আলী (রাঃ)-এর শৈশব এবং তাঁর ইসলাম গ্রহণ

আলী (রাঃ)-এর শৈশব এবং তাঁর ইসলাম গ্রহণ

আলী (রাঃ) পিতা আবু তালিবের পারিবারিক অস্বচ্ছলতা

বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁকে সেই আট বছর বয়স থেকেই নিজের কাছে আপন সন্তানের মত রেখে ছিলেন। শিশু বয়স থেকে তাকে চাচা যে অসীম মায়া মমতা দিয়ে যৌবন কাল পর্যন্ত তাঁর জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নিজে উপার্জন শিখে চাচার সে অবদানের কথা নবী (সাঃ) বিস্মৃত হননি।

হযরত আলী (রাঃ) সে সময়ে শিশু। মক্কা ও তাঁর আশেপাশে জিনিষ পত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি হলো। নবী (সাঃ) ভাবলেন চাচার সংসার বেশ বড়। তাঁর আর্থিক অবস্থা তেমন সুবিধার নয়। তাকে কিছু সাহায্য করা প্রয়োজন।

তিনি (সাঃ) তাঁর আরেকজন অর্থশালী চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ) এর কাছে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনার ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। তাঁর পরিবার অনেক বড়।

আলী (রাঃ) দায়িত্ব মহানবী (সাঃ) ও জাফর (রাঃ) দায়িত্ব আব্বাস (রাঃ) গ্রহণ করেন

জিনিষ পত্রের দাম বেশী হবার কারণে মানুষের অবস্থা যে কি অবস্থায় পৌঁছেছে তা আপনি দেখছেন। চলুন তাকে যেন কিছু সাহায্য করা যায় এ সম্পর্কে তাঁর সাথে কথা বলি। তাঁর এক সন্তানের দায়িত্ব আপনি গ্রহণ করুন এবং এক সন্তানের দায়িত্ব আমি গ্রহণ করি।’

বিশ্বনবীর কথায় হযরত আব্বাস একমত হয়ে আবু তালিবের কাছে যেয়ে তাকে সব কথা জানালো। তিনি বললেন, ‘আক্বীলকে আমার কাছে রেখে আর যারা আছে তাদের ভেতরে যাদেরকে খুশী নিয়ে যাও।’ তখন নবী (সাঃ) গ্রহণ করলেন হযরত আলীর দায়িত্ব এবং হযরত আব্বাস গ্রহণ করলেন হযরত জাফরের দায়িত্ব।

হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত যায়েদ (রাঃ) এর ব্যাপারে অনুমান করা যায়, তাঁরা দু’জনই ছিলেন নবী পরিবারের সদস্য। সুতরাং হযরত আবু বকরের পূর্বে তাদেরই প্রথমে সাড়া দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে আমাদের ধারণা।

আলী (রাঃ) শিশুকাল থেকেই মহানবী (সাঃ) এর পরিবারে বড় হন

আলী (রাঃ) কে সেই শিশু বয়স থেকেই নবী (সাঃ) তাঁর চাচার কাছ থেকে এনে নিজের তত্ত্বাবধানে রাখতেন। আর যায়েদ (রাঃ) ও বিশ্বনবীর সন্তানের মত তাঁর বাড়িতেই থাকতেন। আবু বকর (রাঃ) বিশ্বনবী সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও তিনি তো আর তাঁর বাড়িতে অবস্থান করতেন না।

এসব দিক বিবেচনা করলে ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে আলী (রাঃ) ও যায়েদ (রাঃ) কে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়। এরপরে রয়ে যায় নবী (সাঃ)-এর নিজের কন্যাগণ।

তাঁরা তাদের পিতা-মাতাকে নামাজ আদায় করতে দেখে থাকবেন। মাথার সাথে তাঁরাও ইসলাম ঈমান আনবেন, কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় তাঁরাও প্রাথমিক দিকেই ঈমান এনেছিলেন। নবী (সাঃ) যখন নবুওয়ত লাভ করেন সে সময়ে হযরত যয়নবের বয়স ছিল মাত্র দশ।

আর হযরত উম্মে কুলসুম এবং হযরত রুকাইয়ার (রাঃ) ছিলেন বিবাহিতা। আবু লাহাবের ছেলেদের সাথে তাদের বিয়ে হয়েছিল।

হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর জন্ম হয়েছিল বিশ্বনবী (সাঃ)-এর নবুওয়ত লাভের এক বছর পরে। তিনি পারিবারিক দিক দিয়ে ইসলামী পরিবেশেই পৃথিবীতে এসেছিলেন।

মহানবী (সাঃ) ও খাদিজা (রাঃ) সালাত দেখে আলী (রাঃ) কি করছেন জানতে চান

হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে এ ধরণের বর্ণনা পাওয়া যায় যে, যে সময়ে নবী (সাঃ) তাঁর স্ত্রীকে সাথে করে গোপনে নামাজ আদায় করতেন তখন হযরত আলী (রাঃ) তাদেরকে নামাজ আদায় করতে দেখেন।

শিশু আলী (রাঃ) অবাক বিস্ময়ে ইতিপূর্বে কোনদিন না দেখা দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থেকে নবী (সাঃ)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনারা এ কি করছেন?’

নবী (সাঃ) তাকে বলেছিলেন, ‘আমরা যা করছি এটাই হলো মহান আল্লাহর মনোনীত জীবন ব্যবস্থা’। আল্লাহ আমাকে এই জীবন ব্যবস্থাসহ রাসুল হিসাবে প্রেরণ করেছেন।

আমি তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি, তুমি এক আল্লাহকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর দ্বীন কবুল করে তাঁরই দাসত্ব করো এবং সমস্ত মূর্তি পরিত্যাগ করো।’

কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় বিশ্বনবীর কথা শুনে কোন প্রশ্ন না করেই হযরত আলী (রাঃ) মুসলিমদের মধ্যে শামিল হয়েছিলেন।

কোন বর্ণনায় দেখা যায়, নবী (সাঃ)-এর কথা শুনে বিস্মিত শিশু আলী বলেছিলেন, ‘এ তো একেবারে নতুন কথা, এমন কথা তো কোনদিন শুনিনি! আমি আমার আব্বাকে না বলে এ সম্পর্কে কিছু করতে পারি না।’

মহানবী (সাঃ) শিশু আলী (রাঃ) কে ইমান গ্রহণের বিষয় গোপন রাখতে বলেছিলেন

তখন সময়টা ছিল গোপন কার্যক্রমে, মুহাম্মদ (সাঃ) সতর্ক থাকতেন যেন বর্তমানেরেই তাঁর মিশন সম্পর্কে বাইরের লোকদের মধ্যে কিছু প্রকাশ হয়ে না পড়ে। তিনি (সাঃ) শিশু আলী (রাঃ) কে বলেছিলেন, ‘এই দ্বীন গ্রহণ করার ইচ্ছে না থাকলে তুমি যা দেখলে তা গোপন রাখবে।’

হযরত আলী (রাঃ) বিষয়টা গোপন রাখলেও তাঁর হৃদয় মন সত্য গ্রহণের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। তিনি নীরব থাকতে পারলেন না। পরের দিন প্রভাতেই তিনি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কে প্রশ্ন করলেন,

‘আপনি গতকাল আমাকে কি বলেছেন?’

তিনি (সাঃ) আলী (রাঃ) কে বললেন, ‘তুমি এ কথার প্রতি সাক্ষ্য দেবে যে, এক আল্লাহ ব্যতীত দাসত্ব লাভের উপযুক্ত আর কেউ নেই। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়, তুমি তাঁরই দাসত্ব করবে। সমস্ত মূর্তিকে পরিত্যাগ করবে।’

হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আলী (রাঃ) আর কোন প্রশ্ন না করেই বিশ্বনবীর আহ্বান কবুল করে তাঁর কার্যক্রমের সাথী হয়ে যান। নবী (সাঃ)-এর পরামর্শ মত তিনি তাঁর নতুন আদর্শ গ্রহণের কথা গোপন রেখেছিলেন।

মহানবী (সাঃ) প্রথমে আবদুল মুত্তালিবের পরিবারের সদস্যদেরকে দাওয়াত দিলেন

হযরত খাদিজা (রাঃ) ও নবী (সাঃ)-এর সাথে তিনি গোপনে নামাজ আদায় করতেন। যে সময়ে প্রকাশ্য আহ্বান করার আদেশ এলো তখন নবী (সাঃ) হযরত আলী (রাঃ) কে বললেন কিছু মানুষের আহারাদির ব্যবস্থা করার জন্য। এরপরে মুত্তালিব পরিবারের সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হলো।

তাঁরা একত্রিত হলে আহারাদির পরে বিশ্বনবী (সাঃ) তাদেরকে আহ্বান জানালেন, ‘আমি এমন এক আদর্শসহ প্রেরিত হয়েছি, যা এই পৃথিবী এবং আখেরাতের জন্য কল্যাণময়। আপনাদের ভেতর থেকে কে এই আদর্শ গ্রহণ করে আমার সাথী হবেন?’

আল্লাহর নবীর কথা শুনে উপস্থিত সবাই নীরব থাকলেও কিশোর আলী (রাঃ) নীরব থাকেননি। তিনি সর্বাগ্রে উঠে দাঁড়িয়ে নবী (সাঃ)-কে বললেন, ‘আমি এখানে সবার থেকে বয়সে ছোট।

আমার শরীর দুর্বল তারপরে আমি চোখের রোগে আক্রান্ত। তবুও আমি ঘোষণা করছি যে, আপনার আনিত আদর্শ আমি গ্রহণ করে আমি আপনার সাথী হয়ে গেলাম।’

আবদুল মুত্তালিব পরিবারের ইসলাম গ্রহণ বিষয়ে আফীফ কিন্দী (রাঃ) অনুশোচনা

হযরত আফীফ কিন্দী (রাঃ) তাঁর ইসলাম গ্রহণের পূর্বের একটা ঘটনা বর্ণনা করেন, তাঁর মামার বন্ধু ছিলেন নবী (সাঃ)-এর চাচা হযরত আব্বাস (সাঃ)। তিনি ইয়েমেন থেকে সুগন্ধি ক্রয় করে হজ্জের মৌসুমে বিক্রি করতেন।

তিনি বলেন, একবার হজ্জের মৌসুমে হযরত আব্বাসের সাথে মিনায় তাঁর দেখা হলো। তিনি দেখলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি সেখানে এলো এবং উত্তম পদ্ধতিতে অজু করে নামাজ আদায় করার জন্য দণ্ডায়মান হলো। তারপর একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক সেখানে এলো এবং পূর্বের ন্যায় সেও অজু করে নামাজ আদায়ের দাঁড়িয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে একজন মহিলা সেখানে এলেন এবং তিনিও অজু করে নামাজে দণ্ডায়মান হলেন। তিনি অবাক দৃষ্টিতে সে দৃশ্য দেখে হযরত আব্বাসকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হে আব্বাস! এরা এসব কি করছে? এরা কোন ধর্ম পালন করছে?’

আব্বাস (রাঃ) প্রশ্নকর্তা আফীফ কিন্দীকে জানালেন, ‘এটা আমার ভাতিজা মুহাম্মদ (সাঃ), তাঁর দাবী হলো আল্লাহ তাঁকে রাসুল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। একদিন নাকি রোম ও পারস্যের সমস্ত ধন-সম্পদ তাঁর অধীনে আসবে।

নাবালেগ যাকে দেখেছো, সেও আমার ভাই আবু তালিবের সন্তান। আর ঐ মহিলা হলো আমার ভাতিজা মুহাম্মদের (সাঃ) স্ত্রী খাদিজা (রাঃ)।’

ইতিহাসের ধারা পরিক্রমায় আফীফ কিন্দী যখন মুসলিম হয়ে রাসুলে (সাঃ) এর দলে শামিল হয়েছিলেন, তখন তিনি আফসোস করে সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে বলতেন, ‘আফসোস! সেদিন যদি আমি তাদের সাথে শামিল হয়ে চতুর্থ ব্যক্তি হতাম।’ (আব্দুল বার, আহমাদ, ইবনে জারীর)

কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, কার্যক্রমের সেই গোপন সময়ে নামাজের সময় হলে নবী (সাঃ) কোন নির্জন পাহাড়ের গুহায় চলে যেতেন। আরেক বর্ণনায় দেখা যায়, একদিন হযরত আলী (রাঃ) কে তাঁর পিতা আবু তালিব নামাজ আদায় করতে দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘বাবা, এ আবার কোন ধরণের ধর্ম পালন করছো?’

হযরত আলী তাঁর পিতাকে নিঃসংকোচে জবাব দিলেন, ‘আব্বা, মুহাম্মদ (সাঃ)-কে আল্লাহ রাসুল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। আমি তাঁর ওপরে ঈমান এনে তাঁর দেয়া আদর্শ অনুসরণ করছি।’

আবু তালিব তাঁর সন্তানকে বললেন, ‘মুহাম্মদ (সাঃ) তোমাকে কল্যাণের দিক ব্যতীত অন্য দিকে আহ্বান জানাবে না। তুমি তাঁর অনুসরণ করতে থাকো। তোমার চাচাত ভাইয়ের সাথে থাকো! এবং তাকে সহযোগিতা করো।’ (ইবনে জারির, ইবনে হিশাম)

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *