আবু-তালিবের তত্ত্বাবধানে বিশ্বনবী (সাঃ)

চাচা আবু-তালিবের তত্ত্ববধানে বিশ্বনবী (সাঃ)

আবু-তালিবের সম্যক পরিচয়

আবু তালিবের ছিল বিরাট পরিবার। পিতা আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পরে কোরাইশদের বয়োজ্যষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। আবু-তালিব ও মুহাম্মদ (সাঃ) এর বাবা আবদুল্লাহ ছিলেন একই মায়ের সন্তান। সে হিসেবে আবু তালিব মুহাম্মদ (সাঃ) এর আপন চাচা। আবু-তালিবকে সবাই ইজ্জত সম্মান করত, মান্য করত। আবদুল মুত্তালিবের যে কয়জন সন্তান তখনও বেঁচে ছিলেন, তার মধ্যে আবু-তালিব ছিলেন সরচেয়ে গ্রহনযোগ্য সম্মানী ব্যক্তি। কিন্তু তিনি আর্থিকভাবে ছিলেন কিছুটা অসচ্চল তার উপরে, তার পরিবারে ছিল অনেকগুলো খাওয়ার মানুষ।

এমন অবস্থায় আদরনীয় ভাইপো কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) এর দায়িত্ব পড়ে চাচা আবু-তালিবের উপর। তাছাড়া আবদুল মুত্তালিব এই শিশুটিকে দেখার জন্যে আবু-তালিবকেই বেশী তাগাগা দিয়েছেন। আবু-তালিব নিজের অসচ্চলতা থাকা সত্ত্বেও ভাইয়ের এতিম পুত্রকে খুব আদর করতেন এমনকি তার স্ত্রী ‘ফাতিমা বিনতে আসাদ’ কিশোর নবী (সাঃ) সদা অগ্রাধিকার দিতেন। তার ছেলেরা হুলুস্তুল করে খাবার খেয়ে নিত, কিশোর মুহাম্মদ এসব তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে দেখত! সেটা দেখে চাচী কিশোর মুহাম্মদ যাতে খাদ্য থেকে বঞ্চিত না হন, সে ব্যবস্থা নিতেন।

আবু-তালিব বিষয়ে ইউরোপীয় লেখকগনের নেতিবাচক ধারণা

ইউরোপের ইসলাম বিদ্বেষী লেখকগণ বিশ্বনবীর জীবনি এমনভাবে কলমের আঁচড়ে কাগজের বুকে চিত্রায়িত করেছেন, যা পাঠ করলে তাদের প্রতি করুণাই হয়। চোখে হিংসার প্রলেপ দিয়ে তারা বিশ্বনবী সম্পর্কে কলম ধরেছিল এর প্রমাণ পাওয়া যায় ঘটনার একপেশে বর্ণনার ক্ষেত্রে।

আবু-তালিবের তত্ত্বাবধানে যখন শিশুনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন, সে সময়ে চাচা আবু-তালিব তাকে এতই নির্যাতন এবং ঘৃণা করতেন যে, ছোট ঐ শিশুটিকে দিয়ে তিনি ছাগলের রাখালি করাতেন এবং বাড়ির কাজ করাতেন।

এই ধরণের হাস্যকর এবং কুরূচি পূর্ণ লেখায় পরিপূর্ণ তাদের রচিত ইতিহাস নামক জঞ্জাল গুলো। সে যুগে ছাগল চরানো কোন অসম্মানজনক কাজ ছিল না, এদিকটা তারা তলিয়ে দেখেননি।

তদানীন্তন আরব সমাজের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ঐশ্বর্যশালী এবং প্রতিপত্তিশালী ঘরের সন্তানগণ পশুপাল চরাতো, সব দিক তাদের চোখে পড়েনি। তাছাড়া প্রায় সমস্ত নবীকেই ছাগল চরাতে হয়েছে, এ সম্পর্কে ঐ সমস্ত লেখকগণ কোন গবেষণা হয়তোঃ করেননি বা করে থাকলেও তারা বিদ্বেষের কারণে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করেননি।

চাচা আবু-তালিবের সাথে থাকার সময় কিশোর নবী (সাঃ) মাঠে ছাগল চড়িয়েছেন

সাধারণ একটা দিক চিন্তা করলেই দেখা যায়, ছাগল হলো এমন একটা অবাধ্য জানোয়ার, যাকে ডান দিকে যেতে বললে যায় বাম দিকে। এই ছাগল তার রাখালের আদেশ মানতে অবাধ্যতা প্রদর্শন করে।

ফলে ছাগলের রাখালি করা চরম ধৈর্যের ব্যাপার। যার ভেতরে ধৈর্য নামক মহৎ গুণাবলী অনুপস্থিত, তার পক্ষে ছাগলের রাখালি করা প্রায় অসম্ভব। নবীদের জন্য এই ছাগলের রাখালি করার মধ্যে ছিল ধৈর্য অর্জনের প্রশিক্ষণ মাধ্যম।

ছাগলের থেকেও এমন কি পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর চেয়েও মানুষ হলো সবচেয়ে বেশি অবাধ্য। এই অবাধ্য মানুষদের ওপরে নবীদেরকে নেতৃত্ব দিতে হবে, এ কারণেও তাদেরকে বয়সের একটা বিশেষ পর্যায়ে মহান আল্লাহ ছাগল চরানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

কিশোর বয়সে তাদের মধ্যে ধৈর্য নামক যে মহৎ গুণাবলী সৃষ্টি হবে, পরবর্তীতে তা অবাধ্য মানুষের ওপরে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় প্রয়োগ করবেন। হযরত মূছা আলাইহিস সালাম এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম -এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

হাদিস শরীফে দেখা যায়, ‘আল্লাহর নবী বলেছেন, এমন কোন নবী ছিল না যিনি ছাগল চরাননি। আমিও ছাগল চরিয়েছি।’

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশু বয়সে তাঁর দুধমাতা হালিমার কাছে থাকতেও ছাগল চরিয়ছেন। এটা নবীর অপরের মুখাপেক্ষী না হবারই মানসিকতা।

তিনি যেন এক আল্লাহর মুখাপেক্ষী হন, এ কারণেই মহান আল্লাহ তাঁর কাছ থেকে তাঁর আপনজনদের টেনে নিয়েছেন। তাঁর চাচার আর্থিক অবস্থা তেমন একটা ভালো ছিল না। তাছাড়া আবু-তালিবের পরিবারও ছিল বেশ বড়।

এতবড় একটা অস্বচ্ছল পরিবারে অপরের মুখাপেক্ষী হয়ে আল্লাহর নবী থাকবেন, এটা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী। এ সমস্ত কারণ সামনে রেখে চিন্তা করলে বোঝা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচাকে সাহায্য করার জন্য বা নিজে কিছু উপার্জনের জন্য ছাগল চরাতেন। কিশোর বয়সে তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কায় ছাগল চরিয়ছেন।

কিশোর নবী (সাঃ) চাচা আবু-তালিবের সাথে থাকার সময় অর্থের বিনিময়ে কাজ করেছেন

ইবনে মাজাহ্ শরীফে উল্লেখ রয়েছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং বলেছেন, ‘আমি কিছু কারারিতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরিয়ছি।’ আরবী কিরাত শব্দের বহুবচন হলো কারারিত। এক দিনারের বিশ অথবা দশভাগের একভাগকে কিরাত বলে।

ইবনে সাআদ বর্ণনা করেছেন, কোন একবার সাহাবাদের সাথে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিলু নামক গাছের ঘন বৃক্ষের নিচে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি সেসব গাছের ফলগুলো দেখে বলেছিলেন, যে সমস্ত ফলগুলো কালো হয়ে গেছে, সেগুলো ছিড়ে নাও। আমি যখন ছাগল চরাতাম তখন এ সমস্ত ফল ছিড়তাম।

বিশ্বনবী কারারিতের বিনিময়ে ছাগল চরিয়ছেন, এ কথাটা উল্লেখ করতে কিছু ইসলাম প্রিয় ঐতিহাসিক বিব্রত বোধ করেছেন বলেই মনে হয়। কেননা, তারা কারারিত শব্দের অর্থ করেছেন, এটা কোন একস্থানের নাম। ঐ স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাগল চরিয়ছেন।

অথচ বিখ্যাত ভূগোলবিদগণ বলেছেন, তারা গোটা আরবে ঐ নামে কোন জায়গার অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। এ কারণে বিখ্যাত মনীষীগণ বলেছেন, পারিশ্রমিক নিয়ে ছাগল চরানো এমন কোন লজ্জা বা দোয়ের বিষয় নয় যে, তা থেকে বিশ্বনবীকে মুক্ত করার জন্য কারারিত শব্দের মাধ্যমে একটা স্থানের আবিষ্কার করতে হবে।

চাচা আবু-তালিব শিশুনবীকে নির্যাতন করতেন এবং তাকে ঘৃণা করতেন-ইউরোপীয় লেখকদের এ সমস্ত ভিত্তিহীন কথার জবাবে ইতিহাস পরিপূর্ণ। তাদের কথার জবাব দেয়ার জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করলেই যথেষ্ট।

কিশোর নবী (সাঃ) চাচা আবু-তালিবের ছিল বিরাট পরিবার ঘরে খাওয়ার মানুষ ছিল বেশী

আবু-তালিব তাঁর ভাতিজাকে নিজের সন্তানের চেয়েও যে বেশী ভালোবাসতেন, এ কথা ঐ ইউরোপীয় লেখকদের লেখা থেকেই প্রকাশ পায়। তারাই উল্লেখ করেছেন, আবু-তালিবের পরিবারে আহার পর্ব শুরু হতো না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত না থাকলে।

প্রকৃত ঘটনা হলো, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছেড়ে তারা আহার করলে তাদের কারো পেট ভরতো না। খাদ্য কম পড়তো। তাছাড়া, খাদ্য সামনে এলে আবু-তালিবের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানগণ খাদ্যপাত্রে হাতে দিয়ে কে কার আগে খাবে এমন প্রতিযোগিতা শুরু।

করতো। আবু-তালিব দেখতেন শিশু মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভেতরে এই অভ্যাস নেই। ‘সে হাত গুটিয়ে বসে তাঁর চাচাত ভাই-বোনদের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা অবাক চোখে দেখছে।’

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একত্রে সাথে নিয়ে আহার করলে সবার পেট ভরে যেত এবং খাদ্য উদ্ধৃত্ত হতো। শিশুনবী আস্তে দেরি হলে আবু-তালিব কাউকে আহার শুরু করতে দিতেন না। কেউ খেতে চাইলে তিনি বলতেন, ‘একটু অপেক্ষা করো, আমার আব্বুকে আসতে দাও।’

তিনি এলে তাঁর পবিত্র মুখের দিকে তাকিয়ে চাচা আবু-তালিব মধুর কণ্ঠে বলতেন, ‘আব্বু, তুমি বিরাট কল্যাণের অধিকারী। খোদার শপথ! নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা আমার এই আব্বুরই আছে।’

তাঁর নিজের সন্তানগণ আহারের সময় শৃঙ্খলা মেনে চলতো না, শিশুনবী হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন দেখে তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর নিজের জন্য মাদুর বিছিয়ে পৃথকভাবে আহারের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই উত্তম ব্যবস্থা তাঁর নিজের ঔরসজাত সন্তানদের জন্যও তিনি করেননি।

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *