দাঁড়িয়ে সালাম দেবার প্রথা আমাদের দেশের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি
নামাজের শেষে পশ্চিমমুখী হযে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে, সম্মানের সাথে রাসুল (সা) এর প্রতি সালাম দেবার ইবাদতটি অন্য দশজনের মত আমাকেও খুব আকৃষ্ট করত। নামাজ যাই হোক, এভাবে সালাম দিতে না পারলে যেন এবাদতের মজাই আসত না!
আমাদের দেশে এখনও বহু মসজিদে ইমাম সাহেব এটা না করলে তাকে ওয়াবী হিসেবে চিত্রিত করে; এসব ইমামের চাকুরী খেয়ে ফেলার বহু দৃষ্টান্ত আছে। অনেকে দোয়ার জন্য টাকা দেন কিন্তু এভাবে সালাম না পৌঁছালে ইমামের গোষ্ঠী উদ্ধার করে।
চলুন দরুদ সালাম নিয়ে ইসলাম কি বলে তা একটু দেখে নেই। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ (সল্লু) পাঠান, হে ঈমানদার গণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠাও।” আহযাব-৫৬
সালামের মধ্যে দরূদ শব্দটি ফার্সী, যার অর্থ দরদ তথা আন্তরিকতার সাথে সম্মান দেখানে
দরুদ শব্দটি ফারসী, যার আভিধানিক অর্থ হল দরদ বা আন্তরিকতার সাথে সালাম পাঠানো। দরুদ শব্দটির মূল আরবী (সল্লু)। পরিতাপের বিষয় হল, ভারতীয় উপমহাদেশে ফার্সীর এত প্রভাব ছিল যে, আরবীকে বুঝতে ফার্সীর সাহায্য নিতে হত। পবিত্র কোরআনের মূল শব্দ ‘সল্লু’ কে ব্রাকেটে রেখে ফার্সী দুরূদ শব্দের অর্থের ব্যাখা দিতে হল। দরূদ শব্দটি ‘সল্লু’ পুরোপুরি ব্যাখা নয়, সল্লু শব্দট আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত। কিন্তু আমাদের দেশে দরুদ তথা দরদ দিয়ে নিজস্ব সালাম পাঠানোর একটা রেজওয়াজ ঢুকে পড়েছে। যা হোক.
সল্লু (দরূদ) ও সালাম মুসলমানদের জন্যে ফরজ করা হয়েছে
এই কথা দ্বারা পরিষ্কার বুঝা গেল নবীর প্রতি দরুদ (সল্লু) ও সালাম পাঠানো ফরজ। এটা নিয়ে কারো কোন আপত্তি নেই। কিন্তু গোল হয়ে পাকিয়েছে, দাড়িয়ে, ইজ্জতের সাথে, সুর করে, ছন্দ মিলিয়ে ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ বলে সালাম দেবার যে কবিয়াল পদ্ধতি দেশে চালু আছে, সেটি কোত্থেকে জোগাড় করা হয়েছে!
এর স্বপক্ষে কোরআন-হাদিসের কোথাও একটি শব্দও নেই। আলেম গন বলেন, এ ধরণের এবাদতের মাধ্যমে দোয়া তো কবুল হবেই না উপরন্তু রাসুল (সা) কে অবমাননা করার দোষে অভিযুক্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
পিতার সামনে গোলহয়ে দাঁড়িয়ে এভাবে সালাম দিলে পিতা কি সম্মানিত বোধ করবে?
চলুন দুনিয়া-দারী দিয়ে একটি উদাহরণ দেই! যে বাবার দশটি ছেলে আছে, তারা সবাই মিলে যদি বৃদ্ধ পিতার চেয়ার ঘিরে প্রতিদিন এভাবে সালাম দিয়ে চলে যায়, এতে করে পিতা কি নিজেকে খুব সম্মানিত মনে করবেন?
শুধু আনুষ্ঠানিক সালাম দেবার সময়, পিতার কথা মনে পড়ে, এর পরে আর খবর থাকেনা! এমন সম্মানে তিনি কতটুকু আনন্দিত হবেন বলে মনে করেন? নিশ্চয়ই এটাকে সম্মানজনক কাজ মনে করবেন না। অথচ আমরা রাসুলের (সা) শানে এ ধরনের সম্মান জানানোকেই আসল সুন্নিয়ত মনে করছি।
রহস্যের কথা হল, নবীকে-দাঁড়িয়ে-সালাম পেশ করা, এবাদতের এই পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছে, তুর্কী সুফি দের একটি পথভ্রষ্ট অংশ। ধর্তব্য যে, তুর্কিদের সকল সুফি কিন্তু পথভ্রষ্ট ছিলেন না। শাহ জালাল, খান জাহান আলি এরা তুর্কি থেকে আগত মুবাল্লিগ ছিলেন। সামনের দিন গুলোতে এটা নিয়ে আলাদা আলোচনা হবে।
সল্লু (দরূদ) ও সালামের অনেক সংস্কৃতি ফার্সী ও তুর্কিদের থেকে ঢুকে পড়েছে
এক সময় তুর্কিদের প্রভাব সারা ইসলামী দুনিয়ার বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। দ্বাদশ শতকের দিকে তুকিদের আগমণ ঘটতে থাকে ভারত পেরিয়ে বাংলায়। সেই সাথে তুর্কি সুফিরাও সারা দেশে ছড়াতে থাকে। সেভাবে তারা আরবেও এর প্রভাব বিস্তার করে।
মক্কা মদিনার উন্নয়নের কাজ বহির্বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতায় হত। সুলতানি আমলে বাংলা মুল্লুক থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ যেত। যাই হোক আরব মুল্লুক দীর্ঘ বছর তুর্কীদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে, তাদের কিছু বেদায়াতি এবাদত মক্কা-মদিনার হারাম এলাকায় চালু হয়েছিল।
যারা হজ্জে যেত তারা এসব দেখে এগুলোকে সঠিক ইসলামী অনুশাসন মনে করে নিজেরাও শিখে আসত এবং দেশে ফিরে এসে আন্তরিকতার সাথে পালনও করত। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার এই এবাদত, এমনকি স্থানীয় আরবিরাও ঘটা করে পালন করত, আজও আরব দেশের বিচ্ছিন্ন কোন কবিলার মাঝে দেখা যায়!
তুর্কি সুফিদের মাধ্যমে আমদানিকৃত এসব এবাদতের মধ্যে অন্যতম একটি হল দাঁড়িয়ে, সুর করে রাসুল (সা) কাছে সালাম প্রদান করার রীতি। বেশীরভাগ আলেমদের দৃষ্টিতে এটা হল পরিপূর্ণ ইসলাম বহির্ভূত একটি বানানো এবাদত। এর পক্ষে কোন দলিল নেই।
তুর্কি শাসনামলে ইসলামের জন্মস্থান মক্কা-মদিনায় ব্যাপক ভাবে বেদায়াত ছড়িয়ে পড়েছিল। সেটা দেখে সৌদি আরবের, নজদ প্রদেশের যুবক, শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাবের (১৭০৩ – ১৭৯২) মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে।
বেদায়াত নির্মূলে সৌদি বাদশাহের প্ররোচণা ও আবদুল ওয়াহার নজদীর ভূমিকা
তিনি এসব ধ্বংসে তদানীন্তন সৌদি বাদশাহ মোহাম্মদ বিন সৌদকে (১৭২৬ – ১৭৬৫) পরামর্শ দেন ও নিজে সহযোগিতা চায়। আবদুল ওয়াহাব সৌদি শাসকের সহযোগিতায় এসব বেদায়াত কঠিন হস্তে নির্মূল করেন! প্রতিবাদ ও বাধাদান কারীদের হত্যা করেন। সে থেকে এসব বেদায়াত সৌদি আরবে বন্ধ হলেও, ভারতীয় উপমহাদেশে তুর্কিদের প্রভাব হেতু এসব বেদায়াত সংস্কৃতি সর্বত্র জিন্দা রয়ে যায়।
পরবর্তীতে আমাদের দেশে, যারা এ ধরনের এবাদত কে নিরুৎসাহিত করে কিংবা বেদায়াত বলে প্রচার করে, বাংলাদেশের সুন্নিদের দৃষ্টিতে তারা সবাই সৌদি আবদুল ওয়াহাবের প্রেতাত্মা তথা ‘ওয়াবী’ হিসেবে চিত্রিত করতে থাকে।
সল্লু (দরূদ) ও সালাম প্রথাকে নিয়ে চট্টগ্রামে ওয়াহাবী ও সুন্নী বিরোধ দীর্ঘবছরের ঘটনা
সঙ্গত কারণে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো ও তাবলীগ জামায়াতের অনুসারীরা এসব এবাদত করে না; উপরন্তু বিরোধিতা করে। এটা দৃশ্যত সৌদি আরবের আবদুল ওহাবের চিন্তাধারার সাথে মিলে যায়।
ফলে মানসিক মিল থাকার কারণে, তারাও সুন্নিদের দৃষ্টিতে ঘৃণিত ও ওয়াবী হিসেবে বদনামের ভাগিদার হয়! চট্টগ্রামের সুন্নিরা এভাবেই ওয়াবী-সুন্নি বাছাই করে। আজো সুন্নি মসজিদে ওয়াবীদের কোন স্থান নেই। অধিকন্তু এসব মসজিদে যাতে ওয়াবীরা না আসে সে জন্য বারণ করা হয়!
সৌদি বাদশাহের প্রশ্রয়ে, মক্কা-মদিনায় উপর আবদুল ওয়াহাবের এ ধরণের আচরণ, তদানীন্তন বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে যারা পীর, আউলিয়া, ফকির, দরবেশি জিন্দেগীতে ভক্ত ছিল, তাদের বেশীর ভাগ মানুষকে আহত করে।
সে থেকে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর আলেম আজীবন সৌদি শাসকদের বদনামী করাকে নিজেদের এবাদতের অংশ বানিয়ে নিয়েছে। যদিও কিছু মানুষ মনে করে সৌদি বিদ্বেষ ইদানীং কালের ঘটনা।
বিলকুল ভুল ধারণা, যথাযথ ইতিহাস বিচার না করার কারণেই এটা হয়েছে। সৌদি বিদ্বেষ সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই উপমহাদেশে লালিত হয়ে এসেছে এবং আজো তা কারো হৃদয়ে গনগনে অবস্থায় আছে।