আবু-বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর জীবনের সোনালী অধ্যায় ও ইসলাম গ্রহণ

আবু-বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর জীবনের সোনালী অধ্যায় ও ইসলাম গ্রহণ

আবু-বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর পরিচয়

আবু-বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তাঁর উপাধি ছিল আতিক এবং সিদ্দীক। তাকে ডাকা হতো আবু-বকর বলে। তাঁর পিতার নাম ছিল উসমান এবং তাকে ডাকা হতো আবু কুহাফা বলে।

আবু-বকর (রাঃ) গর্ভধারিণী মাতার নাম ছিল সালমা এবং তাকে বলা হতো উম্মুল খায়রের বলে। বিশ্বনবী (সাঃ)-এর জন্মগ্রহণের দুই বছর বা কিছু বেশী দিন পরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তিনি।

মহান আল্লাহর মহিমা, তাঁরা দু’জন বয়সের যে ব্যবধানে পৃথিবীতে এসেছিলেন ঐ একই সময়ের ব্যবধানে ইন্তেকাল করেন।

আবু-বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর ব্যক্তিত্ব

আবু-বকর (রাঃ) দেখতে ছিলেন অপূর্ব সুন্দর। মদের সরোবরে বাস করেও তিনি কখনো মদ স্পর্শ করেননি। তাঁর সুন্দর চরিত্র, স্বভাব, জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার কারণে কুরাইশদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। দূরদর্শিতা এবং বিচক্ষণতা, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হবার কারণে মক্কায় তিনি ছিলেন সবার সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র।

মক্কাবাসীদের রক্তের ক্ষতিপূরণের অর্থ তাঁর কাছে জমা থাকত। আরব-বাসীর বংশ সংক্রান্ত জ্ঞানে আবু-বকর (রাঃ) ছিলেন বিশেষজ্ঞ। উচ্চমানের কাব্য প্রতিভা ছিল তাঁর। বাগ্মিতায় ও বক্তৃতায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। চরিত্রবান এবং দানশীলতার কারণে গোটা আরবে তাঁর সুনাম ছিল।

সমাজ জীবনে আবু-বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর চালচলন

আবু-বকর (রাঃ) ছিলে বন্ধু বৎসল এবং তাঁর অমায়িক মেলামেশার কারণে তাঁর বাড়িতে প্রতিদিন মক্কার সম্ভ্রান্ত লোকজন বৈঠকে মিলিত হতেন। তাঁর ব্যবসায়িক দক্ষতা ও মধুর ব্যবহারের কারণে অনেকেই তাঁর সাথে আগ্রহভরে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে আগ্রহী হত।
আবু-বকর (রাঃ) পিতা একজন বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সামাজিক মর্যাদা এবং ধন-সম্পদের কারণে সমাজে তাঁর মতামত সম্মান ও শ্রদ্ধা সাথে গ্রহণ করা হত। মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ না করলেও তিনি ইসলামের বিরোধিতা করেছেন বলে ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় না।

মক্কা বিজয়ের সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ হযরত আবু-বকরের মা উম্মুল খায়রের ইসলামী কার্যক্রমে প্রথম পর্যায়েই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বনবীর ইন্তেকালের পরে হযরত আবু-বকর (রাঃ) যখন খলীফাতুর রাসুল সে সময়ে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। হযরত আবু-বকরের পিতা হিজরি চৌদ্দ সনে ইন্তেকাল করেন।

আবু-বকর সিদ্দীক (রাঃ) যেভাবে ইসলামের দাওয়াত পান

ইসলামী দাওয়াতের সেই গোপন দিনগুলোতে হযরত আবু-কবর (রাঃ) একদিন তিনি হযরত খাদিজা (রাঃ) এর ভাতিজা হাকিম ইবনে হিজামের বাড়িতে বসে ছিলেন।

এমন সময় হাকিমের দাসী এসে হাকিমকে জানালো, ‘আপনার পিতার বোন আজ বলছিলেন যে, তাঁর স্বামীকে মহান আল্লাহ নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম কে যেভাবে নবী করে প্রেরণ করলেন।’

এ কথা শোনার সাথে সাথে হযরত আবু-বকর (রাঃ) সেখান থেকে উঠে নবী (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন হাকিমের দাসী যা বললো তা সত্য কিনা। (ইবনে কাসীর, যুরকানী-শরহে মুওয়াহেব)

নবী (সাঃ) জানালেন হাকিমের দাসী যা বলেছে তা অবশ্যই সত্য। সিদ্দীকে আকবর কোন প্রশ্ন করলেন না। প্রশ্নাতীত-ভাবে নবীর হাতে হাত দিয়ে তিনি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। পরবর্তীতে বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর এই মহান বন্ধু আবু-বকর (রাঃ) সম্পর্কে প্রশংসা করে বলেছেন যে,

‘আমি যাকেই ইসলামের দিকে আহ্বান করেছি, সেই কিছু না কিছু প্রশ্ন করেছে, চিন্তা-ভাবনা করেছে। পক্ষান্তরে একমাত্র ব্যতিক্রম ধর্মী ছিলেন আবু-বকর। তিনি কোন প্রশ্ন না করে, কোন চিন্তা-ভাবনা না করে, সামান্য ইতস্তত না করে সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।’ (ইবনে ইসহাক, আব্দুল্লাহ ইবনে আল হোসাইন আতিমিযী)

গবেষকগণ বলেন, হযরত আবু-বকরের ইসলাম গ্রহণের বিষয় থেকে একটা ব্যাপার অনুমান করা যায় যে, বিশ্বনবী (সাঃ) প্রথম পর্যায়ে আল্লাহর শিখানো কৌশলে ইসলামের দাওয়াত দিতে একান্ত নিজস্ব পরিমণ্ডলে কাজ করে যাচ্ছিলেন।

ক্রমশ: দিন যত গড়িয়ে যাচ্ছিল ততই এ কাজ সম্পর্কে নিজস্ব আত্মীয়-স্বজনের ভেতরে একটা স্পষ্ট ধারণা বিস্তার করছিল। আত্মীয়-স্বজন অনুভব করছিল, মুহাম্মদ (সাঃ) প্রচলিত আদর্শের বিপরীত একটা নতুন আদর্শ উপস্থাপন করেছে এবং সেসহ বেশ কয়েকজন সে আদর্শের অনুসরণ করছে।

তাঁরা বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি, এ কারণে বোধহয় তাঁরা বিশ্বনবী (সাঃ)-এর আনিত জীবন পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন কৌতূহল প্রদর্শন করেনি।

পরিচিত মহলে তাঁর সম্পর্কে তাঁরা কোন আলোচনাও করেনি। যারা বিষয়টা অবগত হয়েছিল তাঁরা বোধহয় বিশ্বনবীর কল্যাণকামীই ছিল। এ কারণে তাঁরা কোন বিরোধিতা করেনি বা সমাজের সর্বত্র নবী (সাঃ)-এর নামাজ আদায় সম্পর্কে কোন কথা কাউকে বলেননি।

যেমন হযরত খাদিজা (রাঃ) এর ভাতিজা হাকিম এবং তাঁর দাসী ও আবু-তালিব, তাঁরা কারো কাছে কিছু জানালে অবশ্যই প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতের কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হত। (সীরাতে সরওয়ারে আলম, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১২০)

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