পীতাম্বর শাহের সাথে যাদু মন্ত্রের কারবারীদের সাথে যত সখ্যতা
পীতাম্বর শাহ! নিশ্চয়ই এই নাম ভুলে যান নাই। আমি জানিনা এই ব্যক্তি কে ছিলেন এবং এই নামের অর্থই বা কি? চট্টগ্রাম শহরে সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই তিনি এবং তার বংশধর একচেটিয়া ব্যবসা করে চলছেন।
তাদের পৈত্রিক বাড়ী ভারতে। ট্রাকে ট্রাকে ভারত থেকে মালামাল আসে আর এসব দেদার বিক্রি হয়। হেন জিনিষ নাই, যা এই দোকানে পাওয়া যায় না।
মন্ত্রের সমুদয় উপকরণ পীতাম্বর শাহের দোকানে আছে
শোধন করা পারদ, লোহা জারণ, রূপা জারণ, মৃগ নাভি, কস্তূরী, রাজা-রাণী লতার গোটা, মনামনী লতার বোঁটা, রাজমোহিনী দানা, বাঘের দুধের ছানা, উলট কম্বলের মূল, শতমূলীর শিকড়, যৈত্রিকের ছাল, দেবদারুর শাঁস, সোনা তোলার পাতা, রূপা তোলার কাণ্ড, চিতায় পোড়ানো বাঁশ, অমাবস্যায় মৃতের কাফনের কাপড়, জন্মান্ধের লাটি, শ্মশানের ঘটি, বারবনিতার ঘরের মাটি, ঘটি চালান দেবার বাটি ইত্যাদি।
এসব উপাদান সত্যাসত্য যাচাইয়ের সুযোগ নাই, কেউ যাচাই করেও না। যার দরকার শতভাগ বিশ্বাসের সহিত দরদাম ব্যতীত সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।
এছাড়াও তাবিজ, যাদু, টোনা, মন্ত্রের জন্য ব্যবহৃত সকল প্রকার উপাদান তাদের কাছে রক্ষিত আছে। আমি এই দোকানের সন্ধান পেয়ে পুলকিত হলাম এবং তাদের বিরাটকায় দোকানটির জিনিষ পত্র দীর্ঘক্ষণ ধরে ঘুরে দেখার সুযোগ হল।
দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অবলোকন করলাম কত বিচিত্র ধরনের কাষ্টমার তাদের দোকানে আসা যাওয়া করছে!
যাদু মন্ত্রের বইগুলো মন দিয়ে পড়ার সুযোগ হল
যাই হোক বাড়ীতে এনে বইগুলো সব যথারীতি পড়া হল। কেউ সন্দেহ করেনি কেননা আমার এমনিতেই বই পড়ার বাতিক ছিল। সন্তান হবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন বইতে অনেক গুলো তাবিজের নকশা আঁকা আছে এবং ব্যবহার বিধি ও নিয়ম পদ্ধতি বলা আছে।
কৌতূহল বেড়ে গেল। এই প্রবন্ধ লিখার শুরুতেই বলেছি, বিভিন্ন বৈদ্যের কিছু পুরানো বই আমার সংগ্রহে আগে থেকেই চলে এসেছিল। সে গুলো যখন পড়েছিলাম, তখন মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝিনি।
কেননা সেসব বইয়ে এমন কিছু জিনিষের নাম লিখা ছিল যার সাথে আমার কোন পরিচয় ছিলনা।
পীতাম্বর শাহের দোকান পরিদর্শনের পর আমার কাছে দিনের মত পরিষ্কার হয়ে গেল যে, এই বইয়ে যত উপাদানের কথা বলা হয়েছে তার বেশ কিছু সেই দোকানে দেখেছি, সুতরাং বাকীগুলোও সেখানে পাওয়া যাবে।
বাজারের তাবিজের বই আর মন্ত্রের বই দুটোই আলাদা শাস্ত্র
বাজারের তাবিজের বইয়ে, মানুষের ক্ষতি করা যায় এমন তাবিজের উল্লেখ নাই। তবে সংগৃহীত এসব বইয়ে মানুষের খারাপ কিছু ঘটানোর ব্যাপারেও বহু তাবিজ, কবজ, মন্ত্র, যাদুর নকশা ও উপাদানের বর্ণনা আছে।
খারাপ কাজের জন্য বিখ্যাত শাস্ত্রের নাম ‘রাজমোহিনী বিদ্যা’। এখানে তাবিজ গুলো বার্মা ও পার্লি ভাষায় অঙ্কিত যার অর্থ বোধগম্য নয়। তবে বৈদ্যরা নিজে বুঝার জন্য হাতের কলমে বাংলায় কিছু ব্যাখা ও বর্ণনা লিখেছেন।
এতটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল। সব বই গুলো একে একে প্রয়োজনীয় চুম্বক অংশ গিলে ফেলতে লাগলাম।
মন্ত্র ও মন্ত্রের কার্যকারিতার উপর লিখিত বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যগুলো পড়ে নিলাম। কাউকে বাণ মারা, কারো মেয়ের বিয়েটা বন্ধ করে দেওয়া, কাউকে অসুস্থ করে রাখা, সবগুলো এইধরনের বর্ণনাতে ভরপুর।
বিভিন্ন ধরনের চালানের মন্ত্র আছে, বাটি চালান, লাটি চালান, আতশি চালান ইত্যাদি। চোরাই জিনিষ উদ্ধার করতে বাটি চালান, চোর ধরতে লাটি চালান, কে কোথায় হারিয়ে গেছে তা জানতে আতশি চালান বা জিন হাজিরা ইত্যাদি।
রাজমোহিনী তন্ত্র-মন্ত্রের বিদ্যাও সমাজে বেশ আলোচিত
রাজমোহিনী বিদ্যায় কারো ক্ষতি কিংবা কাউকে আকর্ষণ কিংবা কোন মেয়েকে বশীকরণ করাতে চাইলে, সেই ব্যক্তির চুল, নখ, ব্যবহৃত কাপড়ের সুতা ইত্যাদি প্রয়োজন হয়। সেটাও না হলে, তার চলার সময় যেখানে পা পড়েছে, সেই পায়ের ছাপের ধুলো হলেও সংগ্রহ করতে হবে।
ভারতীয় উপমহাদে হল তান্ত্রিকদের স্বর্গরাজ্য। একজন সঠিক তান্ত্রিক সৃষ্টি হলে, তার সাথে কমপক্ষে বিশ জন ভণ্ড তান্ত্রিক সৃষ্টি হবে। যেহেতু তান্ত্রিক হবার জন্য কোন স্কুলে লেখাপড়া লাগেনা, সার্টিফিকেটও নাই, শুধু দাবী করলেই চলে।
হাতের কৌশলের সাহায্যে দুই একটি ম্যাজিক দেখিয়েও অনেকে নিজেকে তান্ত্রিক দাবী করে। কেননা মানুষ তান্ত্রিক বলে তাকেই মনে করে, যার কাছে ব্যাখা যোগ্য নয় এমন কিছু কাজের উপস্থিতি আছে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সহজ-সরল মানুষকে ধোঁকা দেওয়া সহজ হয়। বইয়ের ভাষানুযায়ী, একজন ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ তান্ত্রিক হতে গেলে, অনেক কিছু অর্জন করতে হয়।
চৈনিক পরিব্রাজক হিউ য়েং সাং ও ভারতীয় তান্ত্রিক সাধু
চৈনিক পরিব্রাজক ‘হিউ য়েং সাং’ একদা ভারতের কালিকট বন্দরে এক তান্ত্রিক সাধুর নর বলি দেবার দৃশ্য দেখতে গিয়েছিলেন! অবশেষে পরিব্রাজক নিজেই বলির জন্য নির্বাচিত হয়ে যান। অতি ক্ষীণকায় এই সাধুর প্রচণ্ড শারীরিক বলের কাছে তিনি হার মেনেছিলেন।
ভাগ্যক্রমে তুফান শুরু হওয়াতে তিনি প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এই ঘটনা তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন। তাই আমার প্রাপ্ত মন্ত্র-তন্ত্রের বইয়ের এসব বর্ণনা বিশ্বাস অবিশ্বাস কোনটাই করতে পারছিলাম না। তবে কৌতূহল উত্তরোত্তর বেড়েই চলছিল।
তন্ত্র মন্ত্র পরীক্ষার জন্যে তুলা রাশির মানুষ দরকার
মন্ত্র-তন্ত্র পরীক্ষার জন্য একজন তুলা রাশির মানুষ দরকার। মাকে প্রশ্ন করলাম আমাদের এলাকাতে তুলা রাশির কোন মানুষ আছে নাকি? মা বললেন, কেন তোমার বাবাই তো তুলা রাশির মানুষ!
আমাদের ঘরে কোত্থেকে যেন একটি তামার বড় বাটি এসে যায়, সচরাচর এগুলো হিন্দুদের বাড়ীতে থাকে। পাত্রটি বাবার হাতে দিয়ে বললাম, আব্বু এটা ধর, একটা জিনিষ দেখব।
কি মনে করে কোন প্রশ্ন না করে বাবা সেটা ধরে বসলেন। আমার একটা হবি ছিল, এটা ওটা মিশিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করা। সম্ভবত বাবা নতুন কোন পরীক্ষা করছি ভেবে বাটি হাতে ধরেছিলেন। যাক সেটা আরেকটা ভিন্ন অধ্যায়।
বাবার হাতে তামার বাটি ধরিয়ে দিয়ে মন্ত্র পড়া শুরু করি
বাটি বাবার হাতে তুলে, মনে মনে বাটি চালানের মন্ত্র আওড়াতে শুরু করলাম। দেখলাম পুরো বাটি বাবার হাতের মধ্যে সেঁটে গেল। তিনি ভয়ঙ্কর ভাবে কাঁপছেন। প্রচণ্ড গতিতে দরজায় আঘাত হানলেন. দরজা ভাঙ্গতে চাচ্ছেন।
আমি ভয়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়লাম। আতঙ্কে মাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার দিলাম। তিনি হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে দেখলেন, বাবার হাতে পিতলের বাটি। আমাকে হুঙ্কার দিয়ে বলল তুমি কি করেছ! তাড়াতাড়ি হাত থেকে বাটিটা কেড়ে নাও।
আমি ও মা প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি করে বাবার হাত থেকে বাটি টা কেড়ে নিলাম। বাবা জ্ঞান হারালেন! আমি কান্নায় বুক ভাসিয়ে ফেললাম। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল, কি করলাম, আর মুহূর্তের মধ্যে কি ঘটনাই না ঘটে গেল।
বাবা সুস্থ হবার পর মা-বাবার হালকা তর্কা-তর্কীর মাঝে শুনতে পেলাম। মা বলছেন, ‘এই বাটি নিয়ে তুমি তৃতীয়বার এই ঘটনা ঘটালে, তোমাকে বলেছিলাম এই বাটি দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আস। কোন পাপের কারণে আবদুল কাদেরের সাথে পরিচয় হয়েছিল বুঝলাম না’।
বুঝতে পারলাম এই বাটি আবদুল কাদেরের মাধ্যমেই আমাদের ঘরে ঢুকেছে এবং আজকের মত কাণ্ড অতীতে আরো দুবার ঘটেছিল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, পরিণাম সম্পর্কে ধারনা না থাকা পর্যন্ত আর কোন মন্ত্র প্র্যাকটিস করব না। পীতাম্বর শাহের দোকানেও এমন তামার বাটি দেখেছি। কখন প্রশ্ন করিনি কি কাজ করা হয় এগুলো দিয়ে।
তন্ত্র-মন্ত্র বলতে আসলেই কি বুঝায়
তন্ত্র (Tantra): ‘তন্ত্র’ শব্দটির মূল অর্থ হলো ‘তত্ত্ব’, ‘সিস্টেম’ বা ‘বুনন’। এটি একটি ব্যাপক আধ্যাত্মিক দর্শন এবং সাধনা পদ্ধতি। তান্ত্রিক সাধনায় শরীর ও মনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে উচ্চতর চেতনা বা শক্তির (যেমন কুলকুণ্ডলিনী শক্তি) জাগরণ ঘটানোর চেষ্টা করা হয়।
মন্ত্র (Mantra): ‘মন্ত্র’ হলো কিছু বিশেষ পবিত্র শব্দ, ধ্বনি বা বাক্যাংশ, যা নির্দিষ্ট ছন্দে ও নিয়মে বারবার উচ্চারণ করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে মন্ত্রের বিশেষ ধ্বনি-কম্পন বা শক্তির মাধ্যমে মনকে একাগ্র করা যায়, এবং কোনো নির্দিষ্ট শক্তিকে আহ্বান বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। এই মন্ত্র থেকেই গোপন চিন্তার পরামর্শ, গোপন মতবাদ বুঝিয়ে থাকে।
রাজাকে যিনি মন্ত্রনা তথা গোপন পরামর্শ দিতেন তিনিই মন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হতেন। আর এই মন্ত্র শব্দ থেকেই বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু আমার সেই মন্ত্র তো এই রাজাকে দেওয়া মন্ত্র ছিল না, সেটা ভিন্ন একেবারেই যার রহস্যের আজো সমাধা হয়নি, সেটা কি বাটির দোষ ছিল, না আমার মন্ত্রের গুন ছিল কোনটাই উদ্ধার হয়নি।
আমার মা কোনদিন এই ব্যাপারে কথা তুলেন নি। আমারও আগ্রহ হয়নি। আজ এ বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে বসে, অনুভব করছি, বিষয়টি যদি আগে থেকেই জানা থাকত, তাহলে মাকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারতাম, রহস্যটা কি ছিল!
আগের পর্ব: যে ভাবীর কারণে আমি হলাম বালক পীর! এক পিকুলিয়ার মানুষ,