেও অগ্রগামী থাকেন। তারা দ্রুততর সময়ে সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন এবং তার একটি সুন্দর গ্রহণযোগ্য বিকল্প হাজির করার ক্ষেত্রে পারদর্শিতা দেখাতে পারেন। সমস্যার ভিতরে হাবুডুবু খাওয়ার সময়, প্রজ্ঞাবানের দেওয়া বিকল্প প্রস্তাবে মানুষের প্রবল আস্তা-বিশ্বাস ভর করে। মানুষ তাদের দেখানো পথেই মুক্তির আলো দেখতে পায়। প্রজ্ঞাবান মানুষের চরিত্রের প্রভাব এমন যে, তাদের সাহচর্যে যারা থাকে তারাও প্রজ্ঞার ছোঁয়া পেয়ে থাকে। এদের মধ্য থেকেও অনেকে জগতে সম্মানিত ও গ্রহণীয় হয়ে উঠে।
উপরে উল্লেখিত ধর্মবেত্তাগন সর্বাঙ্গীণ ভাবে সকল বিষয়েই প্রজ্ঞাবান ছিলেন। এর বাহিরেও আল্লাহ তায়ালা কোন একটি বিষয়ে, একটি সমস্যার আলোকেও প্রজ্ঞাবান মানুষের সৃষ্টি করেন। পৃথিবীতে বহু দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ, শাসক, বিচারক, শিক্ষক, অভিভাবক, লেখক, পরিব্রাজক এসেছিলেন। তারাও তাদের নিজ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাবান ছিলেন। দুনিয়া পরিচালনা করার মত প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা আল্লাহর পক্ষ হতেই আসে। দুনিয়াবি জীবনে যারা একনিষ্ঠতার সাথে কাজে নিয়োজিত হয়ে পড়েন, তারাও প্রজ্ঞার দিশা পান। সে জন্য রাসুল (সা) বলেছেন,
“আল্লাহ্ তা’আলা যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেন।”
মুসলিম-২২৭৯
অনেক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির মধ্যে আকল ও যুক্তির সংমিশ্রণ ঘটলে তারা সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে যোগসূত্র হারিয়ে ফেলেন। ফলে কেউ দাম্ভিক, অহংকারী হয়ে উঠে। প্রজ্ঞাবান মানুষ জনগণের দৃষ্টি সীমায় আবদ্ধ থাকে, ফলে তারা জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। এই খ্যাতির প্রভাবে অনেকেই জ্ঞানপাপীতে পরিণত হয়। দুনিয়ায় বহুভাবেই মানুষ প্রজ্ঞা অর্জন করেন কিন্তু এর পিছনে যে, আল্লাহ তায়ালার রহমতের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে তা অনেকেই মানতে চায় না। কেউ সম্মানিত হতে হলে, মৃত্যুর পরেও মানুষের হৃদয়ে আসন নিতে চাইলে, নিজেকে প্রজ্ঞাবান হিসেবে গড়ে তোলরা বিকল্প নেই। এবং প্রজ্ঞার জন্য আল্লাহর কাছে যাচ্ঞা করা ব্যতীত কোন গত্যন্তর নেই।
প্রজ্ঞাবান মানুষ নিজের বিশ্বাসকে অন্যের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারেন। মানুষের মনের উপর যথেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেন। মানুষের খাসিয়ত, রুচি, বৈশিষ্ট্যকে শ্রেণিবিভাগ করে, সবার জন্য একই পরামর্শ না দিয়ে, মানুষের যোগ্যতা, চরিত্র ও আগ্রহ অনুসারে কর্মবন্টন করতে পারে। এতে করে সকল মানুষ খুশী হয় এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। প্রজ্ঞাবান সবাইকে একই দণ্ডে খবরদারী করে না। কে কোন সমাজ থেকে এসেছে, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, মন-মস্তিষ্ক, সমাজ-কৃষ্টির সাথে পরিচিত হয়েই তাদের উপর খবরদারী করে থাকেন। মানুষের দুঃখ-বেদনা, ভাবাবেগ-উত্তেজনা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে প্রজ্ঞাবানেরা সিদ্ধ হস্ত। প্রজ্ঞাবানেরা কোন অবস্থাতেই সৃষ্ট পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুধাবন না করে, সমস্যার ভিতরে হাত দেয়না। আধুনিক যুগ জিজ্ঞাসার জবাবে প্রায় সকল ধরণের প্রশ্নেরই সম্যক জ্ঞান রাখে একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। পরিস্থিতি যত প্রতিকূলতাই সৃষ্টি করুক না কেন, তারা এসবের মোকাবেলা করেই সামনে এগোয়। সাথে সাথে তার গ্রহণযোগ্য সমাধান কল্পে একটি উত্তম মতামত ও পন্থা হাজির করার ক্ষেত্রে নিরলস কাজ করে।
প্রজ্ঞাবান হতে হলে অবশ্যই ইতিহাসের জ্ঞানে ভারী হতে হয়। ইতিহাসের বিখ্যাত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যেমন জানতে হয়, তেমনি কুখ্যাত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড ও পরিণতি সম্পর্কেও সম্যক ধারণা অর্জন করতে হয়। বিভিন্ন জাতি ও ধর্ম সম্পর্কে জানতে হয়, সাথে সাথে তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল হতে হয়। কোন জাতি কেন শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রসিদ্ধ পেয়েছে এবং কোন জাতি সেরা হবার পরে কিভাবে ধ্বংস হয়েছে, তার বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। সর্বোপরি স্রষ্টা ও সৃষ্টি এবং তাদের সম্পর্ক ও দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করতে হয়। এই মানের প্রজ্ঞাবানেরা একটি নিরস জাতিকেও, প্রেরণা সৃষ্টির মাধ্যমে জাগিয়ে তুলতে পারে।
প্রজ্ঞাবানেরা শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ ও ধনী-দরিদ্র সকল শ্রেণীর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত ব্যক্তিত্ব থাকে। মানুষের দুঃখ-বেদনা, ভাবাবেগ-উত্তেজনা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে করণীয় ঠিক করতে পারে। কোন এক পক্ষের মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়ে যাবেন বলে কোন ঘটনাকে এড়িয়ে চলেন না। সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল সমস্যায় তিনি পরামর্শ দেবার ক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখেন। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ভুল কথা বলে, পরে অনুতপ্ত হয়ে দুঃখিত হবার চেয়ে; প্রয়োজনে কম কথা বলে কিংবা সে পরিস্থিতিতে চুপ থাকে এবং পরবর্তীতে তার ব্যাখ্যা দেয়।