আমেনার কোল ছেড়ে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) দুধ মা হালিমার কোলে

আমেনার কোল ছেড়ে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) হালিমার কোলে

মুহাম্মদ (সাঃ) এর দুধ মা হালিমা আস সাদিয়া

অভিজাত আরবরা একটা প্রথা চালু রেখেছিল যে, তারা তাদের শিশুদের দুধ পান করানোর জন্য আরবের শহরতলীর অধিবাসীদের কাছে প্রেরণ করতো। এর কারণ হলো, শহরতলীর ওদের ভাষা ছিল প্রকৃতই আরবী এবং উচ্চারণও ছিল একেবারে স্পষ্ট।

তাছাড়া তাদের মধ্যে শিশু প্রতিপালিত হলে, সে শিশু আরবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠত। তাদের চরিত্রে আরবের প্রকৃত স্বভাব প্রস্ফুটিত হত।

মুহাম্মদ (সাঃ) উচ্চ মার্গের বিশুদ্ধ আরবী পরিবেশে বড় হন

এ সম্পর্কে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং বলেছেন, আমি প্রতিপালিত হয়েছি আরবের শুদ্ধভাষী বনী সা’আদ গোত্রে। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ময়ূর বলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শারীরীক দিক দিয়ে বর্ধিতু ছিলেন।

তাঁর চরিত্র ও স্বাধীন মনোবৃত্তি ছিল তুলনাহীন। তিনি আরবের বনী সা’আদ গোত্রে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছেন, এ কারণে তাঁর ভাষা ও বর্ণনা শৈলীতে আরবের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য প্রস্ফুটিত হত।

আরবে দীর্ঘদিন যাবৎ শিশুদের দুধ পান করানোর এই প্রথা বহাল ছিল। খেলাফত ব্যবস্থার অবসানের পরেও এই প্রথা চালু ছিল।

কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পরে বনী উমাইয়াগণ বিশ্বের অন্য দেশের রাজ রাজাদের মতই জীবন যাপন করতো। তবুও তারা তাদের শিশু সন্তানকে শহরতলীর অধিবাসীদের কাছে বহু বছরের জন্য দিয়ে দিত।

রাজতন্ত্রের যুগে অলীদ ইবনে আব্দুল মালেককে প্রথা অনুযায়ী শহরতলীতে দুধ পান করানোর জন্য না দিয়ে তাকে রাজপ্রাসাদে রেখেই প্রতিপালিত করা হয়েছিল। ফল এই দাঁড়িয়েছিল যে, অলীদই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি শুদ্ধভাবে আরবী বলতে পারতেন না।

শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) কে সংগ্রহ করার সংক্রান্ত হালিমার নিজস্ব কিছু মন্তব্য ও উপলব্দি

শহরতলীর এই বেদুঈনেরা বছরে দুইবার প্রথানুসারে শহর এলাকায় আগমন করতো। এ সম্পর্কে সীরাতে ইবনে হিশাম হালিমার নিজস্ব বর্ণনা তুলে ধরেছেন,

‘আমি স্বামীকে ও তাঁদের দুধের শিশুকে সাথে নিয়ে বনী সা’আদের কয়েকজন নারীর সাথে দুধ পান করাবে এমন শিশুর খোঁজে এসেছিলাম। সে বছরে কোন ফসলাদি জন্মেনি ফলে আমাদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। বাহন হিসাবে আমরা যা গাধাটা ব্যবহার করছিলাম তা ছিল সাদা রঙের এবং রোগা।

আমাদের সাথে একটি উট ছিল। কিন্তু সে উট এক ফোঁটা দুধ দিতেও সমর্থ ছিল না। ফলে আমার দুধের শিশুটি সব সময় কাঁদতো এবং আমরা তাঁর কান্নার শব্দে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আমার সন্তান পেটেভরে দুধ পান করবে এমন পরিমাণ দুধ আমার বুকেও ছিল না। আমরা সে সময়ে একটু বৃষ্টি এবং সুখের আশা করছিলাম।’

এ বিষয়ে হযরত হালিমা আরো বলেন,

‘আমাদের পথ ছিল দীর্ঘ, ফলে আমাদের কাফেলা ভীষণ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। অবশেষে আমরা শিশুর সন্ধানে মক্কায় এসে উপস্থিত হলাম। এ সময়ে আমাদের সবাইকে একে একে ঐ সন্তানটি গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হলো। তারপর যখনই আমরা জানতে পারলাম শিশুটির পিতা জীবিত নেই, তখন আমরা সবাই শিশুটিতে গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করলাম।

কেননা, আমরা সবাই আশা করতাম শিশুর পিতা আমাদেরকে বড় অঙ্কের অর্থদান করবে। কিন্তু শিশুটির পিতা নেই, ইয়াতীম। এই শিশুর দাদা আর মা আমাদেরেকে তেমন কোন কিছুই দিতে পারবে না। ফলে শিশু প্রতিপালনের সমস্ত শ্রমই আমাদের বৃথা যাবে। এ সমস্ত দিক ভেবে আমরা অন্য শিশুর সন্ধান করছিলাম। ইতিমধ্যে সবাই ধনী ঘরের শিশু লাভ করলেও আমার ভাগ্যে কিছুই জুটলো না।’

হযরত হালিমা তিনি আরো বলেন,

‘আমার সাথে যারা এসেছে তারা সবাই শিশু নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে যাত্রা করলে, অথচ আমি কোন শিশুী পেলাম না। অবশেষে আমি আমার স্বামীকে বললাম, খোদার শপথ! আমার সাথীরা শিশু নিয়ে যাচ্ছে আর আমি তাদের সাথে রিক্ত হাতে ফিরে যাবো, এটা আমার কাছে লজ্জার কারণ বলেই মনে হচ্ছে।

আমি ঐ ইয়াতীম শিশুটিকেই নিয়ে যাবো। আমার স্বামী আমার কথা শুনে আমাকে পরামর্শ দিয়ে বললো, শুন্য হাতে না ফিরে ঐ শিশুটিকেেই নিয়ে নাও। এমনও তো হতে পারে যে, ঐ শিশুর মধ্যেই খোদা আমাদের জন্য উত্তম কোন কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধমাতা হালিমা বলেন,

‘তারপর আমি ঐ শিশুর মা ও দাদার কাছে গেলাম এবং শিশুটিকে নেয়ার কথা জানালাম। তারা আমাকে দিয়ে দিল এবং আমি শিশুটিকে আমার কোলে উঠাতেই আমার বুকে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল।’

সে দুধ শিশুটি পেটেভরে পান করলো এবং আমার নিজের সন্তানও পেটেভরে পান করে ঘুমিয়ে পড়লো। অথচ অন্য দিন আমার সন্তান পেটেভরে দুধ পেত না বলে সব সময় কাঁদতো। বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করলো। তারপর আম’র স্বামী আমাদের উটের কাছে যেয়ে দেখলো, আমাদের সেই উটেরও হঠাৎ করে প্রচুর দুধ এসেছে।

হালিমা দুধ দোয়ালেন এবং আমরা দু’জনে তা তৃপ্তি মিটিয়ে পান করলাম। তারপরেও উটের দুধ পরিপূর্ণ থাকলো। আমার স্বামী অত্যন্ত খুশী হয়ে আমাকে বললো, তুমি এমন এক মহাকল্যাণময় শিশু এনেছো, যে শিশুর কোন তুলনা হতে পারে না। আমিও স্বামীর কথায় সম্মতি জানলাম।’

হযরত হালিমা বলেন, ‘তারপর আমরা আমাদের সেই রোগা দুর্বল গাধার পিঠে উঠে নিজের এলাকার দিকে যাত্রা করলাম। আমরা অবাক হয়ে গেলাম, আমাদের সেই দুর্বল রোগা গাধা আমার সাথীদের শক্তিশালী গাধাদের পরাজিত করে অত্যন্ত দ্রুত বেগে সবার আগে এগিয়ে চললো। আমার সাথিরা অবাক হয়ে আমাকে ডেকে বললো, আমাদের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা

করো। তুমি যে গাধার পিঠে চড়ে এসেছিলে, এই গাধা কি সেই গাধা? আমি তাদেরকে জানলাম, এটাই সেই গাধা। তারা অবাক কন্ঠে মন্তব্য করলো, শপথ খোদার! গাধার গতিতে এত পরিবর্তন!’ এ বিষয়ে হালিমা বলেন,

‘এভাবে আমরা সবার পূর্বে আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলাম। সে সময়ে আমাদের ঐ এলাকার মত রৌদ্র তাপে বলসানো এলাকা এই পৃথিবীতে আর একটি ছিল কিনা আমরা জানিনা। আমরা শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে আসার পর থেকে আমাদের পশুপাল প্রতিদিন পেটেভরে খেয়ে আসতো।

আমরা সেই পশুপাল থেকে প্রচুর দুধ পেতাম। অথচ অন্যের পশুপাল খেটেও পেত না দুধও দিতে পারত না। আমাদের পশুপাল পেটেভরে খেতে পায় এ কারণে অনেকে আমাদের পশুর সাথে তাদের পশুও চরতে দিত, যেন তাদের পশু আমাদের পশুর সাথে পেটেভরে খেতে পারে।

কিন্তু তবুও তাদের পশুর পেট ভরতো না দুধও দিত না। এভাবে আমরা অল্প দিনেই অভাব মুক্ত হয়ে গেলাম। এই সচ্ছল অবস্থার ভেতর দিয়ে দিন দুই বছর পার হয়ে গেল। আমি শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুধ ছেড়ে দিলাম। সাধারণ শিশুর থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত দ্রুত বেড়ে উঠিল। মাত্র দুই বছরের শিশু, অথচ তাঁর শারীরিক গঠন এবং স্বভাব ছিল কয়েক বছরের বালকের মত।’

হযরত হালিমা আরো বলেন,

‘আমরা তাকে আমাদের কাছেই রাখতে আগ্রহী ছিলাম বেশি। কারণ তাকে নিয়ে আসার পর থেকেই আমাদের উন্নতি হচ্ছিল। তবুও প্রথানুসারে তাকে আমরা তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। তাঁর মা’কে আমরা বললাম, শিশুটিকে যদি আমাদের কাছে আরো কিছুদিন থাকতে দিতেন তাহলে আরো তাঁর স্বাস্থ্য ভাল হতো।

আমাদের মনে এই ভয় হয় যে, শিশুটি মক্কায় কোন ধরণের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আমাদের এ সমস্ত কথা ও আগ্রহ দেখে তাঁর মা শিশুটিকে পুনরায় আমাদের সাথেই দিয়ে দিলেন। আমরা আনন্দ চিত্তে তাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে ফিরে এলাম। সে সময়ে প্রকৃত অর্থেই মক্কায় মহামার আকারে বসন্ত রোগ ছড়িয়ে ছিল।’

হালিমার সন্তান আবদুল্লাহ ছিল মুহাম্মদ (সাঃ) এর এক দুধ ভাই

তাওয়ারীখে হাবীবে ইলাহ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালিমার ডান স্তনের দুধই শুধু পান করতেন। বামের দুধে কখনো মুখ দিতেন না। কেননা, মা হালিমার শিশু সন্তান আবদুল্লাহর জন্য সে দুধ শিশুংবী রেখে দিতেন।

তিনি শিশু সুলভ কান্নাকাটি করতেন না এবং কখনো কাপড়ে মল মূত্র ত্যাগ করতেন না। নির্দিষ্ট সময়ে তিনি যথাস্থানে মল মূত্র ত্যাগ করতেন। তিনি কখনো উলঙ্গ হয়ে পড়তেন না। উলঙ্গ হয়ে পড়ার উপক্রম হলে অদৃশ্য জগৎ থেকে তাকে আচ্ছাদিত করে দেওয়া হতো।

হালিমার মেয়ে সায়মা শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) কে কোলে নিতেন দোল দিতেন

হালিমার একটি পুত্র সন্তান ও তিনটি কন্যা সন্তান ছিল। ছেলের নাম আবদুল্লাহ ও মেয়েদের নাম ছিল, হাজাফা, উনাইসা ও হোজাইফা। হাজাফাকে সায়মা নামে সবাই ডাকতো।

সায়মা ছিল কিশোরী বা তার চেয়েও কিছু কম বয়স। সেই শিশুনবীকে সব সময় দেখা শোনা করতো। তাকে কোলে নিয়ে ঘুরতো।

শিশুনবীকে সে আদর করতো আর কবিতা আকারে বলতো,

‘আমাদের ভেতরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাক। সে সুন্দর সুঠামদেহী বলিষ্ঠ যুবকে পরিণত হোক, আমরা তাকে দু’নয়নভরে দেখবো। নেতা হয়ে সে যেন ইয়েমেন নিজের অধিকারে গ্রহণ করতে পারে। তার সাথে যারা শত্রুতা করবে তাদের যেন মঙ্গল না হয়। হে প্রভু! তাকে অসীম সম্মানের অধিকারী করে দাও।’

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *