চলুন তওবা করি : মহামারির ছোবল থেকে নিরাপত্তা খুঁজি

মুরগীর ঠোঁটে এটেল প্রকৃতির নোংরা লেগে থাকলে সে এটা ছড়াতে, তার দুই গাল তথা ঠোটের দুই পার্শ্ব বারবার মাটিতে ঘষতে থাকে। বিদ্রূপ করে অনেকে বলে মুরগী তওবা করছে। কেননা এই ধরণের অবিকল খাসিয়ত কিছু মানুষের কাছেও দেখা যায়। কিছু মানুষ নিজের দুই হাত দ্বারা দুই গালে তওবা তওবা বলে সজোরে চপেটাঘাত করতে থাকেন। এটাকে তারা তওবা মনে করেন। এন্থনী মাসকারেন হার্স লিখেছেন, এক নামকরা ব্যক্তি তওবার কথা, যিনি এ ধরনের তওবায় নিজের চোয়ালের দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিলেন, অবশেষে প্রাণটাই খুইয়েছেন! না! এটা প্রকৃতই কোন তওবা নয়। বড়জোর উল্লেখিত মুরগীর তওবার মত হতে পারে। শুধু তাই নয়, সারা জগত বাসী মিলে যদি কারো গালে এভাবে জুতো মেরে বেহুশ করে ফেলে তাহলেও সেটা তওবা হবেনা।
 
তওবার মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয়। দোয়া কবুল হয়। বিপদ থেকে মুক্তি ঘটে। এবাদত পরিশুদ্ধ হয়। আল্লাহর কাছাকাছি চলে যাবার সুযোগ হয়। দুনিয়াতে খ্যাতি ছড়িয়ে পরে। তওবার উপকারিতা লিখে শেষ করা যাবেনা। তওবা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা) ব্যক্তিজীবনে পাপ না করা সত্ত্বেও, দৈনিক বহুবার তওবা করতেন। তাহলে বুঝতে পারি তওবার গুরুত্ব কত। কিন্তু তওবা করাটা আমাদের দেশে খুবই সোজা একটি প্রচলিত জিনিষ বলে মনে হয়। তওবা নিয়ে দেশে বহু কাণ্ডের অবতারণা হয়। মৃত্যুমুখে পতিত মানুষকে তওবা করানো হয় প্রাণ বের হবার আগে। পীর সাহেবেরা সম্মিলিত তওবা করিয়ে থাকেন। করোনা আতঙ্কের ভয়াবহ সময়েও মানুষ গণ তওবায় অংশ গ্রহণ করছে! মাশায়াল্লাহ এটাতে জনগণের আশানুরূপ উপস্থিতিও হচ্ছে। কেউ যদি এটাকে আসল তওবা মনে করেন তাহলে বুঝতে হবে তিনি তওবার মূল জায়গা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছেন। 
 
কেউ জেনে বুঝে সজ্ঞানে যদি তওবা করার চেষ্টা করেন, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন তওবার মত কঠিন কোন কর্ম মনে হয় দুনিয়াতে নেই। আর সে কারণেই আল্লাহ তওবাকে বেশী পছন্দ করেন। দোয়া করলে সেটা কবুল হতেও পারে আবার কবুল নাও হতে পারে। পঞ্চাশ পঞ্চাশ সম্ভাবনা। কিন্তু যথাযথ তওবা করলে শতভাগ নিশ্চিত তার দোয়া কবুল হবেই। আর সে ধরণের তওবা করার সময় ও সুযোগ বর্তমানের সারা বাংলাদেশের মানুষের সামনে উপস্থিত। দরকার নিজের ইচ্ছে। করোনা আক্রমণের ভয়াবহ দিনে এ তওবা কবুল হবার জন্য কাউকে মসজিদে যেতে হবেনা, হুজুর ডাকতে হবেনা, পীরের খানকায় যাবারও প্রয়োজন হবেনা। এই তওবা একাকী ঘরে বসেই করতে পারেন, শুধু দরকার গভীর মনোনিবেশ, সদিচ্ছা ও এক টুকরো পবিত্র যায়গা! 
 
