জালিমের চরিত্রগত প্রকৃত পরিচয়

আমাদের দেশে জালিম, জুলুম আর মজলুম শব্দগুলো খুবই পরিচিত। এগুলো আরবি শব্দ। সন্ত্রাসী-গডফাদারেরা কাউকে নির্যাতন করলে সেটাকে জুলুম বলা হয়। ভূমি-দস্যুরা গরীবের জায়গা দখল করে নিজের বাড়ী বানায়; সেটাকেও জুলুম হিসেবে চিত্রিত করে। দুর্বলের উপর সবলের খবরদারীকে জুলুম বলে। দৃশ্যত মনে হয় জুলুমটা শুধুমাত্র সবল ও শক্তিশালীরাই করে থাকে। কথাটি মোটেও ঠিক নয়।

দুর্বল-অসহায়, গরীব-মিসকিন, অন্ধ-পঙ্গুরাও জুলুম করতে পারে, সেটা ভুলেও কেউ ভাবে না। এভাবে ভাবতে কেউ অভ্যস্ত নয়! পবিত্র কোরআনে বহু স্থানে আল্লাহ জুলুম সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। তাই জুলুম মূলতই কি জিনিষ সেটা পরিষ্কার না হলে অনেক কথার ভাবার্থ ও গভীরত্ব বুঝাটা কঠিন হয়ে যায়।

 ইসলামী মনীষীদের বিশ্লেষণে জুলুম কে সাত ভাবে চিহ্নিত করেছে। সে সব হল,

১. প্রতিদানের অধিকারী ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য প্রতিদান না দেওয়া।
২. সে যতটা প্রতিদান লাভের উপযুক্ত, তার চেয়ে কম দেওয়া।
৩. কেউ শাস্তি যোগ্য অপরাধ না করলেও তাকে শাস্তি দেওয়া।
৪. যে শাস্তির উপযুক্ত তাকে শাস্তি না দেওয়া।
৫. যে কম শাস্তির উপযুক্ত, তাকে বেশী শাস্তি দেয়া।
৬. অপরাধী নির্দোষ বিবেচিত হওয়া এবং বিনা অপরাধীর তা চেয়ে দেখতে থাকা।
৭. একজনের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেয়া।

আল্লাহ্‌ পবিত্র কোরআনে বলেছেন,

﴿ اَلۡيَوۡمَ تُجۡزٰى كُلُّ نَفۡسٍۭ بِمَا كَسَبَتۡؕ لَا ظُلۡمَ الۡيَوۡمَؕ اِنَّ اللّٰهَ سَرِيۡعُ الۡحِسَابِ﴾

আজ প্রত্যেক প্রাণীকে তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেয়া হবে। আজ কারো প্রতি কোন জুলুম হবে না। আল্লাহ অতি দ্রুত হিসেব গ্রহণকারী। সুরা মুমিন-১৭

সে হিসেবে, অপাত্রে মাল্য দান জুলুম। অযোগ্যকে পদে বসানো জুলুম। চরিত্রহীনকে ভোট দান জুলুম। ভাল লোককে ভোট না দেওয়াও জুলুম। নিজের চোখের সামনে কারো নির্যাতন উপেক্ষা করা জুলুম। দলীয় বিবেচনায় লোক নিয়োগ জুলুম। কোটা পদ্ধতিতে চাকুরী দেওয়া জুলুম। সমান পরিশ্রমে পুরুষকে বেশী বেতন নারীকে কম বেতন দেওয়াও জুলুম। নেতা হিসেবে হাসপাতালে, বিমানে অগ্রাধিকার পাওয়া জুলুম। গরীব বলে তার প্রতি অযত্ন অ-শ্রদ্ধাশীল হওয়া জুলুম। হাফেজ সাহেবকে আলেম বলা জুলুম আবার কারো চরিত্র ফুলের মত পবিত্র বলাও জুলুম। যিনি পুরস্কৃত হবার যোগ্য তাঁর বঞ্চিত হওয়া; যিনি নিন্দার যোগ্য তাঁকে পুরষ্কারে আল্হাদিত করা জুলুম। জ্ঞানীকে তুচ্ছ করে ধনীকে অগ্রাধিকার দেওয়াও জুলুম। আল্লাহর সাথে কিছুকে অংশীদার বানানোও জুলুম এবং এটা দুনিয়ার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম জুলুম!

আল্লাহর সাথে অংশীদার আর অপাত্রে মাল্যদান একই ধরনের প্রকারের অপরাধ। মূলত জুলুম সবলেরা বেশী করে থাকে। কিন্তু এখানে আল্লাহ হলেন সবচেয়ে বেশী সবল আর মানুষ হল সবচেয়ে দুর্বল। এরপরও দুর্বল মানুষের ইচ্ছার ক্ষমতার জোড়ে, আল্লাহর নেয়ামত খেয়ে, তাঁর প্রাচুর্য উপভোগ করে, তাঁর সৃষ্টির উপকরণ ব্যবহার করে, তারই দেওয়া জগতে আরাম-আয়েশের সুখ অবগাহন করে; অন্তরের স্বীকৃতি দেয় অন্য উপাস্যকে। এই অপরাধ সকল পর্যায়ের দুর্বল মানুষেরা সবল ও শক্তিশালী আল্লাহর বিরুদ্ধে করে। সে জন্য অংশীদার তথা ‘শিরক’ বৃহত্তম জুলুমের পর্যায় ভুক্ত।  যা কখনও কোন অবস্থাতেই ক্ষমা-যোগ্য নয়।

আমাদের দেশে আমরা প্রতিনিয়ত কত ধরনের জুলুম করে যাচ্ছি তার কোন ইয়ত্তা নাই। অনেকে নিজের অজান্তেই জুলুম করে চলছেন, অথচ তিনি নিশ্চিন্তে আছেন যে, তার দ্বারা কোন জুলুম সংঘটিত হবার কথা নয়। কেয়ামতের দিন আল্লাহ ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র জুলুম গুলো পর্যন্ত প্রকাশ করবেন এবং তার শাস্তি ও প্রাপ্য বুঝিয়ে দিবেন। আমাদের দৃষ্টিতে যা ক্ষুদ্র ছিল কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে তা অনেক বড় জুলুম  হিসেবে  প্রকাশিত হবে। একটি ছোট জুলুমের উত্তর চাইতে তিনি একজন মানুষকে তপ্ত কড়াইয়ের মত ময়দানে কোটি বছর ঠায় দাড়িয়ে থাকতে বাধ্য করবেন। এমনকি দুনিয়াবি জীবনে একটি প্রাণী অন্য প্রাণীকে শাসন করার নিমিত্তে যদি গুঁতো দিয়ে থাকে, তার সমান ওজনের, সমান ব্যথার হুবহু আরেকটি গুঁতো কেয়ামতের দিন তাকে খেতেই হবে। এটাই মহান আল্লাহর পরিষ্কার ওয়াদা। আসুন আমরা জুলুম থেকে বাচতে আল্লাহর নিকট সাহায্য চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *