মক্কার গৃহযুদ্ধ ও বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ)
বিশ্বনবীর আবির্ভাবের পূর্বে শুধু মক্কারই নয়, গোটা পৃথিবীর অবস্থা যে কি চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছিল, তা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। এখন আমরা মূলত: আলোচনা করবো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াত লাভ করার পূর্বে মক্কায় যে সমস্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সে যুদ্ধে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অংশ গ্রহণ করেছেন কি না এবং করলেও তাঁর ভূমিকা কি ছিল।
ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বে আরবদের কাছে যুদ্ধ ছিল তাদের আয় রোজগারের সর্বোত্তম মাধ্যম। মোট কথা, আরবদের কাছে যুদ্ধ ছিল তাদের পেশার মত। যুদ্ধহীন জীবন তাদের কাছে ছিল এক অকল্পনীয় বিষয়।
এর কারণ হিসাবে ঐতিহাসিক এবং গবেষকবৃন্দ বলেছেন, তাদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা নির্বাহের উপায়-উপকরণের দৈন্যতা, অর্থ-সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রের স্বল্পতা এবং সর্বোপরি তাদের সমাজে ঐক্য, সামাজিক আইন-কানুন প্রতিষ্ঠিত না থাকা।
এ ধরণের নানাবিধ কারণে তাদের রক্তের শিরায় শিরায় যুদ্ধ যেন মিশে ছিল। কারণে বা অকারণে যুদ্ধ, রক্তপাত, নরহত্যা এবং লুটতরাজ করা তাদের কাছে সম্মান ও মর্যাদার বিষয় হিসাবে পরিগণিত হতো। ঐতিহাসিকগণ ধারণা করেন, চারণভূমিতে পশু চরানোর দখলদারি এবং নিজেদের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবৃত্তির জন্য প্রথমে যুদ্ধের প্রয়োজন হয়েছিল।
এই ধরণের যুদ্ধ তাদের ভেতরে প্রায়ই অনুষ্ঠিত হতো ফলে তাঁরা যুদ্ধে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কারণে অকারণে যুদ্ধে জড়িত থাকার কারণে তাঁরা নর-রক্ত দর্শনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং তাদের চরিত্রে কল্পনাতীত পাশবিক বৈশিষ্ট্য সমূহ প্রকাশ পেয়েছিল।
আরবের কাব্য সাহিত্যেও যুদ্ধের প্রেরণা যোগাত
যুদ্ধ সম্পর্কে নিজেদের ধ্যান-ধারণা এবং চিন্তা-কল্পনাকে সার্থক-ভাবে প্রস্ফুটিত করার জন্য তাঁরা উপযুক্ত পরিভাষা, দৃষ্টান্ত, উপমা এবং রূপক প্রতীকী শব্দ চয়ন করতো। যেমন ওয়্যাগাঁ, মাগদাবাতুন, শাররুন, রওউন, হারব, ইহরাব, কারিয়াতুন, মাহরুৱ, তাহরীব, হিয়াজ, হারিবা, হারাব ইত্যাদি শব্দ দ্বারা তাঁরা যুদ্ধকেই বুঝাতো।
আরবের কাব্যেও যুদ্ধ সম্পর্কে নানা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাও এবং লোভই তাদেরকে যুদ্ধোন্মাদ ও জঙ্গি করে তুলতো। আরবের কোন ব্যক্তি যখন যুদ্ধে অংশ গ্রহণের লক্ষ্যে হাতে অস্ত্র ধারণ করতো, তখন তাঁর মনের কোণে যে আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত থাকত তাহলে, সে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে প্রচুর ধন-সম্পদ, দাস-দাসী ইত্যাদি সে হস্তগত করবে।
কেননা, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ছিল তাদের কাছে বড় পবিত্র সম্পদ। যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করা ছিল তাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাকর পেশা। ব্যবসা বা নিজের দেহের শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করা ছিল তাদের কাছে অপমানজনক।
শত্রু ভাবাপন্ন বিভিন্ন গোষ্ঠী রাতের অন্ধকারে হঠাৎ একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে নানা ধরণের দ্রব্য সামগ্রীসহ পশুসম্পদ ও নারী-পুরুষদের ছিনিয়ে নিয়ে যেত। মানুষগুলোকে তাঁরা দাস-দাসী হিসাবে ব্যবহার করতো বা বিক্রি করে দিত। এ সমস্ত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা যুদ্ধ করে থাকে, এসব কথা দিয়ে আরবের কাব্যসমূহ পরিপূর্ণ।
আরবেরা যুদ্ধ করত বীরত্ব প্রদর্শের জন্য
আরো একটা কারণে তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তো, তাহলে নিজেদের সাহসিকতা এবং বীরত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। একে অপরের আভিজাত্য প্রদর্শন এবং তা নিয়ে গর্বকরা এবং পরস্পরে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া তাদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য ছিল।
নিজেকে একজন সাহসী বীর হিসাবে সবার কাছে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল তাদের হৃদয়ের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। তাকে সবাই সাহসী যোদ্ধা বলুক, বিখ্যাত বীর বলুক এটা ছিল তাদের মনের একান্ত কামনা।
এ উদ্দেশ্যে তাঁরা যে কোন ধরণের পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকত। তাকে বীর এবং সাহসী হিসাবে সবাই জেনে যেন তাঁর পশুচারণ ভূমিতে অন্য কেউ পশু চরাতে সাহস না পায়। তাঁর বাসস্থানের কাছে যেন কেউ বাস করতে সাহস না পায়। তার কূপ থেকে যেন কেউ পানি নিতে সাহস না পায়। তার তুলনায় অন্য কেউ নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে না করে। তার মত রং এবং ধরণের পোশাক যেন কেউ পরিধান না করে। সে যাকে খুশী হত্যা করবে, কেউ যেন প্রতিবাদের সাহস না পায়। সে যে কোন নারীকে ভোগ করবে কেউ যেন বাধা দিতে সাহস না পায়। তাঁর ওপর কোন কেন মাথা উঁচু করে উচ্চে কণ্ঠে কথা না বলে, সবাই যেন তাকেই নেতা হিসাবে মান্য করে। তাকে সবাই যেন সেবা-যত্ন করে এ ধরণের কামনা-বাসনা প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যেই তাঁরা যুদ্ধ করতো।
মনের এ ধরণের কামনা-বাসনা ব্যক্ত করে তাঁরা অজস্র কাব্য রচনা করেছে। আজো সেসব কাব্য ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান। বর্তমান পৃথিবীতে পরাশক্তিগুলো যেমনভাবে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করার অশুভ লক্ষ্যে, প্রয়োজনে রক্তের খেলায় মেতে ওঠে, সে যুগেও তেমনিভাবে একজন ব্যক্তি তাঁর প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে তরবারী ধারণ করতো।
‘আইয়ামুল আরবের’ অর্থাৎ আরবের লোকগাথা পাঠ করলে অবগত হওয়া যায়, সে সময়ে যতগুলো ভয়ংকর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং তা দশকের পরে দশক জীবিত থেকেছে তা সবই ছিল তাদের অহংকার ও আভিজাত্য প্রদর্শনের কারণে।
হারবে বাসুস যুদ্ধ ছিল নিজেদের অহঙ্কার আর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য
‘হারবে বাসুস’ বা বাসুস যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ যুদ্ধ। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শুধুমাত্র নিজের অহংকার এবং প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত রাখার হীন উদ্দেশ্যে। বনী তাগলাব এবং বনী বকর গোত্রের মধ্যে দীর্ঘ চল্লিশ বছর ব্যাপী এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল।
বনী তাগলাবের গোত্রপতি ছিল কুলাইব ইবনে রাবিয়া। তাঁর নীতি ছিল তাঁর কূপ থেকে কেউ পানি নিতে পারবে না এবং অন্য কারো পশুকে সে পানি পান করতে দিত না। সে যেখানে শিকার করতো, সেখানে অন্য কাউকে সে শিকার করতে দিত না।
সে যে চারণভূমিতে পশু চরাতো, সেখানে অন্য কারো পশু চরাতে দিত না। সে যেখানে অগ্নি প্রজ্বলিত করতো সেখানে আর কাউকে আগুন জ্বালাতে দিত না।
অতিথির উট আক্রান্ত হয়েছে এমন সামান্য কারণেও আরবে গৃহযুদ্ধের বিস্তার ঘটত
একবার বনী বকর গোত্রের এক অতিথির আগমন ঘটলো। সে অতিথির উট চরতে চরতে তাগলাব গোত্রের গোত্রপতি কুলাইবের চারণভূমিতে গিয়ে তাঁর উটের সাথে চরতে থাকে। কুলাইব তা দেখতে পেয়ে রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে সে তীর ছুঁড়ে উটের স্তনে বিদ্ধ করলো।
বনী বকরদের সে অতিথি তাঁর উটের এই দুর্দশা দেখে চিৎকার করে বললো, ‘আহা, কি আফসোস! এ কি অসম্মান !’ বনী বকর গোত্রের প্রতিটি লোকের রক্ত যেন প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে থাকলো। তাদের অতিথির এই অপমান কিছুতেই তাঁরা সহ্য করবে না।
এই গোত্রের ভেতরে আত্মীয়তার বন্ধনও ছিল। বনী বকর গোত্রের জাসসাস ইবনে মুররা তাঁর বোনকে বিয়ে দিয়েছিল বনী তাগলাব গোত্রের গোত্রপতি কুলাইবের সাথে। এই জাসসাস স্বয়ং গিয়ে তাঁর বোনের স্বামী কুলাইবকে হত্যা করলো। কুলাইবের ভাই মু হালহিল তাঁর ভাই হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করবে বলে ঘোষণা দিল।
মুহালহিল কেন বনী বকর গোত্রের জাসসাসের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের ঘোষণা দিল-অহংকারে লাগলো বনী বকর গোত্রের। শুরু হয়ে গেল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং এই দুই গোত্র প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এই যুদ্ধ স্থায়ী হলো দীর্ঘ চল্লিশ বছর। (ইবনে আসীর, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৮৪, ৩৯৭, ইকদুল ফরিদ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৭৪, ৭৭)
যুদ্ধের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত মৃতদের আত্মা হামা পাখির অন্তরে ধরপড় করতে থাকে
সে যুগে আরবদের ধারণা ছিল, কেউ নিহত হলে তাঁর আত্মা পাহাড় পৰ্বতে পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায়। সে পাখির নাম তাঁরা বলতো হামা পাখি বা সাদা পাখি। নিহত ব্যক্তির আত্মা পাখি হয়ে উড়তো আর বলতো, ‘পান করাও আমাকে পান করাও!’ আবার কেউ ধারণা করতো, কেউ নিহত হলে যদি প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয় তাহলে সে নিহত ব্যক্তি কবরে জীবিত থাকে। আর প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে কবরে সে মৃত অবস্থায় থাকে।
কারো বিশ্বাস ছিল, নিহত ব্যক্তির জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে কবরে সে অন্ধকারের ভেতরে অবস্থান করে। প্রতিশোধ গ্রহণ করলে তাঁর কবর আলোকিত হয়। এ সমস্ত কুসংস্কারের কারণে তারা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠতো। ফলে যুদ্ধে বা অন্য কোন কারণে যারা নিহত হতো, তাদের গোত্র প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কোন ফয়সালায় না এসে যুদ্ধের পথই অবলম্বন করতো।
নিহত ব্যক্তির হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে কেউ যদি বিলম্ব করতো বা কোন অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিত, তা তো ছিল তাদের কাছে লজ্জার বিষয়। এ সব ছিল তাদের কাছে নীচতা এবং মর্যাদা হানিকর ব্যাপার। সুতরাং কোন প্রকার আপোষে না এসে তাঁরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তো।
আরবের কবিরাও গৃহযুদ্ধ না থামানোর জন্যে কবিতা লিখে উষ্কানি দিত
আরবের কবিগণ তাদের কবিতায় নিজ নিজ গোত্রকে কোন অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে হত্যাকারীকে ক্ষমা যেন করা না হয়, এ ধরণের কবিতা রচনা করে তাদেরকে উস্কানি দিত। তারা নিহত ব্যক্তির মাথার খুলিতে মদ পান করতো। আরবের বিশ্বাস ছিল কোন ব্যক্তি যুদ্ধে নিহত না হয়ে অন্য কোন কারণে শয্যায়ে শুয়ে মারা গেলে তার আত্মা নাক দিয়ে বের হয়। আর নাক দিয়ে বের হওয়া ছিল তাদের কাছে চরম অপমানজনক বিষয়।
আর যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর হাতে নিহত হলে তাঁর আত্মা বের হয় আঘাত প্রাপ্ত সেই ক্ষতস্থান দিয়ে। এটা ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে সম্মান জনক মৃত্যু। এ কারণে যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন কারণে মারা যাওয়াকে তারা বলতো, ‘অমুক নাক নিয়ে মরেছে’।
আর যুদ্ধের ময়দানে কেউ নিহত হলে তারা বলতো, ‘সে নাক নিয়ে মরেনি’। নাক নিয়ে মরা অর্থাৎ যুদ্ধে নিহত না হয়ে অন্যভাবে মরা ছিল লজ্জার বিষয়। এ জন্য তাদের কবিগণ গর্ব করে বলেছে, ‘আমাদের গোত্রের কোন নেতা নাক নিয়ে মরেনি।’ অর্থাৎ তাদের গোত্রের কোন নেতা শয্যায়ে শুয়ে মরেনি।
ইয়াওমে মাসহালান যুদ্ধ, তাহলাকুল লামাম যুদ্ধ, দাহেস যুদ্ধসহ এ ধরণের নানা যুদ্ধ তাদের ভেতরে কোন যুক্তি সংগত কারণে সংঘটিত হয়নি। সামান্য ঘোড় দৌড় নিয়ে-কার ঘোড়া আগে দৌঁড়ালো আর কার ঘোড়া পরে দৌঁড়ালো এই নিয়ে দাহেস যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
প্রায় ৫০ বছর ধরে এই অহংকার প্রদর্শনীর যুদ্ধ চলল। আউস এবং খাজরাজ গোত্রের ভেতরে শুধুমাত্র ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও হিংসার কারণে প্রায় ১০০ বছর ধরে যুদ্ধ চলেছিল। যথা সময়ে ইসলামী জাগরণ শুরু না হলে উভয় গোত্রই ধরা পৃষ্ঠা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
একজনের পায়ের উপর দিয়ে, অন্যজন চলে যাবার কারণে সূচনা হয়েছিল এক ভয়ানক যুদ্ধের
কিনানা গোত্রের এক ব্যক্তির নাম ছিল বদর ইবনে পাশা। উকাজ মেলায় এই লোক বসে সামনের দিকে তাঁর পা দুটো মেলে দিয়ে কোন কারণ ছাড়াই অহংকার প্রদর্শনের জন্য ঘোষণা করলো, ‘গোটা আরবের ভেতরে আমিই হলাম সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তি। আমার চেয়ে কেউ যদি নিজেকে অধিক মর্যাদাবান মনে করে তাহলে তাঁর সাহস থাকলে যেন আমার পায়ে তরবারীর আঘাত হানে।’
তাঁর এই অর্থহীন ঘোষণা অনেকের মনে আগুন ধরিয়ে দিল। বনী দাহমান গোত্রের একজন যুবকের শরীরের রক্ত গরম হয়ে উঠে গেল। সে এসে বদর ইবনে পাশার পায়ে তরবারী দিয়ে আঘাত করলো। আর যায় কোথা, শুরু হয়ে গেল কুখ্যাত ফুজ্জার যুদ্ধ! কিনানা গোত্র এবং হাওয়াজেন গোত্রের ভেতরে এমন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, উভয় পক্ষের মিত্র গোত্রগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। এই দুই গোত্রের মধ্যে আর আপোষেই হলো না।
ফুজ্জার যুদ্ধের মত ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ আরবে আর কখনও হয়নি
শেষ ফুজ্জার যুদ্ধও ছিল প্রতিহিংসা আর অহংকারের অনিবার্য পরিণতি। ঐতিহাসিকদের মতে আরবের শেষ ফুজ্জার যুদ্ধের মত ভয়ংকর যুদ্ধ আর ইতিপূর্বে সংঘটিত হয়নি।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের ছাব্বিশ বছর পূর্বে হিরার রাজা নোমান ইবনে মুনভ্যের একটা বাণিজ্য বহর আরবের উকাজ নামক স্থানে যে বিখ্যাত মেলা অনুষ্ঠিত হতো, সে মেলায় প্রেরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তখন তিনি আরবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাঁর বাণিজ্য বহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করবে কে?’
তাঁর প্রশ্নের জবাবে কিনানা গোত্রের বারাদ ইবনে কায়েশ রাজাকে আশ্বাস দিয়ে বললো, ‘আমি আমার গোত্রের পক্ষ থেকে আপনার বাণিজ্য বহরের যাবতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।’
অপর দিকে হাওয়াজেন গোত্রের নেতা উরওয়াতুর রাহহাল অহংকার প্রদর্শন করে বললো, ‘আমি আপনাকে সমস্ত আরবের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলাম।’
হাওয়াজেন গোত্রের এই নেতার কথা কিনানা গোত্রের বারাদ ইবনে কায়েশের শরীরে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। হাওয়াজেন গোত্রের নেতা হিরার রাজার বাণিজ্য বহর নিয়ে যখন যাত্রা করল, তখন কেনানা গোত্রের বারাদ ইবনে কায়েশ হাওয়াজেন গোত্রের উরওয়াতুর রাহহালকে পথিমধ্যে তায়মান নামক এলাকায় হত্যা করলো।
পরিণতিতে যা হবার তাই হলো। এই দুই গোত্রের পুরোনো শত্রুতা ঐ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিল। উভয় গোত্রে ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হলো।
কুরাইশ গোত্র কানানা গোত্রের সাহায্যে এগিয়ে গেল আর বনী সাকিফ গোত্র এগিয়ে গেল হাওয়াজেন গোত্রের পক্ষে। ইয়াওমে শামতাত, ইয়াওমে শারব ও ইয়াওমূল হারিবার ভয়ংকর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। প্রায় চার বছরের অধিক কাল এই যুদ্ধ হলো।
এই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বিভৎসতা এতই ছিল, যে ঐতিহাসিকগণ বলেন, আরবের অতীতের সমস্ত যুদ্ধের নৃশংসতাকে এই যুদ্ধ ম্লান করে দিয়েছিল। (ইকদুল ফরিদ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৭৪, ৭৭, ৮৬। ইবনে আসীর, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৮৪, ৩৯৭, ৪৩৯, ৪৪৫, ৪৯৪, ৫১১। তাবাকাতে ইবনে সাআদ, উসুলুল গাবাহ, ফাতহুল বারী)
আবরাহা যে বছরে মক্কার কা’বা ঘর আক্রমণ করতে এসেছিল সে বছর থেকে যে গণনা শুরু হয় তাকে হাতী বছর বলে। চতুর্থ ফুজ্জার বা ফিজার যুদ্ধ ইকদুল ফরিদ, জওহরী ও আগানী বলেছেন, এর আগেও তিনবার এই ফুজ্জার বা ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
ইবনে সাআদ লিখেছেন, আব্রাহা কা’বা আক্রমণ করতে আসার প্রায় বিশ বছরের সময় চতুর্থ ফুজ্জার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ইবনে ইসহাক, ইবনে জারীর আত তাবারী ও বালাযুড়ীও এই কথাই বলেছেন।
কেনানা গোত্রের বারাদ ইবনে কায়েশ তায়মান নামক এলাকায় যখন হাওয়াজেন গোত্রের উরওয়াতুর রাহহালকে হত্যা করে, সে সময় কুরাইশরা উকাজেন মেলায় ছিল। তাদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছা মাত্র তাঁরা মক্কার কা’বাঘরের দিকে চলে আসে। কিন্তু তাঁরা কা’বার এলাকায় প্রবেশের পূর্বেই হাওয়াজেন গোত্র তাদের পেছনে ধাওয়া করে তাদেরকে ধরে ফেলে।
ফলে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ, গোটা দিন যুদ্ধ চলার পরে রাতে কুরাইশরা কা’বা এলাকায় প্রবেশের সুযোগ লাভ করে। ফলে হাওয়াজেন গোত্র যুদ্ধে বিরতি দেয়। কিন্তু তারপর দিন থেকে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
এ সময়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী অপূর্ব সুন্দর বিশ বছরের তরতাজা যুবক। ইবনে হিশাম বলেছেন, সে সময়ে তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বা পনের। তিনি ছিলেন কুরাইশ গোত্রের, আর এই গোত্র ছিল কিনানা গোত্রের মিত্র।
আত্মীয়তার বন্ধন টিকিয়ে রাখতে মুহাম্মদ (সাঃ) ফুজ্জার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন
কুরাইশরা যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেছিল ফলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কেও তাঁর আত্মীয়দের সাথে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থাকতে হয়েছিল। নিষিদ্ধ মাসে এসব যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আর এসব মাসে যুদ্ধ করা ছিল পাপের কাজ। এ কারণে কুরাইশরা বলতো, আমরা পাপের কর্ম করেছি। ফলে এসব যুদ্ধকে হরবে ফিজার বলা হয়।
ঐতিহাসিকগণ বলেন, এসব যুদ্ধে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাঁর আত্মীয়গণ যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যেত। এ সম্পর্কে স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর এবং বর্শাগুলো ফিরিয়ে দিতাম এবং সেগুলো একত্রিত করে চাচাদের কাছে দিতাম।’
ফিজারের এই শেষ যুদ্ধ ছিল ফিজার আল বারাদ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধের পূর্বে আরো তিনবার ফিজার যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধ প্রথম হয়েছিল কেনানা এবং হাওয়াজেন গোত্রের মধ্যে। দ্বিতীয়বার হয়েছিল কুরাইশ এবং হাওয়াজেনের মধ্যে। তৃতীয় বার হয়েছিল হাওয়াজেন এবং কেনানা গোত্রের মধ্যে।
সর্ব শেষ ফিজার যুদ্ধে অর্থাৎ যে যুদ্ধে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাঁর চাচাদের সাথে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থাকতে হয়েছিল, সে-যুদ্ধে কুরাইশ এবং কেনানার যৌথ বাহিনীর সিপাহসালার ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুরাইশ গোত্রের হারব ইবনে উমাইয়া। তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ানের পিতা এবং হযরত মুয়াবিয়ার দাদা।
আল্লামা শিবলী নোমানী বলেছেন, এই যুদ্ধে কুরাইশরা সত্যের পক্ষে ছিল এবং সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে তাদের ওপর হামলা করা বিধায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যোগদান করেছিলেন। ইবনে হিশাম বলেছেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো ওপর অস্ত্র প্রয়োগ করেননি।
ইমাম সুহাইলী বলেছেন, এই যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরাসরি অংশগ্রহণ করেননি। তিনি অস্ত্র পরিচালনা বা কোন ধরনের রক্তপাত করেননি। ইতিপূর্বে তিনি কোন্ যুদ্ধের ময়দানে যাননি। তাছাড়া যুদ্ধের ময়দানের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল না। তিনি সে যুগের অর্থহীন গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্ত ছিলেন।
আরবে গৃহযুদ্ধ থাকলেও মুহাম্মদ (সাঃ) এসব যুদ্ধ থেকে কোন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন নাই
ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে সমস্ত যুদ্ধ একান্ত বাধ্য হয়ে পৃথিবীর কল্যাণের লক্ষ্যে তাঁকে করতে হতো এবং সেসব যুদ্ধে সামরিক নেতৃত্বের যে অদ্বিতীয় যোগ্যতা ও রণকৌশল তিনি সাল্লাল্লাহু আ’লায়হি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শন করেছিলেন, তা তাঁর অভ্যন্তরীণ বা অর্জিত কোন যোগ্যতা বা পূর্ব অভিজ্ঞতার ফসল ছিল না। তাঁর যাবতীয় গুণাবলী ছিল মহান আল্লাহর দান। প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তাকে দুর্লভ গুণাবলীতে ভূষিত করেছিলেন।
এই ফিজারের যুদ্ধ ময়দানে উপস্থিত থাকার কারণে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ তাঁর চরিত্রকে ভিন্নভাবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা করে বলেছে, ‘ফিজারের যুদ্ধে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং সে যুদ্ধে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, পরবর্তীতে তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সব যুদ্ধ তাকে করতে হয়েছে, সেসব যুদ্ধে তিনি সেই অভিজ্ঞতাটাই প্রয়োগ করেছিলেন।’
জীবনের প্রথম একটি যুদ্ধে দর্শকের ভূমিকা পালন করে কোন মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সিপাহসালার, অদ্বিতীয় Unique Commander-In-Chif, Matchless General কি করে হতে পারে তা আমাদের বোধের অগম্য। প্রকৃত পক্ষে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক মানসিকতার কারণেই এ ধরনের যুক্তিহীন লেখনী দ্বারা তাদের গ্রন্থগুলো পরিপূর্ণ করেছে।
আরব অঞ্চলে সংঘটিত হুনাইনের যুদ্ধ মুহাম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে হয়েছিল মুসলিম বাহিনীর ক্ষতি হয়
হুনাইনের যুদ্ধে প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রথম পর্যায়ে এত তীব্র ছিল, যে মুসলিম বাহিনী টিকতে না পেরে ময়দান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এমন এক সময় এসেছিল যে, প্রতিপক্ষে তীর আর বর্শা আকাশ আড়াল করে আসছিল।
সে সময়ে যুদ্ধের ময়দানে একমাত্র ব্যক্তি যিনি উপস্থিত ছিলেন তিনি হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব কি করে হয়েছিল, গোটা ইউরোপীয় গবেষকদের কাছে আজো গবেষণার বিষয়।
আমাদের কাছে এটা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়, কেননা আমরা জানি মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে এবং মহাসত্যের অনুসারীদেরকে এভাবেই সাহায্য করেন। এটা আমাদের হৃদয়ের লালিত বিশ্বাস। হুনাইনের যুদ্ধে যে দৃঢ়তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শন করেছিলেন, তা নিশ্চয়ই সেই সমস্ত বিভ্রান্ত ঐতিহাসিকের ধারণানুযায়ী ফিজার যুদ্ধ প্রদর্শনের কারণে নয়।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |