শয়তানের মারাত্মক অস্ত্রের নাম ওয়াসওয়াসা তথা সংশয় সৃষ্টি

ওয়াসওয়াসা শব্দের মূল ভাবার্থ হল সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা, কোন দৃঢ় সিদ্ধান্তকে দুদোল্যমান অবস্থায় ফেলে দেওয়া। জিন-শয়তান মানুষের উপর বল-শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনা; তবে মানব-মনে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করার মাঝে সে খুবই পটু। মানুষের মন হল সকল চিন্তা ও শক্তির উৎস। মন যেদিকে ঘুরে যায়, সে দিক থেকেই সে সফলতা আশা করে। আর মানুষের সেই মনের মধ্যেই শয়তান ওয়াসওয়াসা নামক ধারালো অস্ত্র দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে। যে সমস্ত মানুষ শুধুমাত্র যুক্তির মাধ্যমেই যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত, শয়তান তাকে লাটিমের ন্যায় ইচ্ছা মত ঘুরাতে পারে। কেননা, বেশী যুক্তির সাহায্য নেওয়া মানেই তিনি গভীর সংশয় কিংবা দুদোল্যমানতায় ভারাক্রান্ত বুঝায়।

ইতিহাসের একটি সত্য ঘটনা উল্লেখ করতে হয়। উত্তেজিত জনতা শাস্তি দেবার জন্য এক পাগলীকে ধরে আনে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে। জনতার দাবী, এই মহিলার উপরে শয়তান ভর করেছে। সে মানুষের মনের গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়! হাজ্জাজ কিছুক্ষণ ভাবলেন অতঃপর মাটি থেকে গুনে গুনে কিছু নুড়ি পাথর হাতের মুঠোয় ভরে মহিলাকে প্রশ্ন করলেন, বলতো আমার হাতের ভিতরে কতগুলো পাথর কণা আছে? মহিলাটি হুবহু সঠিক সংখ্যা বলে দেয়! এবার হাজ্জাজ না গুনেই, মাটি থেকে এক মুঠো পাথর কণা তুলে নিলেন। আবারো পাগলীকে প্রশ্ন করলেন, এবার বলতো এখানে কতগুলো কণা আছে? এবার সে সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়!

লক্ষণীয়, হাজ্জাজ প্রথমে যখন পাথর গুনে নিচ্ছিল তখন তার সাথে থাকা শয়তানও তা গুনে নেবার সুযোগ পায় কিংবা হাজ্জাজের মগজের স্মৃতি ভাণ্ডার থেকে তথ্যটি সংগ্রহ করে ফেলে। মহিলার সাথে থাকা শয়তান সাথে সাথেই পাগল মহিলার মনের মধ্যে উত্তরটি ঢুকিয়ে দেয়, মহিলা সঠিক উত্তর বলে ফেলে। পরবর্তীতে হাজ্জাজ যখন হিসেব করে পাথর কণা তুলে নাই, তাই শয়তানও তা গুনতে পারে নাই এবং পাগলীকে সঠিক তথ্যও দেওয়া যায় নি।

এখানে লক্ষণীয়, পাগলী একটা প্রশ্নের সঠিক তথ্য দিতে পেরেছে, অন্যটির পারে নাই। মানুষের অভ্যাস হল কোন পাগল জাতীয় মানুষ দশটি প্রশ্নের অন্তত তিনটার সঠিক উত্তর দিতে পারলেই তাকে মহামানব বানিয়ে ছাড়ে। সাতটি প্রশ্নের ভুল উত্তর দিলেও মানুষ সেটা নিয়ে ভাবতে চায়না। পাগলের ভুল উত্তরকে হেয়ালী পনা মনে করে। অর্থাৎ পাগল যদি মন দিয়ে প্রশ্ন শুনত তাহলে এসব প্রশ্নেরও সঠিক জবাব দিতে পারত। এই ধারনাটাও পাগলের পক্ষে যায়। পরিশেষে তারা পাগলকে আল্লাহর ওলির মর্যাদায় পৌছিয়ে দেয় এবং তার দুটি সত্য তথ্য প্রদানকে কেরামতি বলেই মানতে থাকে। এটাই হল শয়তানের অন্যতম ‘ওয়াসওয়াসা’। সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার যুতসই নিয়ম। ফলে শয়তানের এক চাতুরীতেই শত শত মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে বাধ্য।

ধরুন একজন মানুষ পুলিশী তল্লাশিতে পড়েছে। এমতাবস্থায় তিনি ভাবলেন, জীবন বাঁচানো তো ফরজ! তাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করি। তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে, বাঁচার জন্য সকল কৌশল কাজে লাগালেন। দেখা গেল তারপরও তিনি সন্দেহ জনক ব্যক্তি হিসেবে ধৃত হলেন! একই ভাবে এখানেও উপরের কারণটি ঘটেছে, ধৃত ব্যক্তির শয়তান, পুলিশের শয়তানকে তথ্য দিয়ে দিবে এবং সে পুলিশের মনে এই ব্যক্তি সম্পর্কে মজবুত সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি করাবে। ব্যস! কাজ হয়ে গেল। মুমিনদের জন্য অনর্থক সন্দেহ করা পাপ কিন্তু পুলিশ তার প্রাথমিক কাজ শুরু করে সন্দেহ ও সংশয় দিয়েই! শয়তান তো এই কাজে এমনিতেই পটু। বস্তুত, শয়তান পাপী-পুণ্য সব মানুষেরই শত্রু কিন্তু তবে ইমানদার মুত্তাকীদের জন্য ভয়ঙ্কর শত্রু! সে স্পেশালী মুত্তাকীদের পিছনেই অহর্নিশি জোকের মত লেগে থাকে।

যে শয়তান  মানুষের মন-মগজকে পেঁচিয়ে ফেলার যোগ্যতা রয়েছে, তার দক্ষতা সত্যিই কার্যকর। তাকে যেন কোন অবস্থাতেই ছোট্ট ও তুচ্ছ জ্ঞান না করা হয়। তার মারাত্মক যুক্তি ও কু-বুদ্ধির প্ররোচনায় মানবজাতির প্রথম পিতা-মাতা উভয়েই ধোঁকায় পড়েছিল। আমরা জ্ঞানে-বুদ্ধিতে তাঁদের চেয়ে কোনভাবেই সেরা নই। তাই নিজেদের কে শয়তানের চেয়েও বেশী চালাক মনে করে নতুন করে যেন শয়তানির রাস্তা না খুলে বসি।