একদা টিকা নিতে মানুষ ভয় পেত গোশত ফালা ফালা হয়ে যাবার ভয়ে! যুগ বদলের পালায় এখন টিকা নিতে মানুষ ভয় পায় বিশ্বস্ততার অভাবে! টিকাতে ভয় ও ভয়ের টিকা
৬০ এর দশকের টিকা প্রদানের একটি দৃশ্য আমরা ছবিতে দেখতে পেয়েছি। ব্যাটারি চালিত মেশিনের মাধ্যমে মাংসপেশিতে আঘাতের মাধ্যমে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং সেখানে টিকার তরল ঔষধ লাগিয়ে দেওয়া হত।
এ ধরনের মেশিন কিনে সারা দেশের মানুষকে টিকা প্রদান ছিল একটি ব্যয়বহুল কর্মকাণ্ড। ফলে কাজটি দক্ষ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে, খোলা হাতেই করার ব্যবস্থা চালু হয়। হাতের মাংস ছিঁড়ে সেখানে লাগিয়ে দেয়া হত ঔষধ।
সকল মানুষের সমান দক্ষতা ছিলনা, ফলে স্বাস্থ্য কর্মীদের নানা বাক্যবাণ শুনতে হত। চাকুরীর গরজে কাজটি করতে হলেও, এই কাজের মানুষগুলোকে শিশুরা ভয় পেত। তারা নির্দয় হিসেবে বিবেচিত হত।
শিশুকালে নিষ্ঠুর কায়দায় টিকা দেবার ঘটনার কিছুটা ভাসা ভাসা আজো আমার মনে আছে। টিকা প্রদানকারীর টেবিলে, বিশেষায়িত কাঁটাযুক্ত ছুরিটি রক্ষিত আছে।
সেটি দিয়ে হাতের মাংসপেশিতে আঘাত করে ক্ষত বানানো হবে এবং সে স্থানে ঔষধ লাগিয়ে দেয়া হবে! অতঃপর টিকার কাজ শেষ।
এই টিকা দেবার পরের অবস্থা আরো কাহিল হয়ে উঠত। বুঝুন ব্যাপার খানা! ক্ষতের মাঝে পানির ছিটা! ভয়ঙ্কর ব্যথা তো থাকতই; হাত ফুলে একাকার হয়ে যেত! কারো হাতে ঘা হয়ে যেত! পুঁজ বের হত!
আমার আগে একটি বয়স্ক শিশুকে আনা হয়েছিল। সে তার চাচার কোলেই আনন্দের সহিত বিস্কুট খাচ্ছিল। হঠাৎ আথিতেয়তায় সে মজে উঠেছিল। আমার হিংসে লাগল।
বয়স্করা তার চেহারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছিল। ঘরের বাহিরে উঠানে দাড়িয়ে তার মা মুখে আচল এঁটে ফুঁপিয়ে কান্না করছিল।
শিশু মানুষ বুঝতে পারেনি কি হতে যাচ্ছে। হঠাৎ তার গগন ফাটা করুণ চিৎকার শুনে তার মা’ও চিৎকার দিয়ে উঠেছিল! সবাই সান্ত্বনা দিয়ে বলছিল, ব্যস হয়ে গেছে! হয়ে গেছে! ভাল হয়ে যাবে।
সারাদিনেও এই শিশুর কান্না থামে নি। সে তার চাচাকে দেখলে ভয় পেত! যদি তাকে আবারো টিকা দিতে নিয়ে যাওয়া হয়!
আমিও বয়স্ক শিশুদের কাতারে পড়ি, তবে ঘটনা মনের রাখার বয়স হয়েছে। কয়েকজন শক্তভাবে আমাকে ধরে রেখেছে এবং দুই জন ধরে রেখেছে হাত। এরা কেউ নয়, আমারই আপনজন ভাই, পাড়ার প্রতিবেশী।
আমার প্রতি সদা স্নেহ পরায়ণ ব্যক্তিগুলোর চেহারা হঠাৎ এমন নির্দয়-নিষ্ঠুর হয়ে উঠবে কল্পনাতেও ছিলনা! আমাকে আটকিয়ে রাখা এমন কারো অনুকম্পা পাবার আশায়, সকরুণ নেত্রে, অসহায় ভাবে তাদেরই চেহারার পানে তাকিয়েছিলাম। সবই বৃথা গেল!
একেবারেই হতাশ হয়ে উঠেছিলাম! মুহূর্ত মাত্র দেরী! টিকা প্রদান কর্মকর্তা ছুরির গুঁথোয় মাছ-মাংসে লবণ-মরিচ ঢুকানোর কায়দায়, খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে আমার হাতের মাংসপেশিতে কসাইয়ের মত আঘাত করতে রইল!
প্রচণ্ড বেগে চিৎকার বেরুচ্ছিল, এমনি সময় কেউ একজন আমার মুখ চেপে ধরে বলল, ‘এইতো হয়ে গেল’। মুখ চেপে ধরা ব্যক্তির চেহারার দিকে তাকালাম, বিশ্বাস হচ্ছিল তাকে! তিনি আর কেউ নন, আমার মায়েরই পেটের সন্তান, আমারই বড় ভাই!
আমার চিৎকার যাতে মায়ের কানে না পৌঁছে, সে জন্যই তার এই অগ্রিম প্রস্তুতি! মানব জাতিকে বাঁচাতে, কিছু মানুষকে এমন কঠোর চিত্তের অধিকারী হতে হয়েছে। এখন টিকা দেওয়া সহজ হয়েছে কিন্তু টিকার সৃষ্টি ও উৎপাদন নিয়ে, মানুষের মাঝে অবিশ্বাস আর অবিশ্বস্ততার প্রসার ঘটেছে বহু বেশী।
টিকার প্রতি অনাস্থা অবিশ্বাস এখনকার সময়ে নয়, আগেও ছিল এমন বহু ধরনের ঘটনা। ফরাসী বিজ্ঞানী “ওয়েলডেমার হাফকিন” নামে এক গবেষক ১৮৯৪ সালে ভারতে টিকা দিতে এসে বহুবিধ সমস্যার মুখে পড়েছিলেন। বিবিসির একটি লম্বা প্রতিবেদন তাকে নিয়েই আছে।
বয়স্ক বহু মানুষের হাতে, গোলাকার বৃত্তের মত এখনও সেই সব টিকার করুন দৃশ্য বিদ্যমান। পরবর্তীতে ইনজেকশন নিডেল আবিষ্কার হবার ফলে এর বহুবিধ ব্যবহার শুরু হয়েছে।
যা টিকা প্রদানের অন্যমত মাধ্যম হিসেবে দুনিয়াতে বেশী মাত্রায় স্বীকৃতি পেয়েছে। টিকাতে ভয় ও ভয়ের টিকা