ইসলামী আন্দোলনে সাফল্য পেতে যে সব শর্তাবলী রয়েছে, বই থেকে তার পিন পয়েন্টগুলো আলোচিত হয়েছে
ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলী বইয়ে লেখক বলেছেন, যারা আসলেই একটি ইসলামী সমাজ কায়েম করতে চান তাদের জন্যে ৩টি শর্ত উল্লেখ করেছেন।
-
১. হতাশার দিক,
-
২. আশার দিক ও
-
৩. করনীয়।
১. হতাশার দিক ৩টি সাফল্যের শর্তাবলী
ক. ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার মানুষের অভাব নেই। আসল অভাব আগ্রহ ও উদ্যোগের, তার চেয়েও বেশী দরকার যোগ্যতার
খ. জাতির প্রভাবশালী অংশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমানে বিকৃতি ও ভাঙ্গনে ব্যস্ত। যারা এগুলোতে নেই তারাও সৃষ্টি ও বিন্যাসে থেকে চিন্তামুক্ত।
গ. সমাজ পরিগঠণ ও ভাঙ্গার বৃহত্তম শক্তি হল সরকার। যেখানে গণতন্ত্র আছে, সেখানে জনগণের উপযুক্ত বা অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের হাতে শাসন ক্ষমতা সোপর্দ করার উপর নির্ভরশীল। এখানে ভাঙ্গার কাজে যারা লিপ্ত তারা জনগণ যাতে নির্ভুল নির্বাচনের যোগ্য হতে না পারে, সে জন্য জনগণকে প্ররোচিত করতে সকল শক্তি ব্যয় করে।
২. আশার দিক ৩টি সাফল্যের শর্তাবলী
ক. আমাদের সমাজে সবাই অসৎ নয়। কিছু সৎলোক আছে যারা সংশোধন ও চরিত্র গঠন করতে চায়। নিজের পরিবর্তনের জন্যে আগ্রহ ও যোগ্যতা আছে।
খ. জাতি সামগ্রিকভাবে অসৎ-প্রবণ নয়। অশিক্ষা, অজ্ঞতার দরুন তরার প্রতারিত হচ্ছে। তবে প্রতারণা প্রবণতাকে তারা ঘৃণা করে। পরিবেশ হলে তারাও সমাজ সংশোধনী শক্তিকে সাহায্য করবে।
গ. বিকৃতর জন্যে যার কাজ করে তারা সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা লাভ করে কিন্তু তারা দুটি জিনিষ অর্জন করতে পারে না। একটি চারিত্রিক শক্তি অন্যটি ঐক্যের শক্তি।
৩. করণীয় সাফল্যের শর্তাবলী
– সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ আল্লাহ তায়ালার নিজের কাজ।
– এজন্য যারা প্রচেষ্টা চালায় তারা আল্লাহর সমর্থন লাভ করে।
– শর্ত এই যে, তাদের ছবর ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা পরিহার করলে চলবে না।
– এ ধরণের লোক যতই স্বল্প সংখ্যক হোক না কেন এবং তাদের সাজ-সরঞ্জাম-উপকরণাদি যতই সামান্য হোক না কেন অবশেষে আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থন তাদের সকল অভাব পূরণ করে দেয়।
বইটি ৫টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে
- ১. ব্যক্তিগত গুণাবলী
- ২. দলীয় গুণাবলী
- ৩. পূর্নতাদানকারীর গুণাবলী
- ৪. মৌলিক ও অসৎ গুণাবলী
- ৫. মানবিক দুর্বলতা
প্রথম ৩টিকে অর্জনীয় ও শেষের ২টিকে বর্জনীয় গুণাবলী বলা হয়
ব্যক্তিগত গুণাবলী সাফল্যের শর্তাবলী
ইসলামকে সার্থক সাফল্যমণ্ডিত করার জন্যে প্রথম দরকারি পূঁজি হল ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট কিছু গুণাবলী অর্জন করা। সে ধরনের ৪টি গুনাবলী নিয়ে লেখক এখানে আলোচনা করেছেন।
- ১. ইসলামের যথার্থ জ্ঞান
- ২. ইসলামের প্রতি অবিচল বিশ্বাস
- ৩. চরিত্র ও কর্ম
- ৪. দ্বীন হচ্ছে জীবনদেশ্য
১. ইসলামের যথার্থ জ্ঞান
– সংক্ষিপ্ত জ্ঞান যথেষ্ট নয়
– কমবেশি বিস্তারিত জ্ঞান প্রয়োজন
– সবাইকে মুফতি মুজতাহিদ হতে হবে এমন না
– তবে প্রত্যেককে ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসকে জনাতে হবে
– ইসলাম ও জাহেলিয়াতের তফাৎ, নীতি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে
২. ইসলামের প্রতি অবিচল বিশ্বাস
– দ্বীনের ভিত্তিতে জীবন ব্যবস্থার উপর অবিচল ইমান থাকতে হবে
– দ্বীনি জীবন ব্যবস্থার সত্যতা ও নির্ভুলতা সম্পর্কে নিঃসংশয় হতে হবে
– কুরআন-হাদিসের কোন বিষয়ে সংশয়, বিশৃঙ্খল চিন্তা থাকা চলবে না।
– কোরআনে বর্ণিত খোদার গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারের উপর দৃঢ় ঈমান রাখতে হবে
– আখেরাতে বিশ্বাস ও হাদিস-কোরআনের বর্ণনা হুবহু বিশ্বাস করতে হবে
৩. চরিত্র ও কর্ম
– যে বস্তুকে সত্য মনে করাবে, তাকে অনুসরণ করতে হবে
– যাকে বাতিল বলে গণ্য করা হবে, তা পরিত্যাগ করতে হবে
– দ্বীনকে নিজের চরিত্র ও কর্মে ফুটিয়ে তুলতে হবে
– অন্যকে যে কাজে আহবান করবে, নিজে তা আগে মানতে হবে
– বর্জনের ক্ষেত্রেও আগে নিজেকে বর্জন করতে হবে
– খোদার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বিচারেই কাউকে ভালবাসতে হবে
– ভয়-ভীতি, লোভ-লালসা, বিরোধিতা-প্রতিকূলতায়, সত্যপথে অবিচল থাকতে হবে।
৪. দ্বীন হচ্ছে জীবনদেশ্য
– দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে এটাকে আকাঙ্ক্ষা না বানিয়ে, জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য বানাতে হবে
– দ্বীন প্রতিষ্ঠায় তারা দৃঢ় সংকল্প হবে
– সময়-সামর্থ্য, ধন-মাল, দেহ-প্রাণের শক্তি এই উদ্দেশেই ব্যয় করবে
– জীবন উৎসর্গের বেলাতেও তারা পিছপা হবে না।
দলীয় গুণাবলী সাফল্যের শর্তাবলী
ব্যক্তিগত গুণাবলীতে আশা ব্যঞ্জক অবস্থানে থাকলেও কেউ একজন সফল হতে পারে না। তাকে সফল হবার জন্যে দলবদ্ধ হতে হয়। সেই দলের সফলতার জন্যেও, দলের কিছু গুণাবলী থাকা দরকার। তারই আলোকে ৪টি পয়েন্টে আলোচনা রয়েছে এই পর্বে।
- ১. ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা
- ২. পারস্পরিক পরামর্শ
- ৩. সংগঠন ও শৃঙ্খলা
- ৪. সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনা
১. ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা
– পরস্পরের জন্যে ত্যাগ স্বীকার
– প্রতিটি ব্যক্তিই প্রসাদের প্রতিটি ইটের মত, তাদের অন্তর থাকবে একই সূত্রে গাঁথা
– অন্তর একত্রিত হয় আন্তরিক ভালবাসা, কল্যাণ কামনা, সহানুভূতি প্রদর্শন ও পরস্পরের ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে
– ঘৃণাকারী অন্তর, মোনাফেকি আচরণ, স্বার্থবাদী ঐক্য ভ্রাতৃত্ব-ভালবাসা সৃষ্টি করে না, বিশৃঙ্খলাকে প্রশস্ত করে
– স্বার্থবাদী ও পার্থিব স্বার্থের জন্যে ঐক্য, বিক্ষিপ্ত হাবার নিমিত্তেই হয়। এতে মহৎ কাজে পরিবর্তে হানাহানি বেশী হয়।
– নিঃস্বার্থ চিন্তার অধিকারী, উদ্দেশ্যের প্রতি অনুরাগী ও নিজদের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালবাসা তৈরি হলেই মজবুত দল তৈরি হয়।
২. পারষ্পরিক পরামর্শ
– পরামর্শের ভিত্ততে কাজ, নীতি নিয়ম মেনে চলা
– প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী চললে সে দল হয় জন-মণ্ডলী ও স্বেচ্ছাচারী
– দলের এক ব্যক্তি বা প্রভাবশালীদের ইঙ্গিতে দল চললেও তাও বেশী দিন টিকে না।
– একমাত্র পরামর্শের মধ্যেই এই কাজ সম্ভব। এতে বহু লোক ভাল-মন্দ নিয়ে বিতর্ক করে, অবশেষে ভাল সিদ্ধান্তে আসা যায়।
এই পদ্ধতিতে আরো দুটি বড় ফায়দা হাসিল হয়, তাহল
- ক. যে কাজের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সমগ্র দলের পরামর্শ কার্যকরী থাকে, সমগ্র দল তা মানসিক নিশ্চিন্ততার সাথে সম্পাদন করে, তাই এখানে ভাবা হয় না যে, এগুলো উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- খ. সমগ্র দল উদ্ভূত ঘটনাবলী ও সমস্যা থেকে শিক্ষা লাখ করে। প্রত্যেক ব্যক্তি দল ও কাজের প্রতি আগ্রহ পোষণ করে, সব সিদ্ধান্তকে নিজের সিদ্ধান্ত মনে করে। কিন্তু শর্ত থাকে যে, পরামর্শের ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৩. সংগঠন ও শৃঙ্খলা
-শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, পারষ্পরিক সহযোগিতা নিয়ে টিমের মত কাজ করা
– ধ্বংস মূলক কাজ হৈ-হাঙ্গামার সাহায্যে সমাধা হতে পারে কিন্তু গঠনমূলক কাজ সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া সম্পাদিত হয় না।
– কর্তৃত্ব-শীলের নির্দেশাবলী মানা, প্রতিটি ব্যক্তি কর্তব্যনিষ্ঠ হওয়া, যথা সময়ে কাজ নিষ্ঠার সহিত শেষ করা
৪. সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনা
– সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনার যোগ্যতা থাকা বাঞ্ছনীয়
– অন্ধ অনুসারী সরলমনা ভক্তবৃন্দ যতই সঠিক ও নির্ভুল কাজে অগ্রসর হোক না কেন মানবিক দুর্বলতায় তা বিকৃত হয়।
– যখন মানবিক দুর্বলতার প্রতি নজর রাখার কেউ থাকেনা, তা দোষ হিসেবে বিবেচিত হয় না, তখন অক্ষমতা ও গাফিলতি বেড়ে যায়।
– এতে বিভিন্ন মানবিক দুর্বলতা, নিরুদ্বেগ বেড়ে প্রবল আকার ধারণ করে
– সঠিক উদ্দেশ্যে সমালোচনা দলের জন্যে বড় কল্যাণকর হয়ে উঠে। দোষ ত্রুটি সহজে ভেসে উঠে ও তা শনাক্ত করা সহজে সম্ভব হয়।
– একজন দোষ সন্ধানকারী সমালোচকের উদ্দেশ্যমূলক বেয়াড়া, বেকায়দা, অ-সময়োচিত ও বাজে সমালোচনা দলকে বড় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়।
পূর্ণতাদানকারী গুনাবলী সাফল্যের শর্তাবলী
– পূর্ণতা-দানকারী গুণাবলীকে লেখক অপরিহার্য গুণাবলী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। কেননা
– ইতিপূর্বে যে দুটো গুণাবলী নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলো মূলত নিছক প্রারম্ভিক, মৌলিক গুণাবলীর পর্যায়ভুক্ত।
– ব্যবসা শুরু করতে হলে যেমন সর্বনিম্ন একটি পুঁজির প্রয়োজন হয়, যা না হলে ঐ ব্যবসা শুরু করাই যেতে পারে না, সেগুলো তেমনই।
– ওগুলো ছাড়া সমাজ সংশোধন ও ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা পরিগঠণের কাজ শুরু করাই যেতে পারে না।
– যেসব লোক ইসলাম সম্পর্কে অবগত নয়, নিজেদের চরিত্র, কর্ম ও বাস্তব জীবনের ধর্মে পরিণত করতে সক্ষম হয়নি, ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে নিজের জীবনোদ্দেশ্যে পরিণত করেনি। তাদের উপরের গুণাবলী থাকার পরও তা দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা যায় না।
– ফলে যে গুণাবলীর অভাবে আসল কাজটি শুরু করা যায় না, সেই গুণাবলী তথা পুর্ণতাদানকারী গুণাবলীকে ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
- ১. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ও আন্তরিকতা
- ২. আখেরাতের চিন্তা
- ৩. চরিত্র মাধুর্য
- ৪. ধৈর্য
- ৫. প্রজ্ঞা
১. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ও আন্তরিকতা
– দুনিয়ার সকল কাজ ব্যক্তি, পরিবার, গোত্র, জাতি বা দেশের জন্যে করা যেতে পারে
– ব্যক্তি-স্বার্থ ও ব্যক্তিগত লাভ আল্লাহকে বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস করেও হয়, সেভাবে পার্থিব সাফল্যও লাভ হয়। কিন্তু
– ইসলামী জীবন ব্যবস্থা কায়েম আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ব্যতিরেকে হয়না
– আল্লাহর সন্তুষ্টিই এখানে মূল বিষয় তাই সব আল্লাহর তরেই হয় এবং তা অন্তরে বিশ্বাস ও কর্মে প্রমাণ দিতে হয়।
– ভয়, লোভ-লালসা, গোত্র প্রীতি, আনুগত্যের মিশ্রণ বা স্বার্থ অন্তর্ভুক্তি এ কাজকে বিচ্যুত করে।
২. আখেরাতের চিন্তা
– দুনিয়া মুমিনের কর্মস্থল এবং সব উপার্জনের ফল পাবে আখিরাতে
– দুনিয়ার ফলাফলের জন্যে মুমিন অপেক্ষায় থাকে না।
– যে কাজে আখেরাতে লাভ তা গ্রহণ করা, যে কাজ আখেরাতে লোকসান আনে, মুমিন তা পরিত্যাগ করে
– দুনিয়ার কোন শাস্তি বা পুরস্কারের গুরুত্ব না থাকা স্বত্বেও, আখিরাত তার কাছে গুরুত্ব পায়
– দুনিয়ার প্রশংসা ও পুরস্কারের আশা না করে যা করা হল, তা আল্লাহর জন্যে করা হল এবং প্রতিদান আখেরাতে অবশ্যই ফিরে পাব এই চিন্তায় দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী হওয়া।
৩. চরিত্র মাধূর্য
– চরিত্র মাধুর্য গুনটির প্রভাব বিরাট বিজয় পেতে সহায়ক হয়
– আল্লাহর পথের সৈনিকদের উদার হৃদয়, বিপুল হিম্মত, সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিশীল ও মানব দরদী হতে হয়।
– তারা হবে ভদ্র, কোমল স্বভাবের, আত্মনির্ভরশীল, কষ্টসহিষ্ণু, মিষ্টভাষী ও সদালাপী
– তাদের দ্বারা ক্ষতি হতে পারে এমন ধারণা কারো তৈরি না হওয়া; বরঞ্চ তাদের সদাচার ও উপকার পারে এমনই ধারণা থাকা।
– নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করবে, অন্যের গুনের কদর করবে
– তারা অন্যের দুর্বলতার প্রতি নজর না দেবার মত হৃদয়ের অধিকারী হয়
– অন্যের বাড়াবাড়ি ও দোষ মাফ করে, প্রতিশোধ স্পৃহা থাকে না
– অন্যের সেরা গ্রহণ নয় বরং অন্যকে সেবা দান করাই তাদের ব্রত হয়
– প্রসংশার জন্যে অপেক্ষা, নিন্দাবাদের তোয়াক্কা না করে কর্তব্য কাজে দায়িত্ব পাল করে
– মানুষ ও সংগঠনের পুরষ্কারের আশার চাইতে আল্লাহর নিকটি সকল পুরষ্কারের আশা করে
– ধন-সম্পদে বা বল-প্রয়োগে তাদের কেনা যাবেনা কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের সামনে তারা সহজেই ঝুঁকে পড়ে।
– যাতে শত্রুরাও বিশ্বাস করে যে, সে সততা, ভদ্রতা, ন্যায়নীতি বিরোধী কোন কর্মে সহযোগিতা করবে না।
– ভয়-ভীতি, লোভ-লালসা দিয়ে নয় বরং চারিত্রিক গুণাবলি দিয়ে মানুষের মন জয় করে।
৪. ধৈর্য
– ধৈর্য সব সাফল্যের চাবিকাঠি
– ধৈর্য অর্থ তাড়াহুড়ো না করা, তড়িৎ ফল আশা না করা, অস্থির না হওয়া, বিলম্ব দেখে হিম্মত না হারানো
– ধৈর্যশীল ব্যক্তি একটি উদ্দেশ্য সম্পাদনের নিমিত্তে অনবরত পরিশ্রম করতে থাকে। কোন ব্যর্থতা তাকে বিরত করতে পারে না।
– ধৈর্য অর্থ তিক্ত স্বভাব, দুর্বল মত ও সংকল্প-হীনতায় আক্রান্ত না হওয়া।
– ধৈর্যের আরেক অর্থ, বাধা-বিপত্তি বীরোচিত ভাবে মোকাবেলা ও শান্ত চিত্তে লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করা
– ধৈর্যশীল ব্যক্তি পর্বত প্রমাণ তরঙ্গা-ঘাতে হিম্মত-হারা না হওয়।
– ধৈর্য অর্থ দুঃখ ভারাক্রান্ত ও ক্রোধান্বিত না হওয়া বরং কষ্ট সহিষ্ণু হওয়া
– ধৈর্য অর্থ গাল খেয়ে হাসবার মত, নিন্দাবাদ হজমের ক্ষমতা অর্জন করা
– ধৈর্য অর্থ কাঁটাযুক্ত বনে হাঁটতে গেলে কাপড়ের যে অংশ কাঁটার সাথে লেগে থাকে, সেই অংশ ঐ অবস্থায় রেখে হাঁটতে থাকা
– ধৈর্য অর্থ সকল প্রকার ভয়-ভীতি লোভ-লালসার মোকাবেলায় সঠিক পথে অবিচল থাকা
– ধৈর্য অর্থ নফসের খায়েশের বিপক্ষে থাকা, হারাম থেকে বাঁচা ও গোনাহের কাজ প্রত্যাখ্যান করা
– আর ধৈর্য-হীনতা যাবতীয় কুফল ও সকল অনিষ্ঠের মুল কারণ।
৫. প্রজ্ঞা
– প্রজ্ঞা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ গুন, সকল প্রকার সাফল্য এই প্রজ্ঞার উপর নির্ভরশীল
– দুনিয়ার সক জীবন ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে উন্নত পর্যায়ের কিছু বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল লোকদের দ্বারাই
– তাদের পিছনে ব্যক্তিগত উপায় উপকরণের সাথে বুদ্ধি, চিন্তা-শক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল ক্ষমতাও কাজ করছে
– এদের মোকাবেলায় বিসমিল্লাহর গম্বুজে যাদের বসবাস তারা যতই সরলমনা, সৎ ও নেক-দিল সম্পন্ন হউক না কেন গভীর চিন্তা, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, গভীর দৃষ্টি ও বিবেনা শক্তি অভাবে একাজ সম্পাদন হবেনা।
– বিপরীতে উদ্ধৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, বিচার-বিবেচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জীবন সমস্যা বুঝার ও সমাধানের যোগ্যতার রাখে এক কথায় এগুলোকে প্রজ্ঞা বলে।
– প্রজ্ঞার অভিব্যক্তি হল মানসিক, মনস্তত্ব অনুধাবন করে মানুষের সাথে ব্যবহার করা। নিজের দাওয়াত প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ব্যক্তির মন-মগজ, মেজাজ, রোগ নির্ণয় পূর্বক ব্যবহার করা।
– নিজের বিরুদ্ধে বাধা-বিপত্তি, প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা ও বিরোধিতার মোকাবেলায় নিজের উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তা জনে উদ্দ্যেশ্য সফল কতরে হয়।
– দ্বীনের ব্যাপারে সূক্ষ্ম তত্ত্বজ্ঞান, দুনিয়ার ব্যাপারে তীক্ষ্ণ-দূরদৃষ্টি থাকতে হবে
– শরীয়তের বিধিনিষেধ ও মাসয়ালা অবগত হয়ে উপস্থিত ঘটনা, বিশ্লেষণ মুফতির জন্যে যথেষ্ট হতে পারে কিন্তু বিকৃত সমাজের সংশোধন জাহেলিয়াত উৎপাটন পূর্বক সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা অত সহজ নয়।
– এই সব গুন একজনের কাছে এর উপাদান গুলো আছে কিনা, যদি থাকে তা সুপ্ত অবস্থায় হোক কিংবা প্রকাশিত তার দ্বার একাজ হবে। যেমন মাটিতে বীজ থাকলেই কেবল চেষ্টা মাধ্যমে একটি চারা গাছ জন্মা সম্ভব হয় নতুবা নয়।
প্রথমত: উপরোক্ত বিষয়টি লেখক বর্ণনা করার পর অভীপ্সিত গুণাবলীকে তিন অংশে ভাগ করেছেন। আন্দোলন সাফল্যের এ কাজে অংশ-গ্রহণকারী সকল ব্যক্তির কাছে এই গুণ থাকা চাইই।
- ১) দ্বীনের নির্ভুল জ্ঞান;
- ২) তার প্রতি অটুট বিশ্বাস;
- ৩) সে অনুযায়ী চরিত্র গঠন ও কর্ম সম্পাদন;
- ৪) তাকে প্রতিষ্ঠিত করাকে নিজের জীবনোদ্দেশ্যে পরিণত করা।
দ্বিতীয়ত: যে দল এ কাজ সম্পাদনে অগ্রসর হবে, তার মধ্যে যে সব গুণ থাকা উচিৎ সেগুলো হচ্ছে,
- ১) পারস্পারিক ভালোবাসা, সু-ধারণা, আন্তরিকতা, সহানুভূতি, কল্যাণ কামনা ও পরস্পরের জন্যে ত্যাগ স্বীকার।
- ২) সংগঠন, শৃঙ্খলা, সুসংবদ্ধতা, নিয়মানুবর্তিতা, সহযোগিতা ও টীম স্পিরিট;
- ৩) সংশোধনের উদ্দেশ্যে সমালোচনা, পরামর্শের ভিত্তিকে কাজ, ভদ্রতার সাথে, যুক্তিসংগত পদ্ধতি উপস্থাপন করা।
তৃতীয়ত: দ্বীনের পথের সংগ্রামকে নির্ভুল পথে পরিচালিত ও সফল করার জন্যে যে সব গুণ অপরিহার্য সেগুলো হচ্ছে,
- ১) আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন ও তার সন্তুষ্টির জন্যে কাজ করা;
- ২) আখেরাতের জবাবদিহিকে স্মরণ রাখা এবং আখেরাতের পুরস্কার ভিন্ন অন্য কিছুর প্রতি নজর না দেয়া;
- ৩) চরিত্র মাধুর্য;
- ৪) ধৈর্য;
- ৫) প্রজ্ঞা।
মৌলিক ও অসৎ গুনাবলী সাফল্যের শর্তাবলী
লেখক মানুষের ৩ টি গুণাবলীকে মৌলিক ও অসৎ-গুণাবলী বলেছেন। এই ৩টি অসৎ গুনকে সকল প্রকারের সৎগুনের মূলোৎপাটন-কারী প্রধান বলা হয়েছে। এগুলো সকল মানুষের চরিত্র সংগোপনে লুকিয়ে থাকে বলেই, এগুলোকে মৌলিক বলা হয়েছে। এগুলোর একটিও যদি কারে চরিত্রে ভর করে, তাকে অসৎ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার জন্যে যথেষ্ট। সেই ৩টি অসৎ গুণাবলী হল,
- ১. গর্ব ও অহংকার
- ২. প্রদর্শনেচ্ছা
- ৩. ত্রুটিপূর্ণ নিয়ত
১. গর্ব ও অহংকার
– এটা সৎগুনের মূলোৎপাটনাকারী খারাপ গুন
– এটা শয়তানী ধারণা ও তার প্রেরণা থেকেই তৈরি হয়
– অহঙ্কার মিশ্রিত গুন দ্বারা সৎকর্ম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না
– বান্দার এ গুনটিকে আল্লাহ বেশী অপছন্দ করে
– এমন ব্যক্তি অনবরত মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়
– ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়
– সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারীদের মধ্যেও এ রোগ অনুপ্রবেশ করে
– সংকীর্ণমনা লোকদের এ রোগ বিশেষ পথে আক্রমণ করে
– দ্বীনের দাওয়াতের কারণে তাদের নৈতিক মান ভাল হয়
– জনসেবা মূলক কাজও তারা সম্পাদন করে
– ফলে তাদের প্রশংসা ও স্বীকৃতি শোনা যায়, শয়তান ওয়াস ওয়াসা দেয়
– এতে ঐ ব্যক্তি ভুল পথে অগ্রসর হয়
উপরোক্ত রোগ থেকে বাঁচার উপায় ৪ টি
- ক. বন্দেগীর অনুভূতি
- খ. আত্ম-বিচার
- গ. মহৎ ব্যক্তিদের প্রতি দৃষ্টি
- ঘ. দলগত প্রচেষ্টা
ক. বন্দেগীর অনুভূতি
– অহঙ্কার শুধু আল্লাহর জন্য শোভা পায়
– আল্লাহর তুলনায় অসহায়ত্ব ও দীনতা অনুভব করা
– অক্ষমতাই বান্দার মূল পরিচিতি
– আল্লাহর মেহেরবানীর আশা করা
– প্রতিটি কাজে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
খ. আত্ম-বিচার
– ব্যক্তি নিজের সৎ গুণাবলী অনুভব করার সাথে সাথে নিজের অন্যান্য দুর্বলতা, যেমন দোষ, ত্রুটি, বিচ্যুতিগুলো স্মরণ করা
– এতে আত্ম-প্রীতি ও আত্মম্ভরিতা আসবে না।
গ. মহৎ ব্যক্তিদের প্রতি দৃষ্টি
– সর্বদা নিজের অধস্তন ব্যক্তিদের দিকে তাকিয়ে নিজের অবস্থান পর্যালোচনা না করা
– তাদের চাইতে অনেক সম্মানী ও মর্যাদাবান হিসেবে না দেখা
– বরং উন্নত চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিদের প্রতি নজর দেওয়া
– তাদের গুনগত মানের চাইতে নিজের মানের তফাৎ দেখা
ঘ. দলগত প্রচেষ্টা
– দলকে হরহামেশা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে
– যথা সময়ে তার বিপক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া
– এতে এ জাতীয় দীনতা, হীনতা দুর করা সম্ভব হবে
২. প্রদর্শনেচ্ছা
– এই অসৎগুন প্রতিটি সৎকাজের উদ্দেশ্য ও কর্মকে আহত ও দুর্বল করে
– ব্যক্তি বা দল নিছক প্রশংসার উদ্দেশ্যে এ কাজ করে
– এটা ঈমানের পরিপন্থী এবং এটা প্রছন্ন শিরক বলা হয়
– অথচ এটা আখেরাতের ফলের আশায় করা উচিৎ ছিল
– কিন্তু তারা মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন পূর্বক মানুষের নিকটি পুরষ্কার আশা করে
– এই প্রবলতায় সৎকাজের উদ্দেশ্যেই সফল হয় না।
– যারা ব্যাপক পরিমণ্ডলে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সম্পৃক্ত তাদের এ ব্যাপারে লুকানো যেমন কঠিন আবার এটাকে প্রকাশ করার সুযোগ ও বেশী হয়।
উপরোক্ত রোগ থেকে বাঁচার উপায় ২ টি
- ক. ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা
- খ. সামষ্টিক প্রচেষ্টা
ক. ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা
– সংগোপনে চুপি চুপি কিছু সৎকাজ করা
– এখান থেকে দুনিয়াবি প্রশংসার কাজগুলো নির্ধারণ করা
– অতঃপর সাধান হওয়া ও লোকচক্ষুর অন্তরালে তা সম্পন্ন করা
খ. সামষ্টিক প্রচেষ্টা
– দল এই কাজকে সমর্থন না করা
– কাজের প্রকাশ ও প্রচারকে যথাযথ সীমাবদ্ধ রাখা
– শুধু জনপ্রিয়তার জন্যে কাজের পিছনে ধাবিত না হওয়া
– দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নিন্দাবাদে উদ্যম না হারানো
– আবার প্রশংসায় নবোদ্যমে অগ্রসর হওয়ার মনোবৃত্তি পরিহার করা
৩. ত্রুটিপূর্ণ নিয়ত
– ত্রুটি নিয়তে সৎকাজের ভিত্তি স্থাপন হয় না।
– ত্রুটিপূর্ণ নিয়তের কাজে আন্তরিকতা থাকেনা, প্রচেষ্টা সফল হয়না
– দলীয় কাজে ব্যক্তিগত পার্থিব স্বার্থ জড়িয়ে যায়
– সৎকাজের উদ্দেশ্যের সাথে কোন প্রকার পার্থিব স্বার্থ থাকা উচিত নয়।
– এ ধরনের স্বার্থ-প্রীতি আল্লাহর সাথে মানুষের প্রাপ্য নষ্ট করে
– নিয়তের ত্রুটি কাজের উপর প্রভাব পড়ে, ফলে সাফল্য লাভ হয় না।
– নিয়ত পার্থিব স্বার্থ বিবর্জিত, আল্লাহর সন্তুষ্টি মূল বিষয় হতে হবে
– ব্যক্তিগত লাভে আশা করা যাবেনা।
– আংশিক সৎকাজের সময় হয়ত নিয়তকে ত্রুটিমুক্ত রাখা যায়, কিন্তু
– যারা সারা দেশের জীবন-ব্যবস্থা সংশোধনে দায়িত্ব নিবে তাদের নিয়তের ত্রুটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মোড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
– যারা নিজের জন্যে ক্ষমতা চায়, আর যারা নিজের আদর্শের জন্যে ক্ষমতা চায়, উভয়ে ক্ষমতা পেলেও নিয়তের কারণে উভয়ের কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিরাট পার্থক্য সূচিত হবে।
– নিয়তের ফলে নীতি ও আদর্শের জন্যে কর্তৃত্ব চাওয়া আর নিজেদের নেতার জন্যে কর্তৃত্ব চাওয়ার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান।
– যারা সাচ্চা দিলে ইসলামী নীতি আদর্শ অনুযায়ী জীবন ব্যবস্থার সার্বিক কর্তৃত্ব চায়। তাদের ব্যক্তিগতভাবেও উপরোক্ত পার্থক্য গুলো হৃদয়ঙ্গম করে নিয়তকে ঠিক রাখা উচিত।
মানবিক দুর্বলতা সাফল্যের শর্তাবলী
লেখক মানবিক দুর্বলতা অধ্যায়ে ১৪টি দুর্বলতাকে সামনে এনেছেন। এগুলো মানুষের নৈতিক ভিত্তিমূলকে ধসিয়ে না দিলেও, কাজকে বিকৃত করে। এসব থেকে সৃষ্ট গাফিলতি ধ্বংসের কারণ হয় এবং সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এগুলোর একটি দোষ অনেক দোষের সৃষ্টি করে, গ্রহণযোগ্যতা কমে। যিনি সমাজ সংশোধন ও সত্য দ্বীন প্রচার করবেন, তার কাছে এমন দোষ থাকলে ব্যক্তি ও সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ১৪ টি দুর্বলতা নিম্নরূপ,
- ১. আত্ম-পূজা
- ২. আত্ম-প্রীতি
- ৩. সত্যের প্রকাশ
- ৪. হিংসা ও বিদ্বেষ
- ৫. গীবত
- ৬. কু-ধারণা
- ৭. চোগলখোরি
- ৮. কানাকানি ও ফিসফিসানি
- ৯. মেজাজের ভারসাম্যহীনতা
- ১০. একগুঁয়েমি
- ১১. একদেশদর্শীতা
- ১২. সামষ্টিক ভারসাম্যহীনতা
- ১৩. সংকীর্ণমনতা
- ১৪. দুর্বল সংকল্প
১. আত্ম-পূজা
– সবচাইতে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী দুর্বলতা
– নির্ধারিত সীমানার মাঝে তা দূষণীয় নয়
– আল্লাহ তা মানুষের ভালোর জন্যে এ প্রেরণা দিয়েছেন
– কিন্তু শয়তানের দ্বারা এ গুন নিয়ন্ত্রিত হলে, তার অগ্রগতির প্রতিটি ধাপে নতুন দোষের জন্ম নেয়।
২. আত্ম-প্রীতি
– এক্ষেত্রে মানুষ নিজেকে ত্রুটিহীন ও গুণাবলীর আধার মনে করে
– এতে নিজের দোষ ও দুর্বলতার অনুভূতিকে ঢাকা দেয়
– নিজের দোষ ত্রুটির ব্যাখ্যা করে নিজেকে ভাল হিসেবে ভাবে
– অতঃপর আমি কত ভালো রে, এ ধারণা বদ্ধমূল হয়
– তখন সে প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত হয়, উপদেশ দিতে থাকে
– নিজেকে মর্যাদাবান মনে করে কিন্তু অন্যকে মর্যাদা দেয় না
– মর্যাদাবান হয়ে কেউ নিচ থেকে উপরে উঠুক, সেটায় বাধা তৈরি করে
– এই খাসিয়ত হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়
– যারা সমাজ সংশোধন ও পরিগঠনের কাজ চালায় তাদের এ রোগ থেকে মুক্ত হওয়া প্রাথমিক ভাবেই জরুরী
বাঁচার উপায় – তওবা ও এস্তেগফার
– নিজের দুর্বলতাগুলো খুঁজে সেগুলোর জন্যে তওবা এস্তেগফার পড়া
– বিরাট কাজ করার পরও বুক না ফুলিয়ে দীনতার সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া
– যে কাজ করা হয়েছে সেগুলোতে অপূর্ণতা রয়েছে এমন ভেবে আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া।
– আমরা যতই ভাল কাজ করি, তা রাসুল (সাঃ) এর মত হবেনা, সেই নবী বলেছেন,
“খোদার কসম আমি প্রতিদিন সত্তর বারেরও বেশী আল্লাহর নিকট এস্তেগফার ও তওবা করি।” (বুখারি)
৩. সত্যের প্রকাশ
– আত্ম-প্রীতি ত্রুটিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে
– নিজের মতামত কথার স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করে
– অন্য কেউ সমালোচনা করলে বরদাশত করে না।
– ইসলামী শরীয়ত সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা বাধ্যতামূলক করেছেন।
– বিশেষ করে জালেমের সম্মুখে সৎ কথা বলার মত কাজ করা
– এভাবে সত্যের প্রকাশ ঘটাতে পারলে অন্তরে আত্ম-প্রীতি সৃষ্টি হয় না।
৪. হিংসা ও বিদ্বেষ
– হিংসা সকল পুণ্য কাজকে খেয়ে ফেল তথা নষ্ট করে
– হিংসা মরীচিকার ন্যায় অন্তরকে লোহার মত বরবাদ করে
– রাসুল (সাঃ) হিংসা করতে নিষেধ করেছেন
– হিংসা বড় বড় গুনাহের পথ প্রসস্থ করে
৫. গীবত
– গীবত ও কু-ধারনার আরেকটি পর্যায়
– এটা মূলত প্রতিপক্ষকে লাঞ্ছনা ও হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যেই হয়
– গীবত সত্য হলে গীবত হয় আবার মিথ্যা হলে অপবাদ হয়
– গীবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার নামান্তর বলেছেন
– গীবত কারীর ভাল আমলগুলো, কেয়ামতের দিন হাতছাড়া হয়ে যাবে
– আল্লাহ বলেছেন, গীবত হলো জুলুমের নামান্তর।
৬. কু-ধারণা
– কু-ধারনায় গোয়েন্দা মনোবৃত্তি তৈরি হয়, ছিদ্রান্বেষণ প্রবণতা বাড়ে
– সাইকে খারাপ ভাবার প্রবণতা দেখা দেয়
– কারো আপত্তিকর কিছু দেখলে, হামেশা খারাপ ব্যাখ্যা দিতে থাকে
– ভাল ব্যাখ্যা করা সম্ভবপরই হয়না এমনকি ভালো অনুসন্ধানের যোগ্যতাও হারায়
– গোয়েন্দা গিরিতে লপ্ত হয় এবং খারাপ দিক গুলোই অনুসন্ধান করে
– অথচ খারাপ ধারনাকে আল্লাহ হারার ঘোষণা করেছেন
৭. চোগলখোরি
– দু’জনের বন্ধু সেজে উভয়ের মাঝে ঝগড়া লাগানোর চরিত্রকে চোগলখোরি বলে
– চোগলখোর দু’জনেরই বন্ধু সাজে কিন্তু দুই জনেরই অমঙ্গল চায়
– দুই জনের কথা মন দিয়ে শুনে, তবে কারো খারাপ কথার প্রতিবাদ করেনা।
– গীবতের জ্বালানো আগুনে চোগলখোরির বিস্তার ঘটায়
– চোগলখোরি কারো কল্যাণকামী হয়না
– চোগলখোরি গীবতের চাইতেও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী খারাপ গুন
– রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না”
– আরো বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই সবচেয়ে খারাপ যার দুটি মুখ আছে”
৮. কানাকানি ও ফিসফিসানি
– কালে ফিসফিস করে কথা-বার্তা, সলা-পরামর্শ করা
– এতে সন্দেহ সংশয় ও ঘৃণা-বোধ বেড়ে যায়
– নেতৃত্ব মজবুত হলেও, ষড়যন্ত্র ও দলাদলি বেড়ে যায়
– আল্লাহ বলেছেন, “কানাকানি হচ্ছে শয়তানের কাজ”
– ইসলামী শরীয়ত কানাকানির বেলায় যথেষ্ট কঠোর
কানাকানির বিকল্প
– যাবতীয় আলোচনা প্রকাশ্যে এবং সামনে হওয়া উচিত
– প্রতিপক্ষের স্বীকৃতির জন্যে যুক্তিপূর্ণ ও উত্তম আলোচনা করতে হবে
– দলত্যাগ করে নয় বরং দলের ভিতরে থেকে আলোচনা রাখতে হবে
– অন্যতায় দল কু-ধারনা, হানাহানি ও দলাদলিতে লিপ্ত হয়
– গোপন শলা-পরামর্শ দলে উপদল তৈরির প্রবণতা সৃষ্টি করে
– দলে আঞ্চলিকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে
– দলে সৎ নেতার নেতৃত্ব থাকলেও, সে দল উপদলে বিভক্ত হবেই
– দলে এ জাতের কোন্দল তৈরি হলেও, নিজেকে দূরে রাখতে হবে
– এমন অবস্থার জন্যে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “নিদ্রিত ব্যক্তি জাগ্রত ব্যক্তির চেয়ে ভাল, জাগ্রত ব্যক্তি ও দণ্ডায়মান ব্যক্তির চেয়ে ভাল আর দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলন্ত ব্যক্তির চেয়ে ভাল”
৯. মেজাজের ভারসাম্যহীনতা
– এই সমস্যার অধিকারীরা সমস্যা দেখা ও উপলব্ধিতে এক চোখা নীতি গ্রহণ করে
– এরা ভারসাম্যহীন পরিকল্পনা গ্রহণ করে ও বাস্তবায়নে অসম-পদ্ধতি পালন করে
– চরমপন্থি পরিকল্পনা বন্ধ করতে আরো চরমপন্থা অবলম্বন করে
১০. একগুঁয়েমি
– এরা বস্তু একদিক দেখে, ফলে প্রত্যেক বিষয়ের এক দিক টাকেই গুরুত্ব দেয়, অন্যদিক দেখে না।
– যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, সেটাকেই আঁকড়ে ধরে, অন্য আরেকটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটাকে অবজ্ঞা করে।
– তার দৃষ্টিতে কোন কিছু খারাপ মনে করলে, সর্বশক্তি নিয়োগ করে, আবার তার চেয়েও খারাপ কে ছেড়ে দেয়।
– নীতিবান মানুষ হবার পরও স্থবিরতা আসে জীবনে। বাস্তব জীবনে কার্যক্ষেত্রে নামলে নীতিহীন হয়ে পড়ে এবং ন্যায় অন্যায় সকল উপায় অবলম্বন করতে দ্বিধা করে না।
১১. একদেশদর্শীতা
– ব্যক্তি নিজের মতের উপরে প্রয়োজনের অধিক জোড় দিতে থাকে
– মতবিরোধের বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করে
– অন্যের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে ন্যায়ের দৃষ্টিতে দেখে না, বুঝতে চেষ্টা করে না।
– বিরোধী মতামতকে নিকৃষ্টতম অর্থ করে হেয় প্রতিপন্ন করতে থাকে
– ফলে দিন দিন সে অন্যের জন্যে এবং অন্যরা তার জন্যে অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে
১২. সামষ্টিক ভারসাম্যহীনতা
– ব্যক্তি একজন হলে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে
– দল বা সংস্থায় অনেক জন হলে, গ্রুপিং তৈরি হয় এবং মতবিরোধ চরমপন্থায় রূপ নেয়।
– নেতাদের এই রোগ থাকলে মতবিরোধ চরম হয় ও দল টুকরা টুকরা হয়ে যায়।
১৩. সংকীর্ণমনতা
– কোরআনে বলা হয়েছে “যে ব্যক্তি সংকীর্ণমনতা থেকে রেহাই পেয়েছে সে সফলকাম হয়েছে”
– এরা যে সুযোগ পেতে চায় তা আবার অন্যকে দিতে চায় না।
– নিজের দোষকে ক্ষমা-যোগ্য মনে করে এবং অন্যের দোষকে মহা-পাপ জ্ঞান করে।
– নিজের অসুবিধাকে বড় করে দেখায়, অন্যের অসুবিধাকে বাহানা ভাবে
– নিজের রুচি-অভিরুচিকে সম্মানীয় ভাবে, অন্যের অভিরুচিকে হেয় প্রতিপন্ন জ্ঞান করে
– ফলে চোগলখোরি ও অন্যের দোষ তালাশে লেগে যাবার মনোবৃত্তি বৃদ্ধি পায়
– ব্যক্তি দ্রুত ক্রোধান্বিত হওয়া, অহংকার করা, অপরকে সহ্য না করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
১৪. দুর্বল সংকল্প
– এর তাৎপর্য হল, আন্দোলনে অন্তর থেকে সাড়া দেয়, প্রথমদিকে খুব জোশ থাকে
– আস্তে ধীরে জোশে ভাটা পড়ে, অবশেষে উদ্দেশ্য সম্পাদনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে
– তারা আন্দোলনকে সত্য মনে করে, মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, যুক্তিও দেয়, মনে সাক্ষ্য দেয় কাজটি করা উচিত কিন্তু আবেগ ঠাণ্ডা হলে কর্মশক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
– দুর্বল সংকল্পের কারণে কাজে ফাঁকি দেয়, দায়িত্ব এড়াতে চায়। উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে সময়, শ্রম, অর্থ বৌয়ের পিছপা হয় এবং দ্বীনের কাজের উপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়।
– এ ধরনের মানুষ থেকে যারা দাওয়াত পায় কিংবা যাদের তত্ত্বাবধান করা তার দায়িত্বের মধ্যে থাকে, তারা সবাই নিষ্ক্রিয় হবে। তারা বিকাশের সমুদয় পথ হারায়।
– দুর্বল সংকল্পের ব্যক্তি নতুন দুর্বলতায় জড়িয়ে পড়ে, নিজেকে দুর্বল ভাবে না, স্বীকার করতে চায় না। তাই দুর্বলতা ঢাকতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। তাতে প্রথম পন্থার চেয়ে দ্বিতীয় পন্থা আরো নিকৃষ্টতর হয়।
দুর্বলতা দূর করার উপায়
- ১. নিষ্ক্রিয়তার কারণ বের করতে হবে কোন জিনিষ একাজে রসদ যোগায় তা দেখতে হবে।
- ২. আলোচনা ও উপদেশের মাধ্যমে তার মৃতপ্রায় চেতনাকে উদ্দীপ্ত করতে হবে
- ৩. দলে মধ্যে তার নিষ্ক্রিয়তা ও গাফিলতি যেন মামুলী বিষয় না হয়।