শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) বক্ষ বিদারণ তথা ওপেন হার্টের আলোচিত ঘটনা
বুকের দুধ ছাড়ানোর পরে হালিমা শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ফিoরিয়ে দিয়ে আসবেন, এ কথা মনে হলেই তাঁর বুকের ভেতরে একটা মর্মন্তুদ যন্ত্রণা আর হাহাকার জেগে উঠতো। তবুও যার সন্তান তাঁর কাছে ফেরৎ দিতেই হবে।
নবী-মাতা আমেনার কাছে তিনি তাঁর সন্তানকে ফেরৎ দিতে গেলেন। তারপর আবার তাকে নিয়ে এলেন। হযরত হালিমা বর্ণনা করেছেন, শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আমার সন্তান আব্দুল্লাহ আমাদের বাড়ির কাছেই ময়দানে পশু চরাচ্ছিল।
হঠাৎ আমার পুত্র আব্দুল্লাহ ছুটে এসে আমাদেরকে জানালো, সাদা কাপড় পরা দু’জন লোক এসে আমার সেই কুরাইশী ভাইকে ধরে চিরে শুইয়ে দিয়ে তাঁর পেট চিরে ফেলে পেটের ভেতর থেকে সমস্ত কিছু বের করে নাড়াচাড়া করছে।
এ কথা শোনার সাথে সাথে আমার স্বামী এবং আমি দু’জনেই ছুটে গেলাম। আমরা দেখলাম শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে আছে। তাকে আমরা বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইলাম, আব্বু তোমার কি হয়েছে?
শিশু আমাদেরকে জানালো, দু’জন লোক আমার কাছে এসেছিল। তাদের পরনে ছিল সাদা কাপড়। তারা আমার পেট চিরেছে। তারপর তারা আমার পেটের ভেতরে কি যে সন্ধান করলো তা আমি বলতে পারবো না। তারপর আমরা তাকে নিয়ে বাড়িতে এলাম।
শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) বক্ষ বিদারণের পরেই, নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে তাঁকে মায়ের কাছে ফেরত পাঠানো হয়
আমার স্বামী আমাকে বললো, আমার বিশ্বাস এই শিশুর ওপরে কোন কিছুর প্রভাব পড়েছে। শিশুর কোন ক্ষতি হতে পারে। কোন ক্ষতি হবার পূর্বেই চলো আমরা তাকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসি।
এই ঘটনার পরে আমরা তাকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। আমাদেরকে দেখে তাঁর মা বললো, তুমি তো আমার ছেলেকে তোমার কাছে রাখতে বেশী আগ্রহী ছিলে। এখন হঠাৎ করে নিয়ে এলে কেন ?
আমি তাঁর মা’কে জানালো, খোদা আমাকে দুটো সন্তানের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। আমি আমার সাধ্য মত সে দায়িত্ব পালন করেছি। কেন যেন আমার ভয় হচ্ছে ক্ষতিকর কিছু একটা ঘটবে। ফলে আমি ভীষণ দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম। কোন কিছু ঘটার পূর্বেই আমি আপনার ছেলেকে আপনার হাতে উঠিয়ে দিতে এসেছিলাম।
শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) মা বক্ষ বিদারণ সর্ম্পকে জানতে পারলেন
কিন্তু শিশুর মা আমাকে ছাড়লেন না। তিনি প্রকৃত ঘটনা বলার জন্য আমার ওপরে চাপ দিতে লাগলেন। বাধ্য হয়ে আমি তাকে সমস্ত ঘটনা জানলাম। ঘটনা শুনে শিশুর মা আমাকে বললো, তুমি কি মনে করো আমার সন্তানের ওপরে কোন অশুভ শক্তির প্রভাব পড়েছে ?
আমি জানলাম, আমার সে ধরণেরই একটা কিছু মনে হচ্ছে। শিশুর মা আমাকে বললো, এই সন্তান যখন আমার পেটে ছিল তখন আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, আমার শরীর থেকে একটা আলো বের হয়ে চারিদিকে আলোকিত করে তুললো।
এমন কি সেই আলোয় সিরিয়া এলাকার বসরার সুউচ্চ অট্টালিকা সমূহ স্পষ্ট দেখা গেল। সে ক্রমশঃ আমার গর্ভে বৃদ্ধি পেতে থাকলো। খোদার শপথ! এত আরামদায়ক গর্ভধারণ আমি আর কারো দেখিনি।
আমি যখন তাকে প্রসব করলাম তখন তাঁর হাত ছিল মাটিতে এবং আকাশের দিকে উঁচু ছিল মাথা। তুমি তাকে আমার কাছে রেখে নিঃশঙ্ক চিত্তে যেতে পারো।
বক্ষ বিদারণ সর্ম্পকে স্বয়ং মুহাম্মদ (সাঃ) পরবর্তীতে কি বলেছিলেন
সীরাতে ইবনে হিশামে বর্ণনা করা হয়েছে, কয়েকজন সাহাবী একদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল ! আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন !’
‘বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ, শোন। আমি পিতা ইবরাহীমের দোয়ার ফসল এবং ভাই ঈসার সুসংবাদের অনিবার্য পরিণতি। আমি যখন আমার মায়ের গর্ভে ছিলাম সে সময় আমার মা স্বপ্নে দেখেছিল, তাঁর ভেতর থেকে একটা আলো বের হয়ে বিস্তৃত হলো এবং সে আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে গেল।
আমি বনী সাদ ইবনে বকর গোত্রে ধাত্রীর কোলে প্রতিপালিত হয়েছি। এই সময়ে আমার দুধভাইয়ের সাথে আমি বাড়ির পেছনে পশু চরাতে ছিলাম। তারপর সাদা কাপড় পরিহিত দু’জন লোক আমার কাছে এসেছিল।’
আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবাদের আরো জানালেন,
‘তাদের কাছে একটা স্বর্ণ নির্মিত পাত্রে বরফ ছিল। তারা আমাকে ধরে আমার পেট চিরে ফেললো। তারপর আমার হৃৎপিণ্ড বের করে তা চিরে ফেললো। সে হৃৎপিণ্ড থেকে কিছু জমাট বাঁধা কালো রক্ত বের করে ফেলে দিল। তারপর ঐ বরফ মিশ্রিত পানি দিয়ে আমার হৃৎপিণ্ড এবং আমার পেটের ভেতর ধুয়ে পরিষ্কার করে দিল।
তারপর তাদের একজন আরেকজনকে বললো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর উম্মতের দশজনের সাথে পরিমাপ দাও। একজন সেভাবেই আমাকে আমার উম্মতের সাথে পরিমাপ দিল। আমি ঐ দশজনের চেয়ে বেশী হলাম। তারপর আমাকে একশত জনের সাথে ওজন করা হয়, আমি তাদের চেয়ে ওজনে বেশী হলাম। তারপর আমাকে এক হাজার জনের সাথে ওজন দেয়া হলো, আমি এক হাজার জনের চেয়েও পরিমাণে বেশী হলাম। তখন সে তাঁর সাথিকে বললো, আল্লাহর শপথ ! তাকে সমস্ত উম্মতের সাথে পরিমাপ করলেও সবার চেয়ে সে পরিমাণে বেশী হবে।’
ইউরোপীয় হিংসুক লেখকেরা বক্ষ বিরারণকে অলীক কল্পনা ও মুহাম্মদ (সাঃ) কে মৃগীতে আক্রান্ত বলত
বর্তমানে জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নয়নে ইউরোপীয় লেখকদের এ সম্পর্কিত হিংসাত্মক লেখা পাঠ করলে একটি কথা প্রতিভাত হয়ে ওঠে। তারা বিশ্বনবীকে একজন মৃগী-রোগী হিসাবে মানুষের কাছে পরিচিত করতে আগ্রহী। এটা তাদের সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতিফলন।
এই বিষয়টা অনেকে নানা কৌশলে জটিল করে সাধারণ মানুষের কাছে পেশ করেছেন। আবার কেউ এই ঘটনাকে অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করে অত্যন্ত হালকা ভাবে দেখেন। বিষয়টা মহান আল্লাহর অসংখ্য কুদরতের মধ্যে একটি। সুতরাং এটা বিশ্বাসের কোন কারণ নেই।
বর্তমানে এই মানুষ এমন কাজ করছে যা অর্ধ শতাব্দী পূর্বেও ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনাতীত। ব্রেন অপারেশন, হার্ট অপারেশন, চোখে কর্নিয়া সংযোজন, পেস মেকার সংযোজন এ সব তো মাত্র কিছুদিন পূর্বে কল্পনাও করা যেত না।
বক্ষ বিরারণ অলীক কল্পনা নয় বর্তমানে বাস্তব ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহার হচ্ছে
বর্তমানে এসব জটিল অপারেশনের ব্যাপার যদি বাস্তব এবং বিশ্বাস্য হয়ে থাকে তাহলে বিশ্বনবীর বক্ষ বিদারণের ঘটনা কেন বাস্তব এবং বিশ্বাস্য হবে না ? যে আল্লাহ মানুষকে এই জটিল অপারেশনের জ্ঞানদান করেছেন, টেস্ট টিউবে সন্তান জন্মদানের জ্ঞানদান করেছেন, সেই আল্লাহই তো তাঁর ফেরেশতাদের মাধ্যমে বিশ্বনবীর বক্ষ বিদারণের ঘটনা ঘটিয়ে ছিলেন।
মানব জাতিকে শিক্ষা দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ যাদেরকে প্রেরণ করেছিলেন, তাদের সাথে আল্লাহ এমন অনেক ধরনের ব্যবহার করেছেন, যা কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে কারো সামনে পরিবেশন করা যায় না। কিন্তু তাই বলে তা অস্বীকারও করা যায় না।
আরেকজন নবীকে কিছু দিন মাছের পেটে অবস্থান করতে হয়েছিল। তিনি মাছের পেটের ভেতরে জীবিত ছিলেন কি করে ? এ প্রশ্ন আজ অবান্তর। কেননা, সাগর এবং সাগরের প্রাণী নিয়ে যারা গবেষণায়ে আছেন, তাদের অনেকেই সাগরের বিশাল প্রাণীর পেটে গিয়ে হজম হয়ে গেছেন এবং অনেককে ঐ প্রাণী জীবিত উদগীরণ করে দিয়েছে। সহযোগীরা ঐ প্রাণীকে ধরে তার পেট চিরে অনেকেই জীবিত উদ্ধার করেছে।
সুতরাং বিশ্বনবীর বুকে কিভাবে অপারেশন করা হয়েছিল, তা বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে ব্যাখ্যা করে পরিবেশনের প্রয়োজন নেই। তবে যারা আজ এই সমস্ত অপারেশনের কাজে দক্ষতা অর্জন করেছেন, তারা যে বিশ্বনবীর বক্ষ বিদারণের ঘটনা থেকে একটা নতুন ধারণায় উপনীত হয়েছেন, এতে কোন সন্দেহ নেই।
👈পূর্বের পোষ্ট |
𝕋 |
পরের পোষ্ট 👉 |