কিশোর বয়সে মুহাম্মদ (সাঃ) চাচার সাথে সিরিয়া গমণের ঘটনা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, আরবরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে শামেদেশ তথা সিরিয়ায় যাতায়াত করতো। বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময়ে মাত্র বারো বছরের কিশোর।
তাঁর এই পৃথিবীতে তখন পরম আপনজন বলতে একমাত্র চাচা আবু তালিব। সেই চাচা ব্যবসা উপলক্ষে যাচ্ছেন বাণিজ্য কাফেলার সাথে শামেদেশে। যে সময়ে চাচা যাত্রা করলেন শামের দিকে।
কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুটে এসে তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে করুণ কণ্ঠে বললেন, ‘ইলা মান্ তাকিল্নি ইয়া আম্লি লা আবা লি ওয়ালা উম্মি।’ আমার চাচাজান! আমাকে আপনি কার কাছে ছেড়ে যাচ্ছেন! আমাকে কে দেখাশোনা করবে, আমার যে মা বাবা কেউ নেই।’
বিশ্বনবীর পবিত্র কণ্ঠ দিয়ে সেই মুহূর্তে এই কথাগুলো বোধহয় হাহাকারের মতই বের হয়ে এসেছিল। কি মর্মস্পর্শী করুণ আবেদনে সেদিন শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভেঙে পড়েছিলেন।
দুলোক ভুলোক ভেদ করে বোধহয় সেদিনের সেই শিশুর মর্মন্তুদ হাহাকার আল্লাহর আরশে আজীমে পৌঁছেছিল। আবু তালিবও নীরব থাকতে পারেনি। সেও তাঁর ভাতিজাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘খোদার শপথ! আমিও একে দূরে রাখবো না, একেও আমার কাছে থেকে দূরে থাকতে দেব না।
তাকে আমি সাথেই রাখবো।’ একথা বলে সে তাঁর ভাতিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাথে নিল। এটাই ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা।
খৃষ্টান পাদ্রী বাহিরার গীর্জায় অদূরে মুহাম্মদ (সাঃ) এর যাত্রা বিরতি
এই বাণিজ্য কাফেলা যখন বুসরা এসে যাত্রা বিরতি করলো। তখন সেখানকার গির্জায় এক পাদ্রী ছিল। তাঁর নাম ছিল বাহীরা। ঈসায়ী ধর্ম সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। বাহীরা ছিল একজন নেস্টরীয় পাদ্রী।
তারা প্রচলিত খৃষ্টবাদে বিশ্বাস করতো না। খৃষ্টধর্মে সে সময়ে বিকৃতির কারণে নানা ধরণের উদ্ভুত মতবাদসহ তিন খোদারও আবিষ্কার করা হয়েছে।
এই নেস্টরীয় খৃষ্টান সম্প্রদায় তখন যীশুর প্রকৃত শিক্ষা ধরে রাখার চেষ্টা করতো। কোন ধরণের মূর্তির প্রশ্রয় তারা দিত না। ক্রুশ চিহ্ন তারা ব্যবহার করতো না। তাদের কাছে ক্রুশও ছিল মূর্তির প্রতীক।
সেই গির্জায় অনেক দিন পূর্বের একখানা আসমানী কিতাব সংরক্ষিত ছিল। সে কিতাব অনেকেই পাঠ করে খৃষ্টানদের প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস এবং পদ্ধতির বিপরীত শিক্ষা লাভ করতো। সেই সাথে তারা শেষ নবীর আগমন সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করতো।
কারণ, খৃষ্টানরা তাদের ধর্মে বহু পূর্বেই পরিবর্তন এনেছিল। মক্কার বাণিজ্য কাফেলা ঐ গির্জার পাশ দিয়েই আসা যাওয়া করতো এবং কখনো কাফেলা গির্জার কাছে যাত্রা বিরতি করতো। কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু তালিব যে কাফেলায় ছিলেন সে কাফেলাও ঐ গির্জার পাশে যাত্রা বিরতি করেছিল।
বাহীরা পাদ্রী কোনদিনই কারো সাথে গির্জা ছেড়ে বাইরে আসতো না এবং কারো সাথে কোন কথাও বলতো না। পক্ষাস্তরে সে এবার তাঁর চিরাচরিত নিয়ম ভঙ্গ করে গির্জার বাইরে এসে কাফেলার সমস্ত জনশক্তিকে আহারের নিমন্ত্রণ করলো।
একটা বিষয়ে জনশ্রুতি আছে, পাদ্রী বাহীরা তাঁর গির্জায় অবস্থান করেই একটা অবাক করার মত ঘটনা ঘটতে দেখে। বাণিজ্য কাফেলা যখন আসছিল, তখন সে দেখতে পেল, গোটা কাফেলার ওপর সূর্যের প্রখর কিরণ ছড়িয়ে পড়ছে কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর শরীরে রোড স্পর্শ করছে না।
পাদ্রী বাহিরা দেখলেন মুহাম্মদ (সাঃ) কে এক টুকরা মেঘ ছায়া দিচ্ছে
তাকে ছায়া দান করে একখণ্ড মেঘ। পাদ্রী আরো নাকি অবাক হয়েছিল, যে পথ দিয়ে কাফেলা আসছিল সে পথের দুধারের বৃক্ষ তরুণতা নত হয়ে একটা বালককে ছায়া দান করছে বা সম্মান প্রদর্শন করছে। এ সমস্ত দৃশ্য দেখে পাদ্রী গির্জাছেড়ে বাইরে বের হয়ে এসে একজন লোক প্রেরণ করে কাফেলায় আগত যাত্রীদের তাঁর দেয়া ভোজ সভায় অংশ গ্রহণের অনুরোধ জানালো।
পাদ্রীর এ ধরণের ব্যতিক্রম ধর্মীয় আচরণ দেখে একজন কুরাইশ তাকে বললো, ‘হে বাহীরা! আজ আপনি এক নতুন মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়েছেন। আজকের আগে আমরা এই রাস্তায় অনেক বার আসা যাওয়া করেছি, কিন্তু আপনি কোন দিন এমন করে আমাদের আপ্যায়নের আয়োজন করেননি। হঠাৎ আজ আপনার এই ধরণের আচরণের কারণ বলবেন?’
বাহীরা বললো, ‘তোমাদের কথা মিথ্যা নয়। কিন্তু আজ আমি তোমাদের দাওয়াত দিচ্ছি, তোমরা আজ আমার মেহমান। আজ আমার ইচ্ছে হয়েছে তোমাদেরকে আপ্যায়ন করানোর। আমি তোমাদের জন্য আহারের আয়োজন করছি, তোমরা ছোট বড়, মনিব এবং দাস কেউ আমার দাওয়াত থেকে বিরত থাকবে না।’
তারপর যথা সময়ে কাফেলার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত সবাই গিয়েছিল পাদ্রীর দাওয়াতে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপ্রাপ্ত বয়স্ক এ কারণে তাকে সেখানে রেখে যাওয়া হলো, যেখানে বাণিজ্য কাফেলা শিবির স্থাপন করেছিল।
পাদ্রী বাহিরার ভোজে কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) কে দাওয়াত দিলেন
কাফেলার অন্যারা উপস্থিত হয়ে আহারে বসে গেল। বাহীরা তাদেরকে ভালোভাবে দেখে অনুভব করলো, তাঁর দেখা সেই বালক এদের ভেতরে নেই। সে জিজ্ঞাসা করলো, ‘আপনাদের কাফেলার সবাই কি এখানে উপস্থিত?’
তারা বললো, ‘না, একজন রয়ে গেছে। সে অল্প বয়স্ক হবার কারণে তাকে শিবিরে রেখে আসা হয়েছে।’
বাহীরা বললো, ‘কেন তাকে রেখে এসেছো, তাকেও নিয়ে এসো।’
একজন বললো, ‘লাত ও উজ্জার শপথ! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ভেতরে উপস্থিত থাকতে আমরা তাকে ছেড়ে খাবো এটা হতে পারে না। এটা আমাদের জন্য শোভনীয় নয়।’
এ কথা বলে লোকটি উঠে গিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাথে করে নিয়ে এলো এবং তাদের সাথে বসিয়ে দিল।
বাহীরা আসমানী কিতাবে শেষ নবীর স্বভাব এবং চেহারা ও শরীরের গঠন সম্পর্কে যে বর্ণনা পড়েছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে তা মিলিয়ে দেখতে লাগলো। আহার পর্ব শেষে সবাই একে একে বের হয়ে গেলে বাহীরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একান্তে জিজ্ঞাসা করলো,
পাদ্রী বাহিরা আগ্রহী হয়ে নিজেই একান্তে কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) কে নানা প্রশ্ন করেন
‘ওহে বালক! আমি তোমাকে লাত ও উজ্জার কছম দিয়ে বলছি, আমি তোমাকে যা প্রশ্ন করবো, তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দেবে?’
পাদ্রী বাহীরা খৃষ্টান হয়েও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঐ দুই দেবতার কসম দিল এ কারণে যে, সে কুরাইশদের সম্পর্কে জানতো, তারা কথা বলার সময় ঐ দেবতাদের কসম করে। পাদ্রীর কথায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আপনি আমাকে ঐ দেবতাদের কসম দিয়ে কিছুই বলবেন না, আল্লাহর কসম! আমি তাদেরকে সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করি।’
পাদ্রী বললো, ‘আচ্ছা, আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে যা জানতে চাইবো, তুমি তা বলবে?’
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার বললেন, ‘আপনার যা জানার তা আমাকে প্রশ্ন করে জানতে পারেন।’
এরপর পাদ্রী বিশ্বনবীর একান্ত জীবন এবং তাঁর চলাফেরা, ঘুম, আহার, শারীরিক গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রশ্নের জবাব দিলেন।
পাদ্রী বাহিরা নিশ্চিত হলে এই কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) হবেন শেষ নবী
বাহীরা শেষ নবীর এ সমস্ত দিক সম্পর্কে আসমানী কিতাবে যে বর্ণনা পাঠ করেছিল, সে বর্ণনার সাথে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিলিয়ে নিল। তারপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিঠ মোবারক দেখলে। নবীর দুই কাঁধের মাঝে খতমে নবুওয়্যাতের চিহ্ন দেখতে পেল।
বাহীরা আসমানী কিতাবে শেষ নবী সম্পর্কে যা পাঠ করেছিল, তার সাথে সমস্ত কিছু মিলে গেল। এরপর সে পাদ্রী বিশ্বনবীর চাচাকে ডাকলো।
পাদ্রী বাহিরার প্রশ্নে আবু তালিব কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) প্রকৃত পরিচয় দিলেন
আবু তালিব এলে তাকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই বালকের সাথে আপনার সম্পর্ক কি?’ ‘আবু তালিব জানালেন, ‘এ বালক আমার সন্তান।’
পাদ্রী অস্বীকৃতি জানিয়ে বললো, ‘এটা অসম্ভব, কারণ এই বালকের জন্মদাতা পিতা জীবিত থাকতেই পারেন না।’
তারপর আবু তালিব জানালেন, ‘এ বালক আমার ভাইয়ের সন্তান।’ বাহীরা প্রশ্ন করলো, ‘এই ছেলের পিতার মৃত্যুর অবস্থা কি ছিল?’
আবু তালিব জানালো, ‘তাঁর পিতা সে মায়ের গর্ভে থাকতেই মৃত্যুবরণ করেছে।’
বাহীরা এবার বললো, ‘যেমন হবার কথা তেমনি হয়েছে। আপনি আপনার ভাইয়ের ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যান। আর ইহুদীদের কাচ থেকে ওকে কে সাবধানে রাখবেন। মহান আল্লাহর শপথ! তারা যদি এই বালককে দেখে আমার মত চিনতে পারে, তাহলে তারা এই বালকের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। কারণ আপনার এই ভাতিজা কালক্রমে এক মহামানবে পরিণত হবে।’
পাদ্রীর এ সমস্ত কথা শুনে আবু তালিব অতি দ্রুত তাঁর ব্যবসার কাজ সেরে বাড়িতে চলে এলো। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ও হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর সাথে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মক্কায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিশোর মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি পাদ্রী বাহিরার বিশেষ বার্তা
বিশ্বনবীর প্রথম এই ভ্রমণ সম্পর্কে এ ধরণের বর্ণনাও দেখা যায় যে, বাহীরা কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত ধরে এ কথা বলেছিল, ‘এই সে সাইয়েদুল আলামীন! এই সে সাইয়েদুল মুরছালীন! অতি অল্প সময়ে মহান আল্লাহ একে রাহমাতুল্লিল আলামীন করে প্রেরণ করবেন।’
আবার কোন বর্ণনায় দেখা যায়, রোম থেকে একটা দল বের হয়েছিল কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেওয়ার জন্য। তারা নাকি তাদের ধর্মীয় পন্ডিতদের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল, এই সময়ে ঐ নবী বালক বয়সে এই এলাকায় ভ্রমণে আসবে। তারা বাহীরা পাদ্রীর কাছে এসে তাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আমরা জানতে পেরেছি সেই নবী বর্তমানে এদিকে ভ্রমণে এসেছে। তাঁর সন্ধানে চারদিকে দল প্রেরণ করা হয়েছে। আমরা এদিকে তাঁর খোঁজে এসেছি, কোথায় সে?’
বাহীরা তাদেরকে জানিয়ে ছিল, ‘তোমরা কি মনে করো আল্লাহর সিদ্ধান্ত তোমরা পরিবর্তন করতে পারবে? এসব কাজ থেকে তোমরা বিরত হও।’
খাদিজার ব্যবসায়ী সফরে নাস্তুরা গীর্জার পাদ্রীও যুবক মুহাম্মদ (সাঃ) কে চিনে ফেলার ঘটনা
এ প্রসঙ্গে আমরা বিশ্বনবীর বিয়ের সামান্য কয়েক দিন পূর্বের কিছু ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন বোধ করছি। তখন তিনি মহিয়সী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর ব্যবসায় জড়িত। তাঁর ব্যবসার পণ্য সম্ভার নিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় যখন শাম দেশে গমন করেন সে সময়ে তাঁর সাথে ছিল, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর একজন বিশ্বাসী ভৃত্য, তাঁর নাম ছিল মায়সারা।
এই ভ্রমণে যেয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খৃষ্ট ধর্মের পাদ্রী নাস্তুরা গির্জার কাছে একটা গাছের নিচে যাত্রা বিরতি করেছিলেন। যাওয়ার পথেও সম্মানীতা খাদিজার ভৃত্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কেন্দ্র করে আশ্চর্যজনক ঘটনাবলী ঘটতে দেখেছিল।
নাস্তুরা গীর্জার পাদ্রীও যুবক মুহাম্মদ (সাঃ) কে যা বলেছিলেন
তারপর নাস্তুরার গির্জার কাছে সেই গাছের নিচে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবস্থান করতে দেখে পাদ্রী নাস্তুরা গির্জা ছেড়ে বাইরে বের হয়ে এসে মায়সারাকে ডেকে জানতে চাইলো, ‘ঐ গাছের নিচে যিনি অবস্থান করছেন তিনি কে?’
ভৃত্য মায়সারা তাকে জানালো, তিনি মক্কার অধিবাসী কুরাইশ গোত্রের একজন।
তারপর নাস্তুরা তাকে জানালো, ‘হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম -এর পরে এই গাছের নিচে আর কেউ অবস্থান করেনি। তিনি নবী ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না। কেননা, ঈসা আলাইহিস সালাম -এর পরে ঐ গাছের নিচে একমাত্র নবী ব্যতীত আর কারো অবস্থানের কথা নয়।’
এ কথা বলে সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁর পবিত্র কদম ও মাথা মোবারকে চুম্বন করে আবেগ আপুত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি মহান আল্লাহর সেই নবী, যে নবী উম্মী।
মক্কার হাশেমী বংশের। আপনিই হবেন কিয়ামতে হাউজে কাওসারের অধিপতি, সুপারিশ করার ক্ষমতা একমাত্র আপনিই লাভ করবেন। আসমান জমিনে সর্বত্র আপনার প্রশংসা ঘোষিত হবে। আপনি ব্যতীত এখানে আর কেউ বসবে না।’
নাস্তুরার সেই পাদ্রীর এ সমস্ত কথা মায়সারা সবই শুনেছিল। তারপর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবসা কেন্দ্রে গেলে কোন একজনের সাথে তাঁর ব্যবসা সম্পর্কে সামান্য মতানৈক্য হয়। এ সময় সে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মক্কার সেই মূর্তিগুলোর শপথ করতে বললে তিনি বলেন, ‘আমাকে ঐ সমস্ত দেবতাদের শপথ করতে বলবেন না। আমি তাদের নামে কখনো শপথ করিনা।’
তাঁর এ কথা শুনে ঐ লোক তখন বললো, ‘আমি আপনার কথার সাথেই একমত হলাম।’
তারপর ঐ পাদ্রী লোকটি মায়সারাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছিল, ‘তোমার সাথের ব্যক্তি আল্লাহর নবী। আমি তাঁর শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমার সাথি হলো সেই নবী যার কথা আমরা আমাদের ধর্মীয় নেতাদের মুখে একাধিকবার শুনেছি। আমাদের ধর্মীয় নেতারা কিতাবে তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা পাঠ করেছেন।’
এরপর মায়সারা দেখেছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথার ওপরে দু’জন ফেরেশতা ছায়া দান করে। যেন তাঁর শরীর মোবারকে রোড না লাগে। যেদিন তাঁরা ব্যবসার কাজ শেষ করে মক্কায় ফিরে এসেছিল, তখন সময় ছিল বেলা দ্বিপ্রহর।
সে সময়ে সম্মানীতা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তাঁর ঘরের জানালার কাছেই ছিলেন। তিনি তাকিয়ে ছিলেন পথের দিকে। অপেক্ষা করছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখন আসবেন।
হঠাৎ তাঁর দৃষ্টিতে ধরা পড়লো, বেশ দূরে উটের পিঠে চড়ে তিনি আসছেন এবং দু’জন ফেরেশতা তাঁর মাথার ওপরে ছায়া করে আছেন। তাকে রোড থেকে হেফাজত করছেন। তিনি অবাক দৃষ্টিতে এসব অলৌকিক দৃশ্য দেখলেন এবং আরো মহিলাদেরকে ডেকে তিনি দেখালেন।
তারপর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বাড়িতে পৌঁছলে তাঁর ভৃত্য ঐ সমস্ত ঘটনা খাদিজাকে জানালো, যা সে দেখেছিল এবং নাস্তুরা ও ব্যবসায়ীর মুখে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যা শুনেছিল।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন বুদ্ধির বিকাশ ঘটেছিল, তখন থেকে তাঁর জীবনে যা ঘটেছিল, এ সমস্ত ঘটনা তিনি একাই শুধু অনুভব করেছিলেন তা নয়-হযরত খাদিজাসহ অন্যান্য মহিলা, চাচা আবু তালিব, ভৃত্য মায়সারা, পাদ্রী বাহীরা এবং নাস্তুরা, সিরিয়ার এক ব্যবসায়ী এবং রোমের শাসকবৃন্দ জানতো, মক্কার সেই হাশিম পরিবারের মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামের ইয়াতিম বালকই হলো সেই নবী, যার কথা ইতিপূর্বে আসমানি কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |