মক্কায় কিশোর মুহাম্মাদ (সাঃ) ও প্রতিমা দর্শনে অনীহা

কিশোর মুহাম্মাদ (সাঃ) ও প্রতিমা দর্শনে অনীহা

মক্কায় কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবন

কিশোর বয়স থেকেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চলাফেরা, কথাবার্তা, ওঠা-বসা, আহার নিদ্রা ছিল অন্য সবার থেকে ভিন্ন ধরণের। সাধারণত: শিশু কিশোর যেমন হয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেমন ছিলেন না।

তাঁর দিকে দৃষ্টি পড়লেই মানুষের মনে তাঁর প্রতি একটা শ্রদ্ধারভাব জেগে উঠতো। এসব দেখে তাঁর পিতার যে সমস্ত আত্মীয়-স্বজন ছিল, তাঁরা তাকে মমতার দৃষ্টিতে দেখত।

কিশোর বয়সেও এমন কোন আচরণ তাঁর মধ্যে কোন একটি মুহূর্তে প্রকাশ পেত না, যে আচরণ কারো মনে কখনো বিরক্তি উৎপাদন করতো। তিনি কারো সাথে হাঁটতেন, সেই হাঁটার ভঙ্গিতেই তাঁর সাথি আকৃষ্ট হতো।

মোটকথা তিনি যা-ই করতেন এবং বলতেন তা-ই মানুষকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতো। তাঁর মুখ থেকে কথার কোন শব্দ বের হলেই মানুষের উপরে এমন প্রভাব সৃষ্টি হতো যে, সে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতো। তাঁর

এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁর আব্বার বোন ও ভাইদের কাছে তিনি ছিলেন পরম এক রত্ন। পরিবারের সবার চোখের আলো ছিলেন তিনি। তাঁর গোটা মুখমণ্ডল এবং দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেত।

কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) এর সম্পর্কে তার আত্মীয় স্বজনদের বক্তব্য

কিশোর নবীর শোয়া এবং নিদ্রাও সাধারণ কোন শিশুর বা কিশোরের সাথে মিলতো না। ঘুমের সেই অচেতন জগতে অবচেতন অবস্থাতেও তাঁর মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিবাকরের ন্যায় পরিস্ফুটিত হতো।

তাঁর জীবনের এসব দিক সম্পর্কে আত্মীয় এবং পরিচিতজনেরা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, এ পর্যন্ত তারা যা দেখেছে, শুনেছে এবং তাদের অভিজ্ঞতা বলে, এই ছেলের কোন একটি আচরণও আবহমান কালের পরিচিত আচরণের মত নয়।

সুতরাং এ ছেলে পরিণত বয়সে ভিন্ন ধরণের একজন হবে এবং সে ভিন্ন সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবে। মা-বাবা নেই-ইয়াতিম, এ কারণে তাকে শুধু সবাই পরম আদরের দৃষ্টিতে দেখতো তা নয়-তাঁর ভেতরে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য দেখে তার প্রতি পরিবারের প্রতিটি সদস্য আকৃষ্ট হয়েছিল।

এ কারণে মুত্তালিবের ইন্তেকালের সময়ে সবাই গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল, এই বুঝি মুত্তালিবের মুখ থেকে তাঁর নামটাই ঐ শিশুর তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে বের হয়ে আসবে।

উপস্থিত সবাই তাদের কান দুটো সজাগ করে প্রবল আগ্রহে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আব্দুল মুত্তালিবের অন্তিম বাণী শোনার অপেক্ষায় ছিল। আব্দুল মুত্তালিব যখন আবু তালিবের নাম উচ্চারণ করলো তখন অন্যরা হতাশ হলেও শিশুনবীর প্রতি তাদের আগ্রহে সামান্যতম ভাটা পড়েনি।

কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি মমতায় আবদ্ধ আত্মীয় স্বজন

বংশের এবং পরিবারের সবাই সুযোগ পেলেই পরম মমতায় শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদর যত্ন করতো। তাঁর সামান্য একটু কিছু হলে সবাই ব্যাকুল হয়ে উঠতো। যেমন

ইবনে সাআদ উল্লেখ করেছেন, বিশ্বনবীর অত্যন্ত কাছের একজন-যাকে তিনি মা বলে সম্বোধন সেই সৌভাগ্যবর্তী নারী হযরত উম্মে আয়মান নবীর শিশু কিশোর ও তরুণ যুবক বয়সের অনেক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, যে সমস্ত ঘটনা ছিল সে সময়ের সমস্ত মানুষের জীবনে ঘটিত ঘটনার বিপরীত।

তদানীন্তন আরবে ‘বুয়ান’ নামক একটা মূর্তি ছিল, যাকে আরবের লোকজন পরম ভক্তিভরে দর্শন করতে যেত এবং তার বেদীতে প্রচুর উপঢোকন দিত। কুরাইশরা সেই মূর্তি দর্শনে গমন করতো এবং সাধ্য মত উপঢোকন দিয়ে আসতো। আবু তালিব তাঁর পরিবার পরিজন নিয়ে সে মূর্তি দর্শন করতে যেত। শিশু মুহাম্মদকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারা তাদের সাথে যাবার জন্য বলতো।

প্রতিমা তথা মূর্তি দর্শনে কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনীহা

প্রতি বছরই তারা এভাবে ঐ বুয়ানা মূর্তি দর্শন করতে যেত। কিন্তু কিশোর নবী যেতে অস্বীকার করতেন। পরিবারের সবাই তাকে বারবার অনুরোধ করতো, কিন্তু বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সিদ্ধান্তে ছিলেন অবিচল, পাহাড়ের মতই অটল।

অনুরোধ আদরের ব্যর্থ হবার পরে তারা একটু কঠিন কণ্ঠে তাকে তাদের সাথে যাবার আদেশ দিত। কিন্তু তিনি তাদের সাথে যেতেন না। চাচা-চাচী, ফুফুসহ সবাই তাকে নানভাবে বুঝিয়ে এবং আদরের অনুরোধ করেও তাকে সাথে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

নয়নের মনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে যায়নি, ফলে তাদের প্রতিমা দর্শনের আনন্দে তারা কোন ঘ্রাণে স্পন্দন খুঁজে পেত না। সাথে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসেনি, তাদের গোটা মুখমণ্ডলে বিরাজ করতো ঘন কালো মেঘের ছায়া। বিষাদিত চেহারায় মলিন মুখে তারা প্রতিমা দর্শন করতো।

প্রতিমা দর্শনে তিনি যেতেন না, এ কারণে তাঁর ফুফু, চাচা-চাচী এবং পরিবারের অনেকেই তাঁর প্রতি সাময়িকের জন্য অসন্তুষ্ট হতো। এ কারণে একবার প্রতিমা দর্শনে যাবার নির্দিষ্ট দিনে কিশোর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কোথাও কেউ খুঁজে পেল না। সবাই তাকে চারদিকে সন্ধান করতে বের হলো। কিন্তু কেউ তাঁর কোন সন্ধানই বের করতে পারলো না।

ফলে হাশিম পরিবারের মুখের হাসি আনন্দ মুছে গেল। সবার চেহারা বিবর্ণ। অবশেষে তিনি একাই ফিরে এলেন। তাঁর গোটা মুখমণ্ডল জুড়ে ভীতিহির ছায়া বিরাজিত। তাকে দেখে মনে হলো তিনি এমন এক দৃশ্য দেখেছেন, যা দেখে তিনি ভীষণ ভয় পেয়েছেন।

প্রতিমা দর্শনে কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনাগ্রহের কারণ জানলেন আত্মীয়রা

তাকে দেখে সবাই তাকে জড়িয়ে ধরলো। পরম মমতায় তার কাছে জানতে চাইলো, আব্বু তোমার কি হয়েছে? তোমাকে এমন ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে কেন? তাদের কাছে তিনি জানালেন, আমি ভীষণ ভয় পেয়েছি, আমার কোন ক্ষতি না হয়ে যায়।

চাচা-চাচী এবং ফুফুরা তাঁর অদ্ভুত গুন্ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘খোদা তোমার সাথে আছেন, কোন প্রেতাত্মা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।’

 

কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচা ও ফুফুদের কাছে বললেন,

‘আমি যখনই কোন মূর্তির ঘরের দিকে যাই, মূর্তির সামনের দিকে যাই তখনই হঠাৎ এমন একজন লোককে আমি দাঁড়ানো দেখতে পাই, যিনি বিশাল দেহের অধিকারী এবং অপুর্ব সুন্দর। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিচ্ছেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! খবরদার তুমি মূর্তির সামনে আসবে না! এসব মূর্তি তুমি স্পর্শ করবে না।’

হযরত উম্মে ’আয়মান বলেছেন, এতদিনের পর থেকে তিনি আর কোন দিন কোন প্রতিমা ঘরের দিকে অগ্রসর হননি (ইবনে সাআদ)

 

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