মাজার দরগাহ পীর ও ওরস এগুলো আমাদের সমাজ জীবনের অবিছেদ্য অংশ হিসেবে পরিণত হয়েছে। মাজার দরগাহ পীর এগুলো ফার্সি শব্দ হলেও, ওরস শব্দটি খাঁটি আবরী। দেশে বহু বুর্জুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুদিবসে ওরস পালন করা হয়। ওরশ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘বাসর রাতের মিলন’। শুনতে কথাটি নতুন মনে হতে পারে কিন্তু আভিধানিক অর্থ এটাই। এভাবে প্রতিটি শব্দের মধ্যই লুকিয়ে আছে নানা ধরনের ঘটনা।
বাংলাদেশের ওলি আউলিয়ার মাজার আর মক্কা-মদিনার মাজার
মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব মক্কা-মদিনার মাজার ভাঙ্গার কাজটি করেন
মাজার, যিয়ারত, দরগাহ, পীর, অলি-আউলিয়া, ওরস, গাউস, কুতুব শব্দ গুলো আমাদের দেশে খুবই পরিচিত
আমাদের সমাজে মাজার, যিয়ারত, দরগাহ, পীর, অলি-আউলিয়া, ওরস, গাউস কথাগুলো খুবই প্রচলিত। এগুলো যেহেতু বিদেশী শব্দ তাই আমরা এগুলোর অর্থ বুঝে কাজ করিনা কিন্তু শব্দগুলোর পিছনে সম্মান-মর্যাদা, পদবী কাজ করে বলে চোখ বন্ধ করে ব্যবহার করি। এই শব্দগুলো আমাদের জীবন-যাপন, সংস্কৃতি, এবাদত, চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ, মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে।
মাজার শব্দটি আরবি, ভিন্ন অর্থে ‘যিয়ারতের’ স্থান। কোরআন-হাদিসে মৃত দেহ যেখানে দাফন করা হয় তাকে ‘কবর’ বলা হয়। মুসলমানদের সাথে যত কথা-বার্তা আছে সবই ‘কবর’ নিয়ে।
পবিত্র কোরআন-হাদিসে বারে বারে কবরের কথাই বলা হয়েছে। এই কবর যখন দর্শনার্থীদের মিলনস্থলে পরিণত হয় তখনই এটাকে মাজার বলা হয়। এটি কবরের একটি পরিবর্তিত পরিচিতি।
যিয়ারত করার জন্যই মাজারে যাওয়া হয়
যিয়ারত শব্দটিও আরবি, যার সোজা-সাপটা বাংলা অর্থ দর্শনীয় স্থান অন্য কথায় দেখার জন্য যেখানে যাওয়া লাগে। সেজন্য আরব দেশের মানুষেরা কোন দেশ ভ্রমণে গেলে, তাকেও যিয়ারত বলে থাকে। সে হিসেবে কবরে গিয়ে দেখা করার নামও কবর যিয়ারত হিসেবে বিবেচিত হয়।
উল্লেখ্যে কবর যিয়ারতের মূল উদ্দেশ্য হল, যিয়ারত করতে গিয়ে যাতে কবরস্থানের অবহেলিত, পরিত্যক্ত, শুনশান নীরবতা ও গভীর একাকীত্বের কথা মনে পড়ে। কত বিখ্যাত ব্যক্তিরা নিজেদের অর্থ-সম্পদ, বাড়ী-ঘর ফেলে করুণভাবে এই কদাকার মাটিতে শুয়ে আছে, সে একই পরিস্থিতি নিজের জন্যও সামনে অপেক্ষা করছে সেটা অনুধাবন করা।
একটি আলীশান মাজারে কখনও এই ভাবাবেগের উদয় হয়না। তাছাড়া রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “আমার কবরকে তোমরা উৎসবের স্থান বানিও না।” (সুনানে আবু দাউদ ১/২৭৯)। তার মানে কারো কবরকেও যেন তা করা না হয়।
মাজারের আরেকটি প্রতিশব্দ দরগাহ, শব্দটি ফার্সি
‘দরগাহ’ – আমাদের দেশে আরেকটি প্রচলিত সম্মানিত শব্দ হল ‘দরগাহ’। এই শব্দটি ফার্সি। একটি নির্দিষ্ট স্থানে সুফি-সাধকেরা বসে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিত। সুফিদের এসব স্থানকে কোথাও আস্তানা হিসেবেও বলা হত।
সুফিদের এসব আস্তানায় থাকা, খাওয়া, সভা করা, মানুষদের উপদেশ দেওয়া, পথ দেখানোর ব্যবস্থা থাকত। সাধারণ মানুষেরা এখানে খানাপিনা দিয়ে যেত। এসব আগত সুফিরা সবাই এক দেশ থেকে আসত না, আরব, ইরান, তুর্কি, ইয়েমেন সহ বিভিন্ন দেশের হত।
দরগাহে সাধারণত সুফিদের কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল
ফলে ইসলামের প্রভাবের সাথে সাথে, সুফিদের নিজ দেশের রুচি, কৃষ্টি, সংস্কৃতির প্রভাব অনুসারীদের জীবনে প্রভাব পড়ত। এরা সবাই মানুষের কাছে গ্রহণীয়-বরণীয় ছিল। মারা গেলে সেখানেই তাদের করব দেওয়া হত। এদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই স্থানীয় মানুষদের সহযোগীটায় গড়ে উঠত দরগাহ।
মোগল আমলে শিয়া প্রভাবে দরগাহে দর্শনার্থীদের সমাগম প্রিয়তা বাড়ে
মোগল আমল পরবর্তী যুগে, শিয়া দর্শনের প্রভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে দরগাহের সংস্কৃতি গড়ে উঠে। পুরানো পরিত্যক্ত বহু কবরও নতুন ভাবে দরগাহ হিসেবে চিত্রিত হয়ে উঠে। কোন দরগাহে দর্শনার্থীদের প্রাচুর্য বেড়ে গেলে সেটা মাজার ও দরবার হিসেবে পরিগণিত হয়।
খানকাহ শব্দটিও ফার্সী যার অর্থ ইসলামী ধর্মশালা বা জ্ঞানকেন্দ্র
‘খানকাহ’ – আমাদের সংস্কৃতিতে আরেকটি প্রভাবশালী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হল ‘খানকাহ’। এই শব্দটিও ফার্সি। খানকাহ শব্দের অর্থ হল ‘ধর্মশালা’। যেখানে বসে বিদেশ থেকে আগত, একজন মৌলভী স্থানীয় মানুষদের ইসলামের সম্যক জ্ঞান বিতরণ করতেন।
তাই খানকাহের পাশে মসজিদ, মাদ্রাসা ও সভা ঘর তথা ওয়াজ নসিহত শোনার জন্য নির্ধারিত স্থান গড়ে উঠে। মানুষ নিজ দায়িত্বে এখানে এসে ইসলামের তালিম নিত। যারা খানকাহ পরিচালিত করত তারা ‘খানেকার’ তথা ‘খোনকার’ হিসেবে পরিচিত হত।
এরা ছিল খুবই সম্মানিত ব্যক্তি ও নিজেরাও সামাজিক মানুষ হিসেবে গ্রহণীয় থাকতেন। তাই মানুষেরা ইজ্জত করে তাদের বাড়ীতে নিয়ে দাওয়াত খাওয়াতেন। তারাও ইসলামের বিভিন্ন দিন, অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যা করে মানুষকে পরিষ্কার ধারনা দিতেন।
পরবর্তীতে খানকাহ এর তদারককারী ‘খোনকার’ হিসেবে সমাজে পরিচিতি লাভ করে
সময়ের চাহিদায় এক সময় খানকাহ গুলো মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে থাকলেও পরবর্তীতে কিছু খোনকার নিজেদেরকে ইসলামের সঠিক পথ প্রদর্শক হিসেবে মুসলিম সমাজের অংশ বানিয়ে নেয়। সুলতানি আমল পরবর্তী তুর্কি আমলে প্রচুর পরিমাণ সূফিরা আমাদের দেশে আসতে থাকে।
তারা বহু খানকাহ সৃষ্টি করে এদেশে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছে। আবার ইসলাম ধর্মের ভিতরে বিভিন্ন তরিকার জন্ম হয়েছে, যেমন কাদিরীয়া, মোজাদ্দেদীয়া, নকশেবন্দিয়া, তৈয়বীয়া, মুনিরীয়া, গাউছিয়া ইত্যাদি। এসব খোনকার যে তরিকার অনুসারী, তিনি স্থানীয় পরিবেশে, তার তরিকা অনুযায়ীই মানুষকে ইসলামের কথা বলতেন।
খোনকার গন ইসলামী তরিকার ব্যাখা দিতেন, তারা অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন
এতে করে শ্রোতা-অনুসারীদের বিরাট জনগোষ্ঠী, নিজের অজান্তেই পুরো একটি তরিকার অনুসারী হয়ে যায়। তাদের সাথে কোরআন-হাদিসের জ্ঞানের সম্পর্ক খুব কমই থাকে, জানার সুযোগ ও কম হয়। অধিকন্তু এসব ব্যাখ্যা শোনার জন্য তারা পুনরায় সেসব খোনকারদের দ্বারস্থ হয়। যার কারণে যে ব্যক্তি যে তরিকার অনুসারী সে দৃঢ়তার সাথে সেই তরিকার প্রচারিত কথাই বিশ্বাস করে। বর্তমান সময়ে খোনাকার শব্দটি তাচ্ছিল্য অর্থে ব্যবহৃত হয় কিন্তু সমাজে তাদের প্রভাব খুবই মজবুত। তারা যথেষ্ট সামাজিক, ফলে সাধারণ মানুষ তাদের কথার বাহিরে যায় না।
পীর শব্দটি ফার্সি যার অর্থ হল জ্ঞানী, মুরুব্বী, প্রবীণ ব্যক্তি, শব্দটি জরথ্রুষ্ট ধর্মমতে প্রবল
‘পীর’ শব্দটিও ফার্সি। এর বাংলা অর্থ হল জ্ঞানী, মুরুব্বী, প্রবীণ ব্যক্তি। পীর শব্দটির প্রভাব মাজুসি (জরথুস্ত-জেন্দাবেস্তা) ধর্মে প্রবল। তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতকে ‘পীরে মুঁগা’ বলে। তাদের ব্যাখ্যায় পীর হল সেই ব্যক্তি যিনি, স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক করে দিতে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
পীর শব্দটি আরবী নয় বলে, এটাকে কোরআন হাদিসের কোথাও পাওয়া যায় না, এমনকি আরবীদের কাছে শব্দটি অপরিচিত
এই পীর শব্দের সাথে কোরআন-হাদিসের কোন সম্পর্ক নেই। আরবি ভাষায় পীর সম্পর্কে কোন কথাও নেই তাই আরবীরা জানে না যে, পীর বলে ইসলামে কোন কথা আছে। তাই বলে আমাদের সমাজে পীরের গুরুত্ব নেই ব্যাপারটি এমন নয়।
ইসলামের পক্ষে কিছু পীরদের শক্ত ভূমিকা আছে
নিশ্চয়ই খোনকারের কথা এখনও মনে আছে। সমাজে পীরদের ভূমিকা ঠিক খোনকারদের মতই, তবে আরো বেশী। খোনকারেরা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীতে গ্রহণীয় হতেন কিন্তু পীরেরা আরো ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সমাদৃত হতেন।
পীরদের মধ্যেও বিভিন্ন তরিকার মতবাদের প্রভাব আছে। ফলে অনুসারীরাও সে মতবাদের দিকে ঝুঁকে বেশী। তারপরও আমাদের দেশে এমন অনেক পীরও আছে, যারা মানুষকে কোরআন-হাদিসের দিকে ডাকে। ফলে পীর নিয়েও মানুষদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়তে থাকে। কেউ কেউ পীরদের ভণ্ড বলে কটাক্ষ করে। ফলে সকল ধরনের পীরেরা এই কথায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
অলি-আউলিয়া শব্দগুলো শতভাগ বিশুদ্ধ আরবী, অলি অর্থ অভিভাবক, বন্ধু, তত্ত্বাবধায়ক, মুরুব্বী
অলি-আউলিয়া শব্দগুলো শতভাগ বিশুদ্ধ আরবী শব্দ। অলি শব্দের অর্থ অভিভাবক, বন্ধু, তত্ত্বাবধায়ক, মুরুব্বী। কখনো শব্দটির অর্থ হয় শাসক, অভিভাবক, কর্তা, নেতা ইত্যাদি। অলি শব্দটি একবচন, বহুবচনে আউলিয়া। সুতরাং বিচ্ছিন্ন ভাবে অলি বললে কথাটি পরিষ্কার হয়না, আল্লাহর অলি শব্দ দ্বারা
ইসলামী জীবনাচরণে অনুরক্ত ভাল মানুষের পরিচয় বুঝায়। পবিত্র কোরআনে ‘অলি’ এবং ‘আউলিয়া’ শব্দগুলোর অসংখ্যবার ব্যবহার দেখা যায়। পবিত্র কোরআনে মুত্তাকী মানুষদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। তবে কোন বিচারেই একজন অলি, মুত্তাকীর সমতুল্য হতে পারে না।
ওরস শব্দটি ‘আরবি’ যার অর্থ বাসর রাতের মিলন
‘ওরস’ শব্দটি আরবি। যার আভিধানিক অর্থ ‘বাসর রাতের মিলন’। হয়ত শব্দের এই ধরনের অর্থ শুনে অনেকে বিভ্রান্ত হবেন! মূলত এটিই সঠিক অর্থ। কেননা প্রতিটি মানুষের কাছে সারাজীবনে সবচেয়ে বড় আনন্দঘন সময় হল বাসরের দেখা-সাক্ষাত।
তাই পীরের দরগাহে এসে, মৃত পীরের আত্মার সাথে দেখা হওয়াটাও বাসরের আনন্দের মতই একটি আনন্দঘন মুহূর্তের মতই। অন্যভাবে পীর সাহেব নিজেও এই দিনে মৃত্যু বরন করে, মহান প্রভু আল্লাহর সাথে দেখা করে, নিজের আত্মাও ওরসের আনন্দের মত বিমোহিত হয়ে উঠে।
তাই অনুসারীরা পীরের জন্মদিন ও মৃত্যুদিনের সময়টিকে ওরস হিসেবে চিত্রিত করে। যদিও কোরআন-হাদিসের কোথাও এই মতের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। রাসুল (সা) এর অনুসারী সাহাবীরা কোনদিন কখনও এই কাজ করে নি।
গাউস শব্দটি আরবী এর অর্থ ত্রানকর্তা, পরিত্রাণ দানকারী, রক্ষাকর্তা – শব্দটি শতভাগ আল্লাহর জন্যেই খাস
গাউস শব্দটিকে আমাদের দেশের মানুষ কিছু অলিদের পিছনে লাগিয়ে দেন। মূলত ‘গাউস’ শব্দের অর্থ হল ত্রাণকর্তা, পরিত্রাণ-দানকারী, রক্ষাকর্তা। তার উপর শব্দটির পিছনে জোড় দেবার জন্য লাগিয়ে দেওয়া হয় ‘আজম’ শব্দযোগে।
আজম শব্দটি বহুল ব্যবহৃত, এর অর্থ শ্রেষ্ঠ পরিত্রাণদান কারী, এই শব্দটিও আল্লাহর জন্যেই খাস
আজম শব্দের অর্থ সর্ব শ্রেষ্ঠ! তাহলে গাউসুল আজম অর্থ হল সর্ব “শ্রেষ্ঠ পরিত্রাণদান কারী”। এই শব্দটি একমাত্র আল্লাহর নামের জন্যই খাটে। কোন সৃষ্টির জন্যই খাটে না। এমনকি রাসুল (সা) জন্যও না। তাহলে একজন অলির পিছনে কিভাবে লাগানো হয়, তাও আবার মৃত মানুষের উপাধি। এই অলি জীবিত থাকলে কি এই ধরণের উপাধি নিতেন।