লাইলাতুল কদর তালাশ: মতপার্থক্য ও সঠিক বাস্তবতা

লাইলাতুল কদর তালাশ: মতপার্থক্য ও সঠিক বাস্তবতা

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে মতানৈক্য

লাইলাতুর কদর সম্পর্কে সরাসরি কথা না বলে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর পবিত্র কোরআনের যে আয়াত সমূহ কোন মাসের কত তারিখে অবতীর্ণ হয়েছিল, এ সম্পর্কে কে কিভাবে বর্ণনা পেশ করেছেন আমরা সে আলোচনায় না গিয়ে প্রথমে দেখবো, স্বয়ং কোরআনের বক্তব্য এ ব্যাপারে কি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সুরায়ে বাকারাতে ঘোষণা করেছেন:-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۗ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

রমযানের মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে , যা মানব জাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সম্বলিত, যা সত্য –সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয় ৷ কাজেই এখন থেকে যে ব্যক্তি এ মাসের সাক্ষাত পাবে তার জন্য এই সম্পূর্ণ মাসটিতে রোযা রাখা অপরিহার্য এবং যে ব্যক্তি রোগগ্রস্ত হয় বা সফরে থাকে, সে যেন অন্য দিনগুলোয় রোযার সংখ্যা পূর্ণ করে ৷ আল্লাহ তোমাদের সাথে নরম নীতি অবলম্বন করতে চান, কঠোর নীতি অবলম্বন করতে চান না ৷ তাই তোমাদেরকে এই পদ্ধতি জানানো হচ্ছে, যাতে তোমরা রোযার সংখ্যা পূর্ণ করতে পারো এবং আল্লাহ তোমাদের যে হিদায়াত দান করেছেন সে জন্য যেন তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে ও তার স্বীকৃতি দিতে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো ৷ সুরা বাকরা – ১৮৫

পবিত্র কোরআনের ঘোষণানুযায়ী আমরা দেখতে পাচ্ছি, পবিত্র রমজান মাসে এই কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।

রোজার বিধি-বিধান এবং কেন রোজা পালন করতে হবে এ সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারছি। কোরআন কি এবং কেন তা অবতীর্ণ করা হয়েছে এ সম্পর্কে আমরা স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছি।

লাইলাতুল কদর কোরআনে যা বলা হয়েছে

কোন তারিখে এ কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের বক্তব্য হলো:-

﴾إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ﴾ ﴿وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ﴾ ﴿لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ﴾ ﴿تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ﴾ ﴿سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ

এটাকে আমরা অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। তুমি কি অবগত আছো, কদরের রাত কি ? কদরের রাত হাজার মাস থেকেও অধিক উত্তম। ফেরেশতা এবং রূহ তাদের খোদার অনুমতিক্রমে সমস্ত আদেশসহ অবতীর্ণ হয়। সে রাত পূর্ণাঙ্গ শান্তি ও নিরাপত্তার, ফজর আগমন পর্যন্ত। (আল কদর : ১ – ৫)

পবিত্র কোরআন থেকে আমরা জানতে পারলাম রমজান মাসে কদরের রাতে পবিত্র কোরআন তথা প্রথম ওহী বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল।
কিন্তু এ ধারণা আমরা পাচ্ছি না, রমজান মাসের কোন তারিখে কদরের রাত। এ তারিখ সম্পর্কে অবগত হওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো হাদিস এবং হাদিস শাস্ত্রের যারা বিশারদ তাদের গবেষণা।

লাইলাতুল কদর রমজানের কত তারিখে হয়

ইবনে আব্দুল বার এবং মাসউদী বর্ণনা করেছেন, ‘আবরাহার কা’বা আক্রমণের এক চল্লিশ বছরের সময় অর্থাৎ হস্তী বছরের রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নবী হিসাবে নির্বাচিত করা হয়।’

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে কাইয়ুম তাঁর ‘যাদুল মায়াদ’ নামক গ্রন্থে উক্ত তারিখ সম্পর্কে বলেছেন, ‘অধিকাংশ গবেষকগণ এ তারিখ সমর্থন করেছেন।’

অন্যান্য গবেষকগণ বলেন, ‘প্রথম ওহী অবতীর্ণের প্রায় ছয় মাস পূর্ব থেকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যে সত্য স্বপ্ন দেখানো শুরু করা হয়েছিল, তখন থেকে তাঁরা হিসাব করে এ তারিখ নির্ণয় করেছেন।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে ইবনে সাআদের মতামত

কোন কোন গবেষক বলেছেন, রমজান মাসের সাত তারিখে প্রথম কোরআন নাজিল হয়। ইবনে সাআদ বলেছেন, রমজান মাসের বারো তারিখে প্রথম ওহী নাজিল হয়। বাকের বলেছেন, রমজান মাসের সতের তারিখে পবিত্র কোরআনের প্রথম আয়াত অবতীর্ণ হয়। বালায়ুরী ইমাম বাকেরের বর্ণনা পেশ করেছেন।

কোন হাদিসে দেখা যায় হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা এর নামোল্লেখিত বর্ণনায় ঐ তারিখের কথা।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে ইবনে আসীরের মতামত

ইবনে আসীর এবং আতু তাবারী আবু কেলাবাতুল জারমীর বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, সে তারিখ ছিল রমজান মাসের ১৮ তারিখ। আবুল জুলদ, ওয়ালেসা ইবনে আলআসকা এবং জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেছেন, সে তারিখ ছিল রমজান মাসের চব্বিশ।

পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ বলেছেন, পবিত্র কদরের রাতে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। এই কদরের রাত-রমজানের কোন রাত তা কোরআন এবং হাদিসে স্পষ্ট করে না বলা হলেও এটা স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে, রমজানের শেষ দশদিনের মধ্যে যে কোন দিন কদরের রাত।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে উবাদাহ ইবনে ছামেত (রাঃ) মতামত

হাদিস শরীফে বর্ণনা করা হয়েছে, হযরত উবাদাহ ইবনে ছামেত বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে থেকে শুনে বলেছেন, কদরের রাত হলো রমজান মাসের শেষ দশ রাতের মধ্যে এক জোড়াহীন রাত। (অর্থাৎ হতে পারে তা ২১-২৩-২৫-২৭-২৯), (মুসনাদে আহমাদ)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে থেকে শুনে বলেছেন, কদরের রাতকে তোমরা রমজানের শেষ দশ রাতের ভেতরে অনুসন্ধান করো।

রমজান মাস শেষ হতে যখন ৯ দিন অবশিষ্ট থাকে বা ৫ দিন অবশিষ্ট থাকে। অধিকাংশ হাদিস বিশারদগণ এ হাদিসের অর্থ করেছেন বেজোড় রাত। (বুখারী)

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আবু বকর (রাঃ) মতামত

হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন, ৯ দিন, ৭ দিন, ৫ দিন অথবা ৩ দিন অথবা শেষ রাত। এই দিনগুলো তোমরা কদরের অনুসন্ধান করো। (তিরমিজী ও নাসাঈ)

হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে থেকে শুনে বলেছেন, কদরের রাত হলো সাতাশ বা উনত্রিশে রমজানের রাত। (তায়ালসী, আবু দাউদ)

আরেকটি হাদিসে হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন, কদরের রাত হচ্ছে রমজানের শেষ রাত। (মুসনাদে আহমাদ)

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আবু যার (রাঃ) মতামত

হযরত আবু যার রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কে কদরের রাত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল না যে, কদরের রাত ছিল রমজান মাসের সাতাশের রাত।

যেমন হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত হোজাইফা (রাঃ)। (ইবনে আবি শায়বাহ) যির ইবনে হুবাইশ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরেকজন সাহাবী হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কে কদরের রাত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) মতামত

হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু শপথ করে বলেছিলেন, সে রাত হলো রমজানের সাতাশের রাত। (ইবনে হিব্বান, আহমাদ, নাসাঈ, মুসলিম, তিরমিজী ও আবু দাউদ)

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, লাইলাতুল কদরকে তোমরা রমজানের শেষ দশ রাতের ভেতরে বেজোড় রাতে সন্ধান করো। (বোখারী, আহমাদ, মুসলিম ও তিরমিজী)

হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেছেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ রাত ইতেকাফ করতেন।

বিভিন্ন সাহাবাদের রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এর বর্ণনার ভিত্তিতে সেই প্রাচীন কাল থেকেই বিখ্যাত আলেমগণ সমর্থন করেছেন রমজানের সাতাশের রাতকেই।

সুতরাং রমজানের ২৭ তারিখে কদরের রাত এবং এই রাতেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপরে পবিত্র কোরআন প্রথম অবতীর্ণ হয়েছিল-এটাই হলো কোরআন ও হাদিস বিশারদ শ্রদ্ধেয় ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মত।

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *