শিশু নবী (সাঃ) মায়ের সাথে মদিনায় গমন করলেন এবং মাতৃহারা হলেন

শিশু নবী (সাঃ) মায়ের সাথে মদিনায় গমন করলেন এবং মাতৃহারা হলেন

শিশু নবী (সাঃ) মায়ের সাথে মদিনায় গেলেন এবং চিরতরে মাতৃহারা হলেন

মাত্র ৬ বছর বয়সে শিশু নবী (সাঃ) মাতৃহারা হলেন! গর্বে থাকতে পিতাকে হারান, দুনিয়াতে আসেন এতিম অবস্থায়। আর ৬ বছর বয়সে মাকে হারিকে দুনিয়ার কাছের ও নির্ভরযোগ্য ছায় অবলম্বন হারান অচেনা অজানা জনপদের পাদদেশে।

এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মত পার্থক্য আছে যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত বছর বয়সে তাঁর গর্ভধারিণী মায়ের সাথে মদীনা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। কেউ বলেছেন ছয় বছর বয়সে আবার কেউ বলেছেন সাত বছর বয়সে।

বিশ্বনবীর মা আমেনা শিশু নবীকে সাথে করে মদীনা গেলেন। অনেকে বলেছেন, হযরত আমেনার এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল সন্তানকে তাঁর পিতার কবর দেখানো। তাদের সাথে হযরত উম্মে আয়মানও ছিলেন।

মদিনায় শিশু নবী (সাঃ) কে পিতার কবর দেখানো হয়েছে

হযরত আমেনা বিশ্বনবীর দাদার পরিবার বনী আদী ইবনে নাজ্জার গোত্রে প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। সে সময়ে তিনি তাঁর সন্তানকে হযরত আব্দুল্লাহ ইন্তেকালের স্থান এবং তাঁর কবর দেখিয়েছিলেন।

মদীনায় অবস্থান কালের অনেক ঘটনা পরবর্তীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবাদেরকে হিজরতের সময় বলেছিলেন।

হযরত হালিমার কাছ থেকে নিজের মায়ের কাছে ফিরে আসার পরে মক্কায় যখন তিনি অবস্থান করতেন, সে সময়ে নানা ধরণের অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। কোন কোন গ্রন্থে দেখা যায়, সে বছরে মক্কায় অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছিল।

মক্কার অনেকেই বৃষ্টির আশায় দোয়া করার জন্য বের হয়েছিল। বিশ্বনবীর চাচা আবু তালিব শিশু-নবীকে সাথে নিয়ে দোয়া করেছিলেন। যাওয়ার পথে তিনি কবিতা আবৃত্তি করছিলেন যার অর্থ ছিল,

‘আজ এমন একজন স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানির জন্য কামনা করছে, যে হবেন ইয়াতিমদের আশ্রয়দাতা এবং বিধবা নারীদের সতীত্বের রক্ষক!’ কেউ কেউ বলেছেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময়ে নিজের হাতের আঙ্গুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করেছিলেন এবং তাঁর পরেই মুষলধারে বর্ষণ আরম্ভ হয়েছিল।’

মায়ের সাথে মদিনায় অবস্থানকালে শিশু নবী (সাঃ) এর দিনগুলো যেভাবে কাটে

মায়ের সাথে মদীনায় অবস্থানের সময়ে বিশ্বনবী হযরত উম্মে আয়মানের সাথে ঘুরতেন। তিনি বনী নাজ্জারদের বিশাল সরোবরে সাঁতার শিখেছিলেন। তাঁর মা যখন তাঁর আব্বার কবরের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, সে সময়ে শিশু-নবী তাঁর মা’কে সান্ত্বনা দিয়ে বলে ছিলেন, ‘আম্মু তুমি কেঁদোনা। আখেরাতে নিশ্চয়ই আব্বার সাথে তোমার দেখা হবে।’

মদীনায় ঘুরাফিরার সময় অনেক ইহুদী তাকে দেখে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ত। তারা তাদের কিতাব থেকে বিশ্বনবীর বর্ণনা পেয়েছিল। তারা চিনতে পারতো, এই শিশু বালকই হবেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

মদিনা থেকে ফেরার পথে আবওয়াবা নামক স্থানে শিশু নবী (সাঃ) এর মায়ের মৃত্যু হয়

মক্কা থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে অর্ধেক পথ এসে বিশ্বনবীর মাতা হযরত আমেনা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর অসুস্থতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি হলো। আরোগ্যের কোন লক্ষণ ছিল না। তারপর বিশ্বনবীর মমতাময়ী মা পিতৃহীন সন্তানকে মাতৃহীন করে মৃত্যু যবনিকার আড়ালে চলে গেলেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনা যেখানে ঘটেছিল, সে স্থানের নাম ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, ‘আবওয়া’। এই আবওয়া পল্লীতেই শিশু-নবী মা’কে চিরকালের জন্য হারালেন। এলাকার মানুষের সহযোগিতায় হযরত উম্মে আয়মান বিশ্বনবীর মা’কে কাফন-দাফন করেছিলেন।

আজ এই এক বিংশ শতাব্দীর ঊষা লগ্নে ঐ ঘটনার প্রায় দেড় হাজার বছর পরে আমরা আমাদের এই বাইরের চোখ দুটি ক্ষণিকের জন্য বন্ধ করে মনের চোখ দিয়ে একটু যদি ঐ হৃদয় বিদারক দৃশ্যের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, তাহলে কি দৃশ্য দেখতে পাবো?

মায়ের মৃত্যুতে চূড়ান্ত পর্যায়ের নিঃস্ব হলেন শিশু নবী মুহাম্মদ (সাঃ)

এমন একজন শিশু বালক, যিনি পৃথিবীতে আসার পূর্বেই পিতাকে হারিয়েছেন। তাঁর আব্বা ডাকের সাড়া দেবে এমন কেউ আর এই পৃথিবীতে নেই। গোটা পৃথিবী ব্যাপী আব্বা আব্বা বলে চিৎকার করলেও স্নেহ-দাতা আব্বা সন্তানের করুণ ডাকে সাড়া দেবেন না।

সেই অসহায় ইয়াতিম বালক তাঁর অসুস্থ মায়ের পাশে অশ্রু সজল চোখে মায়ের রোগাক্রান্ত মুখের দিকে করুণ দৃষ্টিতে নির্নিমেষে তাকিয়ে আছেন। অসহায়ভাবে দেখছেন, তাঁর জীবনের শেষ আশ্রয় কিভাবে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

গোটা পৃথিবীতে শান্তির একমাত্র স্থানটুকু নিষ্ঠুর মৃত্যু কিভাবে একটু একটু করে নিঃশেষে গ্রাস করে নিচ্ছে। নির্মম মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণকারী মমতাময়ী মা করুণ চোখে তাঁর অসহায় সন্তানের দিকে তাকিয়ে আছেন।

অসহায় সন্তানকে ছেড়ে যাচ্ছেন-তাকে যেতে হচ্ছে। কোন উপায় নেই, যেতে তাকে হবেই। কিন্তু সন্তানের কথা ভেবে তাঁর বুকের মাঝে যে যন্ত্রণার বরফ জমাট বেঁধেছিল, তা গলে তরল হবার পূর্বেই মৃত্যুর হীমশীতল থাবা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল।

বোবা যন্ত্রণা! শিশুর বুকে মাথা কুটে ফিরছে, তাঁরই চোখের সামনে মমতাময়ী মা-তাঁর জীবনের একমাত্র সম্বল কঠিন মাটির নিচে চাপা পড়লো। দৃষ্টির সামনে থেকে চিরকালের জন্য গর্ভধারিণী মা হারিয়ে গেল।

মা আর কোনদিন তাকে গভীর মমতায় বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে আদর করবে না। মধুর কণ্ঠে আব্বু বলে তাকে কাছে ডেকে তাঁর শিশু মুখে আর কোনদিন চুমোয় ভরিয়ে দেবে না।

মুরু যাত্রার নিদারুণ ব্যথা নিয়ে উম্মু আয়মনের সাথে শিশু নবী (সাঃ) মক্কায় ফিরলেন
নেই-কোথাও কেউ নেই এই নির্মম মরু প্রান্তরে শিশুকে সান্ত্বনা দেবার। একমাত্র সাথি আয়মান ছাড়া আর কেউ নেই। শিশু-নবীকে উটের পিঠে উঠিয়ে উম্মে আয়মান মক্কার দিকে যাত্রা করলেন।

শিশু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার পেছন ফিরে তাকায় মায়ের কবরের দিকে। যে কবরে অন্তিম শয়নে শায়িতা বিশ্বনবীর মা জননী আমেনা। আল্লাহর নবীর চোখ দিয়ে মর্মযন্ত্রণার অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।

উম্মে আয়মান আর সহ্য করতে পারলেন না। শিশুকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বললেন, আজ থেকে আমিই তোমার মা। সত্যই, উম্মে আয়মান প্রাণভরে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদর করতেন।

এ কারণে পরিণত বয়সে আল্লাহর নবী তাকে বলতেন, আপনি অমর গর্ভধারিণী মায়ের মতই। তাকে পরম শ্রদ্ধা করতেন তিনি। মদীনায় আল্লাহর নবীকে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর মা খেজুরের যে বাগান দান করেছিলেন সে বাগান তিনি হযরত উম্মে আয়মানকে দিয়ে দিয়েছিলেন। তারপরও তিনি তাকে প্রয়োজন মত সাহায্য করতেন।

আব্বা নেই, কোনদিন তিনি তাকে চোখের দেখাও দেখেননি। মা ছিলেন, আজ তিনিও নেই। দৃষ্টির সামনে দৃশ্যমান সমস্ত পৃথিবীটাই শিশুর কাছে আজ অন্ধকার হয়ে গেছে। নির্জন মরু প্রান্তরে মা’কে কবর দিয়ে এক বুক হাহাকার আর শূন্যতা নিয়েই শিশু-নবী মক্কায় ফিরে এলেন।

শিশুকালের মায়ের স্মৃতি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর মনে কষ্ট দিত

শিশুকালের সমস্ত ঘটনাই বিশ্বনবীর স্মরণে ছিল। তিনি যে সময়ে মদীনায় হিজরত করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর সাথে লোকজনকে মায়ের সাথে যখন মদীনায় এসেছিলেন তখনকার ঘটনা বলতেন। তাঁর আব্বার দাদীর পরিবার বনী আদী ইবনে নাজ্জারের অবস্থান দেখা মাত্র তিনি তা চিনতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,

‘এই সেই স্থান, যেখানে আমি একটা ছোট মেয়ের সাথে খেলা করেছিলাম। সে মেয়েটির নাম ছিল আনিসা। যে সব পাখি এখানে এসে বসতো আমি ছোট ছেলেদের সাথে সেসব পাখিদের উড়িয়ে দিতাম।’

আরেকটি স্থান দেখে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন,

‘এই সে স্থান যেখানে আমি আমার আম্মার সাথে নেমে ছিলাম। এই স্থানেই আমার আব্বার কবর হয়েছে। আমি ঐ সমস্ত ঝর্ণায় সাঁতার কাটার অভ্যাস করতাম।’

তাঁর মমতাময়ী মা’কে কোথায় কবর দেয়া হয়েছিল তা বিশ্বনবীর মনে ছিল। হোদায়বিয়ার সদ্ধির বছরে মায়ের কবরের পাশ দিয়ে আসার সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর চিনতে পেরে বলেছিলেন,

‘আল্লাহ মুহাম্মদকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দিন।’

এ কথা বলে তিনি তাঁর মায়ের কবর পরিষ্কার করে দিলেন। সে সময়ে তাঁর চোখ থেকে পানি ঝরছিল। তাঁর কান্না দেখে সাথিরাবৃন্দও কাঁদছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলো, আপনি আমাদেরকে কাঁদতে নিষেধ করেছেন কিন্তু আপনি নিজেই তো কাঁদলেন!

আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমার মায়ের স্মৃতি, আমাকে ইনি কি যে আদর-স্নেহ করতেন সে কথা মনে পড়ায় আমার কান্না এসে গেল।’ (তাবাকাতে ইবনে সাআদ)

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *