সীল মোহরের প্রচলন ও রাসুল (সা) এর অলৌকিক মোহর

সীল মোহরের প্রচলন ও রাসুল (সা) এর অলৌকিক মোহর

সীলমোহরের ব্যবহার প্রাচীন কাল থেকেই, ইসলামী যুগে রাষ্ট্রীয় কাজে প্রচলন শুরু হয়

সীলমোহর যে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ন বস্তু। তাই এটাকে সতর্কতার সহিত সংরক্ষণ করা হয়। অতীতের রাজা-বাদশাহদের আমলে ব্যবহার হত ধাতব সীলমোহর। পোস্টমাস্টারের ধাতব সিলের আঘাতে খামের ভিতরে রক্ষিত চিঠির গায়ে পর্যন্ত মোহর বসে যেত। এটাকে বলা হয় এমবোস মোহর। আদালতের নির্দেশে গালা গলিয়ে, তালায় সিল গালা করিয়ে দেবার নিয়ম আজো চালু আছে। সরকারী গাছ চিহ্নিত করতে মাস্তুলের মাথায় বিশেষায়িত লোহার সিল মারা হয়।

রাবারের সীলমোহর আসার পরে যুগের পরবর্তন হয়

এর পরে আসে রাবারের সিলের যুগ। যা ব্যবহার করতে কালির ব্যবহার হয়। এটিও অনেক দামী। নথি সত্যায়িত করতে গিয়ে সরকারী কর্মকর্তাদের পিছনে হন্য হয়ে ঘুরতে হয়! তার পিছনেও রয়েছে সেই সিলের ব্যবহার। বর্তমান ডিজিটাল যুগে কাগজ পত্রের ব্যবহার কমেছে, পক্ষান্তরে ইমেইলের মাধ্যমে নথি আদান প্রদানের প্রসার হয়েছে। সেখানেও সিলের উপস্থিতি আছে। সেটার নাম ‘ইলেকট্রনিক্স সিল’।

মূলত এটি সীলমোহরের একটি ছবি! বসের সেক্রেটারি বিশেষ কায়দায় এই সিল নথিতে যোগ করে নিজের ইমেইল এড্রেস ব্যবহার করে প্রাপকের কাছে পাঠায়। মুল কথা হল, যুগের পরিবর্তন যেভাবেই হোক না কেন, সিলের ব্যবহার বরাবরই ছিল এখনও এটার গুরুত্ব হারিয়ে যায়নি বরং বেড়েছে।

সীলমোহরকে আরবীতে বলা হয় ‘খাতম’ হিসেবে

সীলমোহরকে আরবিতে ‘খাতম’ বলা হয়। এটাও শাসন ব্যবস্থারই একটি অংশ এবং রাজশক্তিরই একটি দায়িত্ব। পত্র ও সনদের উপর মোহরের ছাপ দেয়ার রীতি প্রাক ইসলাম যুগেও রাজন্যবর্গের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং বর্তমানে তো এটার ব্যবহার সর্বত্রই।

বোখারী ও মুসলিমের হাদিসে প্রমাণ আছে যে, আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ (সা) রোম সম্রাটের কাছে পত্র লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, তাঁকে বলা হয়েছিল যে, অনারব রাজন্যবর্গ মোহরাঙ্কিত পত্র ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করে না! তাই তিনি রূপার একটি সীলমোহর বানিয়ে নেন এবং তাতে অঙ্কিত ছিল ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘মুহম্মদ আল্লাহর রাসুল’।

রাসুল (সাঃ) অলৌকিক সীলমোহরের ঘটনা

রাসুল (সাঃ) রাষ্ট্রিয় কাজে সীল মোহর ব্যবহার করছেন। তিনি নিজের কাজের জন্যে একটি সীলমোহর বানিয়েছেন এবং সেটা কাজে লাগিয়েছেন। সেই ঘটনাটি ইমাম বুখারির জবানিতে ইবনে খলদুল তার মুকাদ্দিমাকে তুলে ধরেছেন এভাবে,

ইমাম বোখারী (রহ) বলেন, রাসুল (সা) তিনটি শব্দকে তিনটি সারিতে বসিয়ে মোহর তৈরি করান এবং তা দিয়ে ছাপ দেন। আরো উল্লেখ আছে যে, তার ন্যায় এ ধরণের সীলমোহরের নকশা ইতিপূর্বে আর কেউ তৈরি করেন নি। তিনি আরো বলেন যে, রাসুল (সা) এর ব্যবহৃত এই মোহর দ্বারা আবু বকর, উমর ও উসমান (রাঃ) মোহরের কাজ সম্পন্ন। অতঃপর উসমানের (রা) হাত থেকে এটা ‘আরিসের’ কুয়ায় পড়ে যায়! এই কুয়াতে অল্পই পানি ছিল কিন্তু তাতে মোহর পতিত হবার পরে সেই কুয়ার আর তল পাওয়া যায়নি! এই ঘটনায় হজরত উসমান (রা) খুবই দুঃখিত হন এবং দুর্ঘটনাটিকে একটি অশুভ চিহ্ন মনে করেন। পরে তিনি উক্ত মোহরের অনুরূপ আরেকটি তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন। (আল-মুকাদ্দিমা-৪৫৬)

মোহরের গুরুত্বের কথা আগেই বলেছি। এটির যত্ন, সংরক্ষণে স্বয়ং রাসুল (সা) খুবই সতর্ক ছিলেন। ফলে তিনি সেটার ব্যবহার নিশ্ছিদ্র ও সুনিশ্চিত করতে, তাঁর মোহরকে স্বীয় হাতে আংটির মত ব্যবহার করতেন! এতে করে সেটা অন্যের হস্তগত হবার সুযোগ ছিলই না বলাই চলে। কর্তার ইচ্ছে ব্যতীত এটা অন্যদের ব্যবহার করার কোন রাস্তাই ছিলনা। তাঁর মোহরের গায়ে যেহেতু আল্লাহর নাম অঙ্কিত ছিল, তাই তিনি কখনও এটা আঙ্গুল ঢুকিয়ে, প্রস্রাব-পায়খানায় যেতেন না। যাওয়ার দরকার হলে, সেটা খুলে পবিত্র শরীরের অধিকারী কারে কাছে ততক্ষণের জন্য হেফাজতে রাখতে দিতেন।

উসমান (রা) যখন থেকে রাসুল (সা) হাতের ব্যবহৃত বরকত পূর্ণ সেই মোহর হারিয়ে ফেলেন, তখন থেকেই তাঁর ভাগ্য বিড়ম্বনার শুরু হয়। ফলে আলী, হাসান ও মুয়াবিয়া (রা) তাদের শাসনকালে এই মোহরের বরকত থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়েছিল।