খাদিজা বনাম মুহাম্মদ (সাঃ) ব্যবসায়িক চুক্তিতে আবদ্ধ

খাদিজা বনাম মুহাম্মদ (সাঃ) ব্যবসায়িক চুক্তিতে আবদ্ধ

হযরত খাদিজা (রাঃ) ব্যবসায়ে মুহাম্মদ (সাঃ) এর অন্তভূক্তি

তদানীন্তন আরব সমাজে যে কদর্যতা বিদ্যমান ছিল, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু সে সব থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ ধনীদের একজন এবং সে সমাজের এক সম্ভ্রান্ত নারী।

তাঁর বংশের ধারা চার পুরুষ পূর্বে এসে বিশ্বনবীর বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তাঁর পিতার নাম ছিল খুাওলেদ ইবনে আসাদ ইবনে আব্দুল উজ্জা ইবনে কুশাইর। মাতার নাম ছিল ফাতেমা বিনতে যায়েদা।

হস্তী বছর শুরুর অর্থাৎ আব্রাহা কর্তৃক মক্কা আক্রমণের প্রায় পনের বছর পূর্বে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। পরিণত বয়সে তাঁর অনুপম চরিত্রের কারণে তাকে লোকজন ‘তাহেরা’ উপাধি দান করেছিল।

খাদিজার উপাধি ছিল তাহেরা

‘তাহেরা’ আরবী শব্দ, এর অর্থ হলো পবিত্র। অর্থ সম্পদ এবং সে সমাজে তুলনাহীন রূপ সৌন্দর্য ও গুণের কারণে সর্ব শ্রেণীর মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করতো। সাধারণ ভাবে আরবের যে পঙ্কিলতার মধ্যে মানুষ নিমজ্জিত ছিল, তা থেকে তিনি নিজেকে সযত্নে রক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন।

ওরাকা ইবনে নওফেল ছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল কিতাব সম্পর্কে একজন বিখ্যাত জ্ঞানী পণ্ডিত। তাঁর সাথে হযরত খাদিজার বিয়ের কথা চলছিল। কিন্তু সেখানে তাঁর বিয়ে হয়নি।

খাদিজার পূর্বের স্বামীদের নাম পরিচয়

তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল আবু হালা ইবনে যূয়ারা তামীমীর সাথে। এই স্বামীর সাথে সংসার করার সময় হযরত খাদিজা দুটো পুত্র সন্তানের মাতা হন। এ সন্তান দ্বয়ের নাম ছিল হিন্দ ও হালা।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবে ঘোষিত হবার পরে তাঁরা দুই ভাই ইসলামী আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। আবু হালা ইবনে যূয়ারা তামীমীর ইন্তেকালের পরে হযরত খাদিজার পুনরায় বিয়ে হয় আতিক ইবনে আয়েজ আল মাখজুমীর সাথে।

এই স্বামীর সাথে সংসার জীবন-যাপনের সময় তাঁর গর্ভে হিন্দ নামে এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। হযরত খাদিজার এই মেয়ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেছিল।

কোন কোন ঐতিহাসিক বর্ণনা করেছেন, কন্যা হিন্দ-এর পিতা আতিকের সাথে খাদিজার প্রথম বিয়ে হয়েছিল এবং আবু হালা ছিল তাঁর দ্বিতীয় স্বামী।

খাদিজা বংশসূত্রেও মুহাম্মদ (সাঃ) এর আত্মীয় হয়

হযরত খাদিজা (রাঃ) বংশীয় সূত্রে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচাত বোন হতেন। শৈশব কাল থেকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভেতর থেকে যে অদ্বিতীয় গুণাবলী এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাচ্ছিল, ক্রমশ তা তাঁর পারিবারিক গণ্ডি পার হয়ে সমাজের সর্বত্র বিকশিত হয়েছিল।

হৃদয় মন আমোদিত করা কোন সুগন্ধি গোলাপ কার্লো কোন বাগানে পরিস্ফুটিত হলে তার সৌরভ গোপন থাকে না। দিক দিগন্তে সে সৌরভ স্নিগ্ধ সমিরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

তেমনি আমেনা নন্দন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জান্নাতি সৌরভ সেই শৈশব থেকেই দিক দিগন্ত ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছিল। সে ঘ্রাণ হযরত খাদিজার নাসারন্ধে প্রবেশ করেছিল।

মক্কার সেই ইয়াতীম বালক পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করে যে ব্যবসায়িক যোগ্যতা অর্জন করেছিল, যে প্রজ্ঞা, উন্নত চরিত্র, সততা, মহানুভবতা, বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা, আত্মসংযম এবং ধৈর্য, আত্মসম্মান ও নেতৃত্বের গুণাবলী প্রস্ফুটিত হচ্ছিল, বিশ্বনবীর এ সমস্ত মহৎ গুণাবলীর কথা খাদিজার কাছে অজানা ছিল না।

খাদিজা বাণিজ্য বহরের জন্যে একজন বিশ্বস্থ লোকের সন্ধান করছিলেন

ইবনে ইসহাক বলেছেন, এ সময়ে বিশ্বনবীর চাচা আবু তালিব একদিন ভাতিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললেন, ‘বাবা, আমার তেমন অর্থ সম্পদ নেই। আমার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশঃ খারাপের দিকেই যাচ্ছে।

ব্যবসা পরিচালনা করার মত তেমন পুঁজিও আমাদের কাছে নেই। মক্কা থেকে অতিদ্রুত একটা বাণিজ্য বহর সিরিয়া যাবে। খাদিজাও তাঁর ব্যবসার পণ্য সেখানে প্রেরণ করতে আগ্রহী।

সে তোমার সততা এবং উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে অবগত। তুমি যদি তাঁর কাছে যেয়ে তাঁর সামগ্রী নিয়ে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করো, তাহলে সে অন্যদের তুলনায় তোমাকেই অগ্রাধিকার দান করবে।’

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘খাদিজার যদি আমাকে প্রয়োজন হয় তাহলে সে আমার কাছে সংবাদ প্রেরণ করবেন।’ চাচা আবু তালিব বললেন, ‘বাবা, আমার কেমন যেন আশঙ্কা হচ্ছে, তিনি তোমার আগেই অন্য কোন লোককে নিয়োগ না করেন।’

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর চাচা যে আলাপ আলোচনা নিজেদের ভেতরে করেছিলেন তা হযরত খাদিজার কানে পৌঁছেছিল। তিনিই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে সংবাদ প্রেরণ করেছিলেন।

তাবাকাতে ইবনে সাআদ উল্লেখ করেছেন, আবু তালিব স্বয়ং খাদিজার কাছে যেয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ‘তোমার যদি মন চায় তাহলে অন্য মানুষের সহযোগিতা গ্রহণের পরিবর্তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সহযোগিতার বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত করতে।’

খাদিজা বাণিজ্যের জন্যে চাচা আবু তালিবের মুহাম্মাদ (সাঃ) নাম প্রস্তাব

খাদিজা তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি কোন দূরের এমন কোন লোকের কথা বলতেন যাকে আমি পছন্দ করিনা, তবুও তাকে আমি নিয়োগ করতাম। এখন আপনি এমন একজনের কথা বলেছেন, যিনি আমার অতি কাছের একজন।’

এরপর তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘আপনি আমার ব্যবসার পণ্য সামগ্রী নিয়ে সিরিয়া যদি যান তাহলে আমি অন্য লোককে যে বিনিময় প্রদান করি আপনাকেও অনুরূপ প্রদান করবো।’

এরপর হযরত খাদিজা এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে ব্যবসা সংক্রান্ত কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়। খাদিজা তাঁর বিশ্বস্ত গোলাম মায়সারাকে সাথে দিয়ে বিশ্বনবীকে যথা সময়ে তাঁর পণ্য সামগ্রী দিয়ে সিরিয়া প্রেরণ করেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে যে দক্ষতা প্রদর্শন করেন এবং বিভিন্ন মানুষের সাথে যে মহৎ আচরণ করেন, তা দেখে মায়সারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে। খাদিজা ইতিপূর্বে যে সমস্ত লোক দিয়ে তাঁর ব্যবসার সামগ্রী প্রেরণ করে যা মুনাফা অর্জন করতেন এবারে বিশ্বনবীর মাধ্যমে তার দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করলেন।

ওদিকে মায়সারাও মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে, সিরিয়া ভ্রমণের নানা অভিজ্ঞতা, দৃশ্যমান বাস্তবতা, তার বিশ্বস্থতা, কর্মতৎপরতা, আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সকল বর্ণনা তুলে ধরে তাঁর মনিব খাদিজার কাছে বিশ্বনবী সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা করেন।

ফলে খাদিজা খুশী হয়ে মুহাম্মদ (সাঃ) কে তার প্রতিশ্রুতির তুলনায় দ্বিগুণ বেশী মুনাফা প্রদান করেন। মায়সারাার কাছে থেকে মুহাম্মদ (সাঃ) এর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রশংসা শোনার পরে খাদিজা স্থির করেন যে, তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মত একজন মানুষকেই যেন খুজছিলেন।

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *