জিনের কি সাক্ষাতকার কিভাবে হয়
জ্বিনের সাক্ষাৎকার শুনে হয়ত জিনের ছবি আছে কিনা অনেকেই ভাবতে পারেন। তাই জিন সম্পর্কে একটু হালকা ধারনা থাকলে ব্যাপারটি বুঝতে সুবিধা হবে। জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের ‘লু’ অংশ থেকে। তারা আগুনের সৃষ্টি হলেও দুনিয়া জ্বালাতে পারে এমন প্রকৃতির আগুন নয়, তবে এই আগুন মানুষের ইচ্ছা শক্তি দখল করে, তার মনকে জালিয়ে দিতে পারে।
তাদের যেহেতু মাটির তৈরি জিহবা নাই তাই তাদের তাদের কথার আওয়াজ মানুষ শুনতে পায়না। তাদের যেহেতু মাটির তৈরি শরীর নাই, তাই চর্মচোখে তাদের দেখা যায় না কিংবা তাদের হাঁটার শব্দ মানুষ শুনে না।
মানুষের ইচ্ছাশক্তি দখল করে, সেই মানুষের মুখ দিয়েই জিন নিজের কথা বলে, নিজের কাজ করে নেয়। সুতরাং জিনকে কথা বলতে হলে কোন মানুষের সহযোগিতা নিয়েই কথা বলতে হয়। যাকে দিয়ে কথা বলানো হয়, সেই ব্যক্তির উপর জিন ভর করে অতঃপর জিন সেই ব্যক্তির মুখ দিয়ে কথা বলে। এই সাক্ষাৎকারটিও সে এধরনের একটি।
জিনের আছর ও জিনের ভর করা কিন্তু দুটো আলাদা বিষয়
উল্লেখ্য জিনের ভর ও আছর কথা দুটোর মধ্যে মৌলিক তফাত আছে। জিন কারো উপরে ভর করার অর্থ হল, সেই জিন ওই ব্যক্তির উপকার করতে চায়। আর জিনের আছর বলা হলে, জিন গায়ে পড়ে সেই ব্যক্তির সাথে লেগে থাকতে চায়, যার পরিণতি হয় ক্ষতির মাধ্যম।
বাড়ী থেকে রাস্তা দিয়ে যাবার পথে, আগে থেকেই আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা এক মহিলা আমাকে ডাক দিল। তিনি তার পরিচয় দিলেন, আমি তাকে সহজে চিনলাম। এই মহিলার ছেলে আমারই ক্লাস মেট, ফুটবল খেলার নিত্য সঙ্গী। তিনি ভণিতা না করে অনুরোধ করলেন আজকের মধ্যেই যেন তাদের বাড়ীতে যাই।
তিনি আমাকে বেশীক্ষণ আটকিয়ে রাখবেন না, তাবিজও চাইবেন না, পানি পড়াও নিবেন না। আমার কাছে কোনটাই তার প্রত্যাশা নয়, তবে তার ব্যাপারটি বুঝার জন্য আমাকে অবশ্যই তাদের বাড়ীতে যেতে হবে। পূর্ব পরিচিতির সূত্র ধরে ওনাদের বাড়ীতে গেলাম, এই বাড়ীতে বন্ধুর সাথে বহুবার এসেছি, এটা নতুন কোন ব্যাপার ছিলনা।
বাড়ীতে ঢুকতেই দেখি ঘর থেকে আমার নাম ধরে কেউ সালাম দিল, আমি উত্তর দিলাম। ঘরে ঢুকার পর মহিলা বলল তুমি ভিতরের ঘরের এই জায়গায় বস। পাশের ঘর থেকে তখনই আমাকে আবার সালাম দিল।
মহিলা বললেন, এটা আমার দ্বিতীয় ছেলে, আমি সেই ছেলেকে খুব ভাল করে চিনি। প্রশ্ন করলাম তাকে তো অনেক দিন ধরে আমিও দেখিনি।
জিনের সাথে মানুষের বন্ধুত্বের মুল ঘটনার একটি বিবরণ
উত্তরে মহিলা বলতে রইলেন, তার সাথে এক জিন বন্ধুত্ব করেছে, তাই সে বাড়ির বাহিরে কোথাও যায় না। এই কথা বাহিরে কাউকে বললে, জিনটি গোস্বা হয় এবং ছেলেকে ধরে মারে। আমি ছাড়া তার ঘরে কেউ ঢুকতে পারেনা। ঘরের অন্যরা কেউ তার কক্ষে ঢুকতে গেলেই, সজোরে গায়ের উপর কিছু ছুঁড়ে মারে।
বিগত দশ দিন সে কোন খানা খায়নি। বাতাস থেকে সংগ্রহ করে কিছু একটা খাচ্ছে বলে আমাদের দেখায়। কিন্তু আমরা তো কোন খাদ্য তার সামনে দেখিনা। বর্তমানে শরীর একেবারে রুগ্ন। এই জিন তার বন্ধুত্ব ছাড়তে ইচ্ছুক নয়।
মা ছেলেকে প্রশ্ন করেছিল, জিন কি চায়? তাকে সে সব দেওয়া হবে। জিনটি আমাদের সাথে কথা বলতে চায়না। অনেক প্রশ্নে একটি উত্তর দেয় কিন্তু বেশী প্রশ্ন করলে চটে যায় এবং ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলেকে ধরে মারে। ছেলে মারের চোটে কাঁদে। অনেক অনুনয় বিনয়ের পরে, সেই জিন শর্ত দিয়েছে যে, যদি আমি এসে তার সাথে কথা বলি, তাহলে সে আমার সাথে কথা বলবে ও তার দাবীর কথা জানাবে।
কথাটি শুনে আমার কাছেই ভারী আশ্চর্য লাগল! আমিও দুজনের কথার মধ্যে মধস্ততা করব। তাছাড়া আমিতো এসব বিষয়ে সম্পর্ন্ন অজ্ঞ। কারো নিকট থেকে কোন জ্ঞান আহরন করিনি যে, উভয়ের কথা বার্তার মধ্যে কিভাবে ওকালতি করব। জিন যদি ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলেটিকে মারতে পারে, উল্টো সে তো আমাকেও ধরে উত্তম মধ্যম দেওয়া শুরু করতে পারে। তখন আমাকে রক্ষা করবে। উল্টো সেই জিন যদি আমার উপরেই আছর করে বসে। এই প্রথম জিন নিয়ে চিন্তায় পড়লাম। করণীয় কি হবে তা নিয়ে ভাবছি। মনের অজান্তে আবদুল কাদেরের করুন পরিনতির কথা মনে উঠল। হঠাৎ মহিলার ডাকে তম্ময় ভাব কাটল।
জিনদেরও মানুষের মত নাম আছে এই জিনের নাম হানিফ
তিনি বললেন তোমাকে ঘরে ঢুকতে হবে না। তুমি এখানে বসেই ডাক দিলেই সে শুনবে এবং কথা উত্তর দিবে। সুতরাং মনে কিছু বল নিয়ে সজোরে তার নাম ধরে ডাক দিলাম ডাক দিলাম, সেও সাথে সাথে উত্তর দিল।
দীর্ঘক্ষণ ধরে অনেক প্রশ্ন করলাম, সে থেমে থেমে সে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলতে গেলে, জিনের দাবীটি এ রকম।
‘জ্বিনের নাম হানিফ, তারা এই এলাকাতে বসবাস করে দীর্ঘ বছর ধরে। এই বাড়ির পিছনে যে দীর্ঘ স্রোতহীন পানির লেকটি বয়ে গেছে, সেখানেই তাদের আবাস। এই ছেলের বাপ-দাদা জিনদের যথেষ্ট ক্ষতি করেছে। জিনদের পরিবারও সুযোগ পেলে তার শোধ নিতে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু বর্তমানের এই মানব ছেলেটিকে বন্ধু হিসেবে হানিফ নামের জ্বিন ছেলের খুব পছন্দ। এই বন্ধুত্বের বিনিময়ে তারা পুরানো শত্রুতা বন্ধ করতে চায়। এবং জিন তার কোন ক্ষতি করবে না বরং উপকার করবে, তাকে নিরাপত্তা দিবে!
বিদঘুটে পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় কাকে কি পরামর্শ দেওয়া যায় ভাবছি। কথাটি শোনা মাত্রই ছেলের মা প্রতিবাদ করল আবার হু হু করে কেদে উঠল। বলতে লাগল, আমার ছেলের বন্ধুত্ব ছাড় বিনিময়ে যা চাও তাই দিব। তবুও আল্লাহর দোহাই! তোমরা আমার বাড়ী ত্যাগ করো! আমরা কথা দিলাম তোমাদের আর কোন ক্ষতি করব না। ইত্যাদি যা মন চায়, তা মা অনবরত বলতে রইলেন।
মূলত এখানে আমার আর মধ্যস্থতা করার তো কোন দরকার রইল না। যা বলার তা, তো ছেলের মা বলেই দিলেন। আমিও তার কথায় সায় দিয়ে বললাম, তুমি জিন। তোমাদের খাওয়া, পড়া, চলা, সবই আলাদা। তোমাদের জীবন আলাদা। বন্ধুত্ব হবার জন্যে তো একই গোত্রের হতে হয়। এভাবে বন্ধুত্ব হয় না। তুমি ছেলেটির মায়ের দিকে তাকাও কিভাবে কান্না করছে। তাছাড়া ছেলেটি না খেয়ে মারা যাবে। তুমি তাদের রেহাই দিয়ে চলে যাও। বিনিময়ে কি চাও বলতে পার। তাছাড়া তুমি একজন মানুষের জন্যে কিবা উপকার করতে পারেবে?
জিনে ধরা রোগীদের শর্ত দিয়ে জিন বিদায় করতে হয়
উল্লেখ্য প্রতিটি জিনে ধরা রোগির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বৈদ্য জিনকে একটি শর্ত দেয় যে, তুমি কি চাও? কি তোমার দাবী ইত্যাদি। জিন এক্ষেত্রে এমন সব অদ্ভুদ ও মামুলী চাহিদা ও শর্ত উপস্থাপন করে যা খুবই হাস্যপদ এবং সাধারণ মানুষের পক্ষেও সে সব দাবী পুরন করা সম্ভবপর। চলে যাবার ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত চায়। যেমন একজন বৈদ্য প্রশ্ন করেছিল, হে জিন তুমি যে চলে যাচ্ছ, তার প্রমাণ হিসেবে কি রেখে যাচ্ছ? তখন জিন বলল, আমি জুতো কামড়ে ধরে প্রমান দিব! মুহুর্তে জিনে আক্রান্ত রোগী সেখানে রক্ষিত জুতো কামড়ে ধরে এবং বেহুঁশ হয়ে পড়ে। হুশ ফিরার পরেই দেখা যায় আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। ইতিপূর্বে দশটির অধিক ক্ষেত্রে এমনটি দেখেছি বিধায় সেই সূত্র ধরে এই প্রশ্ন এখানে তুলে ধরি…
জ্বিন হানিফই বলল, তুমি তার মাকে বুঝিয়ে বল, আমি কোন ক্ষতি করব না। আমার দ্বারা তার লাভ হবে উপকার হবে। তারা চাইলে আমি চিরদিন থাকব, না চাইলে তিন মাসের বন্ধুত্ব করে চলে যাব। তার বয়স যখন ২৭ বছর হবে তখন আবার ফিরে আসব।
প্রশ্ন করলাম, তুমি তো সব কথা এখানে সরাসরি বলেই দিচ্ছ, তাহলে আমাকে ডেকেছ কেন?
উত্তর দিল, আমি এখানে আছি বলে ঘরের সবাই ভয় পায়, চিৎকার করে। আমি চিৎকার করতে মানা করি, ভয় পেতে নিষেধ করি কিন্তু তারপরও তারা তা করে থাকে। তুমি যেহেতু এসব বুঝ, তাই তোমার নাম বলেছি, তুমি যাতে করে এদের বুঝাতে পার!
উল্লেখ্য লোক সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, জিনেরা নানা জায়গা থেকে নানা বস্তু এনে দিতে পারে। যদিও তা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পাওয়া যায়। মুহুর্তেই সেই বস্তু হাজির করতে পারে। যারা জিন সাধন করেন, তাদের কাছে মানুষ হাজির হলে আপেল, কমলা সহ নানাবিধ বস্তু উপস্থিত করে। এতে করে মানুষ হতচকিত হয়ে পড়ে এবং সেই সাধকের কর্মের উপর আস্তা বৃদ্ধি করে। এটাই জিন সাধকদের অন্যতম কীর্তির একটি নমুনা। আমিও যে কিশোর বয়স থেকে একটি জিনের সাথে বন্ধুত্ব করার জন্যে কবরস্থানে ঘুর ঘুর করতাম; তার অন্তনির্হিত কারণও ছিল কিন্তু এটাই। যদি একটি জিন বন্ধু হয়, তাহলে তাকে দিয়ে সিন্দাবাদের মত অসাধ্য সাধন করাব।
তেমন কোন জিনের সাথে আমার দেখা না হলেও, অন্তত ভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে হলেও, একটি জিন আমার সাথে কথা বলা আগ্রহ দেখাচ্ছে। সুযোগটাকে আমি লুফে নিতে চাইলাম। আর দুইদিন পরে আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু। শুনেছি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইতিমধ্যেই চলে এসেছে।
জিন মানুষের জন্যে কেমন উপকার করতে পারে
মাথায় একটা কুবুদ্ধি কিলবিল শুরু করে। আমি তো আর মহামানব নই যে, জগতের সকল চাহিদাকে উৎরে যেতে পারি। সেদিন কিছুক্ষণের জন্যে আমিও উপেক্ষা করতে পারি নি। আমি তাকে বলে বসলাম, তোমার কথায় আমি আরো আস্তা আনতে চাই, তুমি কি আমার একটি উপকার করবে?
কি উপকার বল,
আসন্ন পরীক্ষার জন্যে প্রশ্নপত্র এসেছে। সেগুলো আমাদের স্কুলের হেড স্যারের অফিসে আছে। সেখান থেকে একটি করে প্রশ্ন নিয়ে আস। কিছুক্ষণ নীরব
উত্তর দিল, টেবিলেরও উপরের কাগজ গুলো? (হেড স্যারের টেবিলে ইতিপূর্বে আমি বার কয়েক মুখোমুখি বসেছি। দৈনন্দিন কিছু কাগজপত্র থাকে। সেখানে ক্লাস রুটিন, কিছু নোট, কোন স্যার কখন আসেন নাই। কিংবা কোন ছাত্রের অভিভাবকের নাম ইত্যাদি থাকে)
না ওগুলো না, থাকলে সেগুলো আলমারীতেই থাকবে? কিছুক্ষণ নীরব
কোন আলমারী? এখানে কয়েকটা আছে!
তালা ওয়ালা আলমারীতে দেখ। আবারো নিরবতা (একটা আলমারীতে তালা লাগানো থাকত, বাকি গুলো শুধুমাত্র হুকের মাধ্যমে আকটানো হত)
এটা তো তালাবদ্ধ কিভাবে বের করব? কাগজ বের করা সম্ভব নয়। (বুঝলাম জিনেরা সব পারলেও মানুষের অনেক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করতে পারে না। ধারণা করছি তারা হাওয়ার মাধ্যমে ঘুরে বলে সহজে ঢুকতে পেরেছে কিন্তু তালাবদ্ধ আলমারী থেকে জড় বস্তু বের করা তার পক্ষে সম্ভব নয়)
কথার মোড় ঘুরিয়ে প্রম্ন করলাম, আমার বাবা এখন কোথায় এবং কি করে বলতে পার কি?
সে উত্তর দিল তোমার বাবা তোমাদের খামার বাড়িতে, শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে। এটা বলেই সে তেতে উঠল ‘আমি কি তোমার গোলাম নাকি ঐ ছেলের বন্ধু।’ আর কোন কথা নয়। কথায় রাজি কি না সেটা বল, নতুবা সব ভেঙ্গে চুরমার করে দিব।
ছেলের মা বলে উঠল, তোমাকে এনেছি আমাদের উপকার করার জন্যে আর তুমি কিনা তাকে বিরক্ত করছ!
ছেলের মাকে বললাম, আপনি তো বিস্তারিত শুনছেন। সে শর্ত সাপেক্ষে তিন মাস থাকবে অতঃপর চলে যাবে। ইতি মধ্যেই দুই মাসের মত হয়ে গিয়েছে। সুতরাং ধৈর্য ধরবেন নাকি গোলমাল বাধিয়ে ফায়সালা করবেন?
শুরুতে মায়ের যে ধরণের একটি আকুতি ছিল এই জিন চলে যাক। পরবর্তীতে জিনের প্রলোভন এবং আমার প্রশ্নোত্তর করার ধরণ দেখে মায়ের মনে কেন জানি পরিবর্তন দেখা দিল। সম্ভবত তিনি সময় নেবার চিন্তার মধ্যে দুদোল্যমানতায় আছেন।
মা জানালেন, আজ আর নয়। দরকার হলে আমি তোমাকে পরে আবারো ডাকব কিন্তু বিষয়টি কারো সাথে আলাপ না করার অনুরোধ জানালেন।
পুনশ্চ: অনেক পাঠক উল্লেখ করেছেন যে, তারা জ্বিনকে বিশ্বাস করেনা! আমি নিজে জ্বিন বিশ্বাস করি, কেননা কোরআনে জ্বিন জাতি সৃষ্টি সম্পর্কে পরিষ্কার বর্ণনা আছে, আর জ্বিন করি বলেই আজকের এই লম্বা রচনা। আমি প্রশ্ন কারী সে সব বন্ধুদের উত্তরের পিছনে ঘুরতে থাকলে সময় নষ্ট হবে প্রচুর। তাই অযথা প্রশ্নবাণ এড়াতে তাদের উদ্দেশ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আজকের প্রবন্ধের সাথে যোগ করতে চাই। যাতে করে তাদের উত্তর না দিয়ে এই ঘটনাটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করতে পারি।
যশোরে জিনের সাথে মানুষের জায়গা নিয়ে গণ্ডগোল
চতুর্দশ শতাব্দীতে রাজা মুকুট রায়ের রাজধানী ছিল ব্রাহ্মণ নগর। যশোর থেকে বেনাপোলের পথে ১১ কিলোমিটারে সেই ঐতিহাসিক জনপদের বর্তমান নাম ‘লাউজানি’। ব্রাহ্মণ নগরের যে স্থানে রাজপ্রাসাদ ছিল, তার বর্তমান নাম গাজীর দরগাহ।

২০০৭ সালে এখানের একটি জমিতে কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটির অর্থানুকূল্যে আমাল কুয়েত বালিকা মাদ্রাসা ও এতিমখানা স্থাপন করা হয়। ২০ কক্ষবিশিষ্ট দোতলা এই মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রথম তলায় ক্লাসরুম এবং দ্বিতীয় তলা আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই মাদ্রাসাটি চালুর পর পরই একদল জিন দাবি করে, যে জমির ওপর এতিমখানা স্থাপন করা হয়েছে পুরুষানুক্রমে সেই জমির মালিক তারা। তাই এতিমখানাকে এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। নতুবা তারা ক্ষতি করবে। এতিমখানা কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে জিনদের কথায় গুরুত্ব না দিলে আলামত হিসেবে একদিন এতিমখানা চত্বরে নতুন জাতের চার-পাঁচ শ’ সাপ জড়ো হয়, যা ইতঃপূর্বে কেউ কোনো দিন দেখেনি।
পরে জিন পর্যায়ক্রমে ভর করে এতিমখানার বাসিন্দা ১৪ জন বালিকার ওপর। তারা হলো- মোবাশ্বেরা, লাবনী, শম্পা, মমতাজ, রহিমা, লাকি, আনোয়ারা, মিনা, যুঁথি, সাথী, রাবেয়া, পিংকি, তানজিরা ও খাদিজা। পেটব্যথা, মাথাধরা ইত্যাদি ধরনের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে থাকে তাদের। এক পর্যায়ে তারা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। তারা প্রায়ই খাওয়ার পর সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলত……… অনেক লম্বা কাহিনী।

এটি জিনের কারণেই হচ্ছে বলে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে গত ১০ অক্টোবর ২০০৯ যশোরের ডিসি একজন ডাক্তার, জেলা প্রশাসনের চারজন পদস্থ কর্মকর্তাকে নিয়ে তদন্ত করেন। ওই দিনও বালিকাদের আচরণে কর্মকর্তারা হতচকিয়ে যান।
এরপর এতিমখানাটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। বিষয়টি উচ্চতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্তের জন্য গতকাল মঙ্গলবার চারজন খ্যাতনামা ডাক্তার আসেন। তারা হলেন- স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. মানোয়ার হোসেন, জাতীয় মানসিক ইন্সটিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ডা. এম রব্বানী এবং স্কয়ার হাসপাতালের দু’জন কনসালটেন্ট ডা. সরোয়ার আলম ও ডা. তৌহিদুজ্জামান।
তাদের সাথে ছিলেন ধানমন্ডি পাকোয়া মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মোঃ জুলফিকার। জেলা প্রশাসনের পক্ষে ছিলেন ডেপুটি কমিশনার মোঃ মহিবুল হক, এডিসি (শিক্ষা) সেফিনা বেগম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন খান প্রমুখ।
উপস্থিতিদের মধ্যে একজন মনোবিজ্ঞানী এটাকে মাস হিষ্টিরিয়া বলে মন্তব্য করেছেন। এসব কন্যারা নিজের বাড়ীতে সুস্থ থাকে এতিম খানায় অদ্ভুত আচরণ করে, তাহলে মাস-হিষ্টিরিয়া প্রকোপ শুধু এতিম খানায় আসলেই হবে।
তাছাড়া এসব বালিকাদের আচরণ মাস হিষ্টিরিয়া রোগীর মত নয়। রীতিমত পুরুষের মত গালাগালি, খিস্তি খেউর, বিভিন্ন জিনিষ ছুড়ে মারা ইত্যাদি আচরণ করে। এর প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেনি। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ এতিম খানাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, বালিকারা তাদের পিতামাতার কাছে সুস্থ জীবন কাটাচ্ছে।
এই ঘটনাটি তখনকার সময়ে প্রায় অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আমি নিজেই অনেক সরকারী কর্মকর্তার পদবি সহ নাম উল্লেখ করেছি। আরো সুবিধার্থে তখন কার দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার তারিখ সহ কিছু শিরোনাম নিচে উল্লেখ করলাম।
- ‘যশোরে জমি নিয়ে মানুষ-জিন বিবাদ: এতিমখানা বন্ধ’ শাহাদত হোসেন কাবিল, যশোর অফিস দৈনিক নয়া দিগন্ত : অক্টোবর ১৩, ২০০৯
- ‘জিনের আছর পড়া ছাত্রীরা বাড়িতে ভালো আছে: যশোর অফিস’ দৈনিক নয়া দিগন্ত : অক্টোবর ১৭, ২০০৯
- ‘জিনে পাওয়া’ বালিকারা ডাক্তারদের বলল, তোরা কি করতে এসেছিস? যশোর অফিস’
- একপর্যায়ে দুর্বল হয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। নয়া দিগন্ত: ২৮ শে অক্টোবর ২০০৯
আগের পর্ব: তাবিজের চাহিদা পূরণ ও ‘টিপু বাবা’ হয়ে ওঠার সম্মান বিড়ম্বনা পর্ব-১১ পড়ুন