বনী ইসরাইলের এক সিরিয়াল খুনি একশত জন মানুষ হত্যা করেও তওবা করার পরে তিনি ক্ষমার সুযোগ পান। চরম হতাশা গ্রস্ত সেই মহিলার কথাই বলি; যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, পৃথিবীতে হেন কোন পাপের রাস্তা বাকি নেই, যে পথে তার পাপের প্রসার সাজানো হয়নি। তার পাপের স্তূপ দুনিয়ার সমুদয় পাহাড়ের উচ্চতাকে হার মানাবে। আল্লাহ বলেছেন, তাঁর রহমের পরিধি মহাকাশের চেয়েও বিস্তৃত। হ্যাঁ সেই মহিলাও তওবার মাধ্যমে ক্ষমা পেয়েছিলেন। তাই আপনার আমারও তওবার মাধ্যমে মহাবিপদ থেকে মুক্তি পাবার সম্ভাবনা সুনিশ্চিত, মৃত্যু যন্ত্রণা শুরুর আগ পর্যন্ত।
 
সারা বিশ্বজুড়ে আজ আতঙ্ক। মানুষ মরছে অকাতরে, করুন অবস্থায়। এই সঙ্কট সময়ে মানুষের প্রকৃত মুক্তি মিলবে যথাযথ তওবার মাধ্যমে। আমি যে তওবার কথা বলছি সেটা শুরুর জন্য খাতা-কলমের দরকার হবে। আপাতত সেটা না হলেও চলবে। এই তওবায় মাঝপথে বাধা বিপত্তি এসে তওবার কাজে বিঘ্ন আসতে পারে। তখন না হয় খাতা-কলস সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে ইচ্ছে করলে মনের খাতায় লিপিবদ্ধ করে তওবার একটা রিহার্সাল করা যেতে পারে। তখন আমরা বুঝতে পারব মূলত তওবা কত কঠিন কাজ। তাই চলুন, দেরী না করে ঠিক এই মুহূর্তেই আমরা তওবার রিহার্সাল করতে বসে পরি।
 
হাশরের ময়দানে ফেরেশতারা মানুষদের হাতে প্রত্যেকের আমল নামা আটকিয়ে দিবে। ধরুন সেটা দেখতে একটি মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের মত দেখাবে। তাতে জীবনের সমুদয় ভিডিও, অডিও, চোখে দেখা স্ক্যান চিত্র, নিয়তের ডাটাগুলো সংরক্ষণ থাকবে। মানুষের অনিচ্ছা স্বত্বেও সে ভিডিও হাই ভল্যূমে চলতে থাকবে, কথা বাজতে থাকবে। নিজে দেখবে অন্যরাও দেখবে। এটা দেখে মানুষ ভয়ে আঁতকে উঠে বলবে,
“হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা! এটাতে ছোট বড় কোন কিছুই বাদ যায়নি সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে।” কাহাফ-৪৯।
আজকের করোনা ভাইরাসের আতঙ্কের দিনে সেই আমলনামা সাথে না থাকলেও আমাদের মানস-পটে নিজেদের চরিত্রের খতিয়ান সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানা আছে। সে সব খতিয়ান লিখার জন্যই খাতার দরকার। আজ না হয় আমাদের মনে যে সব অপরাধের কথা জানা আছে সেগুলো নিয়েই শুরু করি। তওবার জন্য এই খতিয়ান উদ্ধার যেমন দরকার তেমন দরকার আফসোস আর ক্ষমা চাওয়ার অনুভূতি। চলুন না নিজেরা নিজেদের প্রশ্ন করি আর নিচের প্রশ্নগুলো নিয়ে একটু ভাবি, কখনও
 
