জিন তাড়ানোর হাট সংক্রান্ত কথাবার্তা
বাংলায় হাট-বাজার বলে কথা আছে, ইংরেজিতে ও ‘হাট’ শব্দটির ব্যবহার আছে। মূলত: উপরে ছনের ছাউনি চারিদিকে খোলা অস্থায়ী ছোট ঘরকে ইংরেজিতে ‘হাট’ বলে। জিন তাড়াতে তেমন একটি হাটের কথা বলা হচ্ছে প্রবন্ধে।
ছোটকালে গ্রামের হাট গুলো এভাবেই দেখেছি। ছন-বাঁশের অপ্রতুলতায় হাট এখন ইট দিয়েই বানানো হয়। সম্ভবত ইংরেজ শাসনামল থেকেই বাংলাদেশের হাট-বাজার শব্দগুলো বাংলা হিসেবেই ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে আমি যে হাঁটের কথা বলছি এটা সে ধরনের কোন ‘হাঁট’ নয়!
এই হাঁট হল জিন-ভূত-প্রেত, দৈত্য-ডাকিনী দৌড়ানোর এক মহা আয়োজনের নাম। একমাত্র ‘হাঁটের’ মাধ্যমেই উপরোক্ত অশুভ শক্তিকে চূড়ান্তভাবে পাকড়াও কিংবা বন্ধী করা যায়।
জিন তাড়ানোর হাটে বৈদ্য, গাছা, ধ্যানকারী সবাই উপস্থিত হয়
একজন কিংবা কয়েকজন সম্মিলিত বৈদ্যের সমন্বয়ে হাঁট বসাতে হয়! বৈদ্য যদি জিন-ভূতকে বন্ধী করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই জিন চিরদিনের জন্য বৈদ্যের শত্রুতে পরিণত হয় এবং সেই দুষ্ট জিনের দ্বারা অবিরত ক্ষতির মাধ্যমে বৈদ্যের জীবনাবসান হয়!
দুনিয়ার নিয়ম হল ঝুঁকির কাজে টাকা বেশী! তাই দক্ষ বৈদ্যরা এই ধরনের ঝুঁকি নিতে অনেক টাকা দাবী করে।
সুস্থ কিংবা অসুস্থ দুই ধরনের মানুষের জন্য দুই ভাবে হাঁট বসানো যায়। প্রথম পদ্ধতিটি জিনে আক্রান্ত মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে জিনে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষটিকে হাঁটের অনুষ্ঠানে রাখতে হয়। তারপর বৈদ্য বিশেষ পদ্ধতিতে তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে দুষ্ট জিনকে সেই অনুষ্ঠানে নানা প্রলোভন দিয়ে আনার চেষ্টা করে থাকে।
অনুরোধ প্রলোভনের পর্যায় ব্যর্থ হলে জোড় করে তাকে ধরে আনার চেষ্টা করা হয়! এখানে যেহেতু জোরাজুরির ব্যাপার আছে, সেহেতু তাকে ধরতে বড় কোন শক্তির সাহায্য নিতে হয়। যেকারণে অবাধ্য জিনকে জোড় করে ধরে আনতে জিনের রানী ‘মগধইশ্বরী’র সাহায্য নেওয়া হয়!
বেয়াড়া প্রকৃতির জিনকে ধরে আনতেই মূলত হাটের আয়োজন করা হয়
বেয়াড়া জিনকে বাধ্য করার জন্য ‘মগধইশ্বরীর’ রয়েছে প্রচণ্ড ক্ষমতা! তার সাহায্যে যে কোন জিনকে বন্ধী করা কিংবা শাস্তি দেওয়ানো সম্ভব! অতঃপর তাকে দিয়ে জিজ্ঞাসা করানো হয় কেন সে মানুষের উপর ভর করেছে? কি তার অভিলাষ? কিসের বিনিময়ে সে চলে যাবে, ইত্যাদি।
এই ঘটনায় বৈদ্য নিজেও মানুষ ও জিনের মাঝে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মধ্যস্থতা করতে পারে। শর্ত পূরণ হলে জিন মানুষটিকে ছেড়ে চলে যায়! এই পুরো অনুষ্ঠানটির নাম ‘হাঁট’। এটাই হল হাঁট বসানোর মূল কারণ। অর্থাৎ জিনের সাথে বোঝাপড়া করার জন্যে এটা হল মানব কুলের সর্বশেষ প্রচেষ্টা।
জিন তাড়াতে যে হাট, সেটা বসানোর আরো কিছু পদ্ধতি চালু আছে সমাজে
২য় পদ্ধতিটি সুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন কিছু মানুষের উপর সরাসরি জিনের উপদ্রব-উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়না! এক কথায় বলতে গেলে যাকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে পাগল মনে হয়না কিন্তু অসুস্থ মনে করা হয়। ডাক্তার কবিরাজ যার কোন নির্দিষ্ট রোগ খুঁজে পায়না। সাধারণ জনগণ ঐ ব্যক্তির কিছু আচরণে অদ্ভুত অসুস্থ লাগে বিধায়, তার জন্য দ্বিতীয় পদ্ধতির মাধ্যমে হাঁট বসাতে হয়।
এই পদ্ধতিতে রোগ অজ্ঞাত থাকে, কোন জিনে তাকে পাকড়াও সেটাও অজ্ঞাত থাকে। আদৌ তাকে জিনে ধরেছে কিনা সুনিদ্দিষ্ট নয়। তবুও অজানা জিনের কাজ এমন ধারনার উপর নির্ভর করেই যদি আগানো চিন্তা কেউ থাকে থাকে, তাহলে করতে পারে। সেক্ষেত্রে বিহিত করতে কিংবা পরামর্শ নিতে জিনদের রানী ‘মগধইশ্বরী’ কে হাজির করার প্রয়োজন হয়।
তিনিই বলে দিবেন বিষয়টা জিন ঘটিত নাকি ভিন্ন কিছু। যদি কোন জিনের কারণে এটা ঘটছে বলে প্রতীয়মনা হয়, তাহলে খোদ রাণী মগধইশ্বরী সেই জিন আসামীকে ধরে এনে হাজির করবে এবং সমস্যার একটি সুরাহা করবেন।
জিন যদি জ্ঞানী, ঘাড়ত্যাড়া স্বভাবের হয় তাহলে হাটের আয়োজন ও ব্যর্থ হতে পারে
বলা বাহুল্য আমার সমস্যা ছিল এই ক্যাটাগরির অন্তর্গত! তাছাড়া এটা কোন যেন তেন ধরনের জিন হাজিরা নয়! রীতিমত জিনের রানী আসবে! তাই আয়োজন টা একটু রাজকীয় ধরনের হয়!
মনে করিয়ে দেওয়া ভাল, হাঁট বসানোর শুরুতে, বৈদ্য একটা চেয়ার কিংবা উঁচু চৌকিতে আসন বানিয়ে নেন। দেখতে অনেকটা ছোট-খাট সিংহাসনের মত। ধুপ-আগরবাতি, সুঘ্রাণ-মোমবাতি, কাঁচা ফুল, হরেক রকম মূল, নানা রঙ্গের ফল, কিছু গোলাপ জল, সাত পুকুরের পানি, স্বর্ণ খচিত পান দানী, দিয়ে সুন্দর করে আসনটি সাজাতে হয়! এখানেই জিন রানী মগধইশ্বরী উপবেশন করবেন।
জিন তাড়ানোর হাটে তুলা রাশির জাতকের খুব কদর
তুলা রাশির একজন মানুষ তথা জাতককে তাদের নিজের মত করে পবিত্র হয়ে আসনের সামনে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসবেন! বৈদ্য ধ্যানমগ্ন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নানা তন্ত্র-মন্ত্র পড়তে থাকবেন।
