মুহাম্মদ (সাঃ) এর সিরিয়া ভ্রমন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষণ

মুহাম্মদ (সাঃ) সিরিয়া ভ্রমন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষণ

মুহাম্মদ (সাঃ) সিরিয়া ভ্রমন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষণ

মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সংঘটিত আগের বর্ণতি ঘটনাগুলো সম্পর্কে বেশ কয়েকটি হাদিসও রয়েছে। অর্থাৎ উল্লেখিত কয়েকটি ঘটনার সমর্থনে হাদিস রয়েছে। প্রাচীন যুগের কতিপয় বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদগণও উলে্লখিত কতৃক ঘটনা তাদের লেখনীতে উল্লেখ করেছেন। ফলে ধারাবাহিকভাবে এসমস্ত ঘটনা মৌখিক ও লেখনীর মাধ্যমে মানুষের সামনে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশিত হচ্ছে।

কিন্তু একটা বিষয় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, যে কোন হাদিস হোক বা ইতিহাস হোক না কেন, তা যদি কোরআনের বর্ণনার এবং তার মূলভাবধারার বিপরীত হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা সত্যশ্রীয়দের কাছে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। উল্লেখিত ঘটনার পরবর্তীতে উদ্ভূত পরিস্থিতির সামগ্রিক ইতিহাস যদি বর্ণিত ঘটনার বিপরীত হয়, তাহলে সে সমস্ত ঘটনা সত্য বলে গ্রহণ করা কষ্টকর হয়ে যায়।

বাহীরা ছিলেন সে সময়ের একজন অত্যন্ত সৎ লোক এবং তিনি আসমানী কিতাব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন এতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি তাঁর আপন সাধনা চেষ্টা এবং অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে বারো বছর বয়স্ক বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মত অপার্থিব গুণাবলী সম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্বকে দেখে অনেক কিছুই অনুমান করতে পারেন। বাহীরাই শুধু নয়-সে সময়ে এমন অনেকেই জানতো অতিদ্রুত একজন নবী আসবে।

কিন্তু বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই যে সেই নবী এ কথা বাহীরা জানতো, এটা গ্রহণ করা কষ্টকর। তাঁর পরে তিনি আবু তালিবকে তাঁর ভাতিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইহুদীদের সম্পর্কে কেন সাবধান থাকতে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা ইহুদীদের ইতিহাস পাঠ করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি, ইহুদীদের হিংস্রপ্রবণতা সম্পর্কে। তিনিও সে সময়ে অবগত ছিলেন ইহুদীদের হিংস্রতা সম্পর্কে। এ কারণেও হয়তোঃ বাহীরা আবু তালেককে ইহুদীদের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিল। কেননা মক্কার যে কোন নামজাদা ব্যক্তিত্ব ইহুদীদের ক্ষতির কারণ হতে পারে, এ চিন্তা করেও তারা কোন অঘটন ঘটাতে অগ্রসর হতে পারে-এ আশঙ্কা হয়তোঃ বাহীরা করেছিল।

আর আবু তালিবের সামনে এত কিছু ঘটার পরে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওয়াত সম্পর্কে তার ভূমিকা এমন নেতিবাচক কেন হলো, এটাও একটা বড় প্রশ্ন। তাঁর তো উচিত ছিল, কুরাইশ নেতৃবৃন্দসহ পরিচিত মহলে বাহীরার মুখ থেকে তাঁর ভাতিজা সম্পর্কে শোনা কথা ব্যাপকভাবে আলোচনা করা, তা কি তিনি করেছেন?

বাহীরার মুখ থেকে তিনি যদি সত্যিই জেনে থাকবেন যে, তাঁর ভাতিজা একজন নবী হবেন, তাহলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন না কেন?

বাহ্যিক দিক থেকে তিনি অসুবিধা অনুভব করলেও মৃত্যুর সময় কাউকে না জানিয়ে একা বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ)ও তিনি কালেমা পাঠের কথা জানাতে পারতেন? আবু তালিব বাহীরার মুখ থেকে এসব কথা শোনার পরে হযরত বিলাল এবং আবু বকরের মাধ্যমে নিরাপত্তার জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মক্কায় প্রেরণ করেন। ইতিহাস সাক্ষী, সে সময়ে হযরত বেলালের বয়স ছিল একেবারে শিশু।

ইতিহাসে দেখা যায় হযরত বেলালের পিতা রাবাহ ও মাতা হুমামাহ ছিল কুরাইশের বনী জুমাহ্ বংশের গোলাম। হযরত বিলাল বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) নবুওয়াত লাভের প্রায় ২৮ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। বাহীরার কথোপকথনের ঘটনা ঘটেছিল বিশ্বনবীর ১২ বছর বয়সের সময়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে হযরত বিলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থেকে বয়সে প্রায় ১২ বছরের ছোট এবং উল্লেখিত ঘটনার সময়ে বিলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ছিলেন দুধের শিশু। আবু তালিবের পক্ষে ভাতিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বাহীরার কথা শুনে বেলালের সাথে মক্কায় প্রেরণের প্রশ্নই ওঠে না।

হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ছিলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থেকে বয়সে প্রায় দুই বছরের ছোট। তর্কের খাতিরে যদি স্বীকার করে নেওয়া হয় দশ বছরের আবু বকর সেই বাণিজ্য কাফেলায় ছিল, কিন্তু এটা স্বীকার করা যায় না, বাহীরার কথা শুনে চাচা আবু তালিব তাঁর প্রাণ প্রিয় ভাতিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিরাপত্তার কারণে একটা দশ বছরের ছেলের সাথে মক্কায় প্রেরণ করবে।

সুতরাং এ সমস্ত ঐতিহাসিক সত্যের সামনে উল্লেখিত ঘটনাবলীর সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লামা শিবলীও এ সমস্ত বর্ণনা গ্রহণ করেননি।

আমরা বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওয়াত লাভ করার পূর্বে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল তা ওপরে উল্লেখ করে এ কথা বলছি যে, স্বয়ং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ আরো অনেকে অবগত ছিল, যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নবী হতে যাচ্ছেন।

কেননা, এতসব ঘটনা যাকে কেন্দ্র করে ঘটছে, তার যেমন নিজের সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কথা, কেন আমাকে কেন্দ্র করে এসব হচ্ছে, তাহলে আমি কে? আবার তাঁর সম্পর্কে যারা এসব জানে, তাদের ভেতরেও তো একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকার কথা, বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই যখন নবী হতে যাচ্ছে তাহলে তাঁর পরিণত বয়সে সে যখনই নবীর দাবী করবে, তখন তারা সবাই সেই নবীর আনুগত্য করবে।

কিন্তু আমরা দেখছি ইতিহাস তার বিপরীত। ঘটনা যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুভব করতে পেরেছিলেন তিনি নবী হচ্ছেন। তিনি যদি জানতেই যে তিনি নবী হবেন, তাহলে প্রথম ওহী নাজিলের সময় তাঁর অবস্থা ভিন্ন ধরণের হতো।

হযরত খাদিজারও যদি জানা থাকতো যে, তাঁর স্বামী আল্লাহর নবী হবেন, তাহলে তাঁর স্বামী বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর প্রথম ওহী নাজিলের পরে স্বামীর অস্থিরতা দেখে তিনি বিচলিত হয়ে নবীকে তাঁর ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে যেতেন না।

পঁচিশ ত্রিশ বছর ধরে একজন মানুষ জেনে আসলো যে, সে আল্লাহর নবী হবে, তাঁর কাছে হযরত জিব্রাইল ওহী নিয়ে আসবেন, তখন ওহী এবং জিব্রাইল আলাইহিস সালাম -এর আগমন তাঁর কাছে তো অপ্রত্যাশিত কিছুই ছিল না।

কিন্তু ৪০ বছর বয়সে হেরার গুহায় জিব্রাইল আলাইহিস সালাম -এর ওহী নিয়ে আসার পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা যেমন হয়েছিল, তাতে তো স্পষ্ট হয়ে যায় তাঁর কাছে বিষয়বস্তু ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বিয়ের সময় থেকে যদি জানতেন তাঁর স্বামী নবী হবেন, তাহলে তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে যা জেনে এলেন—অর্থাৎ তাঁর সাথে বিয়ের ১৫ বছর পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এলেন।

তিনি জানতেন তাঁর স্বামীর কাছে আল্লাহর ফেরেশতা আসবে ওহী নিয়ে, সুতরাং তাঁর তো মানসিক প্রস্তুতি থাকার কথা।

