তরুণ বয়সে মক্কায় মুহাম্মদ (সাঃ) এর সামগ্রিক জীবন
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরুণ বয়সের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, কোন একদিন আমি মক্কার কুরাইশ ছেলেদের সাথে খেলা করছিলাম। আমার সাথিরা তাদের পরনের কাপড় খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে পাথর বহন করছিল। তাদের পরিধেয় বস্ত্র ছিল তাদের গলায় জড়ানো।
আমিও তাদের মত করার উদ্যোগ নিতেই আমি অনুভব করলাম কে যেন অলক্ষ্য থেকে আমাকে আঘাত করলো। অদৃশ্য কণ্ঠে শুনতে পেলাম কে যেন আমাকে বলছে, সাবধান! এমন করবে না! তোমার পরনের কাপড় যথাস্থানে রাখবে। (মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক)
তরুণ বয়সে মুহাম্মদ (সাঃ) এর মক্কায় ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনা বললেন
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তরুণ বয়সের দুটো ঘটনা তাঁর সাহাবাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, ‘আমি এমন দুটো কাজে অগ্রসর হয়ে ছিলাম যে কাজ থেকে মহান আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন।
মক্কায় সে সময়ে রাতে এক ধরণের গানের উৎসব হতো। আমি তখন ছাগল চরাতাম। আমার সাথে অনেক ছেলেই ছাগল চরাতো। একদিন আমি তাদেরকে বললাম, আমার ছাগলগুলোর দিকে তোমরা একটু খেয়াল রেখো, আমি মক্কায় গিয়ে গানের অনুষ্ঠানে যোগদান করি, যে অনুষ্ঠানে অনেক ছেলেরাই যোগ দেয়।
তরুণ বয়সে মুহাম্মদ (সাঃ) কোন উৎসবে গেলে চোখে রাজ্যের ঘুম চলে আসত
তারপর আমি মক্কা শহরে গেলাম এবং বাড়িতে বেশ গান বাজনার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি তাদের একজনকে প্রশ্ন করলাম, এখানে এসব কিসের উৎসব হচ্ছে? লোকটা আমাকে জানালো এখানে বিয়ের উৎসব হচ্ছে। আমি সে উৎসবের স্থানে বসে পড়লাম।
তারপর কোত্থেকে যে আমার চোখে গভীর নিদ্রা নেমে এলো, আমি কোন কিছুই শুনতে পেলাম না। তারপর সকালে রোদের তাপে আমার নিদ্ৰা ভেঙে গেল।’
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
‘আরেক দিনও আমি আমার ছাগলগুলো রাখাল ছেলেদের কাছে দিয়ে চলে এলাম মক্কায়। তারপর যেখানে গানের উৎসব ছিল সেখানে গিয়ে বসলাম। এরপরই আমার চোখে সেদিনের মতই গভীর নিদ্রা এসে গেল। আমি কিছুই দেখতে এবং শুনতে পেলাম না। সকাল পর্যন্ত ঘুমের মধ্যে দিয়েই কেটে গেল। ফিরে এসে আমি আমার সাথিদেরকে জানালো, আজো আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। এই দুই দিনের ঘটনার পর থেকে আর কোন দিন আরবের প্রচলিত কোন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমার মনে দ্বিতীয় বার আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি।’ (ইবনে সাআদ)
মানুষের চেহারা এবং শারীরিক গঠন দেখে ভবিষ্যৎ বাণী করতে পারতো এমন একজন লোক ছিল, যে লোকটা মক্কায় মাঝে মধ্যে যাতায়াত করতো। মক্কার লোকেরা তাঁর কাছে নিজেদের ছেলেদের নিয়ে যেত তাদের ভবিষ্যৎ জানার জন্য।
আবু তালিব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাথে নিয়ে তাঁর কাছে গিয়েছিল। লোকটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এক নজর দেখে অন্য ছেলেকে দেখতে লাগলো। তাকে দেখা শেষ করে তারপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখবে।
লোকটি তাঁর কাজ শেষ করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লো। লোকটার এতটা আগ্রহ দেখে আবু তালিবের ভালো লাগলো না। সে তাঁর ভাতিজাকে আরেক দিকে সরিয়ে দিল।
বারবার সে বলতে লাগলো, ‘ক্ষণিক আগে যে ছেলেটাকে দেখেছিলাম সে ছেলেটা কোথায় গেল? তোমরা ঐ ছেলেটাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। খোদার শপথ! সে এমন একজন মহামানব হবে যার কোন তুলনা হবে না।’ (ইবনে হিশাম)
তরুণ বয়সে মুহাম্মদ (সাঃ) কাবা ঘর পুনঃনির্মানে সক্রিয় কাজ করেছিলেন
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিয়ের পরেও একটা ঘটনা ঘটেছিল। সে বছর কা’বাঘর পূনঃ মেরামতের কাজ চলছিল। তখন নবীর বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর। মেরামত কাজে তিনিও নিজেও সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কাজের সুবিধার্থে সমস্ত লোকজন তাদের পরিধেয় বস্ত্র খুলে মাথায় বেঁধে, পাথর বহন করছিল। তিনিও পাথর বহন করছিলেন।
সে সময়ের মক্কার সমাজে উলঙ্গ হয়ে কাজ করাটা কোন লাজ লজ্জার ব্যাপার ছিল না। তার উপরে ছিল ওটা কাবাঘর মেরামতের মত পবিত্র কাজ। ফলে মানুষ দল-বেঁধেই একাজে নেমে পড়েছিল।
যেমনটি আছে বর্তমানে আছে পশ্চিমা দেশগুলোতে! তাদেরও ন্যায় লজ্জার কোন অনুভূতির অভাব আছে। বর্তমানে পশ্চিমা দেশসমূহে যেমন সী-বীচগুলোয় নারী-পুরুষ, মা-বাবা, সন্তান, ভাই-বোন এক সাথে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সমুদ্র স্নান করে, কোন ধরণের লজ্জানুভব করে না, তেমনি মূর্খতার যুগে আরবের লোকজনও তাই করতো।
তরুণ কিশোর কোন বয়সে মুহাম্মদ (সাঃ) মুহুর্তের জন্যেও উলঙ্গপনা করেন নাই
তাই বিশ্বনবীর চাচা তাঁর ভাতিজাকে, পাথর টানা কাজের সুবিধার্থে অন্য সবার মত উলঙ্গ হয়ে কাপড়টা মাথায় দিয়ে পাথর বহন করতে বললেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনের কাপড় খোলার সবে মাত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।
এমন সময় তিনি জ্ঞানহারা হয়ে মাটিতে পড়ে যান। তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, কেউ যেন তাকে ডেকে বলছেন, ‘হে মুহাম্মদ! তুমি তোমার পরিধেয় যথাস্থানে রাখ।’
নবুওয়্যাত লাভ করার পূর্বে আল্লাহর নবীকে আরবের মূর্তিপূজার কোন কিছু কোনদিন স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি মূর্তির সামনে জবাই-কৃত কোন পশুর গোস্ত আহার করতেন না। এ ধরণের কোন গোস্ত তাঁর সামনে এলে তিনি তা স্পষ্ট ভাষায় খেতে অস্বীকার করতেন।
কুরাইশরা প্রতিদিন রাতে নিদ্রা যাবার পূর্বে দুটো মূর্তির পূজা করে তারপর শয্যায় যেত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই শিশু বয়স থেকেই এসব কাজ থেকে মুক্ত থেকেছেন। (আব্দুর রাজ্জাক, তাবারানী)
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |