সালাতে জোড়ে আমিন ও রাফেয়াদাইন : কঠোরতা বনাম খট্টরতা

টিপুভাই ডট কম ব্লগের ছবি, নজরুল ইসলা টিপু - tipuvai.com
তারা হানাফি মাজহাবের অনুসারী। সপরিবারে প্রবাসে সন্তানদের বড় করেছেন। এদেশের স্কুল গুলোতে স্কুল শিক্ষক দ্বারা নামাজ ও কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। স্কুলের আরবী শিক্ষক আফ্রিকান। তিনি ছাত্রদের নামাজে রাফেয়াদাইন (রুকু-সেজদায় যাবার আগে দুই হাত উপরে তোলা) করার নিয়ম শিখিয়েছেন। ছাত্ররা স্যারকে খুবই ভালবাসেন, তাদের চরিত্রে তার প্রভাব বিদ্যমান। রাফেয়াদাইন
বাবা-মা নিজেরা রাফেয়াদাইন না করলেও সন্তান শিশুকাল থেকেই তার শিক্ষক থেকে যেভাবে নামাজ শিখেছে, সেভাবেই পড়ে। এটা আরব দেশে কোন সমস্যা নয়। আরব দেশের মসজিদ গুলোতে সকল মাজহাবের মানুষ নিজেদের মত নামাজ পড়তে পারে। এমনকি মসজিদের ইমামেরাও এমন। এদেশে এসব অনেক সহনীয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটা সহনীয় নয়! কোন স্থানে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়। ফেতনার দেশে গিয়ে ভদ্রলোকের পরিবার বিরাট সমস্যায় পড়েছেন।
তারা যে এলাকায় উঠেছেন সেটা সুন্নি এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে ওয়াহাবী-সুন্নি ধন্ধ কোন্দল আগে থেকেই জিইয়ে ছিল। স্থানীয়রা একে অপরের চিন্তাধারা ও আদর্শ সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরে জানে। ফলে সংঘাত এড়িয়ে চলা সহজসাধ্য হয়। বর্তমানে নতুন উপাদান হিসেবে যোগ হয়েছে আহলে হাদিস আর সালাফি মতবাদ। রাফেয়াদাইন
লক্ষণীয়, আহলে হাদিস-সালাফীদের সাথে আবার ওয়াহাবী-সুন্নির বিরোধ তুঙ্গে। কেননা, আহলে হাদিস-সালাফিরা নিজেদের ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী মনে করে! দেশের বাকিরা সবাই গোমরাহিতে নিমজ্জিত বলে বলতে থাকে। তাই তাদের গদা ঘুরে অন্ধের মত এবং এ গদা যার পাশ দিয়ে যায়; তাকে কিছু না কিছু আঘাত করে ছাড়েই। ফলে বাড়ছে বিরোধ, লাগছে সংঘাত।
সাধারণ মানুষ তো আর এসব বুঝে না। তারা মোল্লা-মৌলভীদের ওয়াজ নসিহত শুনেই ইসলাম সম্পর্কে ধারণা অর্জন করে। ফলে তারাও বিভক্ত, ক্ষেত্র বিশেষে বিক্ষুব্ধ, ক্ষিপ্ত! বাংলাদেশের বাস্তবতা এটাই। সাধারণ অনুসারী এসব মানুষ এতটুকু বুঝে যে, যারা নামাজে জোড়ে আমিন বলে কিংবা রুকু-সেজদায় যাবার আগে দুই হাত উপরে তুলে তারাই আহলে হাদিস কিংবা সালাফি।
সুন্নি মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিল সেই প্রবাসীর ছেলে। মাগরিবের নামাজের সুরা ফাতিহার শেষে নিজের অজান্তেই আমিন বলে ফেলে। ব্যাস আর যায় কোথায়? নামাজ শেষে সবাই ঘিরে ধরে। এতবড় বুকের স্পর্ধা। সুন্নির কেল্লায় বসে ধর্ম নিয়ে টিটকারি! আল্লার সাথে মশকারি! স্কুলের ছাত্র, প্রবাসে বড় হয়েছে, কিছুই বুঝে উঠার আগে এতগুলো আক্রমণাত্মক চোখের আগুনে, তার ঝলসে যাবার দশা। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে! বয়স বিবেচনায়, থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বারণ করা হয়েছে, আর যাতে সে মসজিদে না যায়। ইতিপূর্বের কয়েক শুক্রবারের জুময়ার খোতবায় নাকি বয়ান হয়েছে যে, এই মসজিদে যাতে আহলে হাদিস কিংবা ওয়াহাবীরা নামাজ না পড়ে। গত সপ্তাহেই কয়েকজন মুসল্লিকে হেনস্তাও করা হয়েছে। দুর্ভাগ্য এলাকার সকল মসজিদই সুন্নি প্রভাবিত।
রাস্তার ওপারে কাছাকাছি আরেকটি মসজিদ উঠি উঠি করছিল। স্থানিয় পরিভাষায় এটি ওয়াহাবী মসজিদ। কিছু মানুষের ঈমানী জজবায় দিন দশেকের মধ্যে সেটিও একটা আকৃতি নিয়ে খাড়া হয়ে যায়। যথারীতি সেই প্রবাসীর ছেলে সেখানে নামাজ পড়তে যায়। ভয়ে আতঙ্কে কয়েক দিনের প্রচেষ্টায় জোড়ে আমিন বলার অভ্যাস দূর করতে পেরেছে কিন্তু দীর্ঘদিনের স্বভাবের কারণে রাফেয়াদাইনের অভ্যাস মুছতে পারেনি। অজান্তে তা করতে থাকে। এ দৃশ্যে কিছু মুরুব্বীরা বড় চোখে, কড়া গলায় প্রশ্ন করে, “এই তোর বাড়ী কই? তোর বাপের নাম কি?” ন্যাড়া বেল তলায় দ্বিতীয়বার ধরা খেয়েছে! ছেলেটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে বসে, “মাপ করে দেন আঙ্কল, আমি আর মসজিদে আসব না।‘ আঙ্কেল জানালেন তাই ভাল। তার পিতা সে এলাকায় একটি ফ্লাট কিনে ফ্যামিলিকে সেখানে পাঠিয়েছে। কিন্তু তিনি জানতেন না মানুষের বিপদ কত দিক থেকে আসতে পারে।
যে ইসলাম পালন ও প্রচার মানুষের মধ্যে সৌহাদ্য বরবাদ করে, সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায়, ঐক্যে ভাঙ্গন ধরায়; সে আমল কোন কাজেই আসবে না এই অনুভূতি মানুষের মধ্যে আজ নাই। আমল যত বেশী হউক, আকিদা যতই খাটি হউক, মানহায যতই স্বচ্ছ হউক, ঈমান যতই প্রবল হউক, মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব-বোধ নষ্ট করা হলে, সবই বাতিল। এ ধরনের কাজ আল্লাহ গোস্বা বাড়িয়ে তুলে, তিনি কঠোর হয়ে যান।
আজ ওয়াজ নসিহতে আলেমগন খুবই কর্ষক হয়ে উঠেছে, বক্তাগনের রূঢ় চেহারা বিকশিত হচ্ছে। বিতর্ক বাড়ায় এমন কথার চর্চা হচ্ছে, ইসলামী জাগরণকে ঠুনকো বানানো হচ্ছে। ছোট্ট বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বৃহৎ বিষয়কে ধ্বংস করা হচ্ছে! এই স্কুল ছাত্রটিকে তার বাবা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়েছে, দশ পারা কোরআন মুখস্থ করিয়েছে, তার চেয়ে বড় কথা তাকে নামাজি বানিয়েছে এবং ভাল চরিত্র শিক্ষা দিয়েছে।
চাকুরীর সমস্যার কারণে পরিবার দেশে পাঠিয়েছে কিন্তু দেশের উন্মাদ মানুষগুলো সারা দেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। এটা কি ইসলামের জন্য কল্যাণকর! জোড়ে আমিন বলা কিংবা রাফেয়াদাইন করা নামাজের ভিতরের ফরজ-ওয়াজিব কোনটাই না। এটা সুন্নত। এটা না করলে নামাজও ভঙ্গ হয়না, সেজদা সাহু দিতে হয়না। এটা বাস্তবায়নে আমরা অনেকেই যেমন কঠোরতা আরোপ করছি, আবার কিছু মানুষ সেটা প্রতিহতে ততোধিক কট্টরতা প্রদর্শন করছে। দুটোই অনুচিত। আমরা কেন জানি অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছি পক্ষান্তরে নিজেদের আল্লাহর গজবের উপযোগী করে গড়ে তুলেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *