নবী ও রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব এবং ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক কৌশল

নবী ও রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব এবং ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক কৌশল

নবী ও রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব

এই পৃথিবীতে নবী ও রাসুলদেরকে প্রেরণ করা হয় পথভ্রষ্ট মানুষকে সত্য ও সহজ সরল পথ প্রদর্শনের লক্ষ্যে। তাদের প্রধান দায়িত্বই হলো, পৃথিবীর মানুষকে সমস্ত দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁরই গোলামির দিকে আহবান করা।

একমাত্র আল্লাহকেই সমস্ত শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করা, তাঁকেই প্রতিপালক হিসেবে মান্য করা, মানুষের কর্তব্য, এই কর্তব্য পালনের দিকেই মানুষকে আহ্বান করাই হলো রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্বই সমস্ত নবী ও রাসুল পালন করেছেন।বিশ্বনবীর এই কাজ কোন নতুন কাজ নয়।

এ কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মহান আল্লাহ বললেন, ‘তোমার পূর্বে আমি যে রাসুল প্রেরণ করেছি, তাকে আমি ওহীর দ্বারা অবগত করিয়েছি যে, আমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা শুধুমাত্র আমারই দাসত্ব করবে।’ (সুরায়ে আম্বিয়া, আয়াত নং-২৫)

দুনিয়াতে মনিব সাজা শাসকগনই নবী ও রাসুলদের অন্তরায় মনে করেন

পৃথিবীতে যারা মনিব সেজে বসে আছে, যারা দাসত্ব গ্রহণ করছে, মানুষকে যারা নিজেদের তৈরি আদর্শ, মতবাদ, আইন-কানুনদের বেড়াজালে বন্দী করে রেখেছে, তাদেরকে যেন সাধারণ মানুষ অস্বীকার করে, এই অনুপ্রেরণা মানুষের ভেতরে জাগত করা এবং তাদেরকে একমাত্র আল্লাহর দাস হিসেবে গড়ে তোলাও নবীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলের কাছে ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভেতরেই আমি রাসুল প্রেরণ করেছি। এই নির্দেশনা যে, তোমরা সবাই এক আল্লাহর দাসত্ব করো এবং আল্লাহর দাসত্ব করতে বাধা দেয় বা নিজেদের দাস বানিয়ে রাখে এমন সব শক্তিকে অস্বীকার করো।’ (সুরায়ে আল নাহল, আয়াত নং-৩৬)

মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে বিধান রচনা করেছেন নবী এবং রাসুলগণ তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন। এ দায়িত্ব পালন করেন নবীগণ। আল্লাহ তাঁর আইন-কানুন নিজে এসে কোন মানুষের কাছে দিয়ে যান না। তাঁর নিয়মের অধীনেই তাঁর আইন-কানুন মানুষের কাছে আসে।

আল্লাহর নিয়ম হলো তিনি অনুগ্ৰহ করে তাঁর বান্দাদের মধ্যে থেকেই একজনকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করেন এবং রাসুল এসে তাঁরা তাদের গোটা জীবনব্যাপী জীবন বিধান প্রেরণ করেন।

নবী ও রাসুলগন দায়িত্বপালতে অবহেলা করতেন না

পৃথিবীতে যত নবী এবং রাসুল এসেছেন তাঁরা তাদের গোলামি পালন কোন অবহেলা প্রদর্শন করেন না। মুহূর্তের জন্য তারা ভুলে যান না, কোন দায়িত্বসহ তাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আহ্বান করে বলেছেন, ‘হে রাসুল! তোমার কাছে তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা তুমি সঠিকভাবের পৌঁছে দাও।

যদি তুমি না পৌঁছাও তাহলে তুমি তোমার রেসালাতকে পৌঁছেতে না পারা গেলে, কোন দায়িত্বসহ তাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছে। না।’ (সুরায়ে আল মায়েদাহ, আয়াত নং-৬৭)

নবী দের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো তাঁরা সাধারণ মানুষকে ঐ পথের দিকে আহ্বান জানাবেন, যে পথকে আল্লাহ সিরাতুল মুস্তাকিম নামে অবিহিত করেছেন। এই পথের পরিচয় নবীগণ মানুষকে জানাবেন, এ পথে চলতে সাহায্য করবেন, মানুষ যেন এ পথে অগ্রসর হয়ে গন্তব্য স্থূলে পৌঁছতে পারে সেভাবে তিনি সহযোগিতা করবেন।

