বৃদ্ধ দাদা আবদুল মুত্তালিব শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) এর অভিভাবক হলেন
মাকে হারিয়ে দাসী উম্মে আয়মনের হাত ধরে নিঃস্ব শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) ভগ্ন মনোরথে, ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ফিরে এলেন মক্কায়। নির্ভরযোগ্য অভিভাবক বলতে বৃদ্ধ দাদা আবদুল মুত্তালিব। দাদা আবুদল মুত্তালিব আগে থেকেই নাতিকে অসম্ভব ভালবাসতেন।
যে মুহূর্তে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একা ফিরে এসেছিলেন, সে মুহূর্তে আব্দুল মুত্তালিবের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল, তা ঐ আল্লাহই জানেন। তিনি পরম আদরে তাঁর ইয়াতিম নাতিকে কোলে উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
আদরের আব্দুল্লাহ নেই, ছিল আব্দুল্লাহ স্ত্রী, আমেনা। আজ সেও নেই। রইলো শুধু তাদের স্মৃতি এই শিশু। দাদা তাকে চোখের আড়াল করতেন না। নাতির ভেতরে দাদা এমন কিছু দেখেছিল, ফলে দাদার কাছে দাদা আর নাতির বয়সের ব্যবধান ছিল না। দাদা তাঁর নাতিকেই পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।
গোত্রপতি আব্দুল মুত্তালিবের জন্য কাবা ঘরের ছায়ায় একটা কম্বলের আসন ছিল। সে আসনে বসার অধিকার ছিল একমাত্র আব্দুল মুত্তালিবের। স্বয়ং আব্দুল মুত্তালিবের কোন সন্তানও সে আসনে বসতো না।
আবদুল মুত্তালিব শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) কে সম্মান পাইয়ে দিতেন
আব্দুল মুত্তালিব সে আসনে বসে তাঁর কাছে আগত অতিথিদের সাথে কথা বলতো। একদিন সে আসন বিছানো ছিল। আসনের চারদিকে আগত অতিথি বসে আব্দুল মুত্তালিবের জন্য অপেক্ষা করছিল। এমন
সময় শিশু-নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে সে আসনের ওপরে বসে পড়লেন। আগত অতিথিবৃন্দ চমকে উঠলো। দ্রুত আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানগণ শিশু-নবীকে উঠিয়ে দিতে গেল সে আসন থেকে।
আব্দুল মুত্তালিব কা’বার দিকেই আসছিলেন। বিষয়টা তাঁর চোখে পড়তেই সে ব্যগ্র কণ্ঠে বললো, ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উঠানোর প্রয়োজন নেই, তাকে বাধা দিও না।
খোদার শপথ! সে এক অসাধারণ সন্তান। তাঁর মর্যাদাই ভিন্ন ধরণের। আমি আশা করি, সে এমন সম্মান ও মর্যাদাবান হবে, যা ইতিপূর্বে কোন আরব হয়নি। আমার বাচার মেজাজ বড় রাজকীয়, তাকে থাকতে দাও।’
দাদা শিশু-নবীকে কাছে টেনে নিত। নবীর মাথায় পিঠে হাত দিয়ে আদর করতো। প্রিয় নাতির মুখে চুমো দিত। শিশু নবীর হাঁটা উঠা বাসা তাকানো, কথা বলা তথা সমস্ত কিছুই ছিল ভিন্ন ধরণের। শিশু নবীর যে কোন আচরণই আব্দুল মুত্তালিবকে মুগ্ধ করতো। সে তাঁর নাতির দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো।
আব্দুল মুত্তালিব অন্য কারো সাথে আলাপ আলোচনা করার সময় শিশু-নবীর প্রশংসায় সে পঞ্চমুখ থাকতো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামটা যেন তাঁর মুখে লেগেই থাকতো। মায়ের অভাব বাপের অভাব সে তাঁর নাতিকে বুঝতে দিত না।
সে সময়ে একজন লোক কোন মানুষের মুখমণ্ডল এবং শারীরিক গঠন দেখে তার ভাগ্য বলে দিতে পারতো। সে লোক শিশু-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখে আব্দুল মুত্তালিবকে বলেছিল,
‘এই শিশুকে অতি সাবধানে রাখবে। কারণ মাকামে ইবরাহীমে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম -এর পায়ের যে চিহ্ন রয়েছে, আমি এই শিশুর পায়ের সাথে ইবরাহীমের পায়ের চিহ্নের হুবহু মিল পাচ্ছি। এই শিশুর মত পা আমি আর কারো দেখিনি।’
সে সময়ে বিশ্বনবীর চাচা আবু তালিব কাছে ছিল। আব্দুল মুত্তালিব তাকে বললো,
‘তুমি তো শুনলে এরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি বললো। সুতরাং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখে রাখবে।’
চরম দুর্ভাগ্য! অবশেষে দাদা আবদুল মুত্তালিব ও ইন্তেকাল করলেন!
কিন্তু বিধাতার নির্মম নিষ্ঠুর পরিহাস! শিশু-নবীর ভাগ্যে দাদার এই আদরের স্নেহও বেশি দিন সহ্য হলো না। প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলে মহাসাগরের ঊর্মিমালা যেমন একটার পরে আরেকটা এসে আছড়ে পড়ে, তেমনি বিশ্বনবীর জীবনে মর্মন্তুদ যন্ত্রণার তরঙ্গ একটার পরে আরেকটা আছড়ে পড়ছিল।
হঠাৎ দাদা মুত্তালিব গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লো। তারপর এক সময় সবশেষ হয়ে গেল। পরম স্নেহ-দাতা দাদা পরপারে যাত্রা করলো। বিশ্বনবীর বুকের ভেতরটা আরেকবার শূন্য হয়ে গেল।
সীরাতে ইবনে হিশামের বর্ণনানুযায়ী আব্দুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করেছিল হস্তী বাহিনীর আক্রমণের আট বছর পরে। সে সময়ে বিশ্বনবীর বয়সও ছিল মাত্র আট বছর। পিতাকে তিনি চোখেই দেখলেন না। তারপর মমতাময়ী মা তাকে একা ফেলে চলে গেলেন।
মা’কে হারানোর যন্ত্রণার যে ক্ষত বিশ্বনবীর বুকের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছিল, সে ক্ষত থেকে তখন পর্যন্ত রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হয়নি। এই চরম অবস্থার ভেতরে তাঁর বুকে আরেকটা ক্ষত সৃষ্টি হলো। প্রিয় দাদাও তাকে ছেড়ে চলে গেল।
হযরত উম্মে আয়মান বলেছেন, যে সময়ে দাদা মুত্তালিব এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সে সময়ে শিশু-নবী দাদার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল আর তাঁর চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি ঝরছিল। তাঁর জানাজার সাথে শিশু-নবীর কান্না-ভেজা চোখে ছেয়ে গিয়েছিল। তাকে কবর দেয়া হয়েছিল মক্কার জিদুন নামক এলাকায়।
পরিণত বয়সে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনার দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ইন্তেকালের ঘটনা কি আপনার স্মরণে আছে?’
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ‘মনে আছে। সে সময়ে আমার বয়স হয়েছিল আট বছর।’
শিশুকালের সমস্ত ঘটনাই বুঝি বিশ্বনবীর স্মরণে ছিল। তিনি যে সময়ে মদীনায় হিজরত করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর সাথে লোকজনকে মায়ের সাথে যখন মদীনায় এসেছিলেন তখনকার ঘটনা বলতেন। তাঁর আব্বার দাদীর পরিবার বনী আদী ইবনে নাজ্জারের অবস্থান দেখা মাত্র তিনি তা চিনতে পেরেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘এই সেই স্থান, যেখানে আমি একটা ছোট মেয়ের সাথে খেলা করেছিলাম। সে মেয়েটির নাম ছিল আনিসা। যে সব পাখি এখানে এসে বসতো আমি ছোট ছেলেদের সাথে সেসব পাখিদের উড়িয়ে দিতাম।’
আরেকটি স্থান দেখে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ‘এই সে স্থান যেখানে আমি আমার আম্মার সাথে নেমে ছিলাম। এই স্থানেই আমার আব্বার কবর হয়েছে। আমি ঐ সমস্ত ঝর্ণায় সাঁতার কাটার অভ্যাস করতাম।’
তাঁর মমতাময়ী মা’কে কোথায় কবর দেয়া হয়েছিল তা বিশ্বনবীর মনে ছিল। হোদায়বিয়ার সন্ধির বছরে মায়ের কবরের পাশ দিয়ে আসার সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর চিনতে পেরে বলেছিলেন,
‘আল্লাহ মুহাম্মদকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দিন।’
এ কথা বলে তিনি তাঁর মায়ের কবর পরিষ্কার করে দিলেন। সে সময়ে তাঁর চোখ থেকে পানি ঝরছিল। তাঁর কান্না দেখে সাথীবৃন্দও কাঁদছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলো, ‘আপনি আমাদেরকে কাঁদতে নিষেধ করেছেন কিন্তু আপনি নিজেই তো কাঁদলেন।’
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমার মায়ের স্মৃতি আমাকে কাঁদাচ্ছে! আমাকে তিনি কি যে আদর করতেন, সে কথা মনে পড়ায় আমার কান্না এসে গিয়েছে!” (তাবাকাতে ইবনে সাআদ)
আব্দুল মুত্তালিব প্রায় ৮২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছিল। তাঁর এক স্ত্রীর গর্ভের সন্তান ছিল আবু তালিব এবং বিশ্বনবীর পিতা আব্দুল্লাহ। এ কারণে মৃত্যুর পূর্বে আবু তালিবের কাছেই শিশু-নবীকে রেখে যান।
কেউ বলেছেন পিতার নির্দেশ অনুসারে আবু তালিব শিশু-নবীর দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেন আবার কেউ বলেন, তিনি নিজেই তাঁর ভাইয়ের সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আবু তালিব আসলে তাঁর আসল নাম নয়, তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আবদে মান্নাফ! আবু তালিব অর্থ তালিবের বাবা। তালিব তার বড় ছেলে এবং তালিব আর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র কিছু দিনের ছোট বড় ছিলেন।
কিন্তু আবু তালিব নামটা এমনভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলো যে, তাঁর প্রকৃত নাম আবদে মান্নাফ চিরতরে হারিয়ে গেল। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধের সময় ইসলামের শত্রুগন তালিবকে জোর করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে গেছিল।
তালিব মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদরের যুদ্ধে যোগদান করেন নি। যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছিল, তাদের মধ্যেও তালেবকে পাওয়া যায়নি। তিনি বাড়িতেও ফিরে আসেননি আবার মদীনায় চাচাত ভাই নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছেও যাননি। পরে তাঁর কোন সন্ধানই পাওয়া যায়নি। ইতিহাস তাঁর সম্পর্কে নীরব।
আব্দুল মুত্তালিবের ইন্তেকালে বনী হাশিমে মারাত্মক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। সে শূন্যতা পূরণ সহজ ছিল না। গোটা মক্কার নেতৃত্বেই একটা বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। বনী হাশিমের সম্মান এবং মর্যাদা বেশ কিছুটা হোঁচট খেয়েছিল।
তাদের হাতে যে শাসন ক্ষমতা ছিল তা গিয়ে পড়ে বনী উমাইয়াদের হাতে। কেননা, মুত্তালিবের মত নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের অধিকারী তাঁর কোন সন্তানই ছিল না।
তাঁর মৃত্যুর পরে মক্কার নেতৃত্ব পড়েছিল বনী উমাইয়াদের হরবের হাতে। এই হরব ছিল আবু উমাইয়ার সন্তান। তাঁর ভেতরে নেতৃত্বের গুণাবলী ছিল। হাশিম পরিবারের হাতে থেকে সমস্ত কর্তৃত্বই প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল।
শুধুমাত্র হাজীদেরকে পানি পান করানোর কর্তৃত্ব ছিল হাশিম পরিবারের মুত্তালিবের সন্তান আব্বাসের হাতে। আর আব্বাসই ছিল মুত্তালিবের সবচেয়ে ছোট সন্তান।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |