খাটাশ মূল্যবান প্রাণী যার মল থেকে তৈরি হয় দামী কফি

খাটাশের মল থেকে তৈরি হয মূল্যবান কফি

খাটাশ পৃথিবীর মূল্যবান পানীয় ও সুগন্ধি তৈরির মূল উপাদান

খাটাশ, কফি খাটাশ, শহুরে বসবাসকারী মানুষের কাছে এই প্রাণীটি সুপরিচিত না হলেও; গ্রামাঞ্চলের ছেলে-বুড়ো সবাই মোটামুটি খাটাশের সাথে কম বেশী পরিচিত। খাটাশের পায়খানা থেকে তৈরী হয় বিশ্বখ্যাত দামী পানীয় Kopi Luak! তার পর থেকেই সে সন্মানীত প্রাণীর তালিকায় উঠেছে! অনেকে খাটাশ বলে কাউকে গালি কিন্তু খুব কম সংখ্যক মানুষই এই সম্মানী প্রাণীটিকে নিজের চোখে দেখেছে। 

যারা খাটাশের সাথে কমবেশি পরিচিত সে সমস্ত পাঠকবৃন্দ হয়ত আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করবেন, খাটাশ নিয়েও লিখা-লিখির কিছু আছে নাকি? তাদের সবিনয়ে বলব, আপনারা না হয় কিছুক্ষণ ব্যঙ্গ কাজে ব্যস্ত থাকুন। এই ফাঁকে যে সমস্ত পাঠক, খাটাশের সাথে ঘনিষ্ঠ নন, তাঁদেরকে আগে সম্মানিত খাটাশের সাথে একটু পরিচয় করিয়ে দিই।

বাংলাদেশের খাটাশের যথেষ্ট দুর্নাম রয়েছে

বাংলাদেশের সর্বত্র খাটাশ কম-বেশী দেখা যায়। খাটাশ বিড়াল গোত্রের একটি প্রাণী। বৃহত্তর বরিশাল, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর এবং সিলেট অঞ্চলে খাটাশ বেশী পরিমাণে দেখা যেত। পৃথিবীতে বহু প্রজাতির খাটাশ রয়েছে। ইংরেজিতে Civet হিসেবে পরিচিত, প্রজাতি ভেদে Polecat হিসেবেও চিত্রিত করা হয়।

তবে পৃথিবীর সকল প্রজাতির খাটাশের খাসিয়ত প্রায় একই ধরনের, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এরা দেশীয় বিড়ালের চাইতে আকারে একটু বড়, নিরীহ এবং শান্ত। ফল-মূল, ইঁদুর, ব্যাঙ তাদের সবচেয়ে বেশী প্রিয় খাদ্য। খেজুরের রস চুরিতে এদের জুড়ি নেই। কিছু প্রজাতির খাটাশের সামনের পায়ের আঙ্গুলগুলো অপেক্ষাকৃত লম্বাটে, তা দিয়ে কিছু ধরতে, পেঁচাতে কিংবা আটকাতে পারে।

দেশীয় খাটাশের দুর্নামের কারণ

খাটাশের নামে যথেষ্ট দুর্নাম রয়েছে গ্রামাঞ্চলে। কোন ব্যক্তির গায়ে যদি অপরিচিত দুর্গন্ধ পাওয়া যায়, তাহলে বলা হয় তাকে খাটাশে পেয়েছে, নতুবা এত দুর্গন্ধ কোত্থেকে এলো? শহরের কৌতূহলী মেহমান গ্রামের ঝোপ-জঙ্গলে বেড়াতে গেছেন, দেখা গেল শরীর থেকে ভয়ানক বিদঘুটে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে; রীতিমত বমি হবার জোগাড়।

দুর্গন্ধ ছড়াতে এবার গোসল করুন, যত পারেন গায়ে, মাথায় সাবান-শ্যাম্পু মাখুন। শতভাগ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেনা যে, তিনি গন্ধমুক্ত হয়েছেন। উল্টো গোসল শেষে, পুকুরের পানিকে বিশ্রী গন্ধযুক্ত করার কারণে, হয়ত মেহমানকেই জবাবদিহি করতে হবে।

এক্ষেত্রে মেহমানের অপরাধ তিনি নিজের অজান্তে সে পথ দিয়ে ঘুরে এসেছেন, যে পথ দিয়ে ইতিমধ্যে সম্মানিত খাটাশ হেঁটে গিয়েছেন এবং চলার পথে কুকুরের প্রস্রাব করার মত কিছু গন্ধ স্প্রে করেছে।

পথ চিনার ভুলে উদাস কোন পথিক, সৌভাগ্যক্রমে খাটাশের পারিবারিক টয়লেটে পড়ে গেলে তো কথাই নেই। লাক্স, কেয়া, ফেয়ার এন্ড লাভলী কোম্পানির বাপের সাধ্য নাই; শরীরের দুর্গন্ধ দূরীকরণে নতুন কোন পারফিউম তৈরি করবে। এমন  দুর্গন্ধে মানুষ, হিতাহিত জ্ঞান-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে।

মানুষের মত খাটাশেরও নিদ্দিষ্ট টয়লেট সিস্টেম রয়েছে

গোত্রের সকল খাটাশ একটি নির্দিষ্ট স্থানেই পায়খানা করে। মানুষের মত, সর্বত্র মল-মূত্র ত্যাগ করা খাটাশের অভ্যাস নয়! তাদের পারিবারিক টয়লেটে পৌঁছতে যদি দু’মাইল পথ চলতে হয়, তবু তারা সে পথ অতিক্রম করেই যাবে।

চলার পথে পায়খানার বেগ যদি অসম্ভব আকার ধারণ করে, তাহলে অধিক সতর্কতা হিসেবে, খাটাশ কচি গাছের নরম পাতা পুটলি পাকিয়ে গুহ্যদ্বারে ঢুকিয়ে রাখে। এতে চলার একটু অসুবিধা হলেও অন্তত পথেই মলত্যাগের ঝামেলাটা হয় না। পারিবারিক টয়লেটে ঠিকই পৌঁছতে পারে। 

তাই খাটাশের পারিবারিক টয়লেটে অসংখ্য পাতার পুটলি দেখতে পাওয়া যায়। খাটাশ সর্বদা তাদের বিচরণ স্থল লুকিয়ে রাখতে চায়। যে স্থানে তারা খাদ্যের অন্বেষণে আনাগোনা করে; সে স্থানের আশে পাশে ভুলেও কখনও মল ত্যাগ করেনা!

তবে যে স্থান খাটাশের ব্যবহারের জন্য খুব কম প্রয়োজন। সে সব স্থানকেই তারা বাচ্চা পালনের জন্য বাছাই করে এবং তার নিকটের কোথাও মলত্যাগ করে। এক পর্যায়ে সেটাই তাদের পারিবারিক টয়লেট হিসেবে গড়ে উঠে।

সেখানে বেজায় দুর্গন্ধ বের হলেও খাটাশের ভয়ের কোন কারণ নাই। কেননা খাদ্য সন্ধানের জন্য সে এই জায়গার উপর নির্ভর করেনা। এ কারণেই গোত্রের সকল খাটাশ এক জায়গায় মল ত্যাগ করে।

অন্য প্রাণীরা খাটাশকে যে কারণে সমীহ করে চলে

কুকুর, শৃগাল, বাগডাসা সহ নিশাচর সকলের চির শত্রু খাটাশ। রাত্রি কালে কোন এলাকায় আচানক খাটাশ হাজির হলে; তার শরীর থেকে নির্গত দুর্গন্ধ পেয়ে অন্যান্য প্রাণীরা অগ্রিম সতর্ক হয়ে যায়। অসতর্ক পাখি, তন্দ্রায় মগ্ন কাঠবিড়ালির ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং সজাগ হয় পড়র। ফলে বাগডাসা কিংবা খেঁকশিয়াল তাদের কাঙ্ক্ষিত শিকার ধরতে ব্যর্থ হয়।

তদুপরি খাটাশের গন্ধে পরিবেশ বরবাদ হয়ে যায়। সেখানে কারো পক্ষে অপেক্ষা করা, নিদ্রায় আচ্ছন্ন হওয়া কিংবা তন্দ্রায় মগ্ন হওয়া কোনটাই স্বস্তি-দায়ক হয়না। যে সমস্ত প্রাণী গাছের উপরে থাকে তারা কিছুটা সুবিধা পেলেও, স্থলচর প্রাণীদের জন্য বড় মুসিবতের কারণ হয় এই খাটাশের গন্ধে। মাঝে মধ্যে অনভিজ্ঞ শৃগাল খাটাশের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে আক্রমণ করতে যায়, তাকে এলাকা ছাড়া করতেও চায়।

তা কি সম্ভব? কখনও না! দেখা গেছে শৃগাল খাটাশের পিছনে লেগে খাটাশকে তাড়িয়ে নিচ্ছে। আর অমনি খাটাশ কাল-বিলম্ব না করে উদরস্থ বায়ু ছাড়া শুরু করে। সৌখিন মানুষ যেভাবে পারফিউম নিজের শরীরে স্প্রে করে; ঠিক সেভাবেই খাটাশ নিজের উদরস্থ বায়ু, গন্ধযোগে পিছনে ধাবিত প্রাণীর নাক-চোখ বরাবর স্প্রে করতে থাকে।

সে বায়ু তো বায়ু নয়, যেন পরিবেশ বিপর্যয়কারী কোন গ্যাস বোম! পচা গোশত খেতে অভ্যস্ত শৃগাল পর্যন্ত এই গন্ধবোমের আক্রমণ সহ্য করতে পারেনা! নির্গত বায়ু যেমনি ঝাঁজালো, তেমনি দুর্গন্ধ, ফলে খাটাশের পিছু নেওয়া ধাবিত শৃগালের চোখ মুখ অন্ধকার হয়ে যায়, চোখে আসে পানি।

শৃগাল তারপরও নাছোড়বান্দা হলে, মিনিট খানেক পরেই বমি শুরু করে। বুঝুন শৃগালের আবার বমি! শৃগালের এই দুরবস্থার ফাঁকে খাটাশ চিচিং ফাঁ। 

টিপন্নী আছে কয়েকটি খাটাশ বোমার ঝাঁঝে পল্টনের জনসভা পণ্ড করার সম্ভব

পল্টন ময়দানের জনসভা পণ্ড করতে চান? পুলিশ, দলীয় সন্ত্রাসী কাউকে লাগবে না। চার চারটে খাটাশ বোমাই যথেষ্ট। এক মুহূর্তে বক্তা, শ্রোতা, নিরাপত্তা কর্মী সবাইকে মাঠ ছেড়ে পালাতে হবে। টিয়ার শেল গায়ে লাগলে, চোখ মুখ ধুলে নাহয় নিস্তার পাওয়া যায়, কারো বাসায় আশ্রয় নেওয়া যায়। খাটাশ সেল গায়ে লাগলে কোন নিস্তার নাই।

প্রিয়তমা স্ত্রী কটু গন্ধের ভয়ে, খোদ স্বামীকেই ঘরে ঢুকতে দেবেনা। এ অবস্থায় ভুল করে সম্ভাব্য শ্বশুর বাড়িতে ঢুকে গেলে; নির্ঘাত, ইহ জনমে সে বাড়ী আর শ্বশুর বাড়ী হবেনা।

খাটাশ বিচিত্র পদ্ধতিতে বাচ্চাদের রক্ষা করে

খাটাশ তার বাচ্চাকে রক্ষা করে বিচিত্র পদ্ধতিতে। খাটাশ খাদ্যের অন্বেষণে কিংবা মল ত্যাগের জন্য যদি বাহিরে যেতে চায়; তাহলে যেখানে বাচ্চা রাখা হবে, সে জায়গার চারিদিকে ছোট ছোট ঝোপ ঝাড়ে গন্ধ স্প্রে করে যায়। এইভাবে গন্ধ ছাড়াটাকে গন্ধবৃত্ত বলে।

এর ফলে শত্রু, খাটাশ বাচ্চার অবস্থান স্থলের কাছে-কিনারে ভিড়তে পারবে না। মা খাটাশ বাচ্চাদের নিষেধ করে দেয়, যাতে গন্ধবৃত্তের বাহিরে না যায়। অতি কৌতূহলী কোন বাচ্চা মায়ের উপদেশ না মেনে বৃত্তের বাহিরে গেলে, মৃত্যু অবধারিত। কারণ খাটাসের শত্রুর অভাব নেই। 

একটা নির্দিষ্ট বয়সে খাটাশের কিছু গ্রন্থি থেকে এই গন্ধ রস উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন গন্ধরস তার পায়ু পথের পাশে, ভিতরের দিকে একটি থলেতে জমা হতে থাকে। সে যখন আতঙ্কিত ও উত্তেজিত হয় এই রস নিজের অজান্তে বের হয়ে যায়।

পারিপার্শ্বিক প্রাণীদের জীবন অস্বস্তিকর হলেও, খাটাশের প্রেম নিবেদনের সময় এই রসের দারুণ ব্যবহার হয়। পুরুষ খাটাশ ও মাদী খাটাশ মনের আনন্দে গন্ধ স্প্রে করতেই থাকে। তখন বনের অবস্থা, পল্টন ময়দানে রাজনৈতিক সমাবেশে পুলিশি হামলায় পণ্ড ময়দানের মত হয়ে যায়।

পুলিশ ও রাজনৈতিক কর্মীরা যখন দাঙ্গা বাধায়, টিয়ার শেলের ধূয়ায় সব আচ্ছন্ন হয়, জনসাধারণ যে যার মত পালায়। সে ভাবেই বনে অবস্থান করা, অন্য প্রাণীরা প্রেমে আপ্লুত খাটাশের গন্ধ বোমের অত্যাচারে, বমির ভয়ে, ইজ্জত নিয়ে বন ছেড়েই পালায়। 

গন্ধাবাজী করাই খাটাশের মূল অস্ত্র

খাটাশ নিজের ইচ্ছায়ও এই গন্ধরস স্প্রে করতে পারে। সে জানে গন্ধটাই তার একমাত্র অস্ত্র, তাই যখন তখন খেয়াল-খুশি মত, এই গন্ধ স্প্রে করেনা। আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের যথেষ্ট হিসেব কষেই ব্যবহার করে। ফলে খাটাশ দেখলেই যে দুর্গন্ধ লাগবে ব্যাপারখানা এমনও নয়। খাটাশের মলের সাথে গন্ধ রস মিশে থাকে বলেই, মলও ভয়ানক দুর্গন্ধ হয়।

পাহাড়ীদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে বলা হয় খাটাশের মলে আছে আরোগ্য

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ওঝা, বৈদ্য বনজ ঔষধ তৈরিতে খাটাশের মল সংগ্রহ করে। ১৯৮৪ সালের দিকে লিখক নিজেও কৌতূহল বশত এক পাহাড়ি প্রসিদ্ধ ওঝার সাথে গিয়ে, খাটাশের মল সংগ্রহের পদ্ধতি দেখেছেন। ওঝাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কি করা হবে এই মল দিয়ে?

প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, বহু রোগের ঔষধ এই ‘খাটাশ মল’। তিনি জানান পচা  জ্বর ও সুতিকার রোগীকে কিঞ্চিত মল পাকা কলায় ভরে খাওয়ালে, দুদিনের মধ্যে রোগ ভাল হবেই। তবে রাগীর কাছে ঔষধের পরিচয় গোপন রাখতে হবে।

কারণ রোগীর ঘৃণার কারণে শরীরে নতুন উপসর্গ দেখা দেবে। ওঝা নিজে, তাঁর পিতা, তাঁর দাদা বহু বছর যাবত এ চিকিৎসা পদ্ধতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীতে চালিয়েছেন, সফলও হয়েছেন। এমনকি ওঝার সুনাম শুনে স্থলভাগের অনেকে এ ঔষধ নিয়ে যায়।

তবে কেউ জানতোনা পাকা কলায় কি ঔষধ ঢুকানো হয়েছে। পচা জ্বর কাকে বলে ভুলে প্রশ্নটি ওঝাকে করিনি। যাক, খাটাশের এই গন্ধ রসের বদনামের কারণে হয়ত খাটাশকে কেউ চিরিয়াখানায় রাখে না।

মানুষ বড় আজব চিড়িয়া, তারা খাটাশের দুর্গন্ধকে পরিবর্তন করে বানায় মনোহর আতর

খাটাশের শরীর থেকে নির্গত অত্যন্ত তীব্র গন্ধযুক্ত হলেও, অত্যন্ত লঘু বা পাতলা (Diluted) করলে এর গন্ধটি দারুন সুবাসিত ও আকর্ষক হয়ে ওঠে। পারফিউম শিল্পে ব্যবহার: এই সিভেট মাস্ক বা সুগন্ধি প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বের দামি পারফিউম ও সুগন্ধি তৈরিতে ফিক্সাসেটিভ (Fixative) হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে, যা পারফিউমের স্থায়িত্ব অনেক বাড়িয়ে দেয়। তবে বর্তমান সময়ে প্রাণীর সুরক্ষার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর কৃত্রিম বিকল্প ব্যবহার করা হয়।

যে কারণে খাটাশ সুনাম পেতে পারে

খাটাশের দুর্গন্ধের কারণেই সে বেশী পরিচিত ও আলোচিত। তুলনামূলক ভাবে অনেক ভদ্র, শান্ত এই প্রাণীটিকে অন্তত যেখানে সেখানে পায়খানা না করার কারণে তো সুনাম দিতেই হয়।

কুকুর যখন পা তুলে প্রস্রাব করে তখন বলা হয় কুকুরের জীবনে যৌবন এসেছে বা বালেগ হয়েছে। সেভাবে খাটাশের শরীর থেকে যখন থেকে চিত্ত রি..রি.. করা দুর্গন্ধ বের হয় তখন বলা হয় খাটাশ বালেগ হয়েছে।

তাই কেউ যদি সখ করে খাটাশ পুষতে চায়, তাহলে বালেগ হওয়ার আগেই তা সেরে নিতে হবে। তবে সুখের খবর হল খাটাশের বালেগ হতে সময় একটু বেশী লাগে। প্রজাতি ভেদে খাটাশের দুর্গন্ধ কম-বেশীও হতে পারে।

খাটাশের বদনাম শুনে হয়ত অনেক পাঠক ধৈর্য হারিয়েছেন। সৌখিন প্রাণী সংগ্রাহক গন হয়ত এতক্ষণে তাদের সম্ভাব্য প্রাণী সংগ্রহ তালিকা থেকে খাটাশের নাম বাদও দিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে একটি ছোট্ট সুসংবাদ, আর এই সুসংবাদের কারণেই খাটাশ আজ মহা সম্মানিত এক প্রাণী।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন “সৃষ্টির কোন জিনিষই আমি তামাসাচ্ছলে (অপ্রয়োজনে) সৃষ্টি করিনি, এটাতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে” আল-কোরআন। 

আরেকটি কারণে খাটাশ দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় সম্মানিত প্রাণী

খাটাশ সম্মানিত হওয়ার মূল কারণ হল, তাকে দিয়ে তৈরি করা এক ধরনের পানীয় “Civet Coffee” তথা খাটাশ কফি’র বদৌলতে। আমাদের দেশের গরীব মানুষ তো দূরের কথা, মাঝারী গোছের আয়-রুজি সম্পন্ন মানুষও এই কফি খাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারবেনা।

এই কফি ধনী, বিত্তশালী মানুষেরা পৃথিবীর প্রসিদ্ধ শপিং মলে বসে পান করে থাকেন। আন্তর্জাতিক Forbes Magazine এর রিপোর্ট অনুসারে খাটাশ কফি পৃথিবীর সবচাইতে দামী কফি।

কুইন্সল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ছোট্ট কফি শপ গুলোতে, বিনা দরে এক কাপ খাটাশ কফির দাম ৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। যা বর্তমান বাংলাদেশের টাকায় ৩৫০০ টাকা বা একজন নিম্নমান শ্রমিকের ১ মাসের বেতনের সমান। 

পৃথিবীতে বছরে সর্বসাকুল্যে মাত্র ৫০০ কেজি খাটাশ কফি উৎপাদন করা যায়। চাহিদার তুলনায় যা খুবই অপ্রতুল। যারা এই কফি পান করেছেন তারা বলেছেন, “এটা বড়ই সুস্বাদু কফি, যার দ্বিতীয় কোন তুলনা পৃথিবীতে নাই।

ঠিক চকোলেটের মতো এর স্বাদ। তবে খাওয়ার পরে যে ঢেঁকুর আসে সেটা এতই ঘ্রানযুক্ত ও মিষ্টি যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত কফি প্রেমীদের মনে থাকে। মানব শরীর যথেষ্ট উৎফুল্ল থাকে, মেজমেজে ভাব নিমেষেই উদাও হয়ে যায়।

খাটাশ কফি পান কারীদের মন্তব্য, “যারা নিয়মিত কফি পান করেন, অথচ জীবনে কখনও খাটাশ কফি পান করেননি; তারা আসলে প্রকৃত কফির স্বাদ কেমন সেটাই বুঝতে পারেন নি। তারা বরং কফির নামে কিছু বাদামী রংয়ের গরম পানি পান করেছেন”! 

যারা বিত্তশালী অথচ এখনও এই দামী কফি পান করে সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে নাই। তাদের জন্য এখনও সময় হারিয়ে যায় নি।

নতুবা কবি ওমর খৈয়ামের মত হতাশা পেশ করতে হবে।

“এই বেলা ভাই মদ খেয়ে নাও,

কাল নিশিতের ভরসা কই?

চাঁদনী জাগিবে যুগ যুগ ধরি,

আমরা তো আর রইব না সই”।

কৌতূহলী কেউ ভাগ্যবান কফি প্রেমী হতে চাইলে, গুগলে গিয়ে টাইপ করুন Civet Coffee, ব্যস পেয়ে যাবেন। অর্ডার দিন, পান করুন, সুখে থাকুন, ভাগ্যবান ভাবুন নিজেকে।

যেভাবে তৈরি হয় খাটাশ কফি

সব কথা বলা হলেও, কিভাবে তৈরি হয় খাটাশ কফি? সেটাই বলা হল না। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা অঞ্চলে, ফিলিপাইনে এবং থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে বাদামী রংয়ের এক প্রকার কফি বিচির জন্ম হয়। খাটাশের খুবই পছন্দনীয় এই বিচি।

খাওয়ার পরে, বিচির চামড়া ও মাংসল অংশ হজম হয় কিন্তু বিচি হজম হয়না। অতঃপর পায়খানার সাথে বিচি যখন বের হয়, স্বাস্থ্য-কর্মীরা সে বিচি মল থেকে আলাদা করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় ঐতিহাসিক Civet Coffee তথা খাটাশ কফি। 

বিজ্ঞানীরা বলেছেন খাটাশের পেটে যখন কফি বিচি অবস্থান করে, তখন তার শরীরের গ্রন্থি থেকে নির্গত গন্ধ রস এবং আরেক প্রকারের পাচক রস মিলে উদরস্থ বিচির মধ্যে ঢুকে পড়ে। ফলে সে কফি বিচি এক প্রকারের ঔষধি গুন সম্পন্ন হয়।

এই কফি সম্পূর্ণ আলাদা স্বাদযুক্ত, মধুর গন্ধযুক্ত ও শরীরে চঞ্চলতা আনয়নকারী হয়। তবে এই বিচি খাওয়া খাটাশের দুর্গন্ধ একটু কম থাকে। অভিজ্ঞজনেরা বলেছে, খাটাশের পেটে কফি বিচি যথেষ্ট পরিমাণ গন্ধ রস চুষে নেয়, তাই খাটাশের গন্ধরস স্বল্পতার কারণে এমনটি হয়। এটা খামারীদের জন্য সুখকরও বটে।

যারা এই দুর্লভ কফি পান করে ভাগ্যবান হতে চায় তাদের জন্য আরেকটি কথা না বললেই নয়। পৃথিবীতে সম্মানিত এই প্রাণীটির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে অন্যদিকে কফির চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। তাই বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক প্রতারণাও চালু হয়েছে। 

প্রবাদে আছে “সস্তার তিন অবস্থা”। বাদামী রংয়ের সেই কফি বিচি খুবই তিতা বলে অন্য কোন প্রাণী খেতে চায়না, এটা শুধু খাটাশেরই পছন্দ। ব্যবসায়ীরা এক প্রকারের বানর ও ছাগল আবিষ্কার করেছে, যারা এই তিতা কপি বিচি খায়।

প্রতারক ব্যবসায়ীরা ছাগল ও বানর সৃষ্ট কফি, অপেক্ষাকৃত অনেক সস্তায় বাজারে বিক্রি করে। কেউ ভাবেন এত সস্তায় যখন পেয়েই গেলাম একটু পান করে নেই! কাস্টমর জানেন না তিনি ইতিমধ্যে ডলার দিয়ে ছাগল ও পাগল তথা বানরের ‘গু’ পান করেছেন।

কারণ ছাগল ও বানরের গন্ধরস, গন্ধ গ্রন্থি কোনটাই নেই, তাই সে কফিতে উপকারও নেই। ফলে সাধু সাবধান।