পিতা-মাতার সাথে বাজে আচরণ করা হয়েছিল কিনা, প্রতিবেশী উৎপীড়িত হয়েছিল কিনা, কোন নিরপরাধ নারীকে অপবাদে জর্জরিত করা হয়েছে কি? কারো নামে কুট-নামী, পরনিন্দা, কাউকে ছোট করা, সম্মানী মানুষকে হেয় করা, ধমক দিয়ে সুবিধা আদায় করা, লোক দেখানো দান করা, দান করে খোটা দেওয়া, অসহায়কে মেরে-ধরে ক্ষমা করা, এতিম-অনাথকে ভয় লাগানো, কারো অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল কিনা?
 
যদি হয়ে থাকে, তাহলে জলদি তাদের লিস্ট তৈরি করে নিতে হবে। ফোন নম্বর যোগাড় করে তাদের ফোন দিতে হবে এবং সেই দিনের নিন্দনীয় ভূমিকার জন্য আন্তরিকতার সাথে ক্ষমা চাইতে হবে। যদি কেউ এই মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে তওবার প্রাথমিক ধাপ তিনি উৎরাতে পেরেছেন। 
 
কথা আরো বাকী আছে, এবার দেখুন নিম্নের এসব ধাপগুলো জীবনে করা হয়েছিল কিনা?
 
কাউকে মুসিবতে ফেলে উৎকোচ আদায় করা হয়েছে কিনা, সাহায্য করার নামে মাশেহারা আদায় হয়েছিল কিনা, টাকা ফেরত দিবেন বলে হাওলাত নিয়ে ঠগ-বাজির কাজ হয়েছে কিনা, এতিমের সম্পদ ধরে রাখা হয়েছিল কিনা, পিতার সম্পদ থেকে বোনদের বঞ্চিত করা হয়েছে কি? কারো সম্পদে জবর-দখল আছে কিনা, চুরি করা হয়েছে কিনা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করা হয়েছে কিনা?
 
যদি এসব কর্ম ঘটে থাকে, তাহলে ভাবুন এসব ফেরত দিতে হবেই। ফেরত দেবার দু’টো পথ। হয়ত দুনিয়াতে পরিশোধ করতে হবে নতুবা ক্ষমা চেয়ে মাফ করিয়ে নিতে হবে। অন্যতায় হাশরের ময়দানে এসবের হিস্যা জোড় করে আদায় করা হবেই। পাওনাদারকে সওয়াব দিয়ে দিতে হবে, নতুবা তার গোনাহ নিজের কাঁধে নিয়ে তাকে হালকা করে নিজেকে জাহান্নামে যেতে হবে। এমতাবস্থায় তাদের সাথে যোগাযোগ করাই উত্তম, অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক সময় অনুতপ্ত হলে অনেকেই ক্ষমা করে দেন। তারপর তার কাছে ওয়াদা করুন আল্লাহ যদি সময়-সুযোগ করে দেন তাহলে এসব ফিরিয়ে দিবেন। এটা আন্তরিকতার সাথে বলুন। যদি এটা সফলতার সাথে করতে পারেন, বলা যায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করলেন।
 
কথা আরো বাকি আছে, নীচের গুলো কখনও ঘটিয়েছেন কিনা চিন্তা করে দেখুন তো, 
 
মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে কাউকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন কিনা, ন্যায় সঙ্গত কারণ ছাড়া মানুষ হত্যা করেছেন কিনা, কিংবা কারো হত্যাকাণ্ডে উৎসাহ দিয়েছেন কিনা, নিজের উপস্থিতিতে কারো হত্যাকাণ্ড উপভোগ করেছেন কিনা, নিরপরাধ মানুষের জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে দেখে আপনার মনে তৃপ্তি বোধ এসেছিল কিনা, মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্তে অসহায় কেউ বাঁচার জন্য আপনার প্রতি করুণা ভিক্ষা করেছিল, আপনি না করে এড়িয়ে গেছেন এমনটি কখনও ঘটেছিল কিনা।
 
করে থাকলে মারাত্মক অপরাধ করেছেন। এই ভয়ঙ্কর অপরাধের জন্য শুরুতে অনুতপ্ত হতে হবে। যাকে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। যারা নিজের হাতে নিহত হয়েছে তারাই এই বিহিত ব্যবস্থা করতে পারে। তাদের ওয়ারিশেরা সবাই মরে গেলে তাদের সন্তানদের আজীবনের জন্য ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিন। নতুবা ক্ষমা চেয়ে নিন। এর পরে পাপের ফিরিস্তি দিয়ে তওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত কান্নাকাটি করে নিজের জন্য ক্ষমা চাওয়া নিহতদের জন্য দোয়া করতে থাকুন। যতদিন জীবিত থাকবেন, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের কৃতকর্মের জন্য আফসোস করতে হবে। এটার নাম তওবা। এই কাজের জন্য হুজুর, মৌলভী, পীর সাহেব কাউকে লাগবে না। লাগবে শুধু নিজের আন্তরিকতা আর ঐকান্তিক ইচ্ছে। তওবা একবার কবুল হলে যা দোয়া করা হবে আল্লাহ সে সব দোয়া কবুল করবেন।
 
তারপরও ছোট একটি কাজ বাকী আছে। একটি পবিত্র জায়গায় বসে এই তওবা করতে হবে এবং প্রতিনিয়ত দোয়া অব্যাহত রাখতে হবে। আল্লাহ সারা দুনিয়ার মাটিকে পবিত্র করেছেন এবাদতের জন্য। তবে নিচের এই জায়গাগুলো ব্যতীত! যে ফ্লাট সূদের ব্যবসা করে কিনেছেন সে ফ্লাটে দোয়া কবুল হবেনা। ঘুষের টাকায় কেনা জমিতে দোয়া কবুল হবেনা এমনকি ঘুষের টাকায় বানানো মসজিদ হলেও। শ্বশুরের দেওয়া যৌতুকের খাটে বসে দোয়া করলেও সে দোয়া কবুল হবেনা। উৎকোচের মাধ্যমে পাওয়া জায়নামাজে বসে এবাদত করলেও সেটা কবুল হবেনা। ঈদের বাজারে ধমক দিয়ে, ফেব্রিক্সের দোকান থেকে চাঁদাবাজি করে নেওয়া পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে আতর মাখানো পোশাক কান্না করে চোখের জলে ভিজিয়ে ফেললেও তওবা-দোয়া কোনটাই কবুল হবেনা। সুদী ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, ঘুষ খাওয়া, হারাম খাওয়া, অনৈতিক কারবারের টাকা দিয়ে দশবার হজ করে যদি বিশ বার পীর সাহেবের মাধ্যমে তওবা করা হয়, তবুও তওবা কবুল হবেনা। যতক্ষণ না এই জীবনকে পরিবর্তন করা না হয়। সুদে নির্মিত ফ্লাট হতে বের হতে হবে, ঘুষের বাড়ি থেকে চলে আসতে হবে, বাজে ব্যবসা ছেড়ে দেবার প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে হবে, আন্তরিকর সাথে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইতে হবে। তাহলে হয়ত আল্লাহ তওবা কবুল করতে পারেন এবং দোয়াও গ্রহণ হতে পারে। অন্যতায় হাশরের ময়দানে নিজের উত্তম কাজ তাদের দিয়ে দিতে হবে এবং তাদের বদ কাজের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে, সুর সুর করে জাহান্নামে ঢুকে যেতে হবে। কোনটা করা হবে সেটা আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে। এই ঘটনা জানার পরে খাতা-কলম নিয়ে বসার সাহস কয়জনের আছে আমি জানিনা, হয়ত আমি লিখছি কিন্তু আমিও ভয়ে কাতর ও শঙ্কায় থরথর। আল্লাহ তুমি আমাদের ক্ষমা করো।