আবদুল কাদেরের জিন টোটকায় বালক বৈদ্য থেকে বালক পীর (পিকুলিয়ার ম্যান সিরিজ পর্ব-৮)

আবদুল কাদেরের জিন টোটকায় বালক বৈদ্য থেকে বালক পীর

চরম ঝুঁকির একটি কাজ ‘জিন সাধন’

আবদুল কাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে থামলেন, এই সুযোগে বলে বসলাম: আমার জ্বিন সাধন করার কোন ইচ্ছা নাই, তবে টোটকা চিকিৎসা হিসেবে, জ্বিন তাড়ানোর মন্ত্র-তন্ত্র জানা থাকলে নিজের, দেশের ও দশের উপকার হয়। এটা কি আমাকে শেখানো যায়?

তিনি বললেন, এই কাজটি একটু কঠিন এবং অভিজ্ঞতার আলোকে করতে হয়। তুমি তো দেখেছো তোমার মেঝ ভাইকে কিভাবে ছাড়িয়েছি? তিনি বলতে রইলেন, জিন মানুষের ইচ্ছা শক্তিকে দখল করে। মানুষের মুখ দিয়ে জিন কথা বলে।

মানুষের চোখ কান মুখ দিয়েই জিনেরা নিজের কথা প্রচার করে

তখন মানুষের চোখ দিয়ে জ্বিনেরা দেখে থাকে, মানুষের কান দিয়ে জ্বিন শুনে। জেনে রাখবে, জ্বিনে আক্রান্ত ব্যক্তি কখনও হ্যাঁচ্ছো দেয় না! দিতে পারে না। যদি কোনভাবে হ্যাঁচ্ছোটা বের করা যায় তাহলে চিকিৎসা ছাড়াই জিন ভূ-পৃষ্টে আছড়ে পড়বে ও মারা যাবে।

সে জন্য জিনে ধরা রোগীর নাকে সরিষার তৈল লাগানো হয়! মরিচ পোড়া গন্ধ ঢুকানো হয়, যাতে তার শরীরে হ্যাঁচ্ছোর উদ্রেক হয়। রোগীকে জোড়ে ধমক দিলে কিংবা মৃদু পিটালেও জিন আঘাত প্রাপ্ত হয়।

জিন তাড়াতে ওঝা-বৈদ্যরা যে কারণে কঠিন আচরন করে থাকে

সে জন্য ওঝা-বৈদ্যকে ভয়ঙ্কর চেহারার অধিকারী হলে সুবিধা হয়। জ্বিনদের উপস্থিত জ্ঞান বুদ্ধি মানুষের মত প্রখর নয়! মানুষের মত দূরদর্শীতা, মেধা, প্রজ্ঞা জিনদের নাই বললেই চলে। তাই কখনও কড়া হুমকি দিলে, জ্বিন ভড়কে যায় এবং পালাতে বাধ্য হয়! 

জিনে আক্রান্ত রোগীকে পিটালে, মারের ব্যথা রোগী ও জ্বিন দু’জনেই অনুভব কর। এতে অনেক সময় জিন পালিয়ে যায়। জিন পালিয়ে গেলে মানুষ বেহুঁশ হয়ে যায়। হুশ আসার পরে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন আমি এখানে কেন?

শরীরে এত ব্যাথার কারণই কি? এমনকি তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আমি এখানে কেন বা আপনাদের কি হয়েছে ইত্যাদি!

তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, নাকে তৈল লাগিয়ে, মরিচ পোড়া গন্ধ নাকে ঢুকলে জ্বিন পালাবার আগেই মানুষটি মারা যেতে পারে। কেননা বুঝতে হবে একজন সুস্থ মানুষ কি পরিমাণ ঝাঁঝ সহ্য করতে পারে।

তাই জিন তাড়ানোর উছিলায়, মানুষের দেহে এটার প্রয়োগ হলে শারীরিক ক্ষতি হবেই। 

জিন তাড়াতে গিয়ে কখনও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে বসে

অনেক মানুষ শারীরিক পাগল, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষকে জিনে ধরা পাগল মনে করে, এসব ব্যবহার করে এবং কখনও মানুষ অপ চিকিৎসায় মারাও যায়। যাক, সরিষার তৈল ও মরিচ পোড়া হল এক প্রকার প্রাথমিক চিকিৎসা।

মরিচ, সরিষা, গোলমরিচের নাম শুনলে যদি রোগীর চিল্লানো ভাব বেড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে সহজে কাজ হবে। অন্যতায় এই পদ্ধতিকে সর্বদা ব্যবহার করতে নাই। 

জিনেরা কখনও মানুষের আকৃতিকে উপলব্ধি করতে অতি কৌতূহলে কারো উপর ভর করে। সেই জিন বিতাড়ন করা সহজ। কখনও মানুষের আচরণের ভুলে জিন ক্ষিপ্ত হয় এবং তার উপর ভর করে। সেই জিন বিতাড়ন করা আরেকটু কঠিন।

কিছু জিন নালা, নর্দমায়, ডোবায় বসবাস করে এরা উন্মাদ ও পাগল। এ ধরনের জিনকে তাড়ানো তার চেয়েও বড় কঠিন। জিনকে যেভাবেই তাড়ানো হোক না কেন, রোগীর উপর যাতে শারীরিক নির্যাতন না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়।

কেননা জিন পালিয়ে গেলে, রোগীর মন সুন্থ হবার পর, তার শারীরিক নির্যাতনের ব্যথা দূর করতে তাকে আবারও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে! 

আবদুল কাদের আরো যোগ করলেন, কোরআন হাদিস মতে জিন তাড়ানোর ভিন্ন পদ্ধতি আছে। এই পদ্ধতিকে জিন বেশী ভয় করে। পাহাড়ি মানুষেরা জিনে আক্রান্ত মানুষকে পানিতে ভিজাতে থাকে, যাতে করে সর্দি আসে।

সর্দিতে আসলে নাকি জিন পালায়, পাহাড়ী জনবসতির ধারণা

সর্দি আসলে হ্যাচ্ছো আসবে, হ্যাচ্ছো দিলে নাকি জিন পালায়। যদি পাগল রোগী হ্যাঁচ্ছো দেয় এবং তাতেও যদি রোগ ভাল না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা জিনের সমস্যা নয় অন্য রোগ। এটা পাহাড়ী বৈদ্যেদে ব্যাখা।

বেশীর ভাগ জিনের সাথে কথা বলে, আল্লাহ ও পরকালের ভয় দেখিয়ে কিংবা ইসলামী পন্থায় বিদায় করানো যায়। এটাই সহজ ও উত্তম উপায়। এই সুযোগ ব্যবহার করে অনেকে রুকিয়া সেন্টার দিয়েছে। ঝাঁড়-ফুক করাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। 

ভুত, প্রেত গুলো মূলত নোংরা চরিত্রের অধিকারী। (ভুত-প্রেতের ধারণা বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা একটি ইপিসোড সামনে আসবে) অভদ্র মানুষকে শিখাতে যেমন অভদ্র আচরণ দরকার হয়। ভুত-প্রেতের জন্যও তেমনি অভদ্র ব্যবস্থার দরকার হয়। মনে রাখতে হবে কারো জিন ছাড়াতে গেলে, তোমাকে সেই জিনের শত্রু হতেই হবে।

জিনের সাথে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা দুটোই চরম ঝুঁকির কাজ

তাই এই রাস্তা হল শত্রু তৈরির রাস্তা। যে শত্রুকে দেখা যায় না, চিনা যায়না। বিপদে পড়লে শুধু তার পরিণতি বুঝা যায়। তিনি আরো বললেন, আমার অভিজ্ঞতায়, পারত পক্ষে এই রাস্তায় কারো পা না বাড়ানো উচিত। 

মনে রাখবেন জিন সম্পর্কিত এত কথার সবগুলোই কিন্তু তান্ত্রিক আবদুল কাদেরের কথা ও পরামর্শ

আমি তন্ময় শুনতে রইলাম, রাত গভীর হয়েছে, ততক্ষণে হারিকেনের তেল শেষ হয়ে শুধুমাত্র ফিতার উপর নির্ভর করেই আগুন মিট মিট করে জিবীত আছে।

এই গুরুত্বপূর্ন তথ্যগুলো গিলে নিলাম, কথাগুলো মনের মধ্যে গেঁথে রাখেছিলাম। একদা মুসিবতে পড়ে, কয়েক বন্ধুর অনুরোধে, আবদুল কাদেরের বিদ্যা বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে, এক ধনীর ব্যক্তির স্ত্রী থেকে ঝেঁটিয়ে জ্বিন বিদায় করেছিলাম।

এই ঘটনা আমাকে উল্টো জিনের বৈদ্য পরিচিতি করে তুলে। গ্রামে গ্রামে শোর উঠে গেল, জিন থেকে বিদ্যা শিখে আমি নিজেও একজন ‘বালক বৈদ্য বা বালক পীরে’ পরিণত হয়েছি। নিশ্চিত হলাম, আবদুল কাদেরের বিদ্যা বুদ্ধি বিফলে যায় নাই।

মাঝপথে আবদুল কাদেরের দেওয়া বিদ্যা-বুদ্ধি জিনের দেওয়া প্রশিক্ষন হিসেব লোকসমাজে চাউর হয়ে যায়। আমার সহপাঠি বন্ধুদেরকেো অনেকে প্রশ্ন করে জানতে চায়, তার জিন গত বিষয়ের আসলেই ব্যাপার খানা কি?

বন্ধুরাও সেটার কোন উত্তর দিতে পারে না। কেননা তারা স্কুলে আমাকে অন্যান্য সাধারণের মতই দেখে থাকে। এমন আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য দেখতে পায় না। যদ্বারা ভিন্ন দৃষ্টতে মূল্যায়ন কিংবা নতুন কোন তথ্য দিতে পারে। তাছাড়া আমিও তাদের সাথে কখনও এগুলো নিয়ে আলোচনা করতাম না কিংবা কেউ আগ্রহ দেখালেও এড়িয়ে যেতাম। তারা আমাকে এতটুকু জানে যে, আমি একজন পড়ুয়া বন্ধু, মিশুক ও ভাল বন্ধু।

এক মাদ্রাসায় প্রতি সপ্তাহেই কোন এক ছাত্ররের উপর জিনের আছর হত

কলেজ জীবনে পড়ার সময়, এক মাদ্রাসার মসজিদে রীতিমত মাগরিবের নামাজ আদায় করতাম। কখনও নামাজ শেষে মাদ্রাসার ছোট ছাত্রদেরকে অদ্ভুত আচরণ করতে দেখতাম।

আমি জানতাম কেন এমনটি হয়! মাদ্রাসার পাশেই বিরাট ময়লার ড্রেন। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজে বড়দের ভিড়ে, টয়লেটে স্থান না পেয়ে কদাচিৎ বাচ্চা বয়সের ছাত্ররা এই ড্রেনে প্রস্রাব করতে বসে যেত।

বেয়াড়া, বেতমিজ জিন, ভুত গোস্বায় তখনই সেই ছেলেটির উপর ভর করত। জিনের ভর করাকে ‘আছর’ হিসেবেও বলা হয়ে থাকে। আছর অর্থ জিন দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।

প্রতি সপ্তাহে কারো না উপর না কারো উপর এটা ঘটতে দেখতাম। মাদ্রাসায় ছিল এক বুড়ো আলেম, তিনি পান খেতে পছন্দ করতেন, তাই সর্বদা পকেটে আস্ত পান রাখতেন।

কোন ছাত্র পাগলাটে আচরণ করা মাত্রই তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া হত। তিনি সহসা পানের বৃন্তটি ছাত্রের কানে ঢুকিয়ে দোয়া পড়ে চুলকাতে শুরু করতেন! ছাত্র কাতুকুত, বিরক্ত, অস্বস্থি ও অপমানিত বোধ করত। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থলেই জিন ভুত জান ছেড়ে পালাত।

জিন ভুত ও কখনও মানুষের মত বেয়াড়া প্রকৃতির হয়

তবে বেয়াড়া জিন ভুত ও নাছোড় বান্দা! সেও বারবার কাউকে না কাউকে বিরক্ত করেই ছাড়তেন! আর বৃদ্ধ আলেমের পানের দণ্ডের শাস্তিও তাকে রিতীমত ভোগ করতে হত।

বৃদ্ধ আলেম, শুধুমাত্র সুরা ফাতিহা, ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়তে থাকতেন। জিন ভুত মাগো, বাবারে বলে পালিয়ে যেত! কলেজ জীবনে এটা দেখে ভাবতাম আর হাঁসতাম; এটা দেখে যে, আবদুল কাদেরের চেয়েও, ইসলামী পন্থায় আরো সহজে জ্বিন ভুত তাড়ানোর পদ্ধতি আছে!

কলেজ জীবনের এক সময় ভিন্ন আরেকটি কারণে আবদুল কাদেরের দরকার হয়ে পড়ে, তার খবর নিয়ে জানতে পারি, তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে সদলবলে নিরুদ্দেশ হয়েছেন বহু বছর আগেই। 

আগের পর্ব: জিনের গোলামি: আবদুল কাদেরের জীবনের ট্র্যাজেডি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।