ইমাম আবু-হানিফার জমানায়, কুফা নগরীর রাস্তায়, বিচারকের সাথে এক মহিলার তর্ক-বিতর্ক চলছিল। এক পর্যায়ে তা কড়া মেজাজে রূপ নিল। মহিলা বিচারককে একজন ‘জেনাবাজ’ (অবৈধ উপায়ে নারীর সাথে মেলামেশা কারী) হিসেবে তিরস্কার করলেন। এতে বিচারক ক্ষিপ্ত হয়ে তার উপর শাস্তির হুকুম জারি করলেন। পুলিশ মহিলাকে গ্রেফতার করল।
সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন ইমাম আবু-হানিফা (রহ)। তাঁকে ঘটনা জানানো হলো। তিনি বিচারকের এই বিচার সঠিক হয়নি বলে ফতোয়া দিলেন। এই নারীকে এই বিচারকের আদেশে কোন অবস্থাতেই শাস্তি দেওয়া যাবেনা বলে মতামত দিলেন। বিচারক অধিকতর ক্ষিপ্ত হলেন, তিনি বিষয়টি খলিফা আল মনসুরকে জানাবেন বলে, হুমকি দিলেন।
ইমাম আবু-হানিফা বললেন, আপনি ঘটনার বাদী, আবার আপনিই এটার বিচারক! দুটো কখনও এক ব্যক্তি দিয়ে হতে পারে না। প্রথম কথা আপনি তো বিচারই করতে পারেন না, কেননা ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আপনি নিজেই। আর আপনি এই মুহূর্তে বিবাদীও নন। বিবাদী নিজে বিচারক হলেও সেটার ন্যায় বিচার পাবার জন্য অন্য কোন বিচারকের কাছে মামলা পেশ করতে হবে। (পরবর্তীতে সারা দুনিয়ায় এই নীতিই আইনের ধারা হিসেবে কার্যকর হয়)
বিচারক ঘটনাটি খলিফা আল মনসুরের কানে তুললেন। খলিফাকে বিচারক কি বলেছে জানা না গেলেও তিনি ইমাম আবু-হানিফার (রহ) উপর ভবিষ্যতে আর মাসয়ালা না দেবার জন্য সরকারী হুকুম জারি করলেন।
এক ভিন্ন ঘটনায়, খলিফা আল মনসুরের সাথে বসরার মানুষদের সাথে একটি চুক্তি হয়েছিল। চুক্তি ভঙ্গকারীরা বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হবে। খলিফার দৃষ্টিতে বসরার মানুষেরা সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছে। খলিফা সেখানে সৈন্য পাঠিয়ে রক্তপাত করে চরম শাস্তি দেবার জন্য মনস্থির করেছেন।
তাই জনমত সৃষ্টি ও ধর্মীয় ফায়সালা তথা ফতোয়ার জন্য দেশের সেরা আলেমদের বাগদাদে আহবান করলেন। ঘটনাচক্রে, সে অনুষ্ঠানে ফতোয়া দেবার জন্য, খলিফা আল মনসুর ঈমাম আবু-হানিফাকেও দাওয়াত করেন। যদিও তাঁর ফতোয়া দেয়ার ক্ষমতাকে তিনিই নিষিদ্ধ করেছিলেন।
অনেক মুফতি ও সরকারী কাজীরা ফতোয়া দিলেন যে, খলিফা ইচ্ছা করলে বসরার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন। কেউ এমনও বললেন যে, শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করাটাই সমীচীন নয়। খলিফা মাঝ পথে তাদের থামিয়ে ইমাম আবু-হানিফাকে জিজ্ঞাসা করলেন এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?
ইমাম আবু-হানিফা বললেন, মুসলমানদের মধ্যে রক্তপাত ঘটানোর জন্য শর্ত তিনটি।
- ১. খুনের বিনিময়ে খুনির বিরুদ্ধে একই প্রথায় মৃত্যুদণ্ড জারি।
- ২. বিবাহিত নারী-পুরুষের অবৈধ মেলা মেলা প্রমাণিত হওয়া।
- ৩. ধর্মান্তরিত কিংবা ধর্মদ্রোহ করা হলে।
আপনার সাথে বসরা বাসীদের যে চুক্তি হয়েছে, সে চুক্তির মধ্যে উপরোক্ত কোনটাই ঘটেনি! তাছাড়া আপনি খলিফা সেজে যে ধরনের নিবন্ধন মূলক চুক্তি করেছেন, সে ধরনের চুক্তিই জায়েজ নয়। বসরা বাসিরা যেভাবে ওয়াদা বদ্ধ হয়েছে, সেটা তাদের ভুল জ্ঞানের কারণে ঘটেছে।
অর্থাৎ চুক্তি করাটাই তাদের ভুল ছিল। সুতরাং এই চুক্তি ভঙ্গের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অন্যায় এবং ইসলাম সম্মত নয়। (এ থেকে প্রমাণিত হয় শুধুমাত্র ইসলামী জ্ঞানই যথেষ্ট নয় বরং মুফতি-ইমামদের বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা, দূরদৃষ্টি অর্জন, উপস্থিত পরিস্থিতি অনুসারে সম্যক জ্ঞান ও যথেষ্ট প্রজ্ঞা থাকতে হয়)
ঈমাম আবু-হানিফার এই মাসয়ালায় চারিদিকে পিন পতন নীরবতা সৃষ্ট হল! খলিফা আল মনসুর নির্দেশ দিলেন যে, ইমাম আবু-হানিফা ব্যতীত সবাই যাতে সেই মুহূর্তে দরবার ত্যাগ করে। তাই করা হল।
তিনি ইমাম-আবু হানিফাকে কাছে ডেকে বললেন, “ঈমাম সাহেব! আপনার মাসয়ালা টাই সঠিক কিন্তু আমি এই মাসয়ালা মানতে পারব না। কেননা এভাবে মানতে গেলে, অপরাধীকে শাস্তি দেয়া যাবেনা। ফলে, তলে তলে চারিদিকে বিদ্রোহের দানা প্রসারিত হবে।
আপনি অনেক কষ্ট করে বাগদাদ এসেছেন। সে জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি আশা রাখব, আপনি আর কোথাও যাত্রা বিরতি না করে এখনই, এই মুহূর্তে বাগদাদ ত্যাগ করবেন।
তাই যুগে যুগে নিজের ক্ষমতাকে শক্ত করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার মত শাসকের যেমন অভাব ছিলনা। তেমনি নিজেদের ক্ষুন্নিবৃত্তির চাহিদা মেটানোর জন্য ধর্মের মনমত ব্যাখ্যা দেবার জন্য কাজি ও মুফতির ও অভাব ছিলনা।
তাই যুগে যুগে নিজের ক্ষমতাকে শক্ত করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার মত শাসকের যেমন অভাব ছিলনা। তেমনি নিজেদের ক্ষুন্নিবৃত্তির চাহিদা মেটানোর জন্য ধর্মের মনমত ব্যাখ্যা দেবার জন্য কাজি ও মুফতির ও অভাব ছিলনা।