মুহাম্মদ (সাঃ) জীবনী নিয়ে ইউরোপীয় পন্ডিতদের বিভ্রান্তি, ঘৃণা ও হিংসা

মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে ইউরোপীয় পন্ডিতদের বিভ্রান্তি, ঘৃণা ও হিংসা

মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে ইউরোপীয় পন্ডিতেরা ইতিহাস সংক্রান্ত বিষয়ে বিভ্রান্তি, ঘৃণা ও হিংসার কারণ 

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত পূর্ববর্তী নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরণের মুখরোচক কাহিনী রচিত হয়েছে। মুসলিম ধর্মীয় নেতৃত্বই এ সমস্ত কাহিনী রচনা করেছেন। আর যাদের চিন্তার গভীরতা অতি অল্প তারাই এই সমস্ত ঘটনাকে কোনরূপ চিন্তা গবেষণা ছাড়াই প্রশ্রয় দিয়েছেন।

তিরমিজী শরীফে যে হাদিসটিতে ঐ ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, সে হাদিসের বর্ণনাকারী হলেন আব্দুর রহমান ইবনে গাজোয়ান। তাঁর সম্পর্কে হাদিস গবেষকদের ধারণা উত্তম নয়। বিখ্যাত মনীষীগণ তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের অভিযোগ করেছেন।

এই হাদিসের সর্বশেষ বর্ণনাকারী হলেন আবু মূসা আশয়ারী (রাঃ)। কিন্তু তিনি তাঁর বর্ণনায় উর্ধ্বতন বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখ করেননি। আল্লামা শিবলী তাবাকাতে ইবনে সাআদে এ সম্পর্কে যে বর্ণনা এসেছে, নানা দুর্বলতার কারণে সেটাকেও পরিত্যাজ্য বলেছেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন বারো বছর বয়স সে সময়ে তিনি গিয়েছিলেন তাঁর চাচার সাথে শামেদেশে। বাহীরা সম্পর্কে যে ঘটনা বর্ণনা করা হয় সে ঘটনা নাকি এই সময়েই আবু তালিবের উপস্থিতেই ঘটেছিল।

আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ইউরোপীয় ঐতিহাসিক বন্ধুরা গোটা নবুওয়াতকেই বাতিল করে ছেড়েছেন। ঘটনার সত্যতা প্রমাণের জন্য তাঁরা তিরমিজী শরীফে বর্ণিত ঐ হাদিসটিকে স্তম্ভ হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন। তাদের বক্তব্যের একমাত্র সম্বল যেন সেই হাদিসটি। অথচ সেই হাদিসটি হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ কিনা, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার তাঁরা কোন প্রয়োজনই অনুভব করেন না।

পণ্ডিত Margoliouth তাঁর Muhammad নামক গ্রন্থে বিশ্বনবী সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তি জনক আলোচনা করেছেন। তাঁর মন্তব্যের পক্ষে তিনি কোন জোরালো যুক্তিও পেশ করতে পারেন নি। তিনি তাঁর গ্রন্থে বলেছেন, পাদ্রী বাহীরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যে শিক্ষাদান করেছিলেন পরবর্তীতে তাই তিনি ইসলামের নামে পেশ করেছেন।

একই মন্তব্য করেছেন Sir William Muir তাঁর Life of Mahomet নামক গ্রন্থে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে মূর্তি পূজাকে ঘৃণা করতো, এর কারণ হলো তাঁর সিরিয়া ভ্রমণ।

Dreper সাহেব তো আরো অগ্রসর হয়ে বলেছেন, পাদ্রী বাহীরা বসরার ধর্ম প্রতিষ্ঠান থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ‘নাষ্ট্রীয় মতবাদ’ শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর শিক্ষক বাহীরার ধর্মীয় দর্শনে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন। মুহাম্মদের কর্ম তৎপরতা দেখে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সে নাষ্ট্ররী ধর্ম বিশ্বাস মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্তিত্বের সাথে মিশে গিয়েছিল।

এ সমস্ত খৃষ্টান লেখকদের ধারণা হলো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পাদ্রী বাহীরা ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষাদান করেছিল এবং সে ধর্মীয় দর্শন ছিল নাষ্ট্ররীয় দর্শন। এবং এটা ছিল খৃষ্টীয় মতবাদের স্পষ্ট বিজয়। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যে মূর্তির প্রতি অনিহা ছিল, তার কারণ হলো বাহীরা যে কারণে মূর্তিকে ঘৃণা করতো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাঁর শিষ্য ছিলেন, সে জন্য তিনিও মূর্তিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখতেন।

এই খৃষ্টান ঐতিহাসিকগণ এটা তলিয়ে দেখলেন না, তাদের বর্ণনা ও ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোটা জীবন, তাঁর উপস্থাপিত নীতি আদর্শ, সমস্ত চিন্তাধারা, তাঁর ওপরে নাজিলকৃত কিতাব।

এই পণ্ডিতদের জ্ঞান বুদ্ধির পরিধি দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। তাদের ধারণাপায়ী পাদ্রীর সাথে যদি বিশ্বনবীর দেখা সাক্ষাৎ বা কথোপকথন হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স সে সময়ে মাত্র বারো।

এই বয়সের একটা নিরক্ষর ছেলেকে পাদ্রী বাহীরা মাত্র পনের বিশ মিনিটের ভেতরে সূক্ষ্ম ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি যাবতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষাদান করল আর সেই বালকও সম্পূর্ণ শিক্ষা হৃদয়ঙ্গম করে দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সে সমস্ত শিক্ষা ও জ্ঞানের চর্চা না করেই অক্ষরে অক্ষরে স্মরণে রেখে তা চল্লিশ বছর বয়সে মানুষের সামনে পেশ করল?

ঐ সমস্ত পণ্ডিতদের এসব দিকে দৃষ্টি পড়েনি। তারা তাদের লেখনী দিয়ে মানুষকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বিরূপ ধারণাদান করতে যেয়ে নিজেদের চেহারা মানুষের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন।

শুধু তাই নয়, এই সমস্ত লেখকগণ এটাও দাবি করেছেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি মাত্র সন্তান ছিল খাদিজার গর্ভে। সে সন্তানের নাম হলো ফাতিমা। আর অন্য সন্তানগুলো মুহাম্মদের নিজের ঔরসের নয়-খাদিজার অন্য স্বামীগণের। ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে এরা যেন প্রলাপ বকেছেন।

পবিত্র কোরআন প্রমাণ করে দিয়েছে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকটি কন্যা সন্তানের পিতা ছিলেন।

ইতিহাস বলে, বিশ্বনবীর স্ত্রী হযরত মারিয়া কিবতিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন একমাত্র হযরত ইবরাহীম (রাঃ)। তিনি শিশুকালীনই ইন্তেকাল করেন।

হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর গর্ভে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুইজন পুত্র এবং চারজন কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যথাস্থানে আমরা তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করব।

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