তেলের ঘানি

তেলের ঘানি

আমাদের ছোটবেলায় জীবনযাত্রায় ধরণ-প্রকৃতি বর্তমানের চেয়ে অনেক ব্যতিক্রম ছিল। একজন গৃহিণী কে বহুবিধ বিষয় মাথায় রেখেই সংসার জীবনের আঞ্জাম দিতে হত। সকল গৃহিণীরাই হত সদা ব্যস্ত। তেলের ঘানি

বর্তমান সময়ের মত প্রস্তুতকৃত মসল্লা তখনকার দিনে পাওয়া যেত না। গ্রামের সবই সরিষার তৈল দিতে খানা খেত। তেলের ঘানি

ক্ষেতের সরিষা

আমাদের ক্ষেতেও সরিষা হত। মা আরো সরিষা কিনে নিয়ে এক সাথে যোগ করে আমার মাথায় তুলে দিতেন। আমাদের পাশেই ছিল তেলী বাড়ী। এটার নাম তেলী বাড়ী হলেও এই বাড়ীর পুরুষ মানুষেরা বহুবিধ কাজে পারদর্শী ছিলেন।

তাদের এক একজন এক ধরণের ব্যবসা করে জীবন ধারণ করতেন। ফলে তারা প্রায় সবাই সচ্ছলতার সহিত জীবন চালাতেন। ছোট-খাট অনেক ধরনের ব্যবসা যোগ হয়ে বাজারে বৃহৎ একটি অংশ তাদের দখলেই থাকত।

আরো পড়ুন…

  • পৃথিবী যখন দোলনা
  • মুক্তার অলঙ্কার
  • ফেসবুকের বন্ধু সমাচার

 

তেলী বাড়ীর মহিলারাই মূলত তেল ভাঙ্গানোর কাজ করতেন। আমি মাথায় বহন করে যখন তাদের বাড়ীতে পৌঁছতাম। মহিলারা বলতেন আমাদের ঘানি থেকেই তৈল বের করে নিয়ে যাও।

একটি শক্ত সামর্থ্য গরুর মাধ্যমে একটি ঘানির কাজ চলে। ঘানির চারিদিকে চক্রাকারে ঘুরেই তৈল বের করতে হয়।

গরুর চশমা

বিশেষভাবে বানানো একটি চশমা গরুর চোখে বসিয়ে দেয়া হত। এতে করে গরু আর বাহিরের কিছু দেখতে পায়না। চশমার কারণে গরু বুঝতে পারেনা সে দীর্ঘক্ষণ ধরে একই জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে তার মাথায় চক্রাকার ঘুরানি দেখা দেয় না।

গরু চালানো এবং কাঁচামালের উপর ওজন সৃষ্টি হবার জন্য, একজনকে সেই চক্রাকার পাটাতনের উপর বসে থাকার দরকার হত।

আমি ছিলাম ওজনে হালকা এবং স্বভাবে সরল প্রকৃতির। মহিলারা আমার সরলতাকে ব্যবহার করে গরুর সেই পাটাতনে বসিয়ে দিয়ে তেল ভাঙ্গতেন। ওদিতে তাদের সন্তানদের অন্য কাজে লাগিয়ে দিতেন।

আমি বহু দেরীতে বুঝতে পেরেছিলাম যে, এটা আমার দায়িত্ব নয়। তবে ওভাবে ঘানির খাটিয়ায় বসে, মুক্ত বাতাসে, মুফত চক্কর খাওয়ার অনুভূতিটা আমার খুব ভালই লাগত। তেলের ঘানি

একবার ঘানি ভাঙ্গা তৈলে আমার মায়ের তিন থেকে চার মাস চলে যেত। আধুনিক কলের তৈরি ঘানিতে বানানো সরিষার তৈল বাজারে এলো। ড্রাম ভর্তি সরিষার তৈল ছটাক, আধ পোয়া হিসেবে বিক্রি হত।

কিন্তু আমার মা এসব তৈল ব্যবহার থেকে বিরত থাকতেন। তিনি পুরানো পদ্ধতিতেই সংসার চালাতেন। মানুষ ধীরে ধীরে বাজারের তৈলের উপর নির্ভর হতে থাকলেন। এর ফলে তেলীদের কাজ কমে গেল। তাদের অনেক পরিবার পুরাতন পেশা ছেড়ে দিয়ে নতুন পেশা বেচে নিতে বাধ্য হলেন।

আধুনিক শিল্পকারখানা

নতুন কলের আবির্ভাবের কারণে, দেশের বহু পুরাতন শিল্প এভাবে বসে গেল। এই পরিবর্তন আমার চোখের সামনে হয়েছিল। তাই ছাত্রজীবন থেকেই ভাবতাম কখনও যদি সুযোগ পাই তাহলে তেলের কারখানা পরিভ্রমণ করব।

স্কুল জীবন শেষে আমার মনের এই কথা জানতে পেরে, এক ভদ্রলোক আমাকে দেশের একটি বৃহত্তম ভোজ্য তেলের কারখানা পরিদর্শনের সুযোগ করে দিবেন বলে কথা দিলেন। কিন্তু সেটি ঢাকায়! তেলের ঘানি

চট্টগ্রাম থেকে প্রথম ঢাকায় গমন করি শুধুমাত্র তেল কারখানা দেখার জন্য। এটা ছিল আমার জীবনে প্রথম ঢাকা সফর। এই ভদ্রলোক ছিলেন কারখানার প্রধান কেমিস্ট।

তিনি আমাকে একটি অদ্ভুত তথ্য দিলেন যে, “আইসো এলায়েল থায়ে সায়ানাইড” নামের বিষাক্ত তরলের এক আউন্স এক ড্রাম সাধারণ তৈলে মিশাইলে সেটাও নাকি সরিষার তৈলের বর্ণ ও ঘ্রাণ দুটোই ধারণ করে!

এটা সে কারখানায় করে এমন নয় আমার বহু প্রশ্নের একটি জবাব ছিল এই উত্তর।

সরিষার তৈলের বর্তমান বাজার চিত্র

প্রবাস জীবনেও সরিষার তৈলের প্রতি দুর্বলতা কাটাতে পারিনি। কিন্তু এদেশে যত সরিষার তৈল আমদানি হয়ে আসে, সেসব বোতলের গায়ে লেভেল লাগানো থাকে। For external use only অর্থাৎ বাহ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য।

আরো পরিষ্কার ভাবে বলতে গেলে শরীরে মালিশের জন্যই এই তৈল বিক্রি হচ্ছে।

সারা পৃথিবী আজ দুই নম্বরি জিনিষে ভরপুর। আমাদের দেশের যে তৈল একদা সবচেয়ে দামী ভোজ্য তৈল হিসেবে বিবেচিত ছিল সেটা এখানে খাদ্য তালিকাতেই নেই! জানিনা কোন অসুবিধার কারণে এটা এখানে সে মর্যাদা পায়নি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *