বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) যেদিন দুনিয়াতে এসেছিলেন, সেদিনের সুবহে সাদিক ছিল জগতের শ্রেষ্ঠতম সকাল। আগমণের সেই মুহূর্তটা কতই না সৌভাগ্য মণ্ডিত! যা এই পৃথিবীকে হেদায়েত ও মহাসত্যের পথ প্রদর্শনের উদয়ের প্রাণচাঞ্চল্যে খুশীর সংবাদ শুনিয়ে ছিল।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমণের সেই সুবহে সাদিক কতই না কল্যাণময় এবং প্রশংসনীয় ছিল, যা গোটা পৃথিবীর জন্য, সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্য মুক্তির বার্তা বহন করে এনেছিল। যার জন্যে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছিলেন, “আর আমি তো আপনাকে বিশ্ব-জগতের করুনার মূর্ত প্রতিক হিসেবেই প্রেরণ করেছি।“ (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)
বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমণের প্রারম্ভিক কিছু ঘটনা এভাবে তুলে ধরা হয়েছে
সীরাতে ইবনে হিশামে বর্ণনা করা হয়েছে, বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সময়ে মায়ের গর্ভে ছিলেন তখন আমেনার কাছে এক অপরিচিত আগন্তুক এসে তাকে বলতো, তোমার গর্ভে যিনি আছেন তিনি মানব জাতির মহানায়ক। তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন তখন তুমি বলবে, সমস্ত হিংসুকের হিংসা থেকে এই শিশুকে ঐ মহান অদ্বিতীয় রাব্বুল আলামীনের কাছে সোপর্দ করছি। তারপর সে শিশুর নাম রাখবে মুহাম্মদ।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমণের পূর্বে তার আমেনা যে স্বপ্ন দেখতেন
বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) গর্ভে থাকাকালে আমিনা স্বপ্নে দেখতেন, তাঁর শরীর থেকে একটা জ্যোতি বের হয়ে চারদিক আলোকিত করে তুললো। সে আলো মক্কায় সীমাবদ্ধ রইলো না, সুদূর বসরা নগরীর সুউচ্চ অট্টালিকা সমূহের চূড়াগুলোও তাঁর দৃষ্টির সামনে স্পষ্ট প্রতিভাত হলো। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আমেনা এ ধরণের নানা ধরণের তাৎপর্যময় স্বপ্ন দেখতেন।
বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- যে সময়ে তাঁর মায়ের পবিত্র গর্ভে ছিলেন সে সময়ে হযরত আমেনার অবস্থা সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন,
‘It is alleged in popular stories (and only God knows the truth) that Amina d. Wahb, the mother of God’s apostle, used to say when she was pregnant with God’s apostle that a voice said to her, ‘yuo are pregnant with the lord of this people and when he is born say, ‘I put him in the care of the One from the evil of every envier; then call him Muhammad.’ As she was pregnant with him she saw a light come forth from her by which she could see the castles of Busra in Syria. Shortly afterwards Abdullah the apostle’s father died while his mother was still pregnant. (The Life of Muhammad. A Guillaume; P-69)
আরেকটি ব্যাপার তাঁর কাছে বিস্ময় জাগাতো, বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর ভূমিষ্ঠের সময় যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই তিনি মানসিক সুখ স্বাচ্ছন্দ অনুভব করতেন। প্রাণের প্রিয়তম স্বামীহারা শোক যেন তাঁর ভেতর থেকে মুছে যাচ্ছিল। বেহেশতি প্রশান্তিতে তাঁর হৃদয় জগৎ যেন আমোদিত হয়ে আসছিল।
গর্ভবতী হবার কারণে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা যেন কোথায় ক্রমশঃ মিলিয়ে যাচ্ছিল। প্রতি মুহূর্তে তাঁর মনোজগতে পরম প্রশান্তির অমীয় ঝর্ণা বয়ে যেত।
একবার তাঁর মনে হলো, কোন এক সূক্ষ্ম অদৃশ্য জগৎ থেকে কে যেন তাকে সম্বোধন করে বলছে, তুমি এক পুত্র সন্তান লাভ করবে, তাঁর নাম হবে আহমাদ। সেই কণ্ঠ তিনি কোনদিন বিস্মৃত হননি। প্রতি মুহূর্তে তাঁর কানের পর্দায় সেই বেহেশতি কণ্ঠ ঝংকার তুলতো। এ ধরণের বিভিন্ন ঘটনা তাঁর জীবনে ঘটতো।
ওসমান ইবনে আলআসের মাতা সে সময়ে মা আমেনার কাছে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেছেন, যে সময়ে ঐ শিশু ভূমিষ্ঠ হলো, সে সময়ে আমার দৃষ্টি যেদিকেই যাচ্ছিলো আমি শুধু আলোই দেখতে পাচ্ছিলাম।
হযরত আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর মাতা হযরত শিফা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ধাত্রির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। হযরত উম্মে আয়মন রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এ সময়ে আমেনার খাদেমা ছিলেন।
যে সৌভাগ্যবান রাতের শেষে এবং শুভ দিনের শুরুতে বিশ্ব সম্রাট এই পৃথিবীতে এলেন, সেই শুভ মুহূর্ত সম্পর্কে নানা বিচিত্র বর্ণনা বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যায়। আমরা মূল বিষয়ের দিকেই এগিয়ে যাবো।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমণের পূর্বের এক ইহুদী পণ্ডিতের স্বপ্ন
ইবনে হিশাম সেই শুভ মুহূর্তের মদীনার একটা ঘটনার বর্ণনা করেন, হাসান ইবনে সাবিত বলেন-সে সময়ে বয়সে আমি কিশোর। অনেক কিছু জানা বোঝা এবং কিছু শুনে তা মনে রাখার মত ক্ষমতা আমার হয়েছে। এবং সে বয়সেই আমি বেশ শক্তিশালী ও লম্বা হয়ে উঠেছিলাম। হঠাৎ আমি শুনতে পেলাম, একজন ইহুদী মদীনার একটা দুর্গের উপরে উঠে উচ্চকণ্ঠে বলছে, ‘ওহে ইহুদী সমাজ!’
তাঁর চিৎকার শুনে লোকজন এগিয়ে এলো। অনেকে তাকে প্রশ্ন করলো, ‘কেন তুমি চিৎকার করছো? সে বললো, আজ সেই রজনী যে রজনীতে আমাদের আগমনের নক্ষত্র উদিত হয়েছে।’
ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান বর্ণনা করেন, যে শুভ মুহূর্তে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ধরাধামে এসেছিলেন তখন একজন ইহুদী মক্কার কুরাইশদেরকে ডেকে বলেছিল, ‘হে কুরাইশগণ! আজ রাতে কি তোমাদের ভেতরে কারো স্ত্রীর গর্ভে পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে?’
কুরাইশরা জবাব দিয়েছিল, ‘আমরা এখন পর্যন্ত জানিনা।’
ইহুদী বলেছিল, ‘তোমরা খোঁজ করে দেখো। কারণ, আজ রাতে সেই নবী জন্মগ্রহণ করেছে যার দুই কাঁধের মাঝ বরাবর একটা চিহ্ন রয়েছে।’ (সেই চিহ্ন মোহরে নবুওয়াত নামে পরিচিত) এ কথা শুনে কুরাইশগণ সন্ধানে বের হয়ে পড়লো, কার ঘরে পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে তা জানার জন্য। অবশেষে তারা জানতে পারলো, মরহুম আব্দুল্লাহর এক সন্তান তাঁর বিধবা স্ত্রীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে।
কুরাইশরা সে সংবাদ ইহুদীকে জানালে ইহুদী তাদেরকে বললো, সেই সন্তানের কাছে আমাকে নিয়ে চলো। মা আমেনার কাছে যখন ইহুদীকে নেয়া হলো এবং ইহুদী শিশু নবীকে দেখেই জ্ঞানহারা হয়ে পড়েছিল।
জ্ঞান ফিরে আসার পরে সেই ইহুদী আক্ষেপ করে বলছিল, আজ থেকে বনী ইসরাঈলদের কাছে থেকে নবুওয়াত বিদায় গ্রহণ করলো। তারপর সে সমস্ত কুরাইশদেরকে ডেকে বললো, কুরাইশগণ! তোমরা জেনে রাখো, আমি শপথ করে বলছি, এই শিশু এমন বিজয় লাভ করবে, যে বিজয় পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘোষিত হতে থাকবে। (ফতহুল বারী-মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া)
মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমণের পূর্বে দাদা আবদুল মুত্তালিবের ধারণা
বয়সের ভারে আক্রান্ত আব্দুল মুত্তালিব কা’বাগৃহে তাঁর সাথিদের সাথে বসে কথা বলছিলেন। এমন সময় একজন যেয়ে তাকে সংবাদ দিল, তাঁর পুত্রবধু চাঁদের মতোই সুন্দর এক পুত্র সন্তান প্রসব করেছে। মুহূর্তে আব্দুল মুত্তালিবের হৃদয় জগৎ আনন্দে উছ্বেলিত হয়ে উঠলো। দ্রুত সে ছুটে গেল তাঁর নাতিকে দেখতে।
পরম মমতায় সে তাঁর নাতিকে কোলে উঠিয়ে নিল। পূর্ণিমার পূর্ণ শশীর ন্যায় শিশুর মুখমন্ডল। জান্নাতি সুষমা আর আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে শিশুর সর্বাঙ্গ থেকে। কোনদিন অনুভব না করা মন মাতাল করা সুগন্ধে শিশুর নধর কান্তি দেহ যেন প্লাবিত করে দিচ্ছে।
নির্নিমেষে সে তাকিয়ে রইলো শিশুর দিকে। ক্রমশঃ মুত্তালিবের দু’চোখের পাতায় ভেসে উঠলো চিরদিনের তরে হারিয়ে যাওয়া নয়নের নিধি আব্দুল্লাহর মায়াময় সুন্দর মুখখানা। পৃথিবীতে সে আর নেই। কোন দিন আর আসবে না।
মৃত্যু যবনিকার অন্তরালে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর পিতা কি জানতে পেরেছেন.., তিনি কোন মহামানবের পিতা হয়েছেন? তাঁরই সন্তান যে বিশ্ব সম্রাট তা কি তিনি জানতে পেরেছেন? আমাদের বিশ্বাস তিনি জানতে পেরেছেন।
নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে তাঁর কুদরতী ব্যবস্থার মাধ্যমে আব্দুল্লাহকে জানিয়েছেন, তুমিই সেই ধন্য পিতা। তোমারই একমাত্র সন্তান হলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) আখেরী জামানার পয়গম্বর নবী সম্রাট মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আব্দুল মুত্তালিবের নয়ন যুগল অশ্রু সজল হয়ে উঠলো। সন্তানহারা বুভুক্ষু পিতার বুকের ভেতরে হাহাকার করে উঠলো। অদম্য একটা কান্না সমস্ত বুকখানা জুড়ে গুমরে উঠলো। বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো তাঁর কণ্ঠ। আহারে অবোধ শিশু, কোনদিন সে তাঁর পিতার আদোর ভালোবাসা স্নেহ মমতা কি জিনিস, তা সে পাবে না।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের কোলে
গভীর মমতায় আব্দুল মুত্তালিব তাঁর নাতিকে চুমু দিল। তারপর নাতিকে কোলে নিয়ে কা’বাগৃহে এসে কা’বার চাদরে নাতিকে আবৃত করে তাঁর সর্বাঙ্গিন মঙ্গলের জন্য আল্লাহর কাছে প্রাণভরে দোয়া করলো।
তারপর শিশু জন্মের সপ্তম দিনে আড়ম্বর অনুষ্ঠান করে আকিকা দিয়ে তাঁর নাম রাখা হলো মুহাম্মদ। আমন্ত্রিত অতিথিগণ তৃপ্তিসহকারে আহার করে আব্দুল মুত্তালিবের কাছে জানতে চাইলো, ‘তোমার নাতির নাম কি রাখলে?’
আব্দুল মুত্তালিব বেশ গর্বভরে জবাব দিল, ‘আমার নাতির নাম রেখেছি মুহাম্মদ।’
এই নাম শুনে অনেকে পুনরায় প্রশ্ন করলো, ‘আমাদের মধ্যে যে ধরণের নাম রাখা হয় তেমন নাম না রেখে ব্যতিক্রমধর্মী নাম রাখলে যে?’