বৈদ্যের ভাষায় তুলারাশির এসব ব্যক্তিদের নাম হল ‘গাছা’। ধ্যানের এক পর্যায়ে জিন-ভূত কিংবা তাদের রাণী এই ব্যক্তির উপর ভর বা আছর করবেন। তখন ভর করা মাত্র ধ্যান মগ্ন ব্যক্তির আচরণে বিরাট পরিবর্তন ঘটে এবং মুহুর্তেই সেই গাছা বা ব্যক্তির মুখ ও মনের নিয়ন্ত্রণ দিয়েই জিন রানী নিয়ে ফেলে, তার মুখ দিয়েই জিন রানী কথা বলেন।
এলাকায় ধ্যানে সক্ষম তুলা রাশির এই মানুষ তথা গাছাদের গুলোর যথেষ্ট কদর এবং পুরো অভিযানে তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একটা কথা বলে নেই, উপস্থিত দর্শকেরা কিন্তু জিন কিংবা তাদের রানীকে দেখবে না। কেননা তিনি অশরীরি।
তাকে দেখবেন শুধু গাছা বা ধ্যানে মগ্ন ব্যক্তি। ধ্যানের জগতের একটা পর্যায়ে পৌছলেই তবে, জিন ধ্যানমগ্ন মানুষটিকে দেখা দেন এবং তার সাথে কথা বলেন।
বলা বাহুল্য, উপস্থিত মানুষ কিন্তু জিনের কথার আওয়াজ শুনতে পাবেন না, কেননা তিনি আকার ইঙ্গিতে ধ্যান মগ্ন মানুষটির সাথে তথ্য বিনিময় করেন। সেজন্য ধ্যান মগ্ন মানুষটিকে হতে হয় অতীব আকলদার! ধুরন্ধর! কেননা আকলদার মানুষেরাই ইশারার ভাষা বুঝতে পারে। সেক্ষেত্রে বে-আকল মানুষ হলে জিনের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হবে, তিনি বলবনে একটা আর ব্যাখা দিবেন আরেকটা! ফলে সব প্রচেষ্টাই ভণ্ডুল হবে।
জিন তাড়াতে আমার জন্যে একটি হাট বসানো জরুরী হয়ে গেল
বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমার জন্য হাঁট বসাতে হবে। তাই বিভিন্ন বৈদ্যদের সাথে কথা বললেন। এক বৈদ্যের দাবী একেক ধরনের দাবী। এই কাজে বৈদ্য একাকী নয়, তার একটা লাট-বহর থাকে। যার বহর যত বড়, তার খ্যাতি তত বেশী! ফলে তার দাবীও তত অধিক।
তাদের একজনের দাবী ছিল এমন, তিনি গাড়িতে চড়েন না, নৌকায় উঠেন না, ঘোড়াতেও বসেন না। সকল বদ জিন তার শত্রু, অধিকতর নিরাপত্তার জন্য সে একপ্রকার লটকানো চৌকিতে চারজন মানুষের কাঁধে চড়ে চলাফেরা করে!
ত্রিশ মাইল দূর থেকে তাকে এভাবে আনতে হবে আবার এভাবেই ফেরত পাঠাতে হবে। তার সকল লাট বহরকে প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয়, নিরাপত্তা দিতে হবে। বাবার পক্ষে এই লাট-বহর আনা সম্ভব নয় বলে এই দলকে জানিয়ে দেওয়া হল।
বাবার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার মূল্য হিসেবে মনোরঞ্জন বৈদ্য নিজেই এগিয়ে এলেন, তিনিই আমার জন্য হাঁট বসাবেন। শর্ত একটি! এই মহা আয়োজনের খরচ দিবেন আমার বাবা আর অনুষ্ঠান টি করতে হবে মনোরঞ্জন বৈদ্যের বাড়ীতে!
জিন তাড়ানোয় মরোরঞ্জন বৈদ্যের শরনাপন্ন বাবা
মনোরঞ্জন বৈদ্যের বহু দিনের আকাঙ্ক্ষা মা ‘মগধইশ্বরী‘ –কে একদিন তাদের বাড়িতে আনবেন! এর ফলে তাদের বাড়ি বিত্ত-ঐশ্বর্যের ভারে নুয়ে পড়বে! বহু দিনের আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে পোষণ করেছেন, অর্থ কড়ির অভাবে সেটা করতে পারেন নি।
আমার বাবা যদি নিজ প্রয়োজনে তাদের বাড়ীর আঙ্গিনার সম্বৃদ্ধির জন্যে এতটুকু অর্থায়ন করেন তাহলে তিনিই ঝুঁকিটা নিতে রাজিই আছেন। এতে উভয়ের লাভ।
মনোরঞ্জন বৈদ্য জাতে হিন্দু এবং আমার ক্লাস মেট ‘অনু রানীর’ পিতা আর ‘রাধা রানীর’ চাচা! এই দুই ঝগড়াটে ছাত্রীর অসহযোগীতায় স্কুলে আমার ক্লাস ক্যাপ্টেনের কাজ করতে সমস্যা হয়। আর তাদের বাড়িতেই আমার চিকিৎসা হবে! শুনতেই আমার মাথা ভো করে ঘুরে উঠল।
দুই অবাধ্য ছাত্রীর নানা র্কীর্তি কাহিনী তুলে ধরে, বাবাকে বুঝাতে লাগলাম এ কাজ যেন ওদের বাড়ীতে না হয়। কেননা তারা আমার এসব গোপনীয় কথা দেশে দেশে ছড়িয়ে দিবে। বাবা আমাকে বললেন “সেখানে তুমি নিজেই অন্য দশজন দর্শকের মতই, একজন হয়ে উপস্থিত থাকবে মাত্র; সেখানে তোমার কোন ভূমিকা নাই, কোন প্রশ্নেরও কাজ নাই, কোন ভয়ও নাই।”
জিন তাড়াতে শনিবারের ঘোর অমবস্যার রাতের দ্বিতীয় প্রহর নির্ধারিত হল
শনিবার গভীর রাত্রিতে অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকারে মহা ধুমধামের সহিত হাঁটের আয়োজন প্রস্তুত হল। পুরো হিন্দু বাড়ীতেই এক মহা আনন্দ। মহিলারা সবাই সুন্দর পরিষ্কার কাপড় পড়ে প্রস্তুত! সেই মাহেদ্রক্ষণের অপেক্ষায়, যখন মা মগধইশ্বরী আমার চিকিৎসার উছিলায় এই গ্রামে তাদের বাড়ীতে পা রাখবেন!
ব্যক্তিগত উপকার হয়ত আমার হবে! তবে এই জনপদে জিন রানীর পা পড়ার উছিলায়, সকলের ঘরে ঘরেও প্রাচুর্যও ফিরবে, এই সুযোগ কে হাতছাড়া করে। এটাই তাদের প্রত্যাশা, এটাই তাদের মূল প্রাপ্য।
তাই রানীকে সু-স্বাগতম জানাতে তাদের এই আগাম প্রস্তুতি। আমি বাবা, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয় সহ বৈদ্যের বাড়িতে পৌছার আগেই সেখানে সব কিছু প্রস্তুত রাখা ছিল এবং সবাই রাত্রি দ্বি-প্রহর হবার অপেক্ষায় থাকল।
জিন তাড়ানোর হাটে দীর্ঘ আবৃতির এক অভিনব গানের পালা শুরু হয়
ততক্ষণে আমার তন্দ্রা এসে পড়েছিল। হঠাৎ কাঁসার ঝঙ্কার, সিঙ্গার ফুঁৎকার, মৃদঙ্গের আওয়াজ ও লুলু-ধ্বনির কোলাহলে সচকিত হয়ে উঠলাম! মুহূর্তেই তন্দ্রা পালিয়ে গেল, একদল মানুষ বৈদ্যের ইঙ্গিতে এক প্রকার আহবান মূলক গান শুরু করেছেন।
তখন বুঝতে পারলাম এই লাইনেও শিল্পীর প্রয়োজন আছে! এক কবি ও সুরকার জারি গানের স্টাইলে গান শুরু করেছেন। সেই গান আর শেষ হয়না, জিন হাজির করার অনুষ্ঠানের গানের কলিতে ও যে এত কথা, এত সুর দরকার, তা আগে জানা ছিলনা!
কোন কবি এই বন্দনা সঙ্গীত বানিয়েছেন প্রশ্ন করে কোন উত্তর তো পেলাম না, বলা হল বেশী প্রশ্ন না করতে বরং আমাকে জানালো হল আজকের রাত্রিতে সবাই আমাকে প্রশ্ন করবেন? আর আমাকে সবার উত্তর দিতে হবে!
অজানা জগতের এসব কথার কিছুই বুঝলাম না। ওদিকে ধ্যানে পড়া মানুষটিকে বৈদ্য মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করতে থাকলেন আপনি কি কিছু দেখতে পাচ্ছেন?
তার সাবলীল উত্তর অন্ধকার দেখছি। গান, খঞ্জনা, মৃদঙ্গ আরো জোড়ে বেজে উঠে। সাথে সাথে ধ্যানকারীও দুলতে থাকে। সবাই কিছু একটা অনুমান করার জন্য বারবার আমার দিকে তাকায়!
রাত কতক্ষণ হয়েছে অনুমান করা কঠিন। তবে আহবান কারীদের আহবানে কোন ছেদ নাই, কবিতাও শেষ হচ্ছে না। এই কবিতা পড়তে পড়তে গঞ্জের পথে হাটা ধরলে নির্ঘাত এতক্ষণে ৩ মাইল রাস্তা পেরুনো যেত। এত মাইল লম্বা কবিতায় ধ্যানকারী সময় দিতে গিয়ে একপ্রকার নেতিয়ে পড়ার পর্যায়ে চলে গেছে। তবুও তিনি কিছুই দেখছেন না!
জিনের আগমন যেভাবে বুঝতে পারলেন ধ্যানকারী
হঠাৎ ধ্যানকারী বলে বসলেন অনেক, অনেক দূরে আলোর কিঞ্চিত ঝিলিক দেখতে পাচ্ছেন! বৈদ্য বললেন সেদিকে যাও। ধ্যানকারী আলোর উৎসের সন্ধানে যেতে রইলেন। কিন্তু তিনি যত সামনে যায় আলো আরো দূরে চলে যায়!
এভাবে ধ্যানকারী অনেক দূর পর্যন্ত আলোর পিছনে ঘুরলেন অবশেষে পথিমধ্যে তিনি একজন জিনের সাক্ষাত পেলেন। তিনি ভিন্নদিকে মুখ গোস্বাভরা ভাব নিয়ে দাড়িয়ে আছেন। ধ্যানকারী তাকে ডাকলেন কিন্তু তিনি কথা শুনতে রাজি নন। তিনি কোন কারণে চটে আছেন।
ধ্যানকারী জানালেন এটি একটি জিন এবং মনে হচ্ছে তিনি তাদের সম্প্রদায়ের মাঝে বহু বড় জ্ঞানী! তিনি ধ্যান কারীর আহবানে যথেষ্ট বিরক্ত। আরো কিছু বুঝাতে চাইলেও ইঙ্গিতের ভাসা ধ্যানকারী বুঝতে পারছেন না।
এভাবে নিরস আবেদন নিবেদন কতক্ষণ চলল তার ঠিক নাই। এক পর্যায়ে ধ্যানকারী নিজেই ঘেমে ভিজে একাকার হয়ে গেলেন। তার অন্তরে ভয় ধরে গিয়েছে এই দীর্ঘ পথ তাকে আবার ফিরে আসতে হবে। তিনি কিভাবে ফিরবেন এই ভয় তাকে পেয়ে বসেছে। সোজা কথা জিন একটার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বটে কিন্তু সেই বুদ্ধিমান জিনকে পাকড়াও করার কঠিন হবে।
জিনের রানী মগদইশ্বরী যখন গরীবের দোরগোড়ায় উপস্থিত
বৈদ্য সিদ্ধান্ত পালটালেন! পুরো দলটি আবেদন নিবেদনের পদ্ধতিতে হঠাৎ পরিবর্তন আনলেন! গান, সুর, তাল ও বাক্যে প্রয়োগের ধরণ পালটিয়ে ফেললেন। বৈদ্য ধ্যানকারীকে বললেন, তুমি যে যায়গায় আছ সেখানেই থাক, মা মগধইশ্বরীর কাছে নালিশ জানাতে হবে।
সবাই সমবেত সূরে একতালে মগধইশ্বরীকে ডাকতে শুরু করল। মগধইশ্বরীকে ডাকতে কতটুক কাতর হওয়া লাগে, কত নীচে নামা লাগে, গানের সুরে তার সবটাই প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বৈদ্য ও তার দলবল।
ওদিকে ধ্যানকারী এই বলে চিৎকার করেই চলছেন, তিনি অন্ধকারে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন! তার ভয় লাগছে!
ফলে বৈদ্য মহাবান মন্ত্র পড়া শুরু করলেন। এই মহাবানের মাধ্যমে ‘মগধইশ্বরী’ জানতে পারেন, কেউ একজন গুরুতর সমস্যায় পড়েছেন। তার গুরুতর কাজ থাকলেও সেটাতে বিরতি দিয়ে হলেও ধ্যানকারীর আহবানে ছুটে আসেন।
একপর্যায়ে ধ্যানকারী খুশিতে উত্তেজিত হয়ে বললেন, অনেক সঙ্গী-সাথী নিয়া এক রমণী তার দিকে আসিতেছেন। এই নারীর মত অতীব সুন্দরী কাউকে তিনি অতীতে দেখেন নাই।
কিন্তু একি! তিনি তো অন্যদিকে হাঁটা ধরেছেন! বৈদ্য চিল্লায়ে বললেন ব্যাটা করলি কি! পথ আগলে ধর। অনুনয় করে বল টিপুর সমস্যা হয়েছে, এ থেকে রক্ষার উপায় জানতে, তাদের দেওয়া আসনে যেন একটি মুহূর্তের জন্য বসে।
রাণীকে রাজী করাতে অনেক লম্বা কাহিনী ও ঘটনা প্রবাহের এক পর্যায়ে অগত্যা রানী ধ্যানকারীর অনুরোধে, বৈদ্যের অনুনয়ে রানীর জন্য আসন পাতা বাড়িতে আসলেন।
তিনি বাড়িতে এসেছেন কিন্তু ঘরে না ঢুকে ঘরের বাহিরে একটি পেয়ারা গাছের উপর বসলেন! মুহূর্তেই হাটের পুরো পরিবেশ টাই ভূতুরে আকার ধারণ করল। উপস্থিত কারো মুখে কোন কথা নাই, ধ্যানকারী অবিরাম এক প্রকারের আচরণের মাধ্যমে ঢুলতে থাকলেন।
অবশেষে অশরিরি জিন রানী মগদইশ্বরী গাছের ডালে ঝুপ করে এসে বসলেন
বাহিরে ঝুপ-ঝাপ ধরণের কিছু একটার আওয়াজ শোনা গেল। গাছ নড়া চড়ার আওয়াজ বলে মনে হল। এখন রাত্রির কোন প্রহর চলছে অনুমান করা গেলনা। ধারণা করলাম নিশুতি রাতের মাঝামাঝি তো হবেই। ঠিক সেই মুহূর্তে অনেক মহিলার লূ-লূ ধ্বনি উঠল।
বুঝতেই পারি নাই এত গভীর রাতেও এই বাড়ির ভিতরে এত মহিলার আগমন ঘটল কখন! বুঝলাম রানীর আগমন প্রতীক্ষায় সারারাত ধরে তারাও নির্ঘুম অপেক্ষায় ছিল।
তাদের লুলু ধ্বনী শেষ হল। রানীকে ঘরে আসার অনুরোধ করা হল। কিন্তু কি এক কারণে রাণী ঘরে না ঢুকার জন্য বেঁকে বসলেন! অনেক প্রচেষ্টার পরে জানা গলে, সিংহাসনে যথাযথ জিনিষ উপস্থিত করা হয়নি বলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
জিন রানী মগদইশ্বরী যে কারণে গোস্বা করে ফিরে গেলেন
রোগীর জন্য প্রশ্নের উত্তর তো বাদ! সিংহাসনে কাঁচা হলুদ রাখা হয়নি কেন সেই প্রশ্নের উত্তর আগে জানতে চাইলেন রানী!
ঠিকই তো! এত জিনিষের মাঝে কাঁচা হলুদ নাই। মহিলারা যে যার মত নিজেদের ঘরে দৌঁড়ালেন! এতজনের ঘরে কাঁচা হলুদ তো দূরের কথা, নিশুতি রাতে কারো ঘরে এক চামচ শুকনো হলুদের গুড়ো পর্যন্ত পাওয়া গেলনা।
রানী বেজায় গোস্বা হলেন, তিনি রেগে চটে কোন কথা না বলেই চলে গেলেন। এমন ব্যততায় হতচকিত হয়ে ধ্যানকারী বেহুশ হয়ে গেলেন। বৈদ্য চরম মনোক্ষুন্ন হলেন। আমার বাবা হতাশ হলেন। মহিলাদের কেউ কেউ চোখের পানি মুছলেন। পুরো প্রক্রিয়াটি এভাবে ভণ্ডুল হবার জন্য আমার দুর্ভার্গ্যের উপর দোষ চাপালেন।
শিশুকালের বদকর্মেই যেখানে জিন রানি বেজার হন, বড়কালে কি হবে সেটা নিয়ে কেউ দুঃচিন্তা দেখালেন। আর আমার দুর্গতির জন্যে যে হলুদ! সেটা বৈদ্য নিপুণ হাতে লিস্ট করার পরও কিভাবে মিসিং হয়ে গেল, এই প্রশ্ন তোলার জন্যে সেখানে আর কেউ রইল না।