বাঙ্গালী : রক্তে যার সদা বিদ্রোহ

বিদ্রোহ

বিচিত্রময়তায় ভরা বাঙ্গালীদের চরিত্র। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা বাংলাকে শাসন করেছে তারা এ জাতীকে বারে বারে বিদ্রোহী হিসেবে দেখেছে। এদেরকে দাবানো-দমানোতে কাজ হয় না। সেজন্য প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাকে ‘বলগাকপুর’ তথা বিদ্রোহী অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হত। শাসকের চরিত্র জনগণের মত না হওয়া অবধি, প্রজারা বিদ্রোহে মেতে থাকত। বাঙ্গালী : রক্তে যার সদা বিদ্রোহ

নদীমাতৃক অঞ্চল হবার কারণে তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়াটাও কঠিন ছিল। বিদ্রোহীরা দ্বীপে, বিলে, খালে, জলাশয়ে আত্মগোপন করত। তার চেয়েও অন্যতম সমস্যা ছিল, তারা যখন অর্থ-বিত্তে একটু সচ্ছল হয়ে উঠে তখনই বিদ্রোহ করার ইচ্ছা তাদের রক্তে চাড়া দিয়ে উঠে। সে কারণে, প্রাচীন কাল থেকেই একটি ধারণা কার্যকর হয়ে আসছে যে, বাঙ্গালীদের দমিয়ে রাখতে হলে কোন অবস্থাতেই তাদের সচ্ছল রাখা যাবেনা!

আরো পড়তে পারেন…

উপরোক্ত কথাগুলো আমার নয়। ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা। দিল্লীর বাদশাহ গিয়াস উদ্দিন বলবন (রাজত্বকাল ১২৬৬-১২৮৭) নীতিতে ছিলেন কঠোর, বিদ্রোহ দমনে ছিলেন চরম নিষ্ঠুর। তারিখে ফিরোজ-শাহীর তথ্য মতে, তিনি তার ছেলে ‘নাসিরুদ্দিন বুগরা খান’ রাজত্বকাল (১২৮১-১২৮৭) কে বাংলার শাসন কর্তা হিসেবে পাঠাবার সময় লিখেছিলেন,

“সুযোগ্য, পরাক্রমশালী, বিচক্ষণ ও গুণবান শাসক ব্যতীত লক্ষণাবতীর শাসন করার ক্ষমতা কারো নেই” (পৃষ্টা-৭৮)

উল্লেখ্য তখনকার বাংলার রাজধানী ছিল, লক্ষণাবতী যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ। বাঙ্গালী : রক্তে যার সদা বিদ্রোহ

উপরোক্ত উপদেশ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বাংলাদেশের মানুষকে শাসন করতে হলে যোগ্যতা অর্জন বাঞ্ছনীয়। সাথে সাথে পরাক্রমশালী হওয়াটা জরুরী। উপরন্তু বহুবিধ গুনের অধিকারীও হওয়া লাগবে। আমারা যারা বাংলা অঞ্চলের মানুষ, তারা নিজেদের কৃষ্টি, সভ্যতা সম্পর্কে তো ওয়াকিবহাল। অবশ্যই সম্রাট বলবনের এই উপদেশের সাথে একমত না হয়ে পারা যাবেনা।

বাঙ্গালী জাতীর চরিত্র ও খাসিয়তকে বিশ্লেষণ করে তাদের অধিভুক্ত করে রাখার জন্য, তিনি পুত্র বোগড়া খানকে আরেকটি লিখিত উপদেশ দিয়েছিলেন। তারিখে ফিরোজ-শাহীতে সে ঘটনা এভাবে বলা হয়েছে,

“…এবং প্রজাদের ব্যাপারে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করো। তাহাদিগকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব বা সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত অবস্থায় রাখিবে না। খাজনার বেলায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করিবে। প্রজাদের নিকট হতে এত-বেশী চাহিবে না, যাহাতে তাহারা নিঃস্ব হইয়া যায়। আবার এত কমও লইবে না, যাহাতে অতিরিক্ত ধন-দৌলতের অধিকারী হইয়া, তারা বিদ্রোহী হইয়া উঠবে। কারণ অতিরিক্ত সম্পদ রায়তের মাথায় ডিম পাড়িতে আরম্ভ করিবে এবং ক্রমশ তাহাদিগকে আয়ত্তের বাহিরে লইয়া যাইবে। ধনের গরমে তাহারা বিবেক শূন্য হইয়া নাফরমানীর জন্য কোমর বাধিয়া দাঁড়াইবে। নিজ কর্মচারী ও রায়তদিগকে এমনভাবে রাখিবে, যাহাতে নিজ নিজ চাকুরীর বেতন ও গৃহস্থের ফসল দ্বারা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করিতে পারে”। পৃ-৮১

এখানেও সেই কথাটিই লুকায়িত আছে যে, বাংলার জনগণকে কোনদিন সম্পদশালী করানো যাবেনা। কেননা তাদের হাতে সম্পদ আসলে তারা অহংকারী ও বিদ্রোহী হয়ে উঠে। ধনের গরমে তাদের মাথা ঠিক থাকে না।

আবার তাদেরকে নিঃস্ব করানোর ফলে, হিতে বিপরীত হতে পারে। তবে নিঃস্ব হলে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সে বর্ণনা ঐ ইতিহাস গ্রন্থে নেই। তবে নিঃস্ব হলেও যে বাঙ্গালীরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে সে ধরণের বহু ইতিহাসও আমাদের রয়েছে। বাঙ্গালী : রক্তে যার সদা বিদ্রোহ

তবে আমাদেরকে একেবারে নিঃস্ব করেই, শাসন করার ইতিহাস অনেক লম্বা। হউক সেটা ভিনদেশী কিংবা স্বজাতি। এ জাতীকে শাসন করতে হলে, নিঃস্ব করেই শাসন করো। এটাই দুনিয়াতে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজতক এটাই পরীক্ষিত পন্থা হিসেবে বিবেচিত।

বাংলার মানুষের বিদ্রোহী স্বভাব সম্পর্কে তারিখে ফিরোজ-শাহির লেখক ঐতিহাসিক ‘জিয়াউদ্দীন বারানী’ (১২৮৫-১৩৫৮) একটি সুন্দর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন,

“প্রাচীনকাল অর্থাৎ সুলতান মুয়েজউদ্দিন মুহম্মদের দিল্লী অধিকার করার পর হইতে দিল্লীর বাদশাহগণ যে সকল লোককে লক্ষণাবতীর (বর্তমানের বাংলা) শাসক পদে নিযুক্ত করিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশই বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছে। আর যাহারা বিদ্রোহ করে নাই, অন্য লোকেরা তাহাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া, তাহাদিগকে হত্যা করিয়াছে।” পৃ-৬৬

দিল্লীর সম্রাট গিয়াসউদ্দীন বলবন তারই ক্রীতদাস ‘মুগিসউদ্দীন তুঘরল’ (১২৭২-১২৮১) কে বাংলার শাসনকর্তা বানিয়ে এখানে প্রেরণ করেন। লক্ষণীয় বিষয় যে, উপরে বর্ণিত বাঙ্গালী চরিত্রের প্রভাব থেকে সেই ক্রীতদাস তুঘরলও রেহাই পাননি! তিনি এমন এক স্থানের জনগণের শাসক হয়েছিলেন, যাদের নেতৃত্ব দিতে হলে এ কথা শুনতে হয় যে, “হয় তুমিও বিদ্রোহ কর, নয় আমরাই তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব” এই আদর্শে বিশ্বাসী। তুঘরল ভাবলেন ৭২ বছরের বুড়ো বলবনের গায়ের জোড় তো আর আগের মত নেই। তাই তিনিও বাংলার মানুষের প্ররোচনায় যথারীতি দিল্লীর সুলতান বলবনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন! বাঙ্গালী : রক্তে যার সদা বিদ্রোহ

আগেই বলেছি, বলবন ছিলেন খুবই প্রতিশোধ পরায়ণ সুলতান। তিনি প্রয়োজনে দিল্লীর বাদশাহি ছেড়ে দিবেন কিন্তু প্রাণ থাকতে রাজ্যের কোন ক্ষুদ্র বিদ্রোহীকেও মার্জনা করবেন না। বৃদ্ধ বয়সে, বর্ষাকালেই তিনি বাংলা অভিমুখে সৈন্য পরিচালনা করেন এবং তুঘরিলতে সন্ধান করে হত্যা করেন। পরবর্তীতে তারই ছেলেকে বুগরা খানকে বাংলার শাসনকর্তা বানিয়ে দেয়। বাঙ্গালীরা বরাবরই বিদ্রোহী এর স্বপক্ষে ইতিহাসের পাতায় বহু নজীর আছে।

পরিশেষে আমাদের জাতী সম্পর্কে আমরা যা জানলাম তা হল, বিদ্রোহ করে ধ্বংস করতে আমরা যতটা পারদর্শী, গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা তত পারদর্শী নই। বিদ্রোহী হবার কারণে বারে বারে নিজের স্থান থেকে পালিয়ে বেড়ানোর অভ্যাস মজ্জাগত। ফলে নিজের দেশের সম্পদ মেরেও অন্য দেশে পালিয়ে থাকার প্রতি আমাদের ঝোঁক বেশী। নিজভূমি, নিজ দেশের প্রতিনিধিকে তোয়াক্কা কম করি এবং নিজের স্বার্থের কারণে নিজের দেশের বিপক্ষে দাড়াতেও কুণ্ঠিত হই না। কিন্তু বাহিরের শক্তিশালী কেউ নিজেদের শাসক বনে গেলে, তার তোষামোদ করার ক্ষেত্রেও পিছপা হই না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *