জিন দেখার কৌতুহল বহু মানুষকে হতভম্ব করে (পিকুলিয়ার ম্যান পর্ব-২)
আস্তে আস্তে জিন ও তাবিজ গত নানা গুঞ্জরন থিতিয়ে আসল। বন্ধুরা কৌতূহলে দুই একটি প্রশ্ন করলেও সাদামাটা উত্তরে তাদের আগ্রহ কমে গেল। তারপরও আমার ভাবুক প্রকৃতির স্বভাবটাকে অনেকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে রইল।
গ্রামের সকল মানুৃষ আমাকে এমনিতেই পছন্দ করত। ভাল শিষ্টাচার পাইয়ে দিতে আমার মায়ের দিন রাত প্রচেষ্টা থাকত। তিনি আমার দৈনন্দিন ভুলগুলো নজরে রাখতেন, রাত্রে শোয়ার সময় আদর করে একাকী আলোচনা করতেন এবং আমার ভুলগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে, আগামীকাল থেকে এসব ভুল না করানোর জন্য ওয়াদা নিতেন।
মাকে খুব ভালবাসতাম বলে, তাঁর ওয়াদার কথা আমার মনে থাকা পর্যন্ত সেই ভুলটি দ্বিতীয়বার করতাম না। হাই স্কুলে উঠেই মসজিদে এতেকাফে যাওয়ার অভ্যাস করি। এসব কারণে মুরুব্বীরা আমাকে খুবই পছন্দ করত।
বাড়ির সামনেই জিন দেখার পরিবেশ ছিল
বাড়ীর সামনেই স্কুল, মসজিদ, বড় পুকুর ও কবরস্থান। মনের ভিতরে যথেষ্ট সাহস রাখতাম! গ্রামের কোন মানুষ মারা গেলে অন্ধকার রাত্রে কবরস্থানের আশে পাশে ঘুরঘুর করতাম। এই প্রত্যাশায় যে, ভাগ্যক্রমে যদি কোন জ্বিনের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে যায়!
জিনের ভয় কম হত! কেননা হুজুরের বাণীতে শতভাগ নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, সুরা ফাতেহা, ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে শরীরে ফুঁ-দিলে সাপ-কুকুরে কামড়াতে পারে বটে কিন্তু জিনের বাপের সাধ্য নাই যে, কাউকে স্পর্শ করার!
পথিকেরা জিনের ভয়ে পল্লীগীতির সুরে টান দিত
লক্ষ্য করতাম! বাজার ফেরৎ একাকী পথচারী গভীর রাত্রে কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাবার সময় কলিজার ভয় দুর করতে ভাটিয়ালী কিংবা পল্লী-গীতির টান মারতেন! নিস্তব্ধ রজনীতে গ্রামের মানুষ বিনা পয়সায় এসব পথিকের বেসুরো গলার, সুরেলা গান আনন্দ চিত্তে উপভোগ করতেন!
কদাচিৎ কেউ চলমান গানের মাঝে হঠাৎ করে ছন্দপতন ঘটিয়ে চিৎকার করে বলে উঠত ‘ওরে বাবারে, জিন-ভূত’!
পথিকের ভীতিকর এসব ডাক শুনে, গাঁয়ের মানুষ তার সাহাযার্থে হারিকেন বাতি, চেরাগ নিয়ে দৌড়ে যেতেন। তবে সেসব সাহায্যকারীদের মাঝে সর্বদা আমিই অগ্রগণ্য থাকতাম!
বলা বাহুল্য, অন্ধকার রাত্রে জিনের সন্ধানে কবরস্থানে ঘুর ঘুর করা অবস্থায়, পথিক আবছা আবছা আমার অবয়ব দেখে, আমাকেই জিন-ভূত ভেবে চিৎকার করে উঠত!
টর্চ লাইট তখনও সবার জন্য সহজলভ্য ছিলনা, ফলে মানুষকে অন্ধকারেই আসা যাওয়া করতে হত।
অভিজ্ঞতায় দেখেছি নিকষ কালো ঘন অন্ধকারে বের হওয়া মাত্র, নিজের হাত খানা এক বিঘত নিকটে আনলেও কেউ তা ভালভাবে দেখতে পায় না। তবে ঘন অন্ধকারে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে আকাশের তারার আলোর মাধ্যমে রাস্তা কিছুটা হলেও পরিষ্কার দেখা যায়।
অমবস্যার রাত হল জিন দেখার সবচেয়ে বড় উপযোগী সময়
এটাই জিন-ভূত দেখার সবচেয়ে বড় উপযোগী পরিবেশ!
উপদেশ মিশ্রিত পরামর্শ দিলে বললেন, ভবিষ্যতে যেন হারিকেন নিয়েই রাস্তায় নামি! কেননা, চোখ ওয়ালাদের আলোর দরকার হয়, অন্ধের জন্য কোন আলোর দরকার নাই’!
যাক, অন্ধের দুর্নাম করা আমার লক্ষ্য নয়, আমি বলছিলাম কবরস্থানে জিনের তালাশে ঘুর ঘুর করার কথা!
রাত্রিকালে পথিকেরা মাঝে মধ্যে যে জিন ভুতের কারনে ভয় পায়, তার কারণ কি! আমার মা-বাবা আলবৎ এসব আন্দাজ অনুমান করতে পারতেন!
তাঁরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন, কি করা যায় এই ভেবে! অবশেষে আমাকে পাহারা দেওয়া আর পড়ানোর মত দুটি কাজ একত্রে সম্পন্ন করার জন্য, ঘরে একজন লজিং মাষ্টার রেখে দিলেন!
নাস্তিক মাস্টার মশাই জীবনে প্রথম জিন দেখে ভয়ে অজ্ঞান
মাষ্টার মহোদয় আমাদের ঘরে রাজার হালতে থাকতেন এবং স্বভাবে আধা নাস্তিক প্রকৃতির লোক ছিলেন! জিন-ভূতের আদিম গাল-গল্পে বিশ্বাস করতেন না!
কখনও সন্ধ্যা রাত্রে পড়ার ফাঁকে টয়লেটে যাবার নাম করে স্যার থেকে সাময়িক ছুটি নিতাম। শয়ন কক্ষের সাথেই পায়খানা করার ব্যবস্থা তদানিন্তন গ্রামীণ জীবনে চালু ছিলনা! শহুরে মানুষের এসব ভদ্রজনোচিত আচরণ গ্রামের মানুষেরা তখনও রপ্ত করেনি।
গ্রামে বাড়ির বাহিরেই টয়লেটের ব্যবস্থা থাকত। এই সুযোগ ব্যবহার করেই রাত্রিকালে কবরস্থান পরিদর্শনের সুযোগটি হাতিয়ে নিতাম!
মাষ্টার মহোদয় একরাতে দেরি করে বাসায় ফেরার সময়, সদ্য নতুন কবরের চারিদিকে ঘুর ঘুর করা এক জিনকে স্ব-চক্ষে দেখতে পান!
আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস থাকলেও নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করা যায়না? চাক্ষুষ জিন নিজের চোখে দেখতে পেয়ে তিনি ওরে বাবারে ভুত! বলেই ভয়ে মূর্ছা গেলেন!
তার পরদিনই তিনি জানিয়ে দিলেন, জিনের উপদ্রবে আক্রান্ত বাড়ীতে তিনি আর লজিং থাকবেন না।
পরিশেষে, আমার শান্ত স্বভাব, ভাবুক প্রকৃতি, জিন-ভুত আতঙ্কের মোকাবেলায়, প্রতিটি ঘটনায় সহসা আমার উপস্থিতি এবং আমাকে সাহায্যকারী দের মাঝে অগ্রগণ্য দেখে; অনেকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, আমার উপরই কিনা জিন-ভুত ভর করেছে।
তাই, অনেকেই গায়ে পড়ে বাবাকে পরামর্শ দিতেন, ছেলেটাকে তাড়াতাড়ি জিন মুক্ত করুন! এলাকার বদনামী ঘুচবে।
যদি সময় থাকতে সচেতন না হন! তাহলে, জ্বিনেরা আপনার ছেলেটাকেই নিয়ে যাবে, তাই চিকিৎসায় দেরী করলে সব হারাবেন!
জিন তাড়াতে গ্রামীন একটি পদ্ধতির নাম হল হাঁট বসানো
বাবাকে সবাই ‘হাঁট’ বসানোর পরামর্শ দিলেন! আমি মা-বাবাকে বুঝালাম অনেক টাকা খরচ করে হাঁট বসানোর দরকার নাই। আমি ব্যাপার গুলো বুঝাতে চেষ্টা করলাম।
তাদের বললাম, জিন-ভূত সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো নিয়ে আমি বইয়ে পড়েছি, কিছু ঘটনা মানুষের মুখে শুনেছি, তাছাড়া এলাকায় প্রচুর বৈদ্যদের কৌতূহলী জীবন যাপন দেখে, নিতান্ত আগ্রহের কারণেই জিনের সন্ধান করতে কবরস্থানে যেতাম।
আমার উপর কোন জিনের বদ নজর নাই, কিংবা আমি জিনের আছর গ্রস্ত কোন বালকও নই! বাবা আমার কথা সন্তোষজনক ভাবে শুনলেন এবং বললেন এসব কাজ খুবই বিপদজনক তাই আগ্রহ পরিত্যাগ করাই উত্তম।
তিনি আরেকটি নতুন কথা যোগ করে বললেন যে, আমার বাবা নিজেই এই ধরনের আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে, একদা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন! এসব নিয়ে আগ্রহ থাকলেও, যেন অধিক বয়সে থিসিস করার চেষ্টা করি, কক্ষনো যেন অল্প বয়সে না করি।
জিন যখন শিক্ষত হয়, তখন তাকে তাড়াতে বেগ পেতে হবেই
বাবা আমার কথায় আশ্বস্ত হলেও মা বললেন ভিন্ন কথা! তাঁর সাফ কথা, আমি গুছিয়ে পেঁচিয়ে যে কথাগুলো বাবাকে গিলিয়েছি, ওগুলো সব জিনদেরই শেখানো কথা!
তিনি আরো যোগ করে বললেন, আমি একাকী কারো সাথে জটিল ভাষায় কথা বলি, কখনও উত্তেজিত হয়ে বকাবকি করি। এগুলো সব জিনদেরই প্ররোচনা!
মাকে বুঝাতে ব্যর্থ হলাম যে, কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা মুখস্থ করে, তা কবির ছোট ছেলে সব্যসাচীর মত উচ্চারণ ও অঙ্গভঙ্গি অনুশীলন করেছিলাম।
এটা না জিনদের সাথে কথা বলা! না বকাবকি! এটা কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার কঠিন শব্দগুলোর আবৃতি ও উচ্চারণ মাত্র!
মা কিছুটা ক্ষান্ত হলেও আমার কথায় পুরোপুরি বিশ্বাস রাখলেন না! তাই তিনি আমার কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গ্রামে অবস্থান করা পারাতো শিক্ষিত ভাই, Abul Basher BABF (ব্যাচেলর অব আর্টস বাট ফেল) এর শরণাপন্ন হলেন!
Abul Basher BABF (ব্যাচেলর অব আর্টস বাট ফেল)
বশর সাহেব শিক্ষিত মানুষ। ১৯৭৩ সালে ড. আবুল ফজল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে শক্তভাবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে অকাতরে ছাত্র ফেল করে। বশর সাহেব সেই ঝড়ের আঘাতে ঝরে পড়া ফুল। বিএ পরীক্ষার পরে আর শহর মুখী হন নাই। গ্রামের নীরবতা, কোমলতা, মৃদুমন্দ হাওয়া এবং গ্রামের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা (টিউশনি) করার লক্ষ্যে গ্রামেই ফিরে এসেছিলেন
ফলে আমাকে যে জিনে ধরেছে সে কথা প্রায় সত্যের কাছাকাছি পৌছে গেল! তাছাড়া আমার উপর ভর করা জিন, কোন যেমন তেমন সাধারণ জিন নয়! পুরো দস্তুর এক শিক্ষিত জ্বিনের পাল্লায় পড়েছি বলেই সাব্যস্ত হল!
ফলে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত সমালোচনার মুখ বন্ধ করতে বাবা একটি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবতে রইলেন। লোক দেখানো চিকিৎসা করতে গেলেও বহু খরচ। বাবা আমার অন্তহীন মতি গতি বুঝতে পারতেন।
তিনি সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা-ধন্ধে ভুগতেন এই কারনে যে, সমস্যাটি আমার স্বভাব গত নাকি আসলেই জিনের উপদ্রবের কারণে ঘটে, সেটা নির্ণয় করতেই।
ধারনা করতেন যে, সেটি নিতান্ত কৌতূহলের কারণেই হবে, একদিন এমনিতেই এসব চুকে যাবে। তিনি মাকে বুঝাতে গেলে মুসিবতে পড়ে যান, মা উল্টো দোষ দিয়ে বলেন, তুমি এসবকে হাল্কা ভাবে নিয়ে ছেলের জীবনটাকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছ! যার সন্তান নাই সেই বুঝে সন্তান না থাকার ব্যথা!
জিন বন্ধ করতে ছালেক মৌলভীর পুনঃ শরনাপন্ন
সিদ্ধান্ত আগেই চূড়ান্ত হয়েছিল যে, এই জিন তাড়াতেই হবে। অবশেষে খারাপ জিন থেকে আমাকে মুক্ত করতে ছালেক মৌলভীকে আবারো তলব করা হল। তিনি যথারীতি কিতাবাদি নিয়ে আমাদের বাড়ীতে হাজির।
বিষয়বস্তু সব শুনে তিনি হাজিরাতে নিমগ্ন হলেন মৌলভি। দীর্ঘক্ষণ ধ্যান তথা মোরাকাবার পরে তিনি ঘোষণা করলেন এটা একটা বদ জিন তথা খারাপ জিনের কাণ্ড। সেটা যেমনি শক্তিশালী, তেমনি ধুরন্ধর।
এই এলাকায় যত জিন আছে, সে তাদের সকলের সর্দার। এই সেই জিন যে, দীর্ঘদিন আমাকে পুকুরের ঘাটে, জমিনের আলে, মাঠের ধারে সমস্যা করত; এখন সে তার আসল রূপে প্রকাশিত হয়েছে!
মা প্রশ্ন করলেন, আমার ছেলেকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা থেকে সেই জিন কবে, কিভাবে বিরত হবে? আর কেনই বা সে তাঁর ছেলের পিছু নিয়েছে?
মৌলভী নিশ্চিত করে বললেন, এই বারে সে এর একটা বিহিত করেই ছাড়বে, তবে সেজন্য অনেক টাকার দরকার হবে।
মা বললেন, পুরো জীবনে টাকা আপনাকে কম দিলাম কবে? কত লাগবে একবারেই বলেন, আমি চাই আমার ছেলে জিন মুক্ত জীবনের বাতাস নিচ্ছে। মৌলভীকে পুনরায় হাজিরাতে বসতে হবে, সেজন্য নতুন করে ওজুর দরকার, ফলে তিনি পুকুরের ঘাটে গেলেন।
এবার জিনের খপ্পরেই খোদ ছালেক মৌলভী
তাঁর এই ধরনের বিদঘুটে পতনে মা বেজায় বিরক্ত হলেন। মা মৌলভিকে বললেন, ‘এই পুকুরের এক ঘাটে পিছলা খাবার কারণে আপনি আমার ছেলেকে বহুবার তাবিজ দিয়েছেন! আর আপনি আজ সেই পুকুরের ঘাটে জিনের ধাক্কায় রীতিমত আছাড় খেয়ে পানিতে চুবে গেছেন!
বুঝা যাচ্ছে সেই বজ্জাত জিন থেকে আপনিও মুক্ত নন, তাহলে আপনি কিভাবে আমার ছেলেকে জিন থেকে রক্ষা করবেন’?
বেচারা মৌলভী আছাড় খাওয়ার উছিলায় আমার মায়ের কাছে কিছুটা অতিরিক্ত সহানুভূতির আশা করেছিলেন কিন্তু বেমওকা প্রশ্নে তিনি কিছুটা থতমথ খেয়ে উঠলেন। সহানুভূতির স্থলে তিনি উল্টো অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হলেন অধিকন্তু বদ জিন দৌড়ানোর তাঁর পুরো এসাইন্টমেন্টটাই বাতিল হয়ে গেল!
আছাড় খেয়ে ভাঙ্গা আঙ্গুল ঠিক করানোর জন্য মায়ের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিয়ে তিনি সেই যে গেলেন, বাকী জীবনে আর কোনদিন আমাদের বাড়ী মুখো হননি! অবশ্য তাঁর আর আসার দরকারও হয়নি কেননা ততদিনে তাঁর স্থলে নতুন আরেক জন তাবিজ দাতার উত্থান ঘটে যায়।
আগের পর্ব: ‘এক কিশোরের তাবিজ গবেষক হয়ে ওঠার মজার ঘটনা‘ পড়ুন