পক্ষান্তরে প্রকৃত ঘটনা বলে দেয়, তাঁর সে ধরণের কোন ধারণাই ছিল না। মক্কার কুরাইশরা যদি জানতোই, তাদের ভেতরে যে মানুষটা এই দীর্ঘ ৪০ বছর জীবন অতিবাহিত করল, সে আল্লাহর নবী হবে, তাঁর কাছে ফেরেশতা আসবে, তাঁর কাছে ওহী নাজিল হবে। এটা ছিল তাদের কাছে প্রত্যাশিত।

পক্ষান্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে নবী বলে ঘোষণা দান করার পরে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, তাতে অনুমান করা যায় কুরাইশদের কাছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবী হওয়াটা প্রত্যাশিত ছিল না।

নিজে একদিন নবী হবেন এ কথা জানা দূরে থাক বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভ করার পূর্বে আসমানী কিতাব কি জিনিস বা ঈমান কাকে বলে তা তিনি মোটেও জানতেন না। এ সম্পর্কে তাঁর কোন ধারণা বা কল্পনাও ছিল না। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেনঃ—

وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا ۚ مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَٰكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا ۚ وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“এবং এমন করে (হে নবী!) আমি আমার নির্দেশে একটা রূহ তোমার প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি। তুমি কিছুই জানতে না কিতাব কাকে বলে, ঈমান কি জিনিস! কিন্তু সেই রূহকে আমরা একটা আলো বানিয়ে দিয়েছি, যার সাহায্যে আমরা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করি। নিঃসন্দেহে তুমি সরল সোজা দিকে মানুষদেরকে পথ প্রদর্শন করছ।” (সূরায়ে শুরা, আয়াত নং-৫২)

পবিত্র কোরআনে সূরায়ে কাসাসে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্যতম ধারণাও করেননি তাঁর ওপরে ওহী নাজিল হবে, এ জন্য তিনি অপেক্ষার প্রহরও শুনেননি। মহান আল্লাহ বলেনঃ—

﴿وَمَا كُنتَ تَرْجُو أَن يُلْقَىٰ إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِّن رَّبِّكَ ۖ فَلَا تَكُونَنَّ ظَهِيرًا لِّلْكَافِرِينَ﴾
“তুমি তো কখনো এ আশায় অপেক্ষা করোনি যে, তোমার ওপরে কিতাব অবতীর্ণ করা হবে। এটা শুধু মাত্র তোমার আল্লাহর অনুগ্রহ (যে তোমার ওপরে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে) সুতরাং তুমি কাফেরদের সাহায্যকারী হবে না।” (সূরায়ে কাসাস, আয়াত নং-৮৬)

সূরায়ে শুরার আয়াতে রূহ বলতে পৃথিবী ও আখেরাতের সমস্ত জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ মুহাম্মদ (সাঃ) কে তাঁর নবী হবার উপযোগী জ্ঞান দান করেছিলেন। সূরায়ে কাসাসের বর্ণনায় প্রমাণিত হলো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কল্পনাও করেননি তাঁর প্রতি ওহী অবতীর্ণ করা হবে।

ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করে এসেছি, যে কোন হাদিস হোক বা ইতিহাস হোক না কেন, তা যদি কোরআনের বর্ণনার এবং তার মূলভাবধারার বিপরীত হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা সত্যশ্রীয়দের কাছে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। উল্লেখিত ঘটনার পরবর্তীতে উদ্ভূত পরিস্থিতির সামগ্রিক ইতিহাস যদি বর্ণিত ঘটনার বিপরীত হয়, তাহলে সে সমস্ত ঘটনা সত্য বলে গ্রহণ করা কষ্টকর হয়ে যায়।

বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে প্রথম যুগের আলেমদের ভেতরেই সন্দেহ ছিল। তারা অনেকেই পাদ্রী বাহীরার ঘটনা গ্রহণ করেননি। আল্লামা জাহাবী বলেছেন, ‘আব্দুর রহমান পরিত্যাজ্য হাদিস বর্ণনা করতো। বিশেষ করে পাদ্রী বাহীরার ঘটনা। আমি এসব হাদিসের কোন কোন ঘটনাকে স্বকোপল কল্পিত মিথ্যা এবং বানানো হাদিস বলে মনে করি।’

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