নবী ও রাসুলগনই আল্লাহর পরিচয় ঘটিয়ে দিতে দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছেন

সাধারণ মানুষ আল্লাহর পরিচয় জানে না। সত্য মিথ্যার পার্থক্য তাঁরা বোঝে না। কোন কল্যাণকর পথ আর কোনটা কল্যাণকর পথ তা মানুষ জানে না। মানুষকে এসব ব্যাপারে ঠিক নির্দেশনা দান করবেন নবীগণ।

মানুষ যেন নির্ভুলভাবে সহজ সরল পথে চলতে পারে এ কারণেই মহান নবীদের কাছে ওহী অবতীর্ণ করেন। মহান আল্লাহ ওহী প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘এই গ্রন্থ আমি তোমার প্রতি এ কারণে অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি মানুষকে ঘন অন্ধকারের ভেতর থেকে বের করে আলোর পথে নিয়ে আসতে পারো। তাদের প্রতিপালকের আদেশ ক্রমে স্বপ্রশংসিত মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর পথে।’ (সুরায়ে ইব্রাহীম আয়াত নং-১)

বিশ্বনবীকে প্রেরণ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদ প্রদানকারী, ভয় প্রদর্শনকারী এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল আলোক-বর্তনকারী প্রদীপ রূপে।’ (সুরায়ে আল আহযাব, আয়াত নং-৮৬)

নবী ও রাসুলগন মানুষদের দুনিয়ার জীবনে সত্য ও মিথ্যার পরিচয় ঘটিয়ে দিবেন

নবী পৃথিবীতে এসে মানুষকে সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্য বুঝিয়ে দিবেন। যারা নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামী দলে সামিল হয়েছে, তাদেরকে তিনি পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবেন এবং যারা ইসলামের বিরোধিতা করেছে, ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদেরকে তারা পরকালে জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করবেন।

তিনি আল্লাহর আদেশে এই মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানাবেন। তিনি নবুয়তের আলো দিয়ে সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত করবেন। তাঁরাই হবেন একমাত্র অন্ধকার যোগ্য নেতা। সুতরাং তাঁরাই তাহাই হলেন মানবজাতির পথ প্রদর্শক এবং একমাত্র আদর্শ নেতা। শ্রদ্ধা-ভাবে তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে এবং তাকে অনুসরণ করতে হবে।

এই নেতৃত্ব মানুষকে পরকাল সম্পর্কে অবহিত করবে। পৃথিবীতে মানুষের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে-এ সম্পর্কে মানুষকে অবগত করার দায়িত্ব হলো নবী রাসুলের।

মানুষের সমস্ত কাজের হিসাব মহান আল্লাহর কাছে পেশ করতে হবে। এ কথা মানুষকে জানানোর দায়িত্ব হলো নবী রাসুলের। কারণ আদালতে আখেরাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে প্রশ্ন করবেন, ‘তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্যে হতে কোন রাসুল আগমন করেননি, যারা তোমাদের কাছে আমার আয়াত পড়ে শোনাতো এবং আজকের দিনের সাক্ষাত সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করে দেবে?’ (সুরায়ে আনআম, আয়াত নং-১৩০)

নবীগণ মানুষকে তাঁর আসল গন্তব্যের দিকে অগ্রসর করাবেন। পরকালের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন এবং সে জীবন হলো অনন্তকালের। সুতরাং ঐ অনন্তকালে যেন তোমরা সুখে শান্তিতে থাকতে পারো, সে পাথেয় এই পৃথিবী থেকেই তোমাদেরকে সংগ্রহ করতে হবে।

অর্থাৎ নবী রাসুলগণ মানুষকে জড়বাদ আর নাস্তিক্যবাদী বস্তুবাদ থেকে সরিয়ে নীতিবাদীতে পরিণত করবেন। কাজ এবং দায়িত্বই হলো রাসুল ও নবীদের প্রধান কাজ।

মহানবীর (সাঃ) দায়িত্ব পালন, সাফল্যের তিন বছর

মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কৌশল শিক্ষাদান করেছিলেন সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কৌশল অনুসরণ করেই তাঁর উদ্দেশ্য এবং লক্ষের দিকে ক্রমান্বয় অগ্রসর হচ্ছিলেন।

তাঁকে যে উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ নবী হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন, এ সব কিছুই গোপন রাখা হয়েছিল। তাঁকে যে বিশ্ব বা সমগ্র মানুষের নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, এ সব কিছুই গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি সমস্ত মানুষের নবী এবং এর কার্যক্রমের দিকে আহ্বানের একটা বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল।

এ সব কিছুই গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি সমস্ত মানুষের নবী এবং এর কার্যক্রমের দিকে আহ্বান করা হয়নি। প্রথমেই এমন করা হলে ইসলামী দাওয়াতে সামনের দিকে আর এগোয় অগ্রসর হতো না।

নবী ও রাসুলদের কাজের প্রাথমিক কাজের সূচনা প্রক্রিয়া

শুরুতেই প্রকাশ্য কাজ করতে গেলে যে বিরোধিতা আসতো, সে বিরোধিতার কারণে একটা মানুষও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দলে সামিল হতেন না। প্রথমে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সমস্ত গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের কাছেই তাঁর আদর্শ পেশ করতেন, যারা ছিলেন ভদ্র মার্জিত এবং ধীর স্থির।

যথেষ্ঠ জ্ঞান বিবেক অধিকারী ও চুক্তি গ্রহণ করার যোগ্যতা সম্পন্ন। যারা নিছক আবেগ এবং অন্ধ কুসংস্কারকে বিশ্বাস করেন না, সত্যকেই গ্রহণ করবেন। সংকটের ব্যাপারে, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য যুক্তিসহকারে তুলে ধরলে যারা সত্যকে গ্রহণ করবে।

সংকটের ব্যাপারে যারা তীব্রতার পরিচয় দেয় এবং গোপনীয়তা রক্ষা করার ও চিন্তাশীলতার দুর্লভ গুণ যাদের ভেতরে বিদ্যমান। এই ধরনের গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ নির্বাচিত করে তাদের কাছে অত্যন্ত সংগোপনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মহান কার্যক্রমের দাওয়াত পেশ করতেন।

যারা ইসলাম কবুল করতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং তাদেরকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান করতেন। প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ ও অন্যদেরকে বিশেষ করে তাদের পরিচিত মহলে, আত্মীয়-স্বজনের ভেতরে বিশ্বনবীর শেখানো পদ্ধতিতে দাওয়াতে তায়ালা আনহু এর পক্ষে দাওয়াত করার জন্য আহ্বান জানাতেন।

হযরত আবু বকর (রাঃ) এর পক্ষে দাওয়াতের কাজ করার সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। তার সুন্দর চরিত্র, স্বভাব, জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি ও প্রচার কারণে কুরাইশদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। দূরদর্শিতা এবং বিচক্ষণতা, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হবার কারণে মক্কায় তিনি ছিলেন সবার সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র।

মক্কাবাসীদের রক্তের ক্ষতিপূরণের অর্থ তাঁর কাছে জমা থাকতো। আরব-বাসীদের বংশ সংক্রান্ত জ্ঞানে তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ। উচ্চমানের কাব্য প্রতিভা ছিল তাঁর। বক্তব্য ও বক্তৃতায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। চরিত্রবান এবং দানশীলতার কারণে গোটা আরবে তার সুনাম ছিল। বন্ধু বৎসল এবং তাঁর অমায়িক মেলামেশার কারণে তার বাড়িতে প্রতিদিন মক্কার সম্ভ্রান্ত লোকজন বৈঠকে মিলিত হতেন।

তাঁর ব্যবসায়ীক দক্ষতা ও মধুর ব্যবহারের কারণে অনেকেই তাঁর সাথে অগ্ৰহরের বন্ধু স্থাপন করতে আগ্রহী হতেন। এ সুবাদে তিনি অবস্থা বুঝে সেই ধরণের মানুষের কাছেই ইসলামের দাওয়াতে পেশ করতেন, যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করবে। কবুল না করলেও বিরোধিতা করবে না বা প্রকাশ করে দেবে না। হযরত আবুর বকরের পরামর্শ, তাঁর মতামত সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা হতো। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

 

👈পূর্বের পোষ্ট: ওহী সংরক্ষণে নবী (সাঃ) এর পোশাকে পবিত্রতা পরিছন্নতার শিক্ষা
সায়াদ (রাঃ) এর আত্মত্যাগ এবং ইসলামের ইতিহাসের প্রথম রক্তপাত পরের পোষ্ট 👉

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *