জামায়াতের রুকন শপথ নিতে যেসব ব্যক্তিগত তথ্য জমা দিতে হয়

জামায়াতের রুকন শপথ নিতে যেসব ব্যক্তিগত তথ্য জমা দিতে হয়

– জামায়াত কোন ফেরেশতার দল নয়; এটা মানুষ দ্বারা পরিচালিত

– মানুষ দ্বারা পরিচালিত দলে, কর্মীদের মৌলিক চারিত্রিক দুর্বলতা থাকবে

– তাই এগুলো কমাতে জামায়াতে প্রতিনিয়ত অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকে

– এসব বাছ বিছার করে একজনকে রুকন হিসেবে বিবেচনা করা হয়

– রুকন আহামরি কিছু না, তবে তাদেরকে একনিষ্ঠ নির্ভরযোগ্য কর্মী বিবেচনা করা হয়

– এভাবে একজন সক্রিয় কর্মীর অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনা ও মূল্যায়ন করা হয়, এবং

– ভবিষ্যৎ জীবন পরিকল্পনার কুরআন-হাদিস বান্ধব স্বচ্ছ ও পরীক্ষিত ধারনা দেওয়া হয়

– সেই পরিকল্পনার আলোকে চলার অঙ্গিকার করার নাম রুকন শপথ

– রুকন শপথ করা হয়, দলীয় আমীরের হাতে, যেটাকে বাইয়াত বলাও হয়

– রুকন মানে পিলার, সে হিসেবে দল রুকনদের উপর অনেকটা নির্ভরশীল

– এখন কথা হল, সেই রুকন হতে কি কি তথ্য যাচাই করা হয়,

– তার একটা সম্যক ধারণা তুলে ধরা হল, এতে পাঠকদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবেজামায়াত-রুকন-শপথ

ব্যক্তিগত তথ্য

– নাম, পিতার নাম, স্ত্রী-সন্তানদের পরিচয়, তারা ইসলামী জীবন ধারা পছন্দ করে কিনা

– নিকট আত্মীয়ের মধ্যে ইসলামী জীবন পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়

– নিজের পরিবার, পুত্র-কন্যা, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদীদের বিষয়ে জানা হয়

– নিজের পক্ষের আত্মীয় ও শ্বশুর পক্ষের আত্মীয়দের সম্পর্কে ধারনা নেওয়া হয় জামায়াত-রুকন-শপথ

‌এবাদতের প্রতি অভ্যাসগত তথ্য

– বিগত ছয় মাসে প্রতি ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায় হয়েছে কিনা

– বিগত ছয় মাসে প্রতিদিন কোরআন-হাদিসের তাফসীর পড়া হয়েছে কিনা

– বিগত ছয় মাসে প্রতিদিন অন্তত ১০ পৃষ্ঠা ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করা হয়েছে কিনা

– বিগত ছয় মাসে কি পরিমাণ সামাজিক কাজে জন-সম্পৃক্ততা ছিল, এবং

– বিগত ছয় মাসে কি পরিমাণ সময় ব্যয় করা হয়েছে

– এর দ্বারা বুঝে নেওয়া হয়, যে ব্যক্তি এক নাগাড়ে ছয় মাস যে কাজ করতে পারে,

– তাহলে ইচ্ছে করলে, তিনি একই কাজ বাকী সারাটা জীবনেও করতে পারবে জামায়াত-রুকন-শপথ

 

ব্যক্তি জীবনের তথ্য

– বিয়ের মোহরানা কত ছিল এবং স্ত্রীর মোহরানা পুরোটা আদায় হয়েছে কিনা

– আদায় না হলে, পুরোটা দিয়েই তবে রুকন শপথ নিন, বিকল্প হিসেবে

– স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ব্যাংক কিস্তির মাধ্যমে মাসিক ভাবে আদায় শুরু করুন

– কোন ঋণ আছে কি না? থাকলে সেই ঋণের প্রাপক কে? এবং পরিমাণ কত?

– ওয়ারিশ হিসেবে বোন কিংবা ফুফুর কোন সম্পদ বা সম্মতি দখলে আছে কিনা

– অবৈধ উপায়ে অন্যের হক ভোগদখলে রাখছেন কিনা, জবর দখলকারী কিনা

– এর দ্বারা বুঝে নেওয়া হয় ব্যক্তি জীবনে তিনি কেমন স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ত জামায়াত-রুকন-শপথ

 

ব্যবহারিক জীবনের তথ্য

– তিনি কোন পথে কিভাবে আয় করেন এবং প্রতিষ্ঠানে তার পদবী কি?

– তিনি মাসে কি পরিমাণ আয় করেন এবং আয়ের অর্থ পুরোটাই সৎ ও স্বচ্ছ কিনা

– সন্দেহ জনক আয়ের সাথে জড়িত কিনা, কাজের বিবরণ দিতে হবে

– ব্যবসা হলে তার ব্যবসায়ের বিবরণ ও অর্থনৈতিক ট্রানজেকশনের ধরণ জানাতে হবে

– সুদ কিংবা সুদী ব্যবসার সাথে কোন প্রকার সংশ্রব আছে কিনা

– সকল ব্যবসায়ী লেনদেন যে কোন একটি ইসলামী ব্যাংকের সাথে সম্পৃক্ত কিনা

– ফাইনালি নিজের আয় কত দাঁড়ায় এবং আয়ের কত শতাংশ আল্লাহর রাস্তায় দান করবেন

– এর দ্বারা বুঝে নেওয়া হয় যে, ব্যবহারিক জীবনে তিনি কতটা সৎ ও কর্তব্য-প্রবণ জামায়াত-রুকন-শপথ

 

সামাজিক জীবনের তথ্য

এই ব্যক্তি সম্পর্কে, নিজস্ব মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের জরিপ সংগ্রহ করা হয়

– মানুষের সাথে আচরণ কেমন, গালাগালি, কটুভাষী, বিদ্রূপ, ঠাট্টা-মস্করা প্রবণ কিনা

– লেন দেনের চরিত্র কেমন, ওয়াদা ভঙ্গ, ঠগ-বাজি, মোনাফেকি, আত্মসাৎকারী কিনা

– জীবনাচরণ কেমন, কথায় কথায় উত্তেজিত, ওজন-হীন, ঠুনকো স্বভাব, আড্ডাবাজ কিনা

– সাংসারিক জীবন কেমন, স্ত্রী সন্তানদের প্রতি নির্দয় ও তাদের প্রতি বেখেয়াল কিনা

– পারিবারিক জীবন কেমন, পিতা-মাতা, শ্বশুর শাশুড়ি, সু-প্রতিবেশী সুলভ আচরণ কিনা

– ব্যক্তি-স্বভাব কেমন, খোঁটা দানকারী, অহংকারী, লৌকিকতা ও লোক দেখানো ব্যক্তি কিনা

– সামাজিক প্রবণতা, ঝগড়াটে, বিবাদপ্রিয়, কুট-নামি ও দোষ তালাশ প্রিয় কিনা

– উপরের সকল বদ স্বভাবের বিপরীতে, উত্তরোত্তর ভাল স্বভাব অর্জনে প্রচেষ্টা-কামী কিনা

– এর দ্বারা বুঝে নেওয়া হয়ে যে, সামাজিক জীবনে তিনি কতটা গ্রহণযোগ্য ও ব্যক্তিত্ব-প্রবণ

 

তাকওয়ার প্রতি বিবেচনা

– মাঠ পর্যায় থেকে এত কিছুর উত্তর মোটামুটি সন্তোষ জনক হলে তাকে বাছাই করা হয়

– যদি সন্তোষ জনক না হয়, তাকে ডেকে সুন্দর ভাবে পরিবর্তনের আহবান করা হয়

– আহবানের সাথে সাথে তাকে পরিচর্যা করা হয়, যাতে করে তিনি পরিবর্তনের আগ্রহী হন

– তিনি যদি পরিবর্তনের আহবান গ্রহণ করেন এবং নিজের জীবনে দেখানো শুরু করেন

– তাহলে তাকে চূড়ান্ত ইতিবাচক নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

– এর দ্বারা বুঝা যায় তিনি তাকওয়া অর্জনের প্রতি কতটা আগ্রহী, মানদণ্ডে কত বাস্তববাদী

 

আরো বাকি আছে, তার সাথে কথা বলে পরবর্তী জীবন দর্শনের ওয়াদা নেওয়া হয় জামায়াত-রুকন-শপথ

 

ঈমানী দৃষ্টিকোণ বিচার

– জীবনে কখনও ফরজ ওয়াজিব তরফ করবেন না, সুন্নত মত জীবন যাপন করবেন

– জীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কবিরা গুনাহ হতে বিরত থাকতে সর্বান্তকরণে সচেষ্ট থাকবেন

– জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন

– তাই আল্লাহর রাস্তায় শ্রম, সাধনা, সময়, অর্থ, মেধা ও যোগ্যতা ব্যয় করা

– বিপদ, মুসিবত, পরীক্ষা আল্লাহর পক্ষ হতেই, তকদিরের ফায়সালায় উপর নির্ভর করা

– ফলে যে পরিবেশ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা মেনে নেওয়া

– দল ও নেতার আনুগত্য করা, যতক্ষণ নেতার কার্যাবলী ইসলামী শরীয়তের অধীনে থাকে

– তবেই তিনি জামায়াতের আমীরের হাতে আনুগত্যের শপথ নিয়ে রুকন হতে পারেন

– এর দ্বারা বুঝা যায় তিনি প্রকৃতই ইমানের স্বাদ পাওয়া শুরু করেছেন

 

উপসংহার

এত কিছুর পরেও তো কথা আছে। মানুষ তো ফেরেশতা নয়। দুনিয়া হল পাপ প্রবণ, মানুষ হল লোভ প্রবণ, শয়তান হল বন্ধু-ভাবাপন্ন কুচক্রি-প্রবণ। মানুষের আকাঙ্ক্ষা অপরাধ প্রবণ, মানুষের অভিলাষ দুর্দমনীয়, জয় করা কিংবা পাওয়ার আশা ছিনতাই প্রবণ। মানুষের সমস্যা তাকেই সমাধান করতে হয়। এটা সমন্বয় সবাই করতে পারে না। তাই মানুষ ভুল করতে পারে এবং করেই। 

 

উপায়হীনতা

তাহলে শপথ নেবার পরেও যদি তা কেউ ভঙ্গ করে। তার জন্যে করনীয় কি?

এক্ষেত্রে প্রথম কথা হল,

– জামায়াতের নিজস্ব কোন প্রশাসনিক কাঠামো নাই

– তাই তাদের কোন বিচারক নাই, নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও নাই,

– তাদের ব্যক্তিগত কোন পুলিশ নাই, তাই

– তাই আইন অমান্য-কারীকে ধরে শাস্তি দেবার সুযোগ ও নাই

– আবার দলীয় নিতিমালা ভঙ্গকারীকে আইনের হাতে সোপর্দ করার ব্যবস্থা নাই

 

করনীয়

– ফলে, তার রুকনিয়াত তথা শপথ ভঙ্গকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়

– তাকে সিদ্ধান্ত প্রদান ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন-কারীর পর্যায় থেকে দূরে রাখা হয়

– সে অনুকরণীয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ও নেতা হিসেবে মর্যাদা ও গুরুত্ব হারায়

– সেই নেতা দলীয় শৃঙ্খলা ও গণ্ডি হারিয়ে যথেষ্ট অপমানিত ও আত্ম-যাতনায় ভোগে

– এই নিয়ম জামাতের সকল সেক্টরে সারাদেশে সব সময় চলে ও চর্চা হয়

– প্রশাসনিক শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় সেই খবর সাধারণ মানুষ জানে না, দেখতে পায় না

– সেই ভুল যদি চারিত্রিক হয়, তাহলে তওবা করবে এবং ফিরে আসার চেষ্টা করবে

– সেই ভুল যদি ফৌজদারি হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় নিয়ম মেনে মুক্ত হয়ে আসবে

– তার তওবা যদি মানদণ্ডে বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাহলে তাকে আবারও গ্রহণ করা হবে

 

লেখকের দৃষ্টিকোন

বিষয়টাকে এবার নিজের জীবনের আয়নায়, একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, জামায়াতের রুকন হতে গেলে এতগুলো ব্যক্তিগত বিষয় খোলাসা করতে হয়। সত্য কথা হল, এতগুলো ব্যক্তিগত বিষয় দশ জনের কাছে খোলামেলা হয়ে গেল, তার কাছে ব্যক্তিগত বলতে আর কি থাকে? এই দলের প্রতিটি রুকন এভাবেই নিজের ব্যক্তিগত সকল তথ্য তার দলের সকলের আমীরের কাছে খোলামেলা পরিষ্কার করে বলেই; তাদের দলের আমির সংসদের ফ্লোরে দাড়িয়ে ঘোষণা করতে পারে, তার দলে কো ঋণ খেলাপি নাই। এবার পাঠক হিসেবে আপনি একবার ভাবুন তো, নিজের এতগুলো ব্যক্তিগত তথ্য আপনি কার সাথে শেয়ার করেছেন? উত্তরটা একটু কঠিন বৈকি।

 

অভিমত

– এভাবে বিন্যস্ত করা একটি দলকে অনেকে ইসলামী দল বলতে চায় না

– আবার কেউ চারিত্রিক ভুল করলে, তাকে নবীর সাথে তুলনা করে তুলা-ধুনা করা হয়

– কোরআন হাদিস চষে সেই ভুল গুলোকে জনসমাজের প্রচার করা হয়

– এটাতেও জামায়াত বিচলিত হয় না, তারা মনে করে এটাও সংশোধনের একটি উপায়

– ভুল ধরার হাজারো চোখ খোলা থাকলে, ছোট খাট ত্রুটিগুলোও সামনে উঠে আসে

– এভাবে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ভুল গুলো কেউ ধরিয়ে দেয় এবং নিজেরা সংশোধিত হলে

– নিজেদের ঐক্য সমৃদ্ধি যেভাবে বাড়বে, আল্লাহর সান্নিধ্যও তত কাছাকাছি হবে

– ফলে তাদের মধ্যে সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিকে সেগুলোকে নিবারণ করা সহজ হয়

– এভাবেই দলটি পরিবেশ পরিস্থিতির মোকাবেলা করে ও নিজেদের পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালায়

 

পরিশেষে,

এসব তথ্য উপাত্ত আমার অধ্যয়ন লেখাপড়ার আলোকেই তুলে আনা হয়েছে। এগুলোই সব নয়, এর বাহিরেও অনেক আছে। হয়ত অনেকেই মন্তব্য করে আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারে। আরো পয়েন্ট যোগ করতেও পারে। তবে আমার ব্যক্তিগত তিনটি মন্তব্য রেখে গেলাম।

 

– আমরা দেখতেই পেলাম জামায়াতের রুকন হওয়াটা কঠিন। অনেক অগ্রসর কর্মীর কাজকর্ম কথা বার্তায়, সাধারণ মানুষ তাকে রুকন মনে করে কিন্তু দলীয় ফোরামে তিনি কোন ত্রুটির কারণে রুকন হতে পারে নাই। এটা তো সাধারণ মানুষ জানে না। এমন কর্মীরা জামায়াতের দলীয় কোন দোষ-ত্রুটি দেখতে পেলে আগবাড়ায়ে জামায়াতের কড়া সমালোচনা শুরু করে দেয়। ভাবখানা এমন সে দলের একজন চরম মাত্রার হিতাকাঙ্ক্ষী যদিও সে শপথের উপযুক্ত হয়নি। ওরা দলকেও শাসায় আবার বিপক্ষ দলকেও দেখায়।

 

– জামায়াতের রুকনিয়াত থেকে ইস্তফা দেবার সুযোগ নাই। কেননা এটা একটি ওয়াদা পালনের নাম মাত্র। তিনি গোস্বা করে এতটুকু বলতে পারেন যে, কোরআন-হাদিস মতে চলব, কবিরা গুনাহ করবা না। বলে যে ওয়াদা করেছিলাম, সেটা প্রত্যাহার করলাম।

 

– জামায়াত থেকে বহিষ্কার করারও কোন সুযোগ নাই। বড়জোর সাংগঠনিক দায়িত্ব ও কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে পারে মাত্র। সেই ব্যক্তি যদি বলেন যে, শপথের সময় যে ওয়াদা করেছিলেন, বাকি জীবন আবারো তিনি সেটা মেনে চলবেন, আল্লাহ ব্যতীত কারো পক্ষে তাকে বাধা দেবার সুযোগ নাই।

 

জামায়াতকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি তুলে ধরেছি। আল্লাহ আমার পর্যবেক্ষণ থেকে ভুল ত্রুটি ক্ষমা করুন।