ব্যবসায়ী মুহাম্মদ (সাঃ) এর ব্যবসা দক্ষতা অর্জনের পিছনের ঘটনা
হযরত ইবরাহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তান হযরত ইসমাইল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধরদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের সংখ্যাধিক্য দেখা যায়।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে বনী ইসমাইলের এই শাখা ব্যবসাকে তাঁরা পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছিল। ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি, বিশ্বনবীর পরদাদা কিভাবে ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন।
বিশ্বনবীর পিতাও ব্যবসায়িক কারণে দেশের বাইরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মদীনাতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর দাদাও ছিলেন ব্যবসায়ী। তাঁর চাচা আবদে মানাফ ওরফে আবু তালিবও ব্যবসা করতেন। তিনিও পরিণত বয়সে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসাবে ব্যবসাকে প্রাধান্য দিলেন।
চাচা আবু তালিবের সাথে তিনি মাঝে মধ্যে বাণিজ্য কাফেলার সাথে গমন করতেন। এ ধরনের ভ্রমণের কারণে বিশ্বনবীর জ্ঞান ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছিল।
তাঁর অনুপম চারিত্রিক গুণাবলীর কারণে ইতিপূর্বেই ‘আল আমীন’ অর্থাৎ বিশ্বাসী উপাধি লাভ করেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সততা ছিল গোটা আরবে এক মহাস্ময়।
অনেকেই মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিজেদের ব্যবসায়ে যুক্ত করেছিলেন
অনেক ব্যবসায়ী তাঁর সততার কারণে তাঁকে নিজের ব্যবসার সাথে জড়িত করেছিল। তাঁর কাছে লোকজন ব্যবসার পণ্য দিয়ে দিত, দিত, তিনি সে পণ্য যথাস্থানে বিক্রয় করে পণ্যের মূল্য অধিকারীর কাছে সমস্ত অর্থ দিয়ে দিতেন। তারপর হিসাবের লভ্যাংশ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে একটা অংক দেওয়া হত। এই ধরনের পদ্ধতি তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গ্রহণ করে ব্যবসা করতেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে এই অংশীদারীর ভিত্তিতে যারা ব্যবসা করেছেন, তাদের সাক্ষ্য সম্বলিত বর্ণনা ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান রয়েছে। এসব বর্ণনা পাঠ করলে অবাক হতে হয়, একজন নিরক্ষর ব্যক্তি কিভাবে ব্যবসা সম্পর্কে এত বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন।
বর্তমানে ব্যবসায়ীক জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখা-পড়া করে সনদ পত্র গ্রহণ করে। তারপর ব্যবসা শুরু করে।
পক্ষান্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কোন প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ পত্র গ্রহণ না করেই ব্যবসার ক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, তা কোন সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা যায় না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যবসার ক্ষেত্রে যে বিচক্ষণতা এবং সততা প্রদর্শন করেছেন, ত হচ্ছে একজন ব্যবসায়ীর শ্রেষ্ঠ গুণ।
একজন সফল ব্যবসায়ীর জন্য অঙ্গীকার রক্ষা করা এবং সততার প্রতি অবিচল থাকা সফল ব্যবসার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এ কারণে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবে ঘোষিত হবার আগেই গোটা আরবে ‘বিশ্বাসী ব্যবসায়ী’ হিসাবে উপাধি লাভ করেছিলেন।
বিশ্বনবীর সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু হামছা (র) বলেছেন, ‘তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবে আত্মপ্রকাশের পূর্বে একদিন আমি তাঁর সাথে ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ করেছিলাম এবং
সেদিন সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারায় আমি তাঁর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি আমি পুনরায় আসছি। এ কথা বলে আমি চলে এসেছিলাম এবং তিন দিন পর্যন্ত আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যেতে পারলাম না এবং প্রতিজ্ঞার কথা আমার স্মরণে ছিল না। যেখানে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তিন দিন পরে সেখানে আমি উপস্থিত হলাম। আমি দেখলাম তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানেই আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
তাকে আমি এভাবে কষ্ট দিয়েছি, এ কারণে স্বয়ং আমি লজ্জানুভব করলেও তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন ধরনের বিরক্তি প্রকাশ না করে শুধু বললেন, ‘আমি তোমার অপেক্ষায় আজ তিনদিন ধরে এখানে অপেক্ষা করছি, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছো।’
ব্যবসায়ীক জীবনে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কৌশলের মাধ্যমে জটিলতা সৃষ্টি করেননি। প্রতি মুহূর্তে তিনি লেন-দেনের ক্ষেত্রে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেন। ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি কোন ধরনের জটিলতাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি।
যার! তাঁর সাথে ব্যবসা করেছেন এমন একজন লোক, যার নাম ছিল সায়েব। তিনি বিশ্বনবীর দরবারে এসে ইসলাম গ্রহণ করার পরে উপস্থিত ব্যক্তগণ উক্ত সায়েবের রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু চরিত্র সম্পর্কে প্রশংসা করতে থাকে।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, ‘আমি সায়েব সম্পর্কে তোমাদের তুলনায় অধিক ভালো অবগত আছি।’
মুহাম্মদ (সাঃ) এর ব্যবসায়ে পরিচ্ছন্ন লেন-দেন অধিকারী ছিলেন
এ কথা শুনে স্বয়ং সায়েব রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘আমার পিতা-মাতা আপনার কদম মোবারককে উৎসর্গীকৃত হোক! আমি এক মুহূর্তের জন্যও আপনার সাথে ব্যবসা করতে যেয়ে কোন সন্দেহ সংশয়ে নিক্ষিপ্ত হইনি। কারণ আপনি সব সময় পরিচ্ছন্ন লেন-দেন করতেন।’
ব্যবসা উপলক্ষে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরেকজন সাহাবী হযরত কায়েশ ইবনে মাখজুমী রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ও নবীর সাথে এক সময় ব্যবসা করেছেন। তিনিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যবসায়ী জীবনের বিচক্ষণতা এবং সততা সম্পর্কে সাক্ষ্যদান করেছেন।
ব্যবসার কারণে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন মাসের কোন তারিখে কোন কোন দেশে এবং এলাকায় ভ্রমণ করেছেন, এ সম্পর্কে দিন তারিখ উল্লেখ করে এ বিষয়ে লেখা বিতর্কিত ব্যাপার। এ কারণে আমরা কোন দিন তারিখ উল্লেখ না করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যবসায়ীক ভ্রমণ সম্পর্কে আলোচনা করবো।
ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ (সাঃ) ইয়েমেনে গিয়েছেন
পণ্য বাজারজাত করণের স্থান ছিল ইয়েমেনের বিখ্যাত বাজার জুরাশ। এই জুরাশ বাজারেও তিনি গিয়েছেন এবং আরবের বিভিন্ন এলাকা তিনি ব্যবসার কারণে ভ্রমণ করেছেন। হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর পণ্য নিয়ে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই জুরাশ বাজারে দুইবার গিয়েছিলেন এবং এর বিনিময়ে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি করে দুটো উট লাভ করেছিলেন।
সে সময়ে আরবের গোটা পূর্ব সমুদ্র তটভূমিকে বাহরাইন নামে অভিহিত করা হতো। আরবী বাহুর শব্দের অর্থ হলো সমুদ্র বা উপসাগর বা হ্রদ এবং ‘বাহুরাইন’ শব্দের অর্থ হলো দুই সমুদ্রের সংযোগস্থল বা দুটো সমুদ্র। ‘বাহুর’ শব্দের দ্বিবচন হয় ‘বাহুরাইন’। এই বাহুরাইনেও বিশ্বনবী গিয়েছিলেন। তবে বর্তমান মানচিত্রে যে বাহরাইন দেখা যায় এটা সে বাহরাইন ছিল না।
নবী হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরে মদীনায় হিজরী ৬ সালে তাঁর কাছে সেই সময়ের বাহরাইন থেকে আব্দুল কায়েশের নেতৃত্বে একটা প্রতিনিধি দল এসেছিল বিশ্বনবীর দরবারে। সে সময়ে ঐ প্রতিনিধিবন্ধকে তাদের এলাকার বিভিন্ন স্থানের নাম উচ্চারণ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব এলাকার অবস্থা জানতে চাইলে। প্রতিনিধিদল অবাক বিস্ময়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রশ্ন করলো, ‘আমাদের দেশ সম্পর্কে আপনি আমাদের থেকেও অধিক জানেন, কিভাবে জানলেন?’
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে জানালেন, ‘আমি আপনাদের দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেছি।’ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যবসায়ীক কারণে নানাস্থানে ভ্রমণ করেছেন, তাঁর এই ভ্রমণকে কেন্দ্র করে ইহুদী খৃষ্টান লেখকবন্দ নবুওয়্যাতকে অস্বীকার করে লিখেছে, বিশ্বনবী এত বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন শুধুমাত্র ভ্রমণের কারণে।
ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ (সাঃ) কি কখনও সমুদ্র ভ্রমন করেছিলেন?
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ স্থল পথ ও সমুদ্র পথে ভ্রমণ করে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নানা ধরনের মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং ভ্রমণজনিত কারণে যে জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন, পরবর্তীতে সে জ্ঞানই তিনি মতবাদ আকারে মানুষের সামনে পেশ করেছেন। সমুদ্র পথে তিনি মিশরে গিয়েছিলেন।’
গোটা পৃথিবীর সামনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনধারা ও সম্পূর্ণ ইতিহাস অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান। এমন কোন প্রমাণ কোন ব্যক্তি পেশ করতে সক্ষম হবে না যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনদিন সমুদ্র পথে ভ্রমণ বা মিশর ভ্রমণ করেছেন। বিষয়টি চিন্তকদের জ্ঞান ও গবেষণার বাইরে।
তবে ভ্রমণজনিত কারণে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কোন সমুদ্র দেখলে দেখতেও পারেন, কিন্তু তিনি কোনদিন কোন সমুদ্র পথে ভ্রমণ করেন নি।
পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকগণ যেমন বলেছে, ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেকে নবী হিসেবে ঘোষণা দেবার পূর্বে আরবের সাধারণ মানুষ যেভাবে জীবন-যাপন করতো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও ঐ একই ভাবে জীবন অতিবাহিত করেছে।
খাদিজা মূর্তিপূজা করেছে এবং মূর্তির নামে উৎসর্গীকৃত পশুর গোস্ত তারা ভক্ষণ করতো।’ অর্থাৎ তাদের ধারণানুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়্যাত লাভ করার পূর্বে মূর্তি-পূজা করেছেন। ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ অন্তরে পোষণ করে এ ধরনের কল্পিত বহু কাহিনীর অবতারণা করেছে পাশ্চাত্যের লেখক ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